প্রেমানুরাগ পর্ব-১০

0
303

প্রেমানুরাগ পর্ব-১০
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

বিয়ের দুইদিন পর রিসেপশনের দিন সিয়া সহ সবাই গাউন পড়বে। প্রেমাকে অনুরাগ বলেছে সে যেনো নীল গাউন পড়ে। প্রেমারো নীল ও কালো রঙের গাউনটা পছন্দ হয়েছিল। এখন ইশা কালোটা নিবে। প্রিয়া এবার এ্যাশ কালার গাউন নিয়েছে। সাদিবা নিয়েছে বেগুনী রঙের। আর ব্রাইড মানে সিয়ারটা হলো সোনালি রঙের।

সিয়ার পরিবার রিসেপশনের পার্টিতে এসে পড়েছে সন্ধ্যা নাগাদ। আর প্রিয়া ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে গেছে ওদের দেখাশোনা করাতে। জারিফের চোখ আড়ালে বারবার প্রেমাকে দেখছে। কিন্তু প্রিয়া ভাবছে হয়তো তাকে দেখছে! প্রেমা ও প্রিয়া একসাথেই দাঁড়ানো।

জারিফের আবারো খারাপ লাগা শুরু হয়। সে যাকে নিয়ে আড়ালে এতোদিন মনের শহর সাঁজিয়েছে আর সেই মানুষটাই আজ মনের শহরটাকে ধ্বংসস্তুপের পরিণত করে গেলো!
প্রেমার সেদিকে খেয়াল নেই। ছবি তোলার পর সে একটু ফুসরত পেয়ে ফোনে মনোযোগী। তার প্রাণপুরুষ তো আজ নিজের প্রানহরিণীর সাঁজ দেখার জন্য উদগ্রীব!
প্রেমা অনুরাগকে ছবি পাঠিয়ে ম্যাসেজিং করছে। তার অন্যদিকে ধ্যান নাই।

জারিফের হঠাৎ চোখ যায় প্রেমার পাশে বসা প্রিয়ার দিকে। মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। জারিফ চোখ সরিয়ে নেয়।
ইশা ও প্রিয়ম নতুন লাভ বার্ডের মতো লুকোচুরি করে চোখের ইশারাতে কথা বলে। লুকিয়ে কয়েকটা ছবি তুলেছে দুজনে।

রাত ১০টায় রিসেপশন শেষ হয়। সানাফ ও সিয়া আজকেই সিয়াদের বাড়িতে যাবে। সাথে প্রিয়া যাবে। প্রেমাকে বলেছিল কিন্তু প্রেমা রাজী হয়নি। অস্বস্তি বাড়াতে সে ইচ্ছুক না। প্রিয়া গিয়ে গাড়িতে আগে ভাগে জারিফের সাথেই বসে। জারিফ হকচকিয়ে গিয়ে বলে,

–আপনি এখানে কেনো? পেছোনে সানাফ ও সিয়ার সাথে বসেন।

প্রিয়া পাত্তা না দেয়ার মতো করে বলে,
–এই ভারী গাউন পরে আমি ব্যাকসিটে গাদাগাদি করে বসবো না। আমি ফ্রন্টসিটেই বসবো। আপনি তো ড্রাইভ করবেন? তো করেন। যে ফ্রন্টে বসতো তাকে ব্যাকে যেতে বলেন।

জারিফ হতাশ হয়। আসলে জারিফের পাশে জারিফের কাজিন রাতুল বসতো। এখন রাতুলকে ব্যাকসিটে বসতে বলে। জারিফের সব কাজিন জারিফের ছোট। এমনকি সিয়া ব্যাতিত কোনো বিবাহ উপযোগী মেয়ে কাজিনও নেই। জারিফের বাবা সবার বড়। আর মাও। তাদের ভাই-বোনদের সবার প্রথমে ছেলে। আর বাকিরা জারিফের থেকে কম করে হলেও তিন বছরের ছোট। আর যে মেয়ে কাজিন আছে তারা কেউই ক্লাস নাইনের উপরে পড়ে না।

