রংধনু-১০ম (শেষ পর্ব)

0
774

রংধনু-১০ম (শেষ পর্ব)
#লেখনীতে_শাহরিয়ার

কখনো কখনো মনে হয় আমাকে খুব ভালোবাসে। আবার কখনো কখনো মনে হয়। সব কিছু শুধুই আমার ভাবনার জগৎ। সে শুধু আমার মন রাখতেই না বলা আবদার গুলো পুরণ করে চলেছে। এক সময় আজাদকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের উপর ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালে বাড়ি কেউ উঠার আগে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে কালো রঙের শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। কেন জানিনা শাড়িটা আমার ভীষণ রকম ভালো লাগে। ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে সোজা আজাদের কাছে ছুটে আসলাম। ভেজা চুল গুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে আজাদকে ডাক দিলাম। তিন চার বার ডাক দেবার পর আজাদ চোখ মেলে তাকালো তাড়াতাড়ি উঠেন সকাল হয়ে এসেছে।

আজাদ কিছু না বলে আমার হাত ধরে টান দিয়ে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো।

একি করছেন ছাড়েন আর উঠে পরেন।

আজাদ: উঠতে এখন ইচ্ছে করছে না।

তাহলে কি ইচ্ছে করছে?

আজাদ: এভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে।

শুধু কি শুয়ে থাকলে হবে? বেলা হচ্ছে তাড়াতাড়ি উঠে পরুণতো। বলেই আমি উঠার চেষ্টা করলে আজাদ আবার হাত ধরে টান দিয়ে নিজের বুকের মাঝে নিয়ে আসে। তারপর ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখতেই আমি দু’চোখ বন্ধ করে নেই। আজাদ শুধু কি জড়িয়ে ধরে রাখবো আরও কত কি।

এবার ভীষণ লজ্জা লাগতে শুরু করে দিলো। আমি একটা ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উনার দিকে তাকিয়ে উঠেনতো। নয়তো পানি নিয়ে এসে বিছানায় ঢেলে দিবো।

আজাদ মিটমিট করে হাসতে হাসতে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর তোয়ালে নিয়ে রওনা হলো ওয়াশ রুমের দিকে। কেন জানি না তার হঠাৎ এমন পরিবর্তনে আমার ভীষণ ভয় লাগছে সে কি সত্যিই আমাকে মেনে নিয়েছে নাকি পুরোটাই তার অভিনয়? সে কি করছে আমি জানি না। তবে আমার সাথে সব কিছু করার অধিকার তার রয়েছে। সব কিছুর ঊর্ধ্বে সে আমার স্বামী আর আমি তার স্ত্রী।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পরছে। জানি না এতো ভালোবাসার পর যদি কোন রকম অবহেলা জীবনে আসে তা আমি সহ্য করতে পারবো কিনা। আজাদ ওয়াশ রুম থেকে ঘরে এসে আমাকে ডাক দিতেই আমি দ্রুত দু’হাতে চোখের পানি মুছে তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করি।

আজাদ: একি তোমার চোখে পানি তুমি কান্না করছো কেন?

মুখে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে কই কান্না করবো কেন? জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম পোকা এসে চোখে পরেছিলো। তাই চোখ দিয়ে পারি পরছে।

আজাদ: এই না বলে তুমি আমাকে ভালোবাসো আর সেই ভালোবাসার মানুষের কাছেই মিথ্যা বলছো। তবে কি তুমি আমাকে সত্যি কারের ভালোবাসো না? সবটাই শুধু

