শিশির_ভেজা_রোদ্দুর Part_18

0
249

শিশির_ভেজা_রোদ্দুর
Part_18
#Writer_NOVA

কিন্তু রাতে কাপুনি দিয়ে যে জ্বর এলো তাতো সবাই ভয় পেয়ে গেলো।তায়াং ভাইয়া তো পাগলপ্রায়। রাতে গিয়েই ফার্মেসী থেকে ঔষধ নিয়ে এসেছে। তারপরেও আমার জ্বর কমার নাম নেই।সাথে বমি ও মাথা ঘুরানো তো আছেই। খালামণি,তন্বী সবার ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে। দুটো কম্বল মুড়ি দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি। আশেপাশের কোন দিকে হুশ নেই।তিনবার বমি করা হয়ে গেছে। শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ভাইয়া জোর করে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছিলো।সেগুলো বমি করে ফেলে দিয়েছি।এখন যে আমাকে নিয়ে তারা ঢেঢ় টেনশনে আছে তা আমি জানি।

সময় এখন প্রায় রাত বারোটার কাছাকাছি। বোধশক্তি একটু একটু করে ফিরে আসছে।আমার মনে হচ্ছে আমার শিয়রের পাশে বসে কেউ নিবিড় যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সেই পরশে কয়েকবার নড়েচড়ে উঠেছি।কিন্তু চোখ মেলে তাকানোর জো নেই। কপালে হাত রেখে সে জ্বরের তাপমাত্রা চেক করলো।দেয়ালে থাকা ঘড়িটা টিকটিক করে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আমার কানে সেই শব্দটা বারি খাচ্ছে। যা খুবই বিরক্তিকর ও একঘেয়ে।তাতে আমি বেশ কয়েকবার চোখ বুজে মাথা নাড়িয়ে আমার বিরক্তি প্রকাশ করতেই সে ব্যস্ত হয়ে গেলো।আমার এক হাত তার হাতের মুঠোয় নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,

—তোমার কি অনেক খারাপ লাগছে টিডি পোকা?বমি করবে আবার?কি হয়েছে বলো আমায়? খারাপ লাগছে অনেক?

বড় করে এক নিশ্বাস ছেড়ে না চাইতেও চোখ খুললাম।মলিন চোখে পাশ ফিরে তার দিকে তাকালাম।এনজিও সংস্থার চোখেও আমি অসহায়ত্ব দেখতে পেলাম।কিরকম নিস্বার্থভাবে সে আকুতি প্রকাশ পাচ্ছে। যার মধ্যে নেই কোন অভিনয় কিংবা লোক দেখানো।আমি কোনরকম দম ছেড়ে তাকে বললাম,

—আমি উঠবো।

—কোন উঠাউঠি নেই। চুপচাপ শুয়ে থাকো।কোনকিছু লাগলে আমায় বলো।

মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম কিছু লাগবে না। তার পরনে কোর্ট-প্যান্ট দেখে কিছুটা অবাক হলাম।আমার জানামতে উনি বেকার।কোন কাজ করেন না।উনি ও তায়াং ভাইয়া দুজনে মিলে পার্টনারশিপে একটা ব্যবসা শুরু করবে বলে শুনছি।তাই তাকে ফর্মাল গেটআপে দেখে অবাক হওয়ারি কথা।কিন্তু এসব কথা জিজ্ঞেস করতে একটুও ইচ্ছে করছে না।আমি ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

—বাকি সবাই কোথায়?

—উনারা মাত্র খেতে গেলো।কেউ যেতে চায়নি।আমিই জোর করে পাঠিয়েছি।তাদের বললাম আমি তোমার পাশে বসছি তারা যেনো খাবার খেতে যায়।জানি কারো গলা দিয়ে খাবার নামবে না তবুও যতটুকু খেতে পারে।তোমার কিছু লাগলে আমাকে বলতে পারো।

—কিছু লাগবে না।

—শরীর এখন কেমন লাগছে?