________________

আরো একমাস চলে গেছে। প্রেমার চতুর্থ বর্ষের নতুন সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে ১০-১২ দিন হলো। এখন থিসিসের কাজও শুরু হয়েছে। যার জন্য ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছে। আর এদিকে অনুরাগের মুভির কাজ পুরোদমে চলছে। সেও ব্যাস্ত। প্রেমার সাথে রাতজেগে কথা বলতো আর সারাদিন মুভির কাজ সাথে ইংল্যান্ডের বন্ধুর সাথে বিজনেসের কিছু কাজ আবার নতুন ছোট একটা ব্যাবসা ইন্ডিয়াতেই শুরু করেছে সেটার প্রেশার। অনুরাগ কয়েকদিন মাথা ব্যাথা, জ্বরে ভুগেছে। এরপর থেকে প্রেমা স্ট্রিক্টলি মানা করেছে রাতজেগে কথা বলবে না। দুইদিন পরপর ফোনে কথা বলবে তাও সর্বোচ্চ রাত ১.৩০ পর্যন্ত। আর বাকি সময় ম্যাসেজিং ও ভয়েসে কথা বলবে।
অনুরাগ রাজী হচ্ছিলো না কিন্তু প্রেমার সাথে পেরে উঠেনি।

এদিকে সুহানা দেশাইয়ের সাথে অনুজ দেশপান্ডের রিলেশনশিপের গুজব রটে গেছে। অনুরাগের বাবার নির্মিত এই মুভিটাতে এক্সট্রা রোমান্স ছিল সাথে এ্যাকশন। এই কারনেই অনুরাগ কৌশলে মুভি থেকে সরে গেছে। না সরলে আবারো সুহানার সাথে গুজব রটতো। তখন সবাই সেটা বিশ্বাস করেই বসতো। যা অনুরাগের পারসোনাল লাইফের জন্য ক্ষতিকর। অনুজের সাথে সুহানার এটা দ্বিতীয় মুভি। এর আগে একটাতে করেছিল সেটাতেও কানাঘুষা হয়েছিল। তবে সুহানার তারপরের মুভি অনুরাগের সাথে হওয়ায় অনুজের সাথে হওয়া গুজব ধামাচাপা পরে আর অনুরাগের সাথে গুজব রটে গেছিলো। অনুজ সুহানা নাকি মিডিয়াতে কনফেস করেছে, ওরা একে অপরকে ডেট করছে।
তখন সুহানাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল যে,

“অনুরাগ খানের সাথে যেই আপনাকে নিয়ে সম্পর্কের গুজব ছড়িয়েছিল তা নিয়ে আপনি সবসময় সাইলেন্ট থাকতেন তার কারন কি?

সুহানা এই প্রশ্নে বিব্রত হয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

–দেখুন, আমি চুপ থাকতে পছন্দ করি কারন সত্য সামনে আসবেই। অনুরাগ খান তো পুরো ব্যাপারটা ক্লিয়ার করেছিল। তাই আমি সব সময় এইসব প্রশ্ন এড়িয়ে চলি। এখন আমার এড়িয়ে চলাকে আপনারা পজেটিভ সাইন ধরে নিলে আমার কিছু করার নেই।
(হিন্দিতে কথা গুলো বাংলাতে ট্রান্সলেশন করে লিখেছি।)

আরো অনেক প্রশ্ন করার পর সুহানা শেষ পর্যন্ত অনুরাগকে ভালো বন্ধু হিসেবে মিডিয়াতে পরিচয় করিয়েছে। মোট কথা, এখন মিডিয়াতে অনুরাগ ও সুহানার দুজনের স্টেটমেন্টের পর ওই গুজব গায়েব।

মহারাষ্ট্রের বাহিরেও অনুরাগকে যেতে হয়েছে শুটিংয়ের জন্য। এখন আন্ধার প্রদেশে গেছে। মুভিটা এ্যাকশন থ্রিলার আর তাতে অনুরাগ একজন আর্মি অফিসার। গাডচিরুলিতেও পরে যেতে হবে। তাই কিছুটা বাহিরের দেশের সাথে নেটওয়ার্কের সমস্যা হবে এমন জায়গাতেই শুটিং হচ্ছে। তাই অনুরাগ ও প্রেমার যোগাযোগ কম হচ্ছে।

