প্রেমানুরাগ পর্ব-১৯

0
137

প্রেমানুরাগ পর্ব-১৯
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

রাতের খাবার শেষে অনুরাগকে বিশ্রামের জন্য প্রেমার ঘরে নিয়ে যায়। প্রেমার বাবা প্রথমে প্রেমা ও অনুরাগের বিয়ের খবরটা জানতে পেরে কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়। প্রেমা যখন বাবার কাছে এসে আদুরে স্বরে মাফ চায় তখন তিনি আর রাগ করে থাকতে পারেননি। রুমের স্বল্পতার কারনে আজ অনুরাগ, সানাফ ও প্রিয়ম প্রেমার রুমে থাকবে আর প্রেমা, সিয়া, ইশা ও প্রিয়া সানাফের রুমে থাকবে। গেস্টরুম একটাতে প্রিয়ার বাবা-মা থাকবে। আজকে আর প্রিয়াদের বাড়ি ফিরতে দেয়নি প্রেমার মা।
অনুরাগকে প্রেমার সাথে কিছুক্ষন একা সময় কাটাতে দিয়ে ইশা, প্রিয়া ও প্রিয়ম রুমের বাহিরে যায়। প্রেমা পুরোটা সময় নির্বাক হয়ে ছিল। মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে না ভাবগতি। অনুরাগ একটু কেশে নিয়ে সগোউক্তি করে,

–রাজরানী!

এই একটা ডাকে সম্মোহিত করে তোলে। হৃদপিন্ডের রক্ত সঞ্চালন যেনো দ্রুততর হচ্ছে। প্রেমা মুখ নিচু করে খাটের কোনে পা গুটিয়ে বসে আছে। অনুরাগ আস্তে আস্তে কদম ফেলে এগিয়ে যায় তার লাজুকলতার কাছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারে প্রেমা রিতিমতো কাঁপছে। অনুরাগ আলতো ভাবে প্রেমার গাল স্পর্শ করে। আবারো জোরালো ভাবে কেঁপে উঠে প্রেমা। অনুরাগ চমৎকার হাসে। আফসোস! প্রেমা মাথা নিচু করে রাখায় তা দেখতে পেলো না। দেখলে হয়তো আরেক দফা ঘায়েল হতো। অনুরাগ ঘোর লাগা কন্ঠে সগোউক্তি করে,

“অচিন রাজ্যের একমাত্র রাজকুমারী তুমি,
আমার শূণ্য রাজ্যের পূর্ণতার রাজরানী। ”

মন আকাশে রংধনুর সাত রঙের বিচ্ছুরণে রাঙিত মনের অন্দরমহল। প্রেমা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে। লজ্জায় এখন কিভাবে তাকাবে সে! প্রেয়সীর লজ্জা কাটাতে এখন তাকে রাগানো প্রয়োজন। নয়তো একটিবারের জন্যও তাকাবে চোখের দিকে। অনুরাগ প্রেমাকে রাগেতে বলে,

–এই বাড়ির সবাই হি /টলার! কই একটু বউয়ের সাথে রোমান্স করবো তা না! আমাকে নাকি এখন শ্যালকদের সাথে থাকতে হবে! কেনো? আরেকটা এক্সট্রা রুম রাখলেই তো হতো। কিপটে শ্বশুর একটা!

প্রেমা আচানক এমন কথা শুনে মাথা নিচু রেখেই ভ্রুঁ কুঁচকায়। লোকটা এতো অসভ্য কেনো? প্রেমা মাথা তুলে তেজী কন্ঠে বলে,

–এই লজ্জাহীন পুরুষ! আপনি আমার বাবাকে কিপটে বলবেন না। নিজে একটা নিলজ্জ! আর আমার বাবাকে কিপটে বলে। বাসায় এতো মানুষ বলেই তো এই ব্যাবস্থা করলো। কালকে যদি এখানে থাকেন তো আমার সাথেই রাতে থাকতে পারবেন।

শেষের কথাটা বলে প্রেমা আবারো লজ্জাবতী লতার ন্যায় নুইয়ে যায়। অনুরাগ প্রেমার হাত ধরে টান দিয়ে বসা থেকে দাঁড়া করিয়ে নিজের বুকের উপর এনে ফেলে তারপর প্রেমার কোমড় পেঁচিয়ে ধরে বলে,

–তাহলে কাল আমাদের ফুলসজ্জা বলো?

