প্রেমানুরাগ সূচনা_পর্ব

0
297

১.
চেয়ারের সাথে হাত, পা বাঁধা অবস্থায় বসিয়ে রাখা হয়েছে প্রেমাকে। হাত, পা বাঁধা থাকলেও মুখটা ঘন্টা খানেক আগে খুলে রেখে গেছে কিডন্যাপাররা। কিডন্যাপ হবার পর থেকে টানা দুই ঘন্টা মুখেও স্কচটেপ মারা ছিল তার। স্কচটেপ মারা অবস্থাও মুখ দিয়ে গোঙ্গানির শব্দ অনবরত করাতে স্কচটেপ খুলে মুখে কাগজ ঢুকিয়ে স্কচটেপ মেরে দিয়েছিল। বেচারির দম আটকে যেতে যেতেও যায়নি। প্রেমাকে পাহাড়া দিতে দুইজন বডিগার্ড টাইপ লোক ছিল। তারা প্রেমার চোখ-মুখ লাল হতে দেখে মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে বলেছে, যদি প্রেমা কোনো চিৎকার চেঁচামেচি করে তো আবারো এভাবে বেঁধে রাখবে। প্রেমার নিজের তখনকার অবস্থা চিন্তা করে আর চিৎকার করবে না বলে জানায় আর ওরা প্রেমার মুখ খোলা রাখে।

তিন ঘন্টা ধরে চেয়ারের সাথে বাঁধা। কি কারনে তাকে এখানে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে তা প্রেমা জানেও না। সে তো দার্জিলিংয়ের চা বাগানে ঘুরছিল। বিকেল গড়িয়ে গিয়েছিল প্রায় তখনও ফ্রেন্ডদের থেকে আলাদা একটু একাকি ঘুরতে ইচ্ছে করাতে তা না দমিয়ে বিকেলে বেরিয়ে পড়ে ঘোরার জন্য। চা বাগানে যারা চা সংগ্রহ করে তারা তখন একে একে চলে যাচ্ছিলো আর শীত শীত করছিলো হালকা। দারুন উপভোগ্য। প্রেমা কাশ্মীরি শাল জড়িয়ে হাঁটছে।

তখনি হুট করে তিনজন কালো পোশাকধারী মুখ আটকানো লোক এসে ওর মুখ চেপে ধরে অজ্ঞান করে নিয়ে আসে। শুনেছে দার্জিলিংয়ের চা বাগান এড়িয়া সন্ধ্যার পর পর্যটকদের জন্য সেফ না। মেয়ে পর্যটকদের জন্য তো আরো না। এখন তাও পুলিশ টহল দেয়, আগে তো অনেক ঘটনা শোনা যেতো। চুরি, ডাকাতি, রেপ, খুনের ঘটনা।
জ্ঞান ফেরার পর প্রেমা নিজেকে বন্ধি অবস্থায় পায় কিন্তু কারনটাই বুঝতে পারছে না। তার সাথে এখনো কিডন্যাপ ছাড়া খারাপ কিছু হয়নি। মাথায় ঢুকছে না কেনো তাকে কিডন্যাপ করা হলো! দুইজন বডিগার্ডকে জিজ্ঞাসা করতেও ভয় করছে। কিন্তু মনের মধ্যে কৌতুহল চেপে রাখতে পারছে না। শুধু শুধু কেনো কিডন্যাপ করবে? আর মুক্তিপণ চাওয়ার হলে তো তাদের এসে ওর কাছে জিজ্ঞাসা করার কথা যে বাড়ির নাম্বার কি? কোথায় থাকে? এসব। কই কিছুই তো জিজ্ঞাসা করলো না। আর তার জানা মতে সে দার্জিলিং এসে কারো সাথে খারাপ ব্যাবহার করেনি যে তুলে নিয়ে আসবে!

এতো সব ভাবনায় মাথায় জট পেকে এখন মাথা ব্যাথা করছে প্রেমার। খুধাও লেগেছে কিন্তু কি করবে? মনে ভয় নিয়ে প্রেমা মৃদু স্বরে ডাক দেয়,

–এক্সকিউজ মি! ভাইয়ারা!

