প্রেমানুরাগ পর্ব-২১

0
142

প্রেমানুরাগ পর্ব-২১
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

জারিফ ব্যাপারটা বুঝলো না। প্রেমাকে নিয়ে সে আর ভাবতে চায় না। তাকে মুভঅন করতে হবে। নিজের জন্য না হোক তো পরিবারের জন্য। পরিবারের বড় ছেলে ও বাবা-মায়ের এক ছেলে সে। তাছাড়া প্রেমার সাথে তার কমিটমেন্ট ছিলো না। সর্বোপরি সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। সবাই নিজের কস্ট গুছিয়ে জীবনে সামনে এগোতে পারেনা কিন্তু জারিফ অতিরিক্ত ইমোশোনাল টাইপ না। তার মতে,

“যা আমার তা আমার হবেই হোক সেটা দ্রুত বা দেরিতে।”

জারিফ চাইলে প্রেমাকে প্রপোজ করতে পারতো অনুরাগের সাথে পরিচয়ের আগে কিন্তু হারাম সম্পর্ক বা অনির্দিষ্ট সম্পর্ক তার ভালো লাগে ন। এজন্যই সানাফও জারিফকে সিয়ার সাথে রিলেশনের ব্যাপারে বলেনি।

প্রিয়া ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে গ্রাউন্ডের সেকেন্ড ফ্লোরে চলে গেছে। যেখানে ব্যাডমিন্টন কোট ও দুইটা কমন রুম আছে। সচরাচর এই সময় কমন রুম ব্যাতিত গ্রাউন্ডের সেকেন্ড ফ্লোর ফাঁকা থাকে। প্রিয়া সিঁড়িতে বসে নাক টেনে চোখ মুছছে। অভিমানিনী অল্পতেই অভিমান করে বসে। কিছুক্ষন পর চোখ মুছে প্রিয়া নিজেই বাচ্চাদের মতো অভিমানী ও কাঁদো কাঁদো স্বরে বলছে,

–ওই রিনা ম্যামের সাথে তাকে কেনো হেসে হেসে কথা বলতে হবে? ম্যামটা কতো সুন্দর আর তার পারসেনালিটিও সুন্দর। এখন এই জারিফটা যদি রিনা ম্যামকে পছন্দ করে ফেলে? ডিপার্টমেন্টে কি আর ম্যাম ছিলো না! আর ম্যামদের সাথেই কেনো তার কথা বলতে হবে! স্যারও তো কতোগুলা আছে। তাদের সাথে কথা বললেই হয়। আমাকে তার কোনো সময়ই পছন্দ হবে না! হবেই বা কেনো? সে তো ম্যাচুরিটি খোঁজে। আমার মধ্যে তো তার বিন্দু মাত্র নেই। বাচ্চামো করা মেয়েকে কেনো সে ভালোবাসতে যাবে!

প্রিয়া টিস্যু দিয়ে চোখের পানি মুছছে। এদিকে প্রেমা, অর্ষা, নিশি, মিম, সারিফ, শান্ত, রিজন ও জারিফ সবাই প্রিয়ার বাচ্চা বাচ্চা অভিমানী কথাগুলো শুনছে। তখন প্রেমা যখন প্রিয়ার পেছোনে আসছিল তখন ক্যান্টিন থেকে বের হবার আগেই নিশি প্রেমাকে হাত ধরে আটকায়। তারপর নিশি রিজনকে বলে যেনো জারিফকে ডেকে আনতে। আসলে নিশিরা প্রিয়ার ব্যাপারে জানে আর প্রিয়া উঠে চলে যাবার পরে নিশি খেয়াল করে জারিফকে তাই সে কিছুটা বুঝেছে। রিজন জারিফের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে একটু সাথে আসতে বলে। আর জারিফের খাওয়া তখন শেষ। তাই জারিফ কলিগদের থেকে বিদায় নিয়ে ওদের সাথে আসে। প্রিয়াকে খুঁজতে ক্যান্টিনের পাসে যে গ্রুপ স্টাডি করার ও প্রিন্ট করার জায়গা আছে সেখানে কয়েক জনকে জিজ্ঞাসা করে, কোনো মেয়েকে দৌড়ে কোথাও যেতে দেখেছে কিনা? মানে উপরে গেছে নাকি?
সেখান থেকে জানতে পারে, প্রিয়া নিচে গেছে।

প্রেমা চেয়েছিল প্রিয়াকে চোখ মুছতে দেখে পাশে গিয়ে বসবে কিন্তু নিশি দেয়নি। জারিফ পুরো কথাই শুনেছে। জারিফের হাসি পাচ্ছে ব্যাপারটাতে। সে সামান্য কলিগের সাথে কথা বলাতে মেয়েটা বাচ্চাদের মতো নাক টেনে কাঁদছে। জারিফ হাসি চেপে গলা ঝেড়ে প্রিয়ার দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

–এই মেয়ে, তুমি এভাবে কাঁদছো কেনো?

