প্রেমানুরাগ পর্ব-১৪

0
136

প্রেমানুরাগ পর্ব-১৪
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

অনুরাগ প্রেমার থেকে জেনেছে আপডেট। সানাফকে বলা কথাও জেনেছে। সানাফকে তারও ভুল মনে হয়নি। তার বোনটা যদি বেঁচে থাকতো তবে সেও এমন প্রটেকটিভ হতো। ভাগ্যে ছিলো না বলেই ছোট থাকতে মারা গেছে। অনুরাগ সামনের সপ্তাহে আসবে বলে জানিয়েছে। প্রেমাকে অনেক করে বুঝিয়েছে নিজের যত্ন নিতে। কয়েকদফা রাগারাগি করেছে ভেঙে পড়াতে। এতোটা ভেঙে পড়লে সামনে কি হবে না হবে সেটা সামলানো দুষ্কর হয়ে যাবে।

প্রিয়ম প্রিয়ার মুখ থেকে সবটা শুনে সানাফকে রাতের বেলায় জানিয়েছে। সানাফ অবাক হয়েছে সাথে চিন্তিত। এক বোনের জন্য প্রস্তাব এসেছে কিন্তু সে পছন্দ করে না তবে আরেক বোন পছন্দ করে। এখন জারিফ আবার প্রেমাকে পছন্দ করে। কোনটা আগে সমাধান করবে সেটাই সানাফ বুঝতে পারছে না। সানাফ প্রিয়মকে বলে,

–এখন কি করবো? সব তো প্যাঁচ লেগে গেছে!

প্রিয়ম ফোনের অপর পাশ থেকে অনবরত রুমে পায়চারী করতে করতে বলছে,
–সেটাই তো! জারিফ ভাইয়ের সাথে প্রিয়ার বিয়ের কথা তুললে ঝামেলা আমাদের পক্ষ থেকে হবে না মনে হয় কিন্তু জারিফ ভাই বা তার পরিবার!

সানাফ কপালে হাত রেখে চিন্তিত হয়ে বলে,
–আগে দেখতে হবে চাচ্চু প্রিয়ার বিয়ে দিতে রাজী কি না। চাচ্চু রাজী হলে আমি কিছুটা ম্যানেজ করতে পারবো আমার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বলে। চাচ্চুকে সকালে বলিস। আমি সন্ধ্যের সময় আসবো।

পরেরদিন,,
প্রেমা সকালের নাস্তা করতেও যায়নি। ও নিজেকে ঘর বন্দি করে রেখেছে। প্রেমার বাবা মেয়ের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তার বোঝা হয়ে গেছে মেয়ে তার রাজী না। এখন কিভাবে সিয়ার বাবা-মাকে বলবেন আর সম্পর্ক খারাপ হবার ভয় হচ্ছে। শুধু যে তার মেয় রাজী না তা না! তার ছেলেও বোনের পক্ষে। এখন ছেলেকেই বলতে হবে ভেবে সানাফকে নাস্তার টেবিলেই বলেন,

–সানাফ তুমি কিছু ভেবেছো? তোমারো কিন্তু সেটা শ্বশুর বাড়ি। তাই তুমি তাদের বুঝিয়ে বলো। আমার তো জারিফকে নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না তাই আমি একতরফা কিছুটা হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম। এখন তোমার বোনও রাজী না আর তুমিও না। দেখো কোনো রকম বোঝাও।

উঠে পরেন তিনি নাস্তার টেবিল থেকে। সানাফ নিজেও চায় সেই সবটা বোঝাবে। সিয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাকামোর কারনে যে এতোকিছু হয়েছে তা সেও বুঝতে পেরেছে। সানাফ অফিসে যাওয়ার সময় সিয়াকে বলে,

–তুমি আর ওই বাড়িতে কিছু বলো না। আব্বা-আম্মা কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবে, তোমাদের জামাই কথা বলবে। বুঝতে পেরেছো? আগ বাড়িয়ো কিছু বলবে না। আমি সবটা বলবো।

