বিবর্ণ-৩য় পর্ব

0
438

বিবর্ণ-৩য় পর্ব
#লেখনীতে_শাহরিয়ার

সব কিছু গুছিয়ে নিজের রুমে চলে আসলাম। বিকেলে সকলের জন্য চা বানালাম। অনেক দিন বাবাকে নিজের হাতে চা বানিয়ে খাওয়াই না। বাবা আমার চায়ের খুব প্রশংসা করে। আজ খুব ইচ্ছে করছে বাবার মুখে নিজের প্রশংসা শোনতে। বিয়ের আগে প্রতিটা ছুটির দিন বাবার সাথে বসে চা খেতে খেতে অনেক গল্প হতো। বাবা মা আর ছোট ভাই সোফায় বসে টিভি দেখছে। আমি চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলাম। সকলের হাতে চায়ের মগ তুলে দিলাম। চায়ের মগে চুমুক দিয়ে বাবা আমার দিকে তাকালো। তারপর সেই আদর মাখা কণ্ঠে বাবা বলতে শুরু করলো।

বাবা: চা খুব সুন্দর হয়েছে মা। তোর কি কিছু লাগবে?

না বাবা আমার কিছু লাগবে না।

বাবা: অনেক দিন এক সাথে বসে গল্প করা হয়না। কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়না। একদিন সময় করে সকলে ঘুরতে যাবো।

বাবার কথা গুলো শুনে মনটা ভালো হয়ে গেলো। চায়ের মগ গুলো ট্রেতে তুলে নিয়ে রেখে সন্ধ্যার আগে আগেই আমি আরেক বার ছাদে উঠে আসলাম। কেননা জাহাঙ্গীরের সাথে যদি দেখা হয়ে যায় তবে কিছুটা সময় গল্প করা যাবে। জাহাঙ্গীরকে কেন জানি খুব আপন মনে হয়। ওর সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো বেশ রঙ্গীন মনে হয়। খুব বেশী আপন মনে হয় জাহাঙ্গীরকে। এই একদিনের পরিচয়ে মনে হয় জাহাঙ্গীর কত দিনের পরিচিত। ভাবতে ভাবতে ছাদে উঠে আসলাম। কবুতর গুলো আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছাদের সাথে লাগানো ছাদটায় জাহাঙ্গীর আসেনি দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

নিজেকে শান্তনা দিয়ে ছাদের এক কর্ণারে যেয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। হালকা বাতাস হচ্ছে। সে বাতাসে আমার খোলা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে উড়ে এসে আমার মুখের উপর পরছে। আমি মাঝে মাঝেই দু’হাতে তা সরিয়ে দিয়ে রাস্তার অপর পাশে থাকা বড় মাঠটার দিকে তাকিয়ে খেলা দেখছি। ছোট বড় অনেক মানুষ সেখানে খেলছে। মাঝে মাঝে যখন খুব জোড়ে চিৎকার করে তখন তার আওয়াজ কান অব্দি এসে পৌঁছায়। আমি এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে তাদের খেলা দেখছি। নিজের মন মানুষিকতার পরিবর্তন খুব দরকার আমার। তাই যা ভালো লাগছে তাই করার চেষ্টা করছি। নানান কথার মাঝে হঠাৎ আজাদের কণ্ঠ স্বর ভেসে আসলো কানে।

আজাদ: কি দেখছেন আর ভাবছেন এতো মনোযোগ দিয়ে?

চমকে ঘুরে তাকাতেই পাশের বিল্ডিং এ আমার থেকে কয়েকহাত দূরে আজাদ ও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি নিজেকে স্বাভাবিক করে আজাদের দিকে তাকিয়ে না তেমন কিছু না, কখন আসলেন আপনি ছাদে?

আজাদ: এইতো এসে দাঁড়ালাম। আপনার মন ভালো রয়েছে?

হুম আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে। আচ্ছা আপনি গতকাল এতো রাত পর্যন্ত বাহিরে কি করছিলেন?

