শিশির_ভেজা_রোদ্দুর Part_23

0
471

শিশির_ভেজা_রোদ্দুর
Part_23
#Writer_NOVA

— ভাইয়া আমারে নাড়া দিস না। আমি কিন্তু মইরা গেছি।

ভাইয়া রেগে আমার হাত ধরে একটানে বসিয়ে দিলো।আমার পাশে বসে রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

— জলদী বল কি হয়েছে? নয়তো খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু নোভি।

— কি বলবো দুঃখের কথা ভাইয়া! আমার তো কচু গাছের সাথে গলায় ফাঁস দিতে ইচ্ছে করছে। এই দুই পুঁচকে আমার জীবনটারে তেজপাতা বানায় ফেলতাছে।

— শিরোনাম শুনতে চাইনি। বিস্তারিত বল।

আমি ভাইয়াকে প্রথম থেকে সবকিছু খুলে বললাম। এমনকি ইফাতের দেওয়া চিঠির কথাও। সব শুনে ভাইয়া আমার দিকে হতবাক হয়ে কিছুখন তাকিয়ে রইলো। তারপর ফিক করে হেসে সোফায় গড়াগড়ি দিতে লাগলো। আমি ওর চুল টেনে বললাম,

— এই ছেমড়া পাগল হয়ে গেলি নাকি?

— আল্লাহ কি ছিলো এগুলো? এই পিচ্চিগুলো এত পাকনা কবে হলো? বোইন আমরা কