প্রেমানুরাগ পর্ব-১২

0
138

প্রেমানুরাগ পর্ব-১২
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

প্রেমাকে কাঁদতে দেখে অর্ষা, প্রিয়ারা বিচলিত হয়ে যায়। ইশা ব্যাগটা রেখেই প্রেমার কাছে যায় তারপর প্রেমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলে,

–কি হয়েছে বাবু? কাঁদছিস কেন?

অর্ষা, মিম, নিশি ও প্রিয়াও প্রেমার কাছে গিয়ে বসে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। প্রেমা ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। প্রিয়া চট করে সানাফের ঘরের দিকে যায়। সানাফই প্রেমাকে সামলাতে পারবে। প্রিয়া সানাফের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দেখে সানাফ বিছানার এক কোনে মাথা নিচু করে বসে আছে আর আরেক কোনে সিয়া গুটিশুটি মেরে বসে আছে। প্রিয়া নক করলো। কারো রুমে নক না করে সে আর ঢুকে না। চঞ্চল প্রিয়া এখন অনেকটা বুঝদার হয়েছে। আগে হুটহাট কারো রুমে ঢুকে ভয় দেখাতো কিন্তু এখন নিজেকে সারাদিন ফ্রি সময়ে জারিফের কেমন মেয়ে পছন্দ? সেসব ভেবেই কাটিয়ে দেয়। বাচ্চামো কম করে।
সানাফ দরজায় নকের শব্দে মাথা তুলে তাকায়। সিয়াও তাকায়। সানাফ জবাব দেয়,

–ভেতোরে আসো।

প্রিয়া ভিতরে ঢুকে। সানাফ প্রিয়াকে দেখে বলে,
–ওহ তুই! কখন এলি?

প্রিয়া বলে,
–এই মাত্রই। প্রেমাপি আসতে বললো। এসে দেখি সে কেঁদে কেঁদে চোখ, মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তাই তোমার কাছে এলাম।

সানাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সিয়া চুপ করে আছে। সিয়া এতোটাও ভাবেনি। সিয়া ভেবেছিল, সত্যি সত্যি প্রেমার কোনো পছন্দ নেই। এখন ভুল বুঝে সব প্যাঁচ লাগিয়ে নিজের ভাইকে আরো কষ্ট দিলো!
সানাফ বলে,
–ওরে বল যে ওর ভাই সব ঠিক করে দিবে। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু হবে না। আমি জারিফকে বলে দিয়েছি।

প্রিয়া জারিফের নাম শুনে ভ্রুঁ কুঁচকালো। তারপর সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–জারিফ ভাইয়ার সাথে কি হয়েছে?

সানাফ সিয়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে প্রিয়াকে বলে,
–জারিফের সাথে প্রেমার বিয়ের কথা হচ্ছিলো।

প্রিয়া আঁতকে উঠে। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়ে গেছে তার। সে বিশ্বাস করতে পারছে না। দম বন্ধ লাগছে তার। এই কয়েক মাসে প্রিয়া জারিফকে এতোটাই মনে জায়গা দিয়েছে যে প্রতিরাতে তার চোখের পানির কারন হয়, জারিফ কি তাকে কখনো ভালোবাসবে? এসব নিয়ে কল্পনা ঝল্পনা করে। প্রিয়া জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিলে বলে,

–বিয়ে কি ঠিক?

সানাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–বাবা-মা ও জারিফের পরিবার রাজী। মৌ(প্রেমা) রাজী না। ওর নিজের পছন্দ আছে। তবে জারিফ এসব বিষয়ে জানতো না এটাই জারিফ বললো।

প্রিয়া কিছুটা স্বস্তি পায়। তারপর আবারো নিজেকে সামলে মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–জারিফ ভাইয়ের কি কেউ পছন্দের মানুষ আছে?

সানাফ ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–মৌ ওর ভালোবাসার মানুষ।

কথাটা খুব ভারী ও ধারালো শোনালো প্রিয়ার কাছে। কেউ ওর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করছে বলে ওর মনে হচ্ছে। এতোক্ষন চোখের কোনে জমে আসা জল এবার টুপ করে গড়িয়ে পড়লো। সে যাকে ভালোবাসে সেই মানুষটা তারই বোনকে ভালোবাসে! কতোটা বেদনাদায়ক হয় এটা! ত্রিকোণ প্রেমের সমাহার তিনটা মনে।
“যে যাকে ভালোবাসে সে তাকে ভালোবাসে না!”