আজাদ: তেমন কিছু না, জব শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিলো। আই টি সেকশনের কাজতো তাই মাঝে মাঝে গভীর রাত হয়ে যায়। আর আমার ও অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আর সব চেয়ে বড় কথা আমি বেশ উপভোগও করি। রাতের আঁধারে সোডিয়ামের আলো কিংবা কখনো কখনো জ্যোৎস্না রাত সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। আসলে এক কথায় বলতে গেলে আমি প্রকৃতি প্রেমী। প্রকৃতির মাঝে প্রেম ভালোবাসা সুখ খুঁজে বেড়াই। সেদিন রাতেও অফিস থেকে ফিরে বাড়ির সামনেই জ্বলতে থাকা সোডিয়াম লাইনের নিচে বসে ছিলাম। হঠাৎ করে এতো রাতে আপনাকে বাড়ির বাহিরে হতে দেখে কিছুটা চমকে উঠলাম। বুঝার চেষ্টা করলাম আসলে আপনি কে আর আপনার উদ্দেশ্য কি। যখন আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলাম তখন ছুটে আসা। এই হলো ঘটনা।
এবার আপনি সত্যি করে বলুনতো আপনি কেন এমন জঘন্য কাজ করতে গিয়েছিলেন। বাবা মায়ের সাথে ঝামেলা? নাকি বয়ফ্রেন্ডের সাথে সমস্যা?

আসলে কি করে বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। বাবা মা বা বয়ফ্রেন্ড কারো সাথেই আমার কোন ঝামেলা নেই। আসলে বিয়ের পর নিশ্চই কোন মেয়ের বয়ফ্রেন্ড থাকার ও কথা নয়। ঠিক তেমনি আমারও নেই। বাবা মায়ের পছন্দদ করা ছেলেকে বিয়ে করি দুই বছরের ও কিছু সময় আগে। আর বিয়ের কিছু দিন পর থেকে শুরু হয় আমার উপর নানান রকম অত্যাচার। কোন কারণ ছাড়াই সে আমার গায়ে হাত তুলতো। অকারণেই বকাবকি করতো। বাবা মায়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে সব কিছু নিরবে সহ্য করে যেতে শুরু করলাম। কখনো বাবা মা ভাই কাউকে কিছু জানাইনি। একটা পর্যায় এসে জানতে পারলাম আমার স্বামী একাদিক পর নারীতে আসক্ত। আমার চেয়ে তার জীবনে ঐসব মেয়েদের অধিকার বেশী। তবুও কিছু বললাম না। নিজেকে শান্ত রেখে যতটুকু সম্ভব তাকে সম্মান করে সে বাড়িতে থাকার লড়াই চালিয়ে গেলাম। দিন যত যাচ্ছিলো তার অত্যাচারের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকলো। কখনো কখনো মেরেতো রক্তাক্তও করে ফেলতো। জানেননা আমি কত যে তার হাত পায়ে ধরেছি, একটু আশ্রয় দেবার জন্য। আমি সব জেনেও তাকে কখনো কিছু বলিনি। ভেবেছি সে বাহিরে যা খুশি করুক তবুও বাড়িতে আমাকে একটু আশ্রয় দিক।

কিন্তু সব শেষ আর পেরে উঠলাম না। সে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো। শুধু যে বের করে দিলো তাও না সে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলো। আর এই সমাজে একজন ডিভোর্সি নারীকে মানুষ কতটা বাজে ভাবে দেখে, কতটা ছোট করার চেষ্টা করে তা আমি নিজের চোখে দেখেছি অনুভব করেছি। আমার দেখা মানুষ গুলোর ভিতর একামাত্র আপনাকেই আমি ভিন্ন দেখেছি। যে না জেনে না শুনে কারো বিপদে এগিয়ে এসেছেন। শান্তনা দিয়েছেন একজন বন্ধুর মত পাশে থেকেছেন। কিংবা এমনটাও হতে পারে আমি ডিভোর্সি এটা জানতেন না তাই এতোটা করেছেন।
বলতে বলতে চোখ দিয়ে আবার পানি পরছে হঠাৎ বুঝতে পারলাম আজাদ আর আমার মাঝে হাত দূয়েকের ব্যবধান রয়েছে। আজাদ অপর প্রান্ত থেকে টিসু এগিয়ে দিলো। আমি মাথা নিচু করে টিসুটা হাতে নিলাম।