— ভালো না।সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।আর মাথাটা ঘুরছে।

—কি দরকার ছিলো বৃষ্টিতে ভেজার?তুমি ইচ্ছে করে অসুখকে দাওয়াত করে আনলে।

আমি মলিন হেসে তার দিকে তাকালাম।আজও তার অগোছালো চুলগুলো চোখের একপাশে পরে আছে। খুব ইচ্ছে করছিলো সেগুলো সরিয়ে দিতে।কিন্তু সেটা করার নূন্যতম শক্তিটুকুও আমার শরীরে এখন নেই।থাকলে অবশ্যই ইচ্ছেটা আজ পূরণ করতাম। তাকে খুব অগোছালো ও এলেমেলো লাগছিলো।চোখের মধ্যে একরাশ আকুতি।মনে হচ্ছে কিছু বলতে চাইছে।কিন্তু হাজারো জড়তার ভিড়ে বলে উঠতে পারছে না।আমি চোখ দুটো বন্ধ করে নিলাম।আমার হাতটা এখনো তার হাতের মুঠোয় বন্দী।আমি ফট করে চোখ খুলে সেদিকে তাকালাম।সে ইতস্তত হয়ে আমার হাতটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বিব্রত গলায় বললো,

—কিছু লাগলে আমায় বলো।আমি এখানেই আছি।

আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিলাম।উদ্দেশ্য ছিলো উত্তরটা মুখে দিবো।কিন্তু তা আর বলতে পারলাম না। কারণ সে আমার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো ক্ষমতা আমার এখনো হয়নি।দ্রুত চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ালাম। সে আমার থেকে কিছুটা দুরত্ব রেখে পাশের চেয়ারে বসলো।তবে খুব বেশি দুরত্বেও নয়।আমি আরো ভালো করে কম্বলগুলোকে জড়িয়ে জুবুথুবু হয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো করে শুয়ে রইলাম।শুধু মুখটা একটু বের করে রাখলাম। যাতে নিঃশ্বাস নিতে পারি।এনাজ মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছে। মিনিটে মিনিটে আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে আমি কি করছি?অনেকক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন আমার পেটে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভেবেছিলাম প্রশ্নটা করবো না। কিন্তু না করেও থাকতে পারছি না। তাই ভনিতা না করে কম্বলের থেকে কচ্ছপের মতো করে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম।

—আপনি কোর্ট-প্যান্ট পরে কোথায় গিয়েছিলেন?

—পৌরসভায় কিছু কাজ ছিলো।সেগুলো কমপ্লিট করতে।

পৌর সভার কাজের সাথে কোর্ট-প্যান্টের কি সম্পর্ক তা আমি বুঝলাম না।লাইটের আলোটা চোখে বিঁধছে। তাই কম্বলটাকে টেনে চোখের উপর দিয়ে দিলাম।বেশ কিছু সময় পর এনাজ আমার সামনে বসে আবারো এক হাত তার দুই মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিচু গলায় আমাকে ডাকলো।

— টিডি পোকা , এই টিডি পোকা ।

—হু

—কিছু খাবে?

—উহু।

—না খেলে তো আরো বেশি খারাপ লাগবে।উঠে অল্প একটু কিছু খেয়ে নাও।আমি খাইয়ে দেই?

—উহু।

—অল্প করে খেয়ে নিবে।না খেয়ে থাকলে আরো বেশি খারাপ লাগবে।

—বমি করতে করতে মুখ তিতা হয়ে গেছে। এখন কিছু ভালো লাগবে না।আমাকে খাওয়ার জন্য জোর করেন না প্লিজ।

—ভালো লাগছে না বলেই তো খেতে বলছি।

—প্লিজ কথা বলেন না।আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।একটু চুপ করে থাকুন।

এনাজ চুপ হয়ে গেলো।আর জোর করলো না। হাত ছেড়ে পূর্বের জায়গায় গিয়ে চুপটি করে বসলো।মাথা ঘুরানোর ফলে শরীর প্রচুর দূর্বল লাগছে।কিরকম জানি বমি বমিও লাগছে।একটু পানি খেয়েছিলাম।সেগুলো বোধহয় বের হয়ে যাবে।

💖💖💖

— নোভা কি এখনো ঘুমে?নাকি উঠে গেছে?