দুইজন তাকায় প্রেমার দিকে। প্রেমা ওদের তাকানো দেখে ঢোক গিলে তারপর আবার বলে,
–একটু এদিকে আসবেন? কথা ছিল।

দুইজনের একজন এগিয়ে এসে বলে,
–What happened? Why are you calling us? Didn’t we tell you that not to shout!
(কি হলো? আমাদের ডাকছো কেন? আমরা কি তোমাকে বলিনি যে চিৎকার করো না!)

প্রেমা মিনমিনে স্বরে বলে,
–সেই কখন থেকে বেঁধে রেখেছেন! আমার খুধাও লেগেছে। আমাকে বেঁধে রেখে আপনাদের কি লাভ? আমি তো আপনাদের চিনিও না।

বডিগার্ডটার কথা গুলো পছন্দ হয়না। সে প্রেমার দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। চোখ মুখের অবস্থা দেখে প্রেমার বোধগম্য হচ্ছে না যে প্রেমা কি কোনো ভুল বললো কি না? বডিগার্ডটা এবার নিজ থেকে বললো,

–What did you say?
(তুমি কি বললে?)

প্রেমা বোকার মতো তাকিয়ে আছে। সে তো স্পষ্ট ভাষাতেই বললো। অতোটাও আস্তে বলেনি যে লোকটা শুনবে না!
প্রেমা আবারো বলে,
–খুদা লাগছে আমার। কখন থেকে এনে রেখেছেন। একটু খাবার তো দিন!

বডিগার্ডটা এবার বিরক্তি সূচক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে। প্রেমা এবার হতাশ হয়। তারপর তার মাথায় আসে যে লোকটা কি তার ভাষা বুঝতে পারছে না? চট করে এটা মাথায় আসাতে প্রেমা ইংলিশে বলে,

–I think you don’t understand Bengali. I was saying that i am hungry. Please give me some food.
(আমার মনে হয় আপনি বাংলা বোঝেন না। আমি বলছিলাম যে আমার ক্ষুধার্ত। দয়া করে আমাকে কিছু খাবার দিন।)

বডিগার্ডটা কিছু না বলে চলে যায়। প্রেমা বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে। লোকটা কি ইংলিশেও বুঝলো না! তার কি হিন্দিতে বলা দরকার ছিলো? কিন্তু দেখে তো ইন্ডিয়ান মনে হয় না। একটা কালা তো আরেকটা ধলা!

পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফর্সা করে বডিগার্ডটা এসে ব্রেড ও কলা দিয়ে গেলো। এতোক্ষন তো কালো বডিগার্ডটার সাথে কথা বলছিল। মনে হয় বেচারা বিরক্ত হয়ে গেছে। যাক গে! খাবার তো পেয়েছে। সেই দুপুর দুটোয় লাঞ্চ করেছে আর এখন সাড়ে আটটা বাজে। প্রেমার আবার খিদে সহ্য করার ক্ষমতা কম। গপাগপ কলা দিয়ে ব্রেড খেতে থাকে।

________

প্রেমার বন্ধুরা সেই সন্ধ্যা থেকে প্রেমাকে হন্য হয়ে খুঁজছে। দার্জিলিংয়ে তারা এই প্রথমবার এসেছে। কিছু চিনে না। টুরিস্ট গাইড সাথে নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। প্রেমার যে একা একা প্রকৃতি দেখতে ভালো লাগে তা তারা জানে। বিকেলে একাই বের হয়েছে তা তারা জানে কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে অনেকক্ষণ হবার পরও ফিরে না আসাতে তখন হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানায়। তারপর থেকে গাইড নিয়ে তারা খুঁজছে। প্রেমার বান্ধুবী মিম, নিশি, অর্ষা তো টেনশনে কাঁদা শুরু করেছে। শান্ত, রিজন, সারিফ ওদের স্বান্তনা দিবে না খুঁজবে তাই বুঝতে পারছে না। প্রেমাকে দার্জিলিং নিয়ে আসার জন্য প্রেমার বাবা-মায়ের কাছে অনেক রিকুয়েস্ট করেছে তারা। প্রেমাকে যেতেই দিতে চায়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের ভিতর হলে হয়তো প্রেমার বাবা-মা এতোটা বারণ করতো না কিন্তু অন্য দেশ! অনেক কষ্টে বুঝিয়েছে সবাই মিলে। এখন প্রেমার বাবা-মাকে কি জবাব দিবে? আর প্রেমা হুট করে কই হাওয়া হয়ে গেলো?

