রংধনু-১ম পর্ব

0
404

সকালের নাস্তা বানিয়ে রেখে, বিছানায় শুয়ে দুই চোখ বন্ধ করার সাথে সাথেই কেউ একজন এসে চুল গুলো টেনে ধরলো। আমি ব্যথায় উফ বলে চোখ মেলে তাকাতেই মামী বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো। বড় লোকের বেটি কয়টা বাজে এখনো ঘুমাচ্ছিস?

কোথায় মামী নাস্তা বানিয়ে মাত্রই বিছানায় এসে শুইলাম।

মামী: আবার আমার মুখে মুখে তর্ক করিস। বলেই ঠাস ঠাস করে দু’টো চড় মেরে দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে ঘর বাড়ি সব পরিষ্কার কর। ছোট বেলায় বাবা মাকে খেয়ে আমার ঘাড়ে এসে উঠেছিস। এখন কি আমাকে খাবি?

কথা গুলো বলতে বলতে বের হয়ে গেলো মামী। ব্যথায় দু’চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পরছে। চোখের পানি মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করলাম।
বাড়ি ঘর পরিষ্কার হতে হতে বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে গেলো। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে আসলাম। এসে টেবিলে সবার জন্য নাস্তা বেড়ে দিলাম।

মামা, মামী, রিফাত আর ঝুমা এক সাথে খেতে বসেছে। আমি কার কি লাগবে তা বেড়ে দিচ্ছি।

ঝুমা: প্রিয়া আপু তুমি খাবে না?

প্রিয়া: তোমরা খেয়ে নাও আমি পরে খাবো।

রিফাত: কেন খাবার কি কম আছে যে তোমাকে পরে খেতে হবে? এসো আমাদের সাথে বসে খাও।

প্রিয়া: না ভাই তুই খা আমার এখন ক্ষিদে নেই।

মামা: কি হয়েছে তোর কি মন খারাপ কোন কারণে?

প্রিয়া: না না মামা আমি ভালো আছি, মন খারাপের কোন কারণ নেই।

সকলের আদিখ্যেতা দেখে মামী ভিতর ভিতর ফোঁস ফোঁস করছিলো, এটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলো প্রিয়া। তাই ভয়ে ভয়ে আর সম্পূর্ণ সাবধানতা অবলম্বন করে কথা বলতে ছিলো তার সামনে। কেননা কথায় একটু উনিশ বিশ হলেই সবাই বের হবার পর আবার অত্যাচার শুরু হবে তার উপর। নাস্তা শেষ করে একে একে সবাই যে যার মত বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলে। প্রিয়া সব কিছু গুছিয়ে নিজের নাস্তা নিয়ে বসতেই মামী চেঁচিয়ে বলে উঠলো তাড়াতাড়ি খেয়ে রান্না বসা। দুপুর হতে না হতেই তোর মামা চলে আসবে খাওয়ার জন্য।

প্রিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চটজলদি খাবার খেয়ে দুপুরের জন্য রান্না বসিয়ে দিলো। মামার একার আয়ে সংসার চলে। রিফাত আর ঝুমা দু’জনেই কলে পড়ে কত খরচ। প্রিয়া দুই বছর আগে ইন্টার পাশ করে। মামা ভার্সিটে ভর্তি করাতে চাইলেও প্রিয়া মামার মাথায় আর বুঝা বাড়াতে চায়নি বলে ভর্তি হয়নি। এমনিতেই মামী নানান রকম কথা বলতো স্কুল কলেজে পড়ালেখা করার সময়।

দুপুরের খাওয়া শেষ করতে করতে মামা মামীকে আর প্রিয়াকে বললো বিকালে একটু ভালো কিছু রান্না আর নাস্তার আয়োজন করার জন্য। ঘটক শহর থেকে এতটা ভালো প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। ছেলেরা বেশ বড় লোক। যদি কপাল ভালো হয় তবে এবার প্রিয়ার বিয়েটা হয়ে যেতে পারে।

মামী: কিছুটা রেগেই তোমার ভাগ্নি যে কপাল নিয়ে জন্মেছে তাতে তার কপালে বিয়ে হবে বলে মনে হয়না। শুধু শুধু কিছু টাকা পয়সা খরচ হবে।

