প্রেমানুরাগ পর্ব-৮

0
309

প্রেমানুরাগ পর্ব-৮
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

দেখতে দেখতে দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। অনুরাগ নিজের পারসোনাল বিজনেসের কারনে ইংল্যান্ড গিয়েছে। দুইটা প্রোডাকশন হাউজ থেকে আসা দুইটা মুভি অফারের একটা সে ক্যান্সেল করে দিয়েছে। আরেকটা থ্রিলার ও এ্যাকশন টাইপ আর রোমান্স নাই। তাই সেটাকে সাইন করেছে। অনুরাগের বাবাকে অনুরাগ বুঝিয়েছে যে অন্য নায়কদের নিলে তার প্রোডাকশন হাউজ আরো উন্নতি করবে। অনুরাগের বাবা প্রথমে রাজী হচ্ছিলো না পরে মিডিয়াতে অনুরাগের বন্ধু অনুজ দেশপান্ডের সাথে নতুন মুভি সাইন করেন। কো-একট্রেস সুহানা দেশাই। অনুজও অনুরাগের মতো সুপারস্টার।
প্রেমা তার ভাইকে বলেছে, সে একজনকে ভালোবাসে এবং খুব শ্রিগ্রই সবাইকে সেটা জানাবে। প্রেমার ভাই এতে দ্বিমত করেনি।

_____সিয়া ও সানাফ ভিডিও কলে কথা বলছে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর সিয়া সানাফকে জিজ্ঞাসা করে,

–আচ্ছা তুমি কি জানো? ভাইয়া কেনো ইদানীং এতো মনমড়া হয়ে থাকে?

সানাফ ভাবনার মতো করে বলে,
–সঠিক জানি না। তবে যেটুকু জানি তা যদি সঠিক হয় তো আমার কিছু করার নেই।

সিয়া উদগ্রীব হয়ে বলে,
–কি জানো তুমি? ভাইয়ার কি হয়েছে?

সানাফ ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–জারিফ প্রেমাকে ভালোবাসে।

সিয়া অবাক হয়। পরক্ষনেই খুশি হয়ে বলে,
–তো ভালো কথা। ওদের কথা বাড়িতে বললেই তো হয়। আমার ভাই তো ভালো জব করে। তোমার বাবা-মায়ের পছন্দ হবে বলে আমি মনে করি।

সানাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–বাবা-মায়ের পছন্দ হলেই তো হবে না! প্রেমারো পছন্দ হতে হবে।

সিয়া চিন্তিত হয় কিছুটা তারপর বলে,
–আমার ভাই তো দেখতে মাশাআল্লাহ। উজ্জল শ্যাম বর্ণ, লম্বাতেও ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি। সুঠাম দেহ। সব দিক দিয়ে পারফেক্ট। তোমাদের ভার্সিটিতে পড়াশোনা চলাকালীন তো তুমি, ভাইয়া ও রাকিব ভাইয়া ছিলে তোমাদের ব্যাচ থেকে জুনিয়রদের ক্রাশ বয়। অবশ্য তোমরা তিন বন্ধু ছাড়াও পুরো ভার্সিটিতে আরো চারজন ছিল ক্রাশ বয়। তবে পুরো ডিপার্টমেন্টে তোমরা তিনজন ফেমাস ছিলে। আর সেই তিনজনের একজন আমার ভাই আরেকজন আমার স্বামী। ফিলিং গর্বিত!

সানাফ সিয়ার শেষের কথায় হেসে ফেলেও আবার গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর বলে,
–তোমার সাথে যে আমার রিলেশন চলছিল সেটা কিন্তু জারিফ জানতো না। কারন তুমি, আমি চাইনি। বিশেষ করে আমি চাইনি কোনো ভাইয়ের সামনে বলতে আমি তার বোনের সাথে প্রেম করি! এখন জারিফ আমার বোনকে ভালোবাসলেও আমার বোন জারিফকে ভালোবাসে না।

সিয়া সানাফের দিকে কি প্রতিক্রিয়া দিবে তা সিয়া নিজেও বুঝতেছে না। সানাফ তা দেখে বলে,
–তুমি ও আমি যেমন একে অপরকে ভালোবাসি তেমনি প্রেমাও আরেকজনকে ভালোবাসে এবং সেই মানুষটাও প্রেমাকে ভালোবাসে। তাই জারিফ আমার বোনকে ভালোবাসলেও কিছু করার নাই। তোমাকে জানানো দরকার ছিল বলে জানিয়েছি। আমি আমার বোনকে জোর করতে চাইনা।

সিয়া হুট করে বলে উঠে,
–যদি প্রেমা ভুল কাউকে ভালোবাসে তো! এমনও হতে পারে প্রেমা যাকে ভালোবাসে সেই মানুষটা প্রেমার জন্য ঠিক না।

সানাফ মুচকি হেসে বলে,
–আমার বোন বুঝে শুনেই সম্পর্কে যাবে। আর যদি ভুল হয় তো সেটা ওই বুঝবে। তখনো ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি কিচ্ছু করতে বলবো না। ভুল মানুষকে ভালোবাসলে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনবো তবে এরপর যে ওর জারিফকেই নিজের জীবনে গ্রহণ করতে হবে তা কিন্তু না।

সিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–আমার ভাইকে তাহলে তোমারো পছন্দ না!