কথটা বলার সাথে সাথেই আমি তার মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরলাম। একটা পর্যায় নিজ থেকেই আমার মুখ ঠোঁট চলে গেলো তার ঠোঁটের মাঝে। দীর্ঘ সময় পর তার কাছ থেকে নিজেকে সারিয়ে নিয়ে আমি আপনাকে ভালোবাসি। কেমন করে আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি জানি না। শুধু জানি আপনাকে ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার আমার রয়েছে। সেই অধিকারে সারা জীবন আমি আপনাকে ভালোবেসে যাবো। আমার ভালোবাসায় না আছে কোন মিথ্যা না আছে কোন পাপ। আমি আমৃত্যু আপনাকে শুধু আপনাকেই ভালোবেসে যাবো। আমি জানি না আপনার মনের ভিতর সত্যিই কি আমার জন্য কোন জায়গা হয়েছে কিনা। কিংবা কখনো আপনি মন থেকে আমাকে ভালোবাসবেন কিনা। তবুও আপনার কাছে আমার অনুরোধ আজ এখান থেকে আমরা চলে যাবো। এখানে যেমন হাসি খুশি ছিলেন ঠিক তেমনি হাসি খুশি থাকবেন আপনার বাড়িতেও।

সকাল থেকেই রোদের মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ করেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। তা দেখে মামা, মামী আমাদের আজকের দিনটাও থেকে যেতে বললো। আজাদ বললো নিজেদের গাড়ি কোন সমস্যা হবে না। অফিসে অনেক কাজ রয়েছে না গেলে খুব সমস্যা হবে। মামা, মামী আর বাধা দিলো না। দুপুরের খাবার খেয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, সবাইকে ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে পরলাম।

আজাদ: গাড়ি চালাতে চালাতে কি খারাপ লাগছে?

হুম একটু একটুতো লাগছে।

আজাদ: আচ্ছা আবার সময় পেলেই আমরা বেড়াতে আসবো।

আজাদের কথা শুনে মন ভালো হয়ে গেলো। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। কখনো রোদ তো কখনো বৃষ্টি এর ভিতরেই এগিয়ে চলছে গাড়ি। হঠাৎ নিশাদ বাহিরে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো মা মা দেখো আকাশে ঐটা কি?

আমি আজাদ দু’জনই আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম রংধনু। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝেই তিনজনই গাড়ি থেকে নেমে নিশাদকে বললাম এটা হচ্ছে রংধনু। বেশ কিছুটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে তিনজন রংধনু দেখে আবার রওনা হলাম। গাড়ি দ্রুত গতিতে হাইওয়েতে এগিয়ে চলছে। বাহিরে কখনো বৃষ্টি আবার কখনো রোদের খেলা। দু’জন গল্প করছি আর নিশাদ পেছনের সিটে ঘুমিয়ে রয়েছে। কখন সময় গড়িয়ে রাত হয়ে এসেছে আর কখন ঢাকায় চলে এসেছি সেদিকে খেয়াল নেই আমার। এক সময় বাড়ির গেটের সামনে এসে হর্ণ দিতেই দারোয়ান দরজা খুলে দিলো। গাড়ি বাড়ির ভিতর ঢুকে পরলো।

গাড়ি থেকে নেমে নিশাদকে কোলে নিয়ে দরজা খোলে ভিতরে ঢুকতেই, মা আর আরিশা আমাদের দেখে ভীষণ খুশি হলো। তবে আজাদের দিকে তাকিয়ে মা অভিমানের সুরে বললো শ্বশুড় বাড়ি যেয়ে দেখি তুই একদম আমাদের ভুলেই গিয়েছিস। ফোন ও দেস নি আর ফোন রিসিভও করিস নাই কেন?

মায়ের এমন প্রশ্নে আমি কিছুটা চমকে উঠলাম। নিজের জিবে নিজেই কামড় দিলাম। সত্যিইতো গ্রামে যেয়ে মা আর আরিশার সাথে কোন রকম যোগাযোগ হয়নি। আমারতো ফোন নেই কিন্তু আজাদতো মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারতো।

আজাদ: মুখে হাসি ফুটিয়ে কি করবো বলো, গ্রামে বেশীর ভাগ সময় বৃষ্টি সেই সাথে ঠিকমত বিদুৎ থাকে না। তাই ফোন ওচার্জে দেয়া হয়নি। এজন্য বন্ধ হয়ে ছিলো।

মা: জানি জানি তো মামা শ্বশুড়ের সাথে রোজই আমার কথা হতো। যদিও আমি তাকে বলতে মানা করেছিলাম তোদের না জানানোর জন্য। তাই উনি জানায়নি। এবার তুই রুমে যা আমি একটু বউমার সাথে গল্প করি।

আরিশাও মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলতে থাকলো হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি যাও আমরা তিনজন বসে গল্প করি। আজাদ উপরে চলে যেতেই আরিশা বলে উঠলো ভাবী তুমিতো ভাইয়াকে জাদু করে ফেলছো।

চমকে উঠে মানে কি?

আরিশা: মানে এই যে ভাইয়া কত সুন্দর হেসে হেসে কথা বলছে।

মা: দোয়া করি এমনি করেই হাসি খুশিতে আবার মেতে উঠুক আমার ছেলেটা।

আমি মায়ের হাত ধরে বললাম দোয়া করবেন আমার জন্য। উপরে যেয়ে তিন জনই ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর সকলে যার যার রুমে চলে আসলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করেই আজাদ অফিসে চলে গেলো। আরিশা চলে গেলো ভার্সিটিতে আমি আর মা রান্না শেষ করে গল্প করে সময় কাটিয়ে দিচ্ছি।

দেখতে দেখতে দিন কেটে যেতে থাকলো। আজাদ সপ্তাহে দু’দিন করে এখন আমাদের ঘুরাতে নিয়ে যায়। সে নাকি আগের মতই হয়ে গিয়েছে আরিশা আর মা বলে। আর এসব কিছুই নাকি আমার জন্য হয়েছে বলে বেশ প্রশংসা করে দু’জন। শুনতে খুব ভালো লাগে। তবুও আজাদের মুখ থেকে ভালেবাসি কথাটা শোনার জন্য আমার যেন অপেক্ষার শেষ হচ্ছে না।

মেঘলা আকাশ, রাতের খাওয়ার পর ব্যালকনিতে আজাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। দু’জনের হাতেই কফির মগ। আজাদ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে খুব বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

হুম এখনতো বৃষ্টির সময় বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক।
বলতে না বলতেই বৃষ্টি শুরু হলো। আজাদ আমার হাত ধরে টানতে টানতে চলো আমার সাথে।

কোথায় যাবো?

আজাদ: চুপ চাপ আমার সাথে চলো কোন কথা না বলে।

আমি আর কথা না বলে আজাদের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। সিঁড়ির কাছে আসতেই বুঝতে পারলাম আজাদ আমাকে নিয়ে ছাদে যাবার জন্য এসেছে। ছাদে আসতেই আজাদ আমাকে নিয়ে ঝুম বৃষ্টির মাঝে নিয়ে বাচ্চাদের মত লাফাতে শুরু করলো। এই প্রথম মানুষটার মাঝে আমি বাচ্চামো দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। আজাদ কখনো আমাকে জড়িয়ে ধরছে কখনো বা আমাকে কোলে তুলে নিয়ে উল্লাস করছে। এমন সময় ছাদের সিঁড়ির কাছ থেকে আরিশা কাঁশি দিয়ে উঠলো। আজাদ আমাকে দ্রুত নিচে নামিয়ে দিলো। আমি বেশ লজ্জা পেয়ে ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকলাম।

আজাদ: দৌঁড়ে যেয়ে আরিশার কান টেনে ধরে ছাদে নিয়ে এসে খুব দুষ্ট হইছিস তাই না?

আরিশা: উফ লাগছে আমি কি করলাম। আমিতো ভেজার জন্য আসলাম।

আরিশার কথা শুনে হেসে দিলাম এরপর তিনজন এক সাথে গল্প করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম। আরিশা থাকা অবস্থাতেও আজাদ বেশ দুষ্টমি করে চলছিলো। মানুষটা সত্যিই একদম অন্যরকম। এমন মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়াটা সত্যিই আমার ভাগ্য।

দেখতে দেখতে ছয় মাস কেটে গেলো এর ভিতর সকলে মিলে অনেক ঘুরেছি মজা করেছি। মানুষটার সাথে আমার দূরত্ব একদমই কমে গিয়েছে। সে আমাকে কখনো ভালোবাসি বলেনি। তবে তার অনুভুতি আমাকে বুঝিয়ে দেয় সেও আমাকে ভালোবাসে। আমি এখন তার চোখের ভাষা কিছুটা হলেও বুঝতে পারি পরতে পারি। হঠাৎ এক দুপুরে খাবার টেবিলে আমার মাঝে নতুন কারো অস্তীত্ব অনুভব করলাম। খবরটা সবার আগে আজাদকে দেবার জন্য আমি অপেক্ষা করে রইলাম।

সন্ধ্যার পর কলিং বেলটা বেজে উঠতেই আমি ছুটে এসে দরজা খুলতেই আজাদকে দেখতে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। আজাদ এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।

আজাদ: এই কি করছো এসব?

দূরে মা আর আরিশা দাঁড়িয়ে ছিলো। তাদের দিকে তখন আমার নজর ছিলো না। আমি আজাদকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আপনি বাবা হতে চলেছেন।

আজাদ: আনন্দে আত্মহারা হয়ে সত্যি?

মা আর আরিশাও আমার দিকে ছুটে আসলো। বাড়িতে আনন্দের যেনো শেষ ছিলো না। আজাদ পরদিন অফিসে যেয়ে সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো। আমার প্রতি বাড়ির সকলের কেয়ার বেড়ে গেলো।

নিশাদের কপালে চুমু দিয়ে আজাদকে বললাম আমার কিছু হয়ে গেলে ক্ষমা করে দিয়েন। আমি যদি অপারেশন থিয়েটার থেকে আর ফিরে না আসি। যদি নিশাদকে আর আদর না করতে পারি তবে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। এই প্রথম আজাদের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে আমার হাতের উপর পরলো। খুব শক্ত করে সে আমার হাত চেপে ধরলো। আমার কপালে চুমু এঁটে দিয়ে তোমার কিছু হবে না। তুমি ফিরে আসবে সুস্থ ভাবেই ফিরে আসবে। আমি তোমার অপেক্ষা করবো। আমার ভালোবাসার শক্তি তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।

আজাদের মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আমার মনোবল বেড়ে গেলো। আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকলাম।

কতটা সময় আমি অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম জানি না। তবে কান্নার শব্দে যখন চোখ মেলে তাকালাম। তখন আমার সব কষ্ট সব ক্লান্তী মুহুর্তেই শেষ হয়ে গেলো। সবাই আমার পাশে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজাদ ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললো আমাদের মেয়ে।

আজাদের হাত থেকে মেয়েকে বুকে নিয়ে কপালে চুমু দিয়ে আমাদের ভালোবাসার মেয়ে। নিশাদ ছুটে এসে হাত বাড়িয়ে দিতেই আরিশা ওকে আমার পাশে উঠিয়ে বসাতেই আমি নিশাদের হাতে তার বোনকে তুলে দিয়ে দু’জনকে এক সাথে বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম।

মনে মনে মামাকে আর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম। সত্যিই ভালোবাসার কোন বয়স হয়না। ভালোবাসার জন্য বিশেষ কোন কারণ লাগে না। সত্যিকারের ভালোবাসা ধনী গরীব বুঝে না। ভালোবাসার জন্য সত্যিকারের একজন নিজের মানুষ প্রয়োজন হয়। আজাদ আমার দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। আমি ভরসার হাত পেয়ে দু’চোখ বন্ধ করে নিলাম। আমাকে যে আরও অনেক দূর যেতে হবে এই ভালোবাসার মানুষ গুলোকে সাথে।

#সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here