সারিফ ও মিমের বিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে হবে। আসলে মিম নিজেই বলেছে একটু দেরিতে করতে। সারিফের কিছু সময় লাগবে নিজের ফ্রিল্যান্সিং করাটাকে গুছাতে। পড়ালেখা শেষ না করে সে পার্টটাইম জব করতে চাচ্ছে না। টিউশনি করায় দুইটা-তিনটা। হালকা পাতলা ফ্রিল্যান্সিং করে। মিমের পরিবার রাজী তবে সারিফ একটু সময় চাওয়াতে মিম নিজেই বলেছে কিছুটা পেছোতে বিয়েটা।

_________প্রেমার বাবা-মা প্রেমার বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। একটা বিয়ের কথাও হচ্ছে যা জারিফের বাবা-মা পাঠিয়েছে। জারিফের কোনো পছন্দ আছে কিনা তা জারিফের মা জারিফকে জিজ্ঞাসা করেছিল। জারিফ মনমড়া হয়ে বলেছে তার পছন্দ নেই।
কিন্তু জরিফের মা-বাবা জরিফের মন খারাপের কারন নিয়ে সিয়ার সাথে আলোচোনা করলে সিয়া তাদেরকে বলে,

জারিফের পছন্দ আছে। সাথে এটাও যে, প্রেমার অন্য কাউকে পছন্দ আছে এটা শুনে নাকি জারিফের মন ভেঙে গেছে। তবে প্রেমার কাকে পছন্দ এই নিয়ে প্রেমা কোনো খোলসা করেনি। হতেও পারে, বিয়ে এখন করতে চায় না তাই এমনটা বলে। নাহলে ভাবী হিসেবে তো কতোকিছু শেয়ার করে মানুষ। আর ইশা ও প্রিয়াও জানে না। প্রেমার বান্ধুবীরা সানাফের বিয়েতে আসার পর নাকি সিয়া ওদের কৌশলে জিজ্ঞাসা করেছিল প্রেমার পছন্দের কথা। তখন ওরাও জানায় তাদের জানামতে প্রেমার কোনো পছন্দ নেই।

ব্যাস! সিয়ার এসব বলাতে জারিফের বাবা-মা ধরেই নিয়েছে প্রেমা বিয়ে এখন করতে চায় না বলেই পছন্দ আছে তা বলেছে। তাই তারা প্রেমার বাবা-মায়ের কাছে প্রেমার জন্য জারিফের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। জারিফ এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য জবের পাশাপাশি কাজ করছিল। জারিফের ইচ্ছে সে শিক্ষক হবে। যেটাতে প্রেমা, সিয়া ও প্রিয়া পড়াশোনা করে সেটাতে। রেজাল্ট ভালো ছিল তবে পিএইচডির জন্য দেরি করছে। এখন তো তিন বছর হয়ে গেছে সে পিএইচডির পড়াশোনা সাথে জব করছে। তার জব ক্ষেত্রেও একটা ভালো এক্সপিরিয়ান্স হয়েছে। বায়োকোমেস্ট্রি তার ও সানাফের সাবজেক্ট। সানাফও পিএইচডির জন্য পড়াশোনা করছে জারিফের সাথে। চাইলে বিদেশ থেকে করতে পারতো তবে দুজনেই বাসায় বিবাহ উপযোগী বোন রেখে যেতে চায়নি। পিএইচডি চলাকালীন ভার্সিটিতে জবের এপ্লাই করেছে জারিফ। সানাফ এখনো এপ্লাই করেনি।

প্রেমার বাবা-মায়ের আপত্তি নেই। তাদের ছেলে পছন্দ সব দিক দিয়েই। এখন নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার জন্য সাপ্তাহিক ছুটির দিন তার ছেলে-মেয়েদের সামনে কথা তুলবে।

তারা তো জানেই না তাদের মেয়ে বিবাহিত!

চলবে ইনশাআল্লাহ,

ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here