সব একতরফা। একতরফাতে কেউ অধিকার দেয় না আর অধিকার থাকেও না। শুধু মনে মনে ভালোবাসা। এগুলো ক্ষতির কারন তখন হয় যখন মানুষের মেন্টালিটি ক্ষতির কারন হয়। নাহলে অশ্লিলতা ছাড়া ভালোবাসাই একতরফা। অন্যজনের মনে খবর অজানা অবস্থায় সৃষ্টিকর্তার নিকট তার ভালো চেয়ে পার্থনা করা একতরফার এক অনন্য অনুভূতি।

প্রিয়া কিছু না বলে চলে যায় নিঃশব্দে চোখ মুছতে মুছতে। সিয়া তখন প্রিয়ার দিকে তাকিয়েছিল। প্রিয়ার চোখ মোছাটা ওর বোধগম্য হলো না।

প্রেমা কিছুটা শান্ত হয়ে ওদেরকে বলে,
–আমি একজনকে খুব ভালোবাসি। সে আমার জীবনে অনিশ্চিত ও তার সম্পর্কে ভুল ধারনা নিয়ে তার থেকে দূরে সরে গেছিলাম। ভাগ্য আমাদের মিলিয়ে দিয়েছিল দার্জিলিংয়ে!

নিশিরা অবাক হয়। নিশি জিজ্ঞাসা করে,
–দার্জিলিংয়ে? কিন্তু কিভাবে? কখন?

প্রেমা লম্বাশ্বাস নিয়ে বলে,
–আমাকে তো কিডন্যাপ সেই করিয়েছিল।

ওরা অবাক হয়ে গেছে পুরো। মিম বলে,
–কে কিডন্যাপ করেছিল? সেদিন তুই বিষয়টা এড়িয়ে গেছিলি। কিন্তু আজ তোকে বলতে হবে।

প্রেমা ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–সুপারস্টার অনুরাগ খান।

অর্ষা হেসে উঠে। সাথে মিম ও নিশিও। প্রিয়া ও ইশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রিয়া এতোক্ষন একদম মনমড়া হয়ে সব শুনছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন কথা শুনে একদম হা হয়ে গেছে। অর্ষা বলে,

–তোর এই সিরিয়াস মোমেন্টেও জোক করতে ইচ্ছা করে! সেদিনও এভাবেই জোক করেছিলি।

প্রেমা অনুভূতিহীন চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার নিশি, মিম ও ইশা সিরিয়াস হয়ে প্রেমার দিকে তাকায়। প্রেমার মুখাবয়ব দেখে ওদের আর হাসি পাচ্ছে না। অর্ষাও হাসি বাদ দিয়ে সিরিয়াস হয়ে তাকায়। প্রেমা নিজের ফোন বের করে মেসেঞ্জারে অনুরাগের সাথে সর্বশেষ ম্যাসেজিং দেখায়। অর্ষা বেক্কলের মতো বলে,

–তুই না হেরে দেখতে পারোস না? এখন আবার এসব কি কস? আমার মাথা হ্যাং মারতেছে। ও নিশিরে! আমারো একটু পানি খাওয়া বইন। কোন সময় জানি আমি বেঁহুশ হইয়া যাই!

নিশি বিরক্ত হয়ে অর্ষার মাথায় চাটি মারে। অর্ষা সবসময় ড্রামাকুইন। নিশি বলে,

–সত্যি অষু! তোর বুদ্ধি কবে হবে? এটা সিরিয়াস মোমেন্ট!