দার্জিলিংয়ে আজ সুপারস্টার অনুরাগ খানের একটা মিউজিক ভিডিওর জন্য কনসার্ট আছে। গানের মিউজিক ভিডিওটা দার্জিলিংয়ে করা হয়েছে। তাই রিলিজ হবার পর গায়ক ও এক্টরদের নিয়ে কনসার্ট। গতকাল কনসার্ট হবার কথা ছিল তবে কোনো কারন বশত অনুরাগ খান স্টেজে আসবেনা বলে জানিয়েছে একদম কনসার্টের এক ঘন্টা আগে। তাই আজকে সন্ধ্যা থেকে কনসার্টের প্রিপারেশন হচ্ছে ও রাত আটটা থেকে কনসার্ট শুরু হয়েছে। দূর থেকে হাই মিউজিকের আওয়াজ আসছে। কনসার্টের কারনে রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা। সবাই কনসার্টে গেছে।
হোটেল ম্যানেজার সারিফদের বললো কনসার্টে খোঁজ করতে। ওরা লোকাল থানায় মিসিং ডায়েরি করতে চেয়েছিল কিন্তু ২৪ ঘন্টার আগে মিসিং ডায়েরি নেয় না পুলিশ। তারা ভাবে, হয়তো ভিকটিম নিজ থেকে কোথাও গেছে। সারিফরা খোঁজার মতো সব খুঁজে ফেলেছে। চা বাগানের লোকাল মালিক এনেও খুঁজেছে। এখন শুধু কনসার্ট এড়িয়াতে খোঁজা বাকি। কনসার্ট এড়িয়াতে এখন অনেক জনসমাগম। এতো মানুষের ভীরে কিভাবে খুঁজবে? কনসার্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত দেরি আছে। দশটা বাজবে। রাত দশটার পর কনসার্ট বন্ধ করতেই হবে এটা অর্ডার আছে।

কিন্তু প্রেমার বন্ধুরা ভাবছে অন্য কথা। তারা জানে প্রেমা কনসার্টে যাবে না। যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। হোটেল ম্যানেজারকে এই কথা বললে বলবে,
“সেলিব্রেটি সুপারস্টার এসেছে আর আপনারা বলছেন সে যাবে না!”

বলাটা স্বাভাবিক তবে প্রেমার ওখানে যাওয়াটা স্বাভাবিক না। প্রেমা অনুরাগ খানকে সহ্য করতে পারে না একদমই।
অনুরাগ খানের নাম ওর জন্য মিম, নিশি ও অর্ষা নিতেই পারে না। অর্ষা তো অনুরাগ খানের ফ্যান কিন্তু বান্ধুবীর জন্য সে নিজের ক্রাশকে নিয়ে কিছু বলতে পারে না। আর সেই প্রেমা নাকি অনুরাগ খানের কনসার্টে যাবে! এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য না।
তাও অর্ষা বলে,

–একবার দেখো নিবো আমরা। কারন সহ্য করতে পারে না বলেই হয়তো কনসার্টে কি করে তা দেখতে গেছে!

বাকিরাও একটু ভেবে দেখলো। তারপর সিদ্ধান্ত নিলো কনসার্টে খুঁজবে।

_______

–Yes sir, everything is fine. That girl is silent now. She wanted to eat so I gave her food. You said, keep her mouth open if she doesn’t bother. so, I did that.
(জ্বী স্যার, সব ঠিক আছে। মেয়েটা চুপ করে আছে এখন। সে খেতে চেয়েছিল তাই তাকে খাবার দিয়েছিলাম। আপনি বলেছিলেন, মেয়েটা যদি চুপ থাকে তাহলে ওর মুখ খোলা রাখতে। আমি তাই করেছি।)

ফোনের অপর পাশ থেকে কেউ বললো,
–Ok. Take care. I will be there after some time.

লোকটি সগোউক্তি করে বলে,
–তোমাকে আমার হতেই হবে রাজরানী!

চলবে ইনশাআল্লাহ,

প্রেমানুরাগ সূচনা_পর্ব
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথি

ভুুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here