আজাদ: আমাদের সমাজ বা সমাজের বেশীর ভাগ মানুষই অন্ধ। কেননা যতদিন পর্যন্ত না নিজের ঘরে অন্যের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়টা না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত বুঝতে পারি না। যে সেই মানুষটা কতটা দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনা সহ্য করছে। আমাদের সমাজের মানুষ গুলো কখনো খুব সহজে একজন নারীর পাশে সাহস হিসেবে সঙ্গী হিসেবে দাঁড়াতে চায়না। আমাদের সমাজ নারীকে সব সময় ছোট করে দেখাতে চায়। অথচ কোন পুরুষই নারী ছাড়া পূর্ণ নয়। সব খানেই, সব কাজে বা সব কিছুতেই নারীর অবদান অপরিসীম। অথচ আমরা পুরুষরা তা স্বীকার করতে চাই না। এটা আমাদের সব চেয়ে বড় অপরাধ। আমরা মুখ দিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলি কিন্তু বিশ্বাস করুণ যে ঘরে নারী নাই সে ঘরে আলো নাই। পুরুষের মনে শান্তী নাই। অথচ আমরা তা মানতে চাইনা। আসলে আমরা পুরুষরা কখনোই ছোট হতে চাইনা এটাই আমাদের সব চেয়ে বড় সমস্যা। আমিতো বলবো আপনি এই সমাজকে ভুলে যান। সমাজের মানুষ কি বলবে তা ভুলে যান। নিজের মত করে বাঁচুন। দেখবেন একটা সময় যারা আপনার পেছনে আজ বাজে কথা কটূকথা বলে চলছে। তারাই মাথা নিচু করে বলবে আপনার যোগ্যতার কথা।

আমি মুগ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীরের কথা শুনছি, একটা মানুষ কি করে এতোটা সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে। যত শুনছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। একটা মানুষ কত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা এই জাহাঙ্গীরকে না দেখলে জানতেই পারতাম না। অথচ সেও একজন পুরুষ। আর শাকিল ও একজন পুরুষ ছিলো যে কিনা আমার স্বামী হওয়ার পরেও দিনের পর দিন অত্যাচার আমার উপর অত্যাচার করেছে। সব সময় আমাকে নিচু দেখানোর চেষ্টা করেছে। কথায় কথায় শরীরে হাত তুলেছে। আর এই জাহাঙ্গীর তার চিন্তা ভাবনা কতই উচ্চ পর্যায়ের।

আজাদ: চলুন নেমে যাই পরে আবার কথা হবে। এখুনি আজান দিবে নামাজ পড়ে নিয়েন।

বলেই মিষ্টি করে হেসে দিলো। আমি ছোট বেলা থেকে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প শুনেছি। তার বাঁশির সুরের জাদুর কথা শুনেছি। আর আজ চোখের সামনে আমি এক কথার জাদু করকে দেখতে পাচ্ছি যার কথার জাদুতে আমি মুগ্ধ হচ্ছি শুধু আমি নই, পৃথিবীর যেকোন মানুষ তার কথার জাদুতে তার কথার প্রেমে পরে যাবে। আমিও মুগ্ধ হয়ে তার কথা মত নিচে নামার জন্য পেছনে ফিরলাম। হঠাৎ

জাহাঙ্গীর: আচ্ছা শুনুন যদি রাতে খারাপ লাগে তাহলে ছাদে চলে আসবেন। আমি গভীর রাত পর্যন্ত ছাদে থাকি। আসলে অভ্যাস হয়ে গেছে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার।

আমি জাহাঙ্গীরের কথায় মাথা নাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। এতোটা মুগ্ধতা আমি এর আগে কারো কথায় খুঁজে পাইনি। একপা দু’পা করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি আর ভাবছি সত্যিই জীবন খুব সুন্দর। যদি জীবনকে সুন্দর ভাবে উপভোগ করা যায়। কারো কাছ থেকে সাপোর্ট পাওয়া যায় তবেই হয়তো জীবনকে রঙ্গীন করে সাজিয়ে নেয়া যায়। বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে বুকের মাঝে নিয়ে আমি নিচে নিজের রুমে চলে আসতেই দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসলো মাগরীবের আজানের ধ্বনি।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here