অর্ষা চুপ হয়ে যায়। তারপর নিশি বলে,
–প্রেমা বল এবার। পুরো কাহিনী বল।

প্রেমা একটু থেমে ওদের পুরো কাহিনী শর্টকাটে বলে। সব শুনে সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। অনুরাগ খানের সাথে বিয়েও হয়ে গেছে! এটা একটা বিস্ময়কর খবর। সবার মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে। অর্ষা চোখ বড় বড় করে রাখা অবস্থায় প্রেমার হাত ধরে বলে,

–আমারে একটা চিমটি কাট তো। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু।

প্রেমা অর্ষার অভারএক্টিংয়ে বিরক্ত হয়ে সত্যি চিমটি কাটে জোরে। অর্ষা আর্তনাদ করে সরে যায়। তারপর চোখ ছোট ছোট করে প্রেমার দিকে তাকিয়ে নিজের হাত ডলতে থাকে।
এবার প্রিয়া মলিন কন্ঠে বলে,
–আপি, তুমি অনুরাগ খানকে ভালোবাসো এবং তার স্ত্রী। আর এদিকে জারিফ ভাই তোমাকে ভালোবাসে। পারিবারিক ভাবে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে তোমার জন্য। এখন সম্পর্ক খারাপ হবে কারন সে সিয়া ভাবীর ভাই। আর জেঠা-জেঠিমা কি তোমার ও অনুরাগ খানের সম্পর্ক মেনে নিবে?

প্রেমার মনে আবারো বিষন্নতা ও এক ঝাঁক শঙ্কারা উঁকি মারছে। কি হবে ভবিষ্যতে তা তার মাথায় আসছে না। ইশা বলে,

–শোন প্রেমা, তুই সানাফ ভাইকে একটু আস্তে ধীরে বোঝা। ঠান্ডা মাথায় বোঝাবি। ভাইয়াই পারবে ঠিক করতো সবটা।

প্রেমা সায় দেয়। সন্ধ্যার পর সবাই চলে যাবে। প্রিয়া ও ইশাকে থাকতে বলেছিল কিন্তু পরশু ইশার প্রেজেন্টেশন আর ইশারা আজ রাতে ও কালকে কাজ করবে। তাই ইশা চলে যাবে। প্রিয়া বিনা কারনেই থাকতে চাইলো না।

_________বাসায় ফিরে প্রিয়া মনমড়া হয়ে। প্রিয়ার মা জিজ্ঞাসা করে,
–কিরে! আমি তো ভাবলাম তুই আজকে ওখানে থাকবি। রাত ৮টা বাজে চলে এলি কেন? আর আসবি যেহেতু প্রিয়মকে বলতি নিয়ে আসতে। ও টিউশন থেকে ফেরার পথে তোকে নিয়ে আসতো। পরিক্ষা তো শেষ ওর। বন্ধুদের সাথে আড্ডা না দিয়ে জেঠার বাড়ি থেকে ঘুরেও আসতে পারতো।

মায়ের করা কোনো প্রশ্নের জবাব প্রিয়া দেয়নি। একদম নিশ্চুপে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। প্রিয়ার মা অনেকবার ডেকেও কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে চিন্তিত হন। ইদানীং তিনিও লক্ষ্য করছেন প্রিয়ার চুপচাপ হয়ে যাওয়াটা। চিন্তিত হয়ে চলে যান।

_______
জারিফ সন্ধ্যার পর থেকে বাইরে যাবার নাম করে বাসার ছাদে গিয়ে দুই প্যাকেট সিগেরেট একের পর এক ধোঁয়া উড়িয়ে চলেছে। সিগেরেট খাবার অভ্যাস তার বলতে গেলে নেই। মাঝে সাঝে বন্ধুদের সাথে দুয়েক টান দিতো। আর আজ দোকান থেকে দুই প্যাকেট বেনসন কিনে এনে নিঃশব্দে ছাদে গিয়ে সিগরেট খেয়ে কষ্ট ভুলার চেষ্টা করছে। যখন সে নিজেকে ব্যাস্ত রাখতে চায় প্রেমার খেয়াল থেকে তখনি যেনো প্রেমার খেয়াল তাকে চেপে ধরে। ভুলতে পারবে না জেনেও ভুলে থাকার চেষ্টাতে সে ব্যার্থ। কোনো কিছু না করেই আজ তার ভালোবাসা অন্য কারো ভালোবাসার মাঝে তৃতীয় ব্যাক্তি! কি করে নিজের মনকে বোঝাবে সে? ভালোবাসা যেমন সুন্দর অনুভূতি ঠিক তেমনি বিষাক্ত অনুভূতি।

চলবে ইনশাআল্লাহ,

ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here