খালামণি রুমে ঢুকেই এনাজের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।তাকিয়ে দেখার মতো শক্তিও পাচ্ছি না। কিন্তু দুই কানে সবই শুনতে পাচ্ছি। এনাজ বললো,

—একটু আগে উঠেছিলো।উঠে বসতে চাইলে আমি মানা করেছি।কত করে বললাম কিছু খেয়ে নাও শরীর ভালো লাগবে।শুনলোই না।বলে তার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।আমাকে কথা বলতে নিষেধ করেছে।ওর নাকি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাই চুপচাপ ওর পাশে বসে আছি।

— তুমি কি কিছু খেয়েছো এনাজ?

—হ্যাঁ,আন্টি নয়টার দিকে বন্ধুদের সাথে খাওয়া হয়ে গেছে। তায়াং খেয়েছে?

—তায়াং-কে একটা দানাও মুখে দেওয়াতে পারলাম না।ওর কিছু ভালো লাগছে না বলে খাবেও না।পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে ছেলেটা পাগল হয়ে যায়।তখন ওকে দেখে আমারই ভয় করে।এই বুঝি ছেলেটাও অসুখে পরলো।

—নোভার আম্মু-আব্বুকে খবর দিয়েছেন?

—প্রথমে ভেবেছিলাম ঔষধ খাওয়ালে আল্লাহর রহমতে জ্বরটা ছেড়ে যাবে।তাই ওর আম্মু-আব্বুকে জানাতে চাইনি। সারারাত টেনশন করবে।কিন্তু ঔষধ খাইয়ে তো রাখতে পারছি না। বমি করে ফেলে দিচ্ছে। শরীর অবস্থাও বেশি ভালো না।কল করে তায়াং ওর অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিলো।এখন তো তারা টেনশনে শেষ। এতরাতে আসতেও পারবে না। কলের ওপর কল করছে।

—তারা কি আসবে না?

—ভোরের আলো ফুটতেই ওর আম্মু গ্রাম থেকে রওনা দিবে।ওর আব্বু নবাবগঞ্জ আছে। সেখান থেকে চলে আসবে।এখন আল্লাহ আল্লাহ করে মেয়েটা সুস্থ হলেই চলে।

—আল্লাহ ভরসা।ইনশাআল্লাহ নোভা সুস্থ হয়ে যাবে।তন্বী, তায়াং কোথায়?

—ভাইয়া এক ডাক্তারের সাথে কথা বলছে।ড্রয়িংরুমেই আছে।

—আচ্ছা আমি সেদিকে যাচ্ছি। আন্টি আপনারা একটু ওর খেয়াল রেখেন।

সবাই কতটা ব্যস্ত আমাকে নিয়ে।কিন্তু আমার অসুস্থতার কারণে আমারি কোন আফসোস নেই। ইচ্ছে করেই তো ডেকে আনলাম।তবে এতোটা খারাপ অবস্থা হবে তা ভাবিনি।আব্বু খবর পেয়ে নিশ্চয়ই তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে গেছে। আর আম্মুর চোখ দুটো তো ভুলেও আজ বন্ধ হবে না। আমার ছোট বোন ইভাও হয়তো কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরবে।তন্বী,খালামণিও চিন্তা করতে করতে আমার পাশে এক সময় চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাবে।কিন্তু তায়াং ভাইয়া এক মিনিটের জন্যও চোখ বন্ধ করবে না।তা আমার জানা আছে। সেবার যখন আত্মহত্যা করে ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেলাম।তখন তায়াং ভাইয়া টানা তিনদিন নির্ঘুম কাটিয়েছে। আমি হসপিটালে থাকাকালীন সকল ফর্মালিটি ও পূরণ করেছে। গ্রামে থাকলে আমি আরো অসুস্থ হয়ে যেতে পারি বলে তার কাছে নিয়ে এলো।আমাকে সুস্থ করে আবার স্বাভাবিক করতে পুরোদমে ভাইয়াই সাহায্য করেছে। কখনও অতীত নিয়ে একটা কথাও বলেনি।কিংবা সবার মতো শাসন করেনি,
ধমকায়নি।শুধু হাত দুটো ধরে বলেছিলো,”তোর মতো স্ট্রং মেয়েকে দিয়ে এমনটা আশা করিনি।পরেরবার যদি এমন কিছু করার চিন্তা করিস তাহলে নিজের পরিবারের কথাটা একটু ভাবিস।”ওপর দিয়ে ও যতটা কঠিন দেখাক, ভেতরে এর থেকে বেশি নরম।আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া, আমাকে এরকম একটা বড় ভাই দেওয়ার জন্য।

—নোভা, এই নোভা,নোভারে।অনেক বেশি খারাপ লাগছে বোন?মাথায় কি পানি দিবো?

চোখ দুটো সবেমাত্র একটু লেগেই এসেছিলো। তায়াং ভাইয়ার ডাকে তাও ভেস্তে গেলো।বিরক্তমুখে কম্বল মুড়ি দিয়ে অন্যপাশে ঘুরে গেলাম।

—উঠে অল্প একটু খেয়ে নে।ঔষধ খেতে হবে তো।

—খাবো না।ডিস্টার্ব করিস না।

—অল্প একটু খেয়ে ঔষধটা খেয়ে নে।তারপর ঘুমাস।তোকে আমরা কেউ ডিস্টার্ব করবো না।

তন্বীও ভাইয়ার সাথে গলা মেলালো,
—নোভাপু একটু কষ্ট করে খেয়ে নাও।বেশি খেতে হবে না। দুই লোকমা খাও।যাতে ঔষধ খেতে পারো।

—নোভা উঠ।আমি খাইয়ে দিবো তোকে।মাত্র দুই লোকমা।একটুও বেশি নয়।

—টিডি পোকা, সবাই যখন বলছে তাহলে একটু খেয়ে নাও।না খেলে সুস্থ হবে কি করে?

সবার জোড়াজুড়িতে উঠে বসলাম।তায়াং ভাইয়া ভাতের প্লেট নিয়ে আমার পাশে বসে আছে। এনাজ ডানে বসেছে আর ভাইয়া বামে।তন্বী দূরের চেয়ারে বসে ঘুমে ঢুলছে।তবুও চোখ টেনে জেগে থাকার চেষ্টা করছে।আমি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,

—খালামণি কোথায়?

তায়াং ভাইয়া উত্তর দেওয়ার আগেই এনাজ বললো,
—আন্টি তোমার আম্মুর সাথে কলে কথা বলছে।তোমার আম্মু তো পারলে এখুনি চলে আসে।

তায়াং ভাইয়া ভাত মাখিয়ে মুখের সামনে ধরে বললো,
—নে হা কর।

আমি ভাইয়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
—ভাইয়া আমার একটুও খেতে ইচ্ছে করছে না। বমি বমি লাগছে। সামনে থেকে এসব সরা।

চেয়েছিলাম সবার জোড়াজুড়িতে একটু খেয়ে নিবো।কিন্তু নাকে মাছের গন্ধ পেতেই ভেতর থেকে সবকিছু উল্টেপাল্টে আসতে লাগলো।আমি দ্রুত তায়াং
ভাইয়ার হাত এক হাতে সরিয়ে আরেক হাতে মুখ চেপে ধরলাম।কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।পেটে যতটুকু ছিলো তা সব বের হয়ে গেলো।বমি করতে করতে অস্থির হয়ে গেছি।মাথা প্রচন্ড ঘুরছে।শরীর অনেক দূর্বল লাগছে।তবুও হালকা মাথা উঠিয়ে দেখতে পেলাম, এনাজের ওপরই বমি করে বেচারার কোর্ট-প্যান্ট ভাসিয়ে দিয়েছি।অপরাধী চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম তায়াং ভাইয়ার মতো সেও আমাকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। তার নতুন কোর্ট-প্যান্টের যে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি তাতেও তার ভ্রক্ষেপ নেই। ধীরে ধীরে মনে হচ্ছে শরীরের শক্তিগুলো নিঃশ্বেস হয়ে যাচ্ছে। চোখে, মুখে অন্ধকার দেখছি।জ্ঞান হারানোর আগে শুধু এতটুকু মনে আছে যে হালকার ওপর মাথাটা এনাজের কাঁধে হেলিয়ে দিলাম।তারপর,তারপর কিছু জানি না।

চোখ খুলতেই………

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here