প্রিয়া নিজেও মনে মনে বলে মামী মিথ্যা কিছু বলেনি। এর আগেও বেশ কয়েকবার পাত্র পক্ষ দেখে গিয়েছে। শেষে তারা মোটা অংকের যৌতুক দাবী করায় আর বিয়ের পিড়িতে বসা হয়নি তার। শ্বশুড় শাশুড়ির আদর পাবে না। এই বাহানায় মোটা অংকের যৌতুক তারা দাবী করতো।

মামা: যাবার আগে প্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো তুই চিন্তা করিস না। এবারের ছেলে পক্ষ বেশ বড়লোক। তারা কোন রকম যৌতুক নিবে না। শুধু তোকে পছন্দ হলেই হলো।

প্রিয়া কিছু বলে না, কেননা এখন পর্যন্ত কোন পাত্র পক্ষই বলেনি সে দেখতে খারাপ। প্রিয়া নিজেও জানে সে যথেষ্ট্য পরিমাণ সুন্দরি। তাকে অপছন্দ হবার কোন কারণ নেই। কিন্তু বাবা মা না থাকলে যা হয়। মামার পক্ষেও অনেক বেশী টাকা পয়সা খরচ করা সম্ভব নয়। মামা তার সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রিয়াকে বিয়ে দেওয়ার জন্য।

বিকেলের মাঝেই সব রান্না বান্না শেষ করে ফেললো প্রিয়া নিজেই। মামী তাকে সাহায্য করতে আসলো না। বরং বেশ বিরক্ত হয়েই কয়েকবার বললো। নিজের ছেলে মেয়েদের কথা একবারও ভাবতে চায়না পরে রয়েছে বোনের মেয়েকে নিয়ে।

আজ আরও একবার নিজের অনিচ্ছা থাকার পরেও আয়নার সামনে বসে চোখে কাজল নিলো। গত ঈদের পুরনো শাড়িটা পরলো। এরপর বেশ কয়েকবার আয়নাতে নিজেকে দেখে নিলো। না সব কিছুই ঠিকঠাক আছে।

সন্ধ্যার আগ মুহুর্তে শোঁ শোঁ শব্দ করে দু’টো কালো রঙের পাজেরো গাড়ি এসে বাড়ির উঠানে এসে থামলো। মামা ছুটে যেয়ে তাদের ঘরের ভিতর নিয়ে আসলো। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে সে সব কিছুই দেখলো প্রিয়া। এতো বড়লোক আর গরীব মানুষের বাড়িতে এসেছে বিষয়টা খুব ভালো ঠেকলো না তার কাছে। তবুও শেষ পর্যন্ত দেখার অপেক্ষা তার।

দু’টো গাড়িতে মাত্রই ছয়জন মানুষ এসেছে। শাড়ি আর গহনা দেখেই বোঝা যায়। বেশ আলিশান পরিবারের মানুষ এরা। দু’জন ড্রাইভার দু’টো ডালা নিয়ে তাদের পেছন পেছন বাড়ির ভিতর ঢুকলো।

ডালা দু’টো সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে মিসেস হামিদা বেগম বললো এগুলো আমরা মেয়ের জন্য আর আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি। মেয়েকে আমরা ছবিতে দেখেছি পছন্দ হয়েছে। একটু এগুলো পরে আমাদের সামনে আসতে বলুন।

মামী আর ঝুমা বেশ খুশি হয়ে ডালা দু’টো তুলে নিলো। পাশেই আজাদ চুপচাপ বসে রয়েছে। তার মনে খুব একটা আনন্দ দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে কনে দেখতে এসেছে।

ঝুমা: বিয়ের ডালাটা প্রিয়ার সামনে এগিয়ে দিয়ে আপু উনারা তোমাকে এগুলো দিয়ে বলেছে পরে তাদের সামনে যেতে।

প্রিয়া: কিছুটা চমকে এগুলো পরতে হবে কেন? কি আছে এর ভিতর বলে উপরে থাকা কাপড়টা সরাতেই চোখ কপালে উঠে গেলো প্রিয়ার। দামী শাড়ি আর অলংকার দিয়ে ভরা পুরো ডালা।

ঝুমা বলে উঠে ওয়াও! প্রিয়া বলে এতো দামী শাড়ি গহনা আমি কোন দিনও পরিনি আমি এসব পরতে পারবো না।