সিয়া চুপ করে মাথা নাড়ায়। এমনেই ভেজাল লেগে গেছে এখন সে আর কিছু বলতে বা করতেও চায় না।
__________

সন্ধ্যার সময়, প্রিয়ার বাবা-মা, প্রিয়ম ও সানাফ বসে আছে চুপ করে। সানাফ ও প্রিয়ম তাদের সবটা বলেছে। প্রিয়ার রুমের দরজা প্রিয়ম বাহির থেকে লাগিয়ে দিয়ে এসেছে। যা কিছু বলার প্রিয়ার অনুপস্থিতিতেই বলবে। প্রিয়াটাও আজ একদম চুপচাপ হয়েছিল। সকালের নাস্তাও খায়নি।
প্রিয়ার বাবা গম্ভীর হয়ে বলে,

–প্রিয়া এমনিতে বাচ্চা স্বভাবের আর ও পড়ালেখা করছে। মাত্রই তো অনার্সে ভর্তি করলাম। অনার্সে ভর্তির আগেও অনেক মেয়েদের বিয়ে হয় কিন্তু আমার মেয়ের মাঝে আমি বড়দের মতো ম্যাচুরিটি দেখিনা। সে ইদানীং হয়তো ম্যাচিওর বিহেভ করছে কিন্তু তাই বলে এখনি বিয়ে!

সানাফ ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে বলে,
–চাচ্চু আমি বলছি না প্রিয়াকে বিয়ে দিতেই হবে! প্রিয়া জারিফকে পছন্দ করে অনেকটা। আর জারিফের জন্যই সে নিজেকে ম্যাচিওর করার চেষ্টাতে আছে। বলতে গেলে ওর বদলানোর সব কিছু জারিফকে ঘিরে। এখন জারিফরা প্রেমার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে আর জারিফ প্রেমাকে পছন্দও করে। কিন্তু প্রেমা আমাদের অগোচরে এক প্রকার বাধ্য হয়ে বা নিজের ভালোবাসার জন্য এক সুপারস্টারকে বিয়ে করে নিয়েছে। আমি জারিফকে আগেই প্রেমার কাউকে পছন্দ আছে কথার প্রেক্ষিতে বলেছিলাম যেনো প্রেমাকে নিয়ে আশা না রাখে। তাছাড়া প্রেমার জন্য জারিফের পরিবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেও জারিফ এসব জানতো না। আমি আমার বন্ধুকে চিনি। তাও কালকে মাথা গরম করে ওকে অনেক রূঢ় হয়ে কিছু বলে ফেলেছিলাম। জারিফ নিজের কষ্ট চেপে যায়। সে খুব চাঁপা স্বভাবের। ওর কষ্ট ও সহজে ব্যাক্ত করে না। এখন প্রেমাকে সে পাবে না জেনে আর কিছু বলেনি আমায়। নিজের কষ্ট নিজের মাঝে রেখেছে। এখন প্রিয়া যদি নিজের ভালোবাসা দিয়ে জারিফকে আগলে রাখে তাতে প্রিয়াও খুশি থাকবে আর জারিফও নিজেকে সামলাতে পারবে। প্রিয়ার সাথে জারিফের খুনশুঁটি আমি দেখেছি। আমাদের প্রিয়া নিজের চঞ্চলতা দিয়ে সবার মন জয় করতে পারবে।

প্রিয়ার বাবা সবটাই শুনলো। প্রিয়ার মা এতোক্ষন পর বলে,
–মেয়ের বিয়ের বয়স যে হয়নি তা না। তবে আত্নীয়র মধ্যে যে ঝামেলা লেগে গেলো তা কি মিটবে? জারিফের পরিবার কি প্রিয়াকে মানবে? শেষে আমার প্রিয়ার কষ্ট হলে?