প্রিয়া তখন পানি খাচ্ছিলো। হঠাৎ কারো গলার আওয়াজে হকচকিয়ে উঠে পানি নাক দিয়ে উঠে শ্বাস আটকে যায়। প্রিয়া কাঁশতে থাকে। জারিফ প্রথমে বুঝেনি কি হলো! যখন বুঝে তখন সে ভয় পেয়ে যায়। জারিফ এগিয়ে যাবে তার আগেই প্রেমা দৌড়ে প্রিয়ার কাছে গিয়ে প্রিয়ার পিঠ ঘষতে ও মাথায় হাত দিয়ে আলতো করে ঘষতে থাকে। তারপর পানি খাওয়ায়। প্রিয়া এবার ঠিক করে শ্বাস নিতে পারছে। জারিফ সেখান থেকে চলে যায় কারন তার অস্বস্তি হচ্ছিলো।
প্রিয়াকে কমন রুমে নিয়ে যায় আর অর্ডার করা খাবার গুলো শান্ত, রিজন ও সারিফ ক্যান্টিন থেকে নিয়ে আসে। মেয়েরা মেয়েদের খাবার নিয়ে যায় কমন রুমে আর ছেলেরা সিঁড়িতে বসে খেয়ে নেয়।

________
পরেরদিন,,
প্রিয়ার একটা ল্যাব ক্লাশ আছে প্রথমে। সেখানে ল্যাবের ইন্সট্রাকটরের সাথে আরেকজন থিউরির টিচার থাকে। প্রিয়া ল্যাবে একটু আগে আগে গেছে। তার কাছে ল্যাবের যন্ত্রপাতি ভালো লাগে। সেগুলোর সাথে ল্যাব শুরুর আগে কয়েকটা ছবি তুলবে। আইটির ল্যাবে বিভিন্ন লজিক গেট থাকে। ল্যাব এখন ফাঁকা। ইন্সট্রাকটর নিজের কেবিনে গেছে কি কাজে যেনো। সচরাচর ইন্সট্রাকটর থাকে ল্যাবের ভিতর আর সে নিজের ডেস্কে ল্যাব রিপোর্ট চেক করে বা কম্পিউটারের কাজ করে। আজকে ইন্সট্রাকটরের টেবিল ফাঁকা দেখে প্রিয়া খুশিই হয়। ইন্সট্রাকটরের উপস্থিতিতে প্রিয়া সেলফি তুলতে পারেনা। ফাঁকা ল্যাবে প্রিয়া খুশিতে নেচে নেচে সেলফি তুলছে আর এদিকে দরজার বাহির থেকে জারিফ ভিতরে কাউকে ঘুরঘুর করতে দেখে নিঃশব্দের দরজা খুলে। (দরজার কিছু অংশে কাচ দেয়া যাতে ভিতরে ক্লাশ হয় কিনা তা দেখা যায়)।

জারিফের এই ল্যাব কোর্সটা পেয়েছে তাই সে এখানে আসে। দরজা খুলে দেখে প্রিয়া প্রতিটা ইন্সট্রুমেন্টের সাথে ছবি তুলছে। জারিফ দরজাটা আস্তে করে লাগায় তারপর দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত গুঁজে দাঁড়ায়। কোনো শব্দ করেনা সে।
প্রিয়া সেলফি তুলতে তুলতে দরজার কাছাকাছি এসে জানালার দিকে মুখ করে ও দরজার দিকে পিঠ করে পুরো ল্যাব রুম কাভার করে সেলফি তুলতে চাইছে তখন মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরা দিয়ে স্ক্রিনে দরজার সাথে জারিফকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ বড় বড় করে ফোনের দিকে তাকায়। তারপর বিড়বিড় করে বলে,

–এটা আমার চোখের ভ্রম!

এটা বলে ফোন নামিয়ে চোখ ভালো করে কঁচলিয়ে আবার সেলফি তুলতে নেয় তো আবার জারিফকে দেখে এবার পেছোনে ঘুরে। প্রিয়াকে পেছোনে ঘুরতে দেখে জারিফ চমৎকার হাসে। প্রিয়া তা দেখে ক্যাবলা মার্কা হাসি দেয়।

____________
প্রিয়ম আজকে ইশাদের বাড়িতে এসেছে। গতকাল রাতে ইশা প্রিয়মকে বলেছে, ইশার বাবা-মা নাকি ছেলে দেখছে ইশার বিয়ের জন্য। প্রিয়ম একমাস হলো জব পেয়েছে। বেশ ভালোই স্যালারি প্রথম এক্সপেরিয়ান্স হিসেবে। তাছাড়া ছয় মাস পর স্যালারি বাড়বে। আজকে ইশার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে ছুটি নিয়ে এসেছে।

ইশার বাবা প্রিয়মের বরাবর বসে আছে। প্রিয়ম অনবরত ঘামছে। ইশার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে আর ছোট ভাইটা ক্লাশ ফাইভে পড়ে মাত্র। ইশার বাবা প্রিয়মের দিকে গম্ভীর স্বরে বলে,

–তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাও!

প্রিয়ম রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে আস্তে করে বলে,

–জ্বী মামা।

ইশার বাবা ভ্রঁ কুঁচকে প্রিয়মের দিকে তাকিয়ে আছে। সে তো কোনো বকাঝকা করেনি। তো এই ছেলে ঘামছে কেনো? উনি আবারো বলেন,

–তুমি জব পেয়েছো এক মাস হলো তাই তো?

প্রিয়ম আবারো আস্তে করে জবাব দেয়। এরপর ইশার বাবা বলেন,
–আমি পলক ভাই ও পল্লব ভাইয়ের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো। তোমার থেকে যা জানার আমার জানা হয়ে গেছে।

ইশার বাবা চায়ের খালি কাপটা টি টেবিলে রেখে নিজের স্ত্রীকে ডাক দেন। ইশার মা সেখানে আসলে ইশার বাবা বলেন,
–প্রিয়ম যেনো দুপুরে না খেয়ে না যায়।

প্রিয়ম অস্বস্তিতে হড়বড়িয়ে বলে,
–না না মামা। এতো কস্ট করতে হবে না মামীকে। আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি তো এখন বাসায় যাবো। আর এখন মাত্র পোনে বারোটা বাজে।

ইশার বাবা গম্ভীর স্বরে বলে,
–তুমি না খেয়ে যাবে না ব্যাস!

ইশার বাবা সেখান থেকে উঠে চলে যায়। ইশার মা নিজের ছোট ছেলে ইয়ানের রুমে প্রিয়মকে বসতে বলে। ইয়ান কিছুক্ষন পরেই চলে আসবে। বৃহঃপতিবার বলে হাফ ক্লাশ আজকে। প্রিয়ম সেই কথা মতো ইয়ানের রুমে যায়। ইশা এতোক্ষন নিজের রুম লক করে দরজার কাছে আড়িপেতে বসে ছিল। ইশার মা প্রিয়মকে ইয়ানের রুম দেখিয়ে রান্নাঘরে গেলে ইশা আস্তে করে দরজা খুলে ছোট ভাইয়ের রুমে যায়।

প্রিয়ম ইয়ানের রুমে বিছানার উপর বসে বসে বিছানার সাথে লাগোয়া ইয়ানের পড়ার টেবিল দেখছিল আনমনে। ইশা রুমে ঢুকে দরজা আস্তে করে লাগিয়ে প্রিয়মের সামনে যায়। প্রিয়ম এবসেন্ট মাইন্ডে ছিল তাই খেয়াল করেনি। ইশা চুটকি বাজানোতে সে বাস্তবে ফিরে। ইশা জিজ্ঞাসা করে,

–বাবার ভাবগতি দেখে তোমার কি মনে হলো?

প্রিয়ম এখনো ঘোরের মধ্যে আছে। আস্তে করে বলে,
–বুঝিনি আমি। জীবনের প্রথমবার এরকম পরিস্থিতিতে পরার পর আমি নার্ভাস হয়ে গেছিলাম। মামা বলেছে সে জেঠা ও বাবার সাথে কথা বলবে।

ইশা বলে,
–ওহ। আচ্ছা তুমি থাকো। একটু পর ইয়ান চলে আসবে। আমি রান্নাঘরে যাই।

ইশা চলে যায়।

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here