প্রেমা দৃষ্টি নত রেখে আমতা আমতা করে বলে,
–কি সব বলছেন? চুপ করুন।

অনুরাগ প্রেমার কথায় ও তাকানোর লজ্জাতে বাঁকা হাসে। তারপর প্রেমার কানের কাছে মুখ এনে বলে,

–লজ্জা পেলে তোমাকে চেরি ফলের মতো লাগে। একদম লোভনীয়!

প্রেমা আড়ষ্ট হয়। কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। অনুরাগের কাছ থেকে ছাড়া পেতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখনো অনুরাগের দিকে তাকাচ্ছে না বলে অনুরাগ রম্যতার স্বরে বলে,

–আজকে আমার সিক্সপ্যাক গুলো তোমাকে বেশি আকর্ষন করছে কি? সেখান থেকে নজর সরাচ্ছো না যে! আমি জানি আমি চার্মি, গুড লুকিং, হ্যান্ডসাম! মেয়েরা ফিদা আমার উপর। এমনকি তোমার বোন গুলোও!

প্রেমা কপাল কুঁচকে রাগী চোখে অনুরাগের দিকে তাকিয়ে অনুরাগের বুকে আলতো করে কিল দিয়ে রাগী কন্ঠে বলে,

–খুব মেয়েদের ক্রাশ না! হওয়াচ্ছি তোমায়।

এই বলে অনুরাগের বাহুতে অনবরত কিল, ঘুষি দিতে থাকে। অনুরাগ হাসতে হাসতে প্রেমাকে নিয়ে বিছানায় পরে যায়। এরপর দুজনেই হাসতে থাকে।

_________
পরেরদিন,,
সিয়ার পরিবারকে, ইশার পরিবারকে, প্রেমার খালাদের ও প্রেমার ফুপিদের প্রেমার বাবা আসতে বলে দুপুরে ফ্যামেলি টাইমের জন্য। প্রিয়া, প্রেমাও আজকে ইশার সাথে তাদের মায়েদের সাথে হাত বাটাচ্ছে।

অনুরাগ ড্রয়িংরুমে বসে বারবার রান্নাঘরের দিকে নজর দিচ্ছে। আর তার শ্বশুরদের কথায় তাল মিলাচ্ছে। সানাফ ঘরে বসে ইম্পরট্যান্ট কিছু কাজ করছে আর প্রিয়ম ও সাদিফকে প্রেমার মা বাজারে পাঠিয়ে কাহিল করে ফেলেছে। সাদিবাতো সেলেব্রেটি দুলাভাইয়ের সাথে কতো কথা জুরে বসেছে। ছবিও তুলেছে তবে সেগুলো তো ফেসবুকে দিতে পারবে না এখন।
কিছুক্ষন পর কলিংবেলের শব্দে সাদিবা দৌড়ে দরজা খুলে। দরজার অপরপাশে জারিফ ও তার বাবা-মা প্রিয়মের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই ভিতরে এসে বসে। সাদিবা গিয়ে সিয়াকে জানায়। সিয়া তখন চিকেন ম্যারিনেট করে রেখেছিল ভাজবে বলে। সাদিবার ডাকাতে প্রেমা সিয়াকে যেতে বলে নিজে ভাজা শুরু করে। প্রিয়া কেবিনেটের উপর উঠে শশা খাচ্ছিলো। আর ইশা সোকেস থেকে প্লেট বাটি এনে ধুচ্ছে। প্রিয়া জারিফের আসার খবর পেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠে। তার যেতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। কিন্তু সে যাবে না। জারিফের সামনে যথা সম্ভব নিজেকে স্ট্রং রাখবে সে। কিন্তু মন তো সবসময় কথা শোনে না!