সানাফ ব্যাঘ্র কন্ঠে বলে,
–জোর জবরদস্তি যখন আমার সাথে হয়নি তখন প্রেমার সাথেও হবো না। তুমি কি জানো, আমার বাবা তার বন্ধুর মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিতে চাইছিলেন। বাবা তার বন্ধুর সাথে প্রায় অর্ধেক কথা সেরেও ফেলেছিলেন।

আঁতকে উঠলো সিয়া। সানাফ সিয়ার মুখের ভাবমূর্তি দেখে হাসলো। এমনটাই সে চাইছিলো। কথা যখন নিজের প্রিয় কিছুর হয় তখন এমনটাই হয়। নাহলে সিয়া তার ভাইয়ের কথাই টানতো। জারিফের ভালোবাসা সম্মান করে সানাফ কিন্তু তার কিছু করার নেই। সিয়াকে বুঝাতেই সানাফ অন্তরালের সত্য কথাটা বলে দিয়েছে। অবশ্য সানাফের বাবার বন্ধুর মেয়েরো অন্যজনকে পছন্দ আছে বলেই ব্যাপারটা সহজে মিটে গেছে।

ওদের দুজনের প্রেমার বিষয়ক কথা সেখানেই থেমে গেছে। টুকটাক আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দেয়।
_________

এদিকে প্রিয়া নিজের বাসায় গিয়েও কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ কি যেনো ভাবে। আগের মতো প্রিয়মের পকেটে হাত দেয়না। প্রিয়মের কেমন যেনো খটকা লাগে। চঞ্চল প্রিয়া হঠাৎ করে ভদ্র হয়ে গেলো! প্রিয়ম তার বোনের জন্য পকেটে এক্সট্রা টাকা এমনিতেও রাখে। কোথাও যাওয়ার সময় আলমারি থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে যায়। প্রিয়ম প্রিয়ার রুমের সামনে যায়। প্রিয়ার রুমের দরজা লাগানো। প্রিয়ম নক করে। প্রিয়া তখন ফেসবুকে জারিফের প্রফোইলে ঢুকে বসে আছে। ভর্তি পরিক্ষার সময় তো শেষ। প্রিয়া প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। জানুয়ারির প্রায় মাঝামাঝি সময়। সবে নুতন ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রিয়মের জুনে শেষ হবে মাস্টার্স। দরজায় নকের শব্দে প্রিয়া দরজা খুলে দেখে তার ভাই। প্রিয়া দরজা ছেড়ে ভিতরে এসে বসে। প্রিয়মও ভিতরে ঢুকে। তারপর বলে,

–কি অবস্থা তোর? তোর নতুন ক্লাস কেমন চলছে? নতুন ফ্রেন্ড সব?

প্রিয়া বলে,
–ভালো।

প্রিয়ম প্রিয়ার সংক্ষেপে উত্তর দিতে দেখে মৌন রয়। তারপর বলে,
–নতুন ভার্সিটি, নতুন বন্ধু, সবকিছু নতুন পেয়ে পুরাতন প্রিয়া যে হারিয়ে যাবে বুঝিনি।

প্রিয়া অবাক হয়ে বলে,
–মানে? আমি তো ঠিকই আছি!

প্রিয়ম হতাশ শ্বাস ফেলে বলে,
–আমি তোকে অনেক কিছুই বলি। তাই বলে যে তোকে আমি ভালোবাসি না তা কিন্তু না। সব ভাইদের আগলে রাখার ধরন এক না। সানাফ ভাই প্রেমাকে অন্যরকম ভাবে আগলে রাখে আর আমি অন্যরকম ভাবে। তোর সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগে বলেই করি। তোর বিয়ে হয়ে গেলে তো আর আমাকে এসে জ্বালাবি না। তখন তো আমার শান্তির দিন। কিন্তু সেই শান্তি তোকে এখনই দিতে কে বলেছে?

প্রিয়া চোখ ছোট ছোট করে বলে,
–আমার বিয়ে হয়ে গেলে তোর শান্তি! তাহলে যা। এখনই শান্তি উপভোগ কর। আমি ভালো বাচ্চা হয়ে গেছি। আর তোকে জ্বালাবো না।

প্রিয়ম প্রিয়ার মাথায় চাটি মেরে বলে,
–তোকে বলা না বলা এক। আমি ইনডাইরেক্টলি বলতে চাইছি যে তুই কিছু শেয়ার করতে চাইলে আমার সাথে করতে পারিস।

প্রিয়া বলে,
–সময় হোক। তখন তোকে সব বলবো। আর বাহিরে গেলে আসার সময় আমার জন্য পাঁচটা ফুলকো পুরি নিয়ে আসবি।

প্রিয়ম ভ্রুঁ কুঁচকে প্রিয়ার মাথায় আরেকটা চাটি মেরে চলে যায়। আর প্রিয়া মাথা ঘষতে ঘষতে দরজা লাগিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিন অন করে আগের কাজই করতে থাকে।

অনুরাগ ঘুম থেকে উঠে প্রেমাকে কল করে। লন্ডনে অনুরাগের ওখানে সকাল ৬টা ০৫ বাজে আর বাংলাদেশে দুপুর ১২.০৫ বাজে। প্রেমা ক্লাসে থাকায় নেট অফ। অনুরাগ প্রেমার রেসপন্স না পেয়ে উঠে নামাজ পড়ে নেয়। এখন চেষ্টা করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে তবে মাঝে মাঝে হয়ে উঠে না। প্রেমার ক্লাস আরো পনেরো মিনিট পর শেষ হবার পর সে ক্লাস থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে বসে। ছেলেরা ক্যান্টিনে খাবার আনতে গেলে মেয়েরা ফোন নিয়ে একে অপরের সাথে আড্ডাতে মশগুল হয়ে যায়। প্রেমা অনুরাগের মিসডকল দেখে টেক্সট করে দেয় যে সন্ধ্যার পর কল করবে। কাল ওখানকার সময় রাত ৮টার পর অনুরাগ ঘুমিয়েছে আর উঠেছে এখন। লং জার্নি করে টায়ার্ড হয়ে গেছিলো।

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here