প্রিয়ম মাঝখান থেকে বিরক্তি নিয়ে বলে,
–আহ! মা, তুমি অযথা ভয় পাচ্ছো। ভাই তো বললোই যে সিয়া ভাবী জারিফ ভাইয়ের পছন্দ আছে সে কথা তার বাবা-মাকে বলেছে সাথে এটাও বলেছে প্রেমা হয়তো বিয়ে করতে চায় না বলেই অন্য পছন্দ আছে এটা বলেছে। তার মানে কি? ওনারা জানেন হয়তো রিজেকশন আসতে পারে। এখন যদি সানাফ ভাই ব্যাপারটা ওদের বোঝায় তাহলে সলভ হতে পারে।

সানাফ এবার বলে,
–কাকি তুমি চিন্তা করো না। আমি আগে আমার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথা বলি তারপর তোমরা প্রিয়াকে সবটা জানিয়ো। নাহলে তারা রাজী না হলে প্রিয়ার মন ভাঙতে পারে। আমি ব্যাপারটা দেখছি। শুধু এটা বলো তোমাদের কি জারিফকে পছন্দ? জারিফের সেপ্টেম্বর থেকে প্রিয়ার ভার্সিটিতে জয়েনিং। আর দুই মাস আছে। তোমরা আমাকে শুধু এটুকু বলো। ছেলে হিসেবে জারিফ খুব ভালো। প্রেমার যদি কোনো পছন্দ না থাকতো আর পরিবারের পছন্দে বিয়ে করতো তাহলে আমি চোখ বন্ধ করে জারিফকেই বোনের জন্য পছন্দ করতাম।

প্রিয়ার বাবা কিছুক্ষন মৌন রয় তারপর বলে,
–দেখো কথা বলে! কি বলে তারা। আর প্রেমার ব্যাপারটার কি করবে?

সানাফ ও প্রিয়ম খুশি হয়। তারপর সানাফ বলে,
–অনুরাগ খানকে সামনের সপ্তাহে আসতে বলেছি তারপর যা হবার হবে। আমি আগে এই প্যাঁচটা ঠিক করি তারপর সেটা দেখবো। আজ তাহলে যাই।

সানাফকে ওর চাচি রাতের খাবার না খাইয়ে ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত সানাফ খেয়েই বাড়ি ফিরলো। সিয়াকেও সে কিছু জানায়নি। আগে জারিফের সাথে কালকে অফিসের পর কথা বলবে। বাসায় এসে জানতে পারে প্রেমাকে দুপুরে ওর মা জোর করে একটু খাওয়াতে পেরেছিল। মেয়েটা ঘর থেকেও বের হয়নি। উদাস হয়ে বসে থাকে। সানাফ সিয়াকে বলে ঝাল করে নুডুলস বানাতে। প্রেমার মন খারাপের সঙ্গী নুডুলস। এখন সানাফ প্রেমার মন ভালো করার চেষ্টা করবে।

________
কৃষ্ণ অম্বর জুড়ে এক ফালি অর্ধ চন্দ্র। কোনো সময় চন্দ্রমা মেঘের আড়ালে লুকুচুরি খেলে। জারিফ নিজের রুমের ব্যালকনির ফ্লোরে বসে আছে। এই রুমটা সিয়ার ছিলো তারপর সিয়ার বিয়ের পর জারিফ এখানে শিফট হয়েছে আর জারিফের রুমটা এখন সিয়ারা গেলে থাকে।তিনটা বড় বেডরুম আর একটা ছোট করে গেস্টরুম ও ড্রয়িংরুম ও ডায়নিং এটাচড। জারিফের মন বিষন্ন। সব কিছু তার কাছে খাঁপছারা লাগে। সে চায় প্রেমাকে ভুলতে। এখন সে ভার্সিটির জবটা করবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত। নিকোটিনের ধোঁয়া তার একাকিত্বের সঙ্গী।

চলবে ইনশাআল্লাহ,

ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here