ঝুমা: আপু আমি তোমাকে পরিয়ে দিচ্ছি।

প্রিয়া: আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে যদি তাদের আমাকে পছন্দ না হয়, শেষে এসব খুলে দিতে হবে। তখন কতটা খারাপ লাগবে একবার ভেবে দেখেছিস? ভীষণ লজ্জার বেপার।

ঝুমা: তাদের তোমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে বলেই এসব নিয়ে এসেছে। তাছাড়া বরটা কিন্তু বেশ সুদর্শন। যদিও বয়স তোমার তুলনায় একটু বেশী কিন্তু সত্যিই অনেক সুন্দর। তোমারও খুব পছন্দ হবে।

কথা বলতে বলতে মামীও চলে আসলো। প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো তোরতো দেখছি রাজ কপাল রে। এতো বড়লোক বাড়ির লোকজন তোকে দেখতে এসেছে। কত দামী শাড়ি গহনা। আমাদের জন্যও নিয়ে এসেছে।

প্রিয়া মনে মনে ভাবছে যে মামী সব সময় তাকে পুড়া কপালি বলেছে আজ সামান্য দামী শাড়ি গহনার জন্য তাকে রাজ কপালি বলছে। মানুষ কতইনা বিচিত্র। কিন্তু বিয়েটা না হলেই হাজারটা কথা আর অত্যাচার করতে বিন্দু পরিমাণ দেরী করবে না মামী।

মামী রুম থেকে বের হতে হতে বললো তাড়াতাড়ি রেডি করে নিয়ে আয়।

ঝুমা আর দেরী না করে তাদের নিয়ে আসা শাড়ি গহনা আমাকে পরাতে শুরু করলো। এক সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই জেনো নিজে চিনতে পারছিলো না প্রিয়া মনে হচ্ছিলো একটা পুতুল দাঁড়িয়ে রয়েছে তার জায়গায়। তার কোন অস্তিত্বই নেই আর।

ঝুমা: আপু আমিতো তোমাকে চিনতেই পারছি না এখন।

প্রিয়া: আমি নিজেইতো নিজেকে চিনতে পারছি না।

মুখ পর্যন্ত শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে ঝুমা প্রিয়াকে নিয়ে হাজির হলো সবার সামনে। প্রিয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলো।

মিসেস হামিদা: প্রিয়াকে ডাক দিয়ে আমার কাছে এসে বসো মা।

ঝুমা প্রিয়াকে নিয়ে যেয়ে উনার পাশে বসিয়ে দিলো। মিসেস হামিদা আজাদের মা পাশে তার বোন আর তার পাশেই আজাদ আর তার খালাতো ভাই সুমন বসে রয়েছে। তার উল্টো দিকে সুমনের বাবা আর তার পাশেই ঘটক বসে রয়েছে।

মিসেস হামিদা প্রিয়ার মুখের উপর থেকে ঘোমটাটা সরিয়ে নিয়ে মাশা আল্লাহ একদম পুতুলের মত দেখতে লাগছে। আমার ঘর আলোকিত করার জন্য আর কিছুই চাইনা আমার। আজাদের খালাও বলে উঠলো বেশ মানাবে আজাদের সাথে। প্রিয়ার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে সে আর চোখে আজাদের দিকে তাকালো। তার চোখ অন্যদিকে আর মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই। সে কি আমাকে পছন্দ করেছে কি না। নাকি তার মনে অন্যকারো বসবাস।

এমন সময় মিসেস হামিদা প্রিয়ার মামার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আমরা বেশী দেরী করতে চাইনা। আজই আমরা মেয়েকে বিয়ে করিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হতে চাই। ঘটক নিশ্চই আপনাকে আগেই সব বলেছে?

মামা: জ্বি বলেছে কিন্তু এতো অল্প সময়ে কি করে সব আয়োজন করি বলুনতো।

মিসেস হামিদা: আপনাকে কোন কিছুই করতে হবে না। শুধু কাজী ডাকুন বাকি সব আমরা করছি।

মামা সব মেনে রাজী হয়ে গেলো, অল্প সময়ের ভিতর আমার বিয়েটাও হয়ে গেলো। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলাম আমার নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে। আজাদ এক দৃষ্টিতে বাহিরে তাকিয়ে রয়েছে আর আমার মানুষটার দিকে।

#চলবে…

রংধনু-১ম পর্ব
#লেখনীতেতে_শাহরিয়ার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here