জারিফ এসে অনুরাগের পাশে বসে। জারিফ জানে অনুরাগ খান প্রেমার হাসবেন্ড। তাও সে কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই আছে। তার শুধু মনে আফসোস আছে সেটাও নিজের ভাগ্যের প্রতি। প্রেমা তো কোনোদিনও তার ছিল না। যা কখনো তার ছিলোই না তা নিয়ে আফসোস বা ভিত্তিহীন রাগের কোনো কারন নেই। কিন্তু মানবসত্তা বড় আজব! আফসোস তাদের হয়। জারিফেরও হচ্ছে নিজের ভাগ্যের প্রতি।
অনুরাগের সাথে জারিফ পরিচয় পর্ব সেরে এবার দুজনেই চুপ করে বসে আছে। অনুরাগও জানে জারিফের সাথে তার বউয়ের বিয়ের কথা হয়েছিল। দুজনের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছে। প্রিয়া রান্নাঘরের দরজার আড়াল থেকে দেখছিল। অনুরাগ ও জারিফকে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতে দেখে ভ্রঁ কুঁচকালো। যখন ব্যাপারটা ওর মাথায় ঢুকলো তখন হতাশ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ওদের দিকে এগিয়ে যায়। ওদের সামনে গিয়ে চোখ মুখে দুষ্টমির ছাঁপ এনে কোমড়ে দুই হাত ঠেকিয়ে কপাল কুঁচকে বলে,

–এই! আপনারা দুজন এমন বাংলার পাঁচের মতো করে বিরস মুখে বসে আছেন কেনো? একটু হাসলে কি দাঁত খুলে পরে যাবে নাকি!

অনুরাগ ও জারিফ আচমকা প্রিয়াকে দেখে ও এরূপ কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। প্রিয়া আবারো একই ভঙ্গিমায় বলে,

–এখন কি আপনাদের গায়ে তেলাপোকা ছেড়ে দিতে হবে? যাতে করে একটু হাসেন!

অনুরাগ এবার ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি টেনে বলে,
–আমার আর তোমার বোনের বাসর ঘরে ছেড়ে দিয়ো তেলাপোকা। তোমার লজ্জাবতী বোনটা যদি তেলাপোকার ভয়ে একটু হলেও রোমান্টিক হয়। এরপর তোমার বাসর ঘরে এই মহৎ কাজটা নাহয় আমি করে দিবো।

প্রিয়া ভাব নিয়ে বলে,
–আমি তেলাপোকা ভয় পাইনা। তবে মাঝে মাঝে গায়ে বসলে ভয় করে। আমি কোনটা ভয় পাই সেটা বলবো না। প্রেমাপি তেলাপোকা দেখলেই লাফালাফি শুরু করে দেয়।

অনুরাগ ভাবুক স্বরে বলে,
–ভাবতে হবে তুমি কি ভয় পাও!

প্রিয়া ভাব ধরে বলে,
–ভাবতে থাকেন আপনি।

তারপর প্রিয়া জারিফের দিকে তাকিয়ে দেখে জারিফ চুপ করে বসে আছে। প্রিয়া ওকে হাসানোর জন্য হুট করে বলে উঠে,

–আমি সারাজীবন সিঙ্গেল থাকবো গো দুলাভাই! আমার মতো উড়নচণ্ডীকে কেই বা বিয়ে করবে বলেন! কতো চেষ্টা করলাম একটা বিএফ বানাতে কিন্তু ফাটা কপালে একটাও ভালো পোলা প্রোপোজ করলো না। ফিলিং দুক্কু! এবার একটু পশ্চিম দিকে চেপে বসেন দুলাভাই। আমি এখানে বসবো। তারপর ছবি তুলে স্ট্যাটাস দিবো, হ্যাসট্যাগ মিঙ্গেল!

অনুরাগ প্রেমার কথায় হাসতে হাসতে সরে বসে। জারিফ ও অনুরাগের মাঝে প্রিয়া বসে পরে। তারপর নিজের ফোনটা জারিফের দিকে দিয়ে বলে,

–এই শান্ত ও নিশ্চুপ ছেলে! নিজেকে সহ আমাদের নিয়ে একটা কিউটি পিউটি সেলফি তোলো দেখি।

জারিফ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা তাকে তুমি করে বলছে! প্রিয়ার চঞ্চলতার সাথে তো সে পরিচিত তবে মাঝে কেমন যেনো ছন্দ কেটে গেছিলো। আবারো আগের মতো চঞ্চল হওয়ায় জারিফের ভালো লাগলো। মিষ্টি হেসে প্রিয়ার হাত থেকে ফোন নিয়ে সেলফি তুলে ওদের নিয়ে কয়েকটা। প্রিয়া প্রতিটা সেলফিতে একেক ভঙ্গিমায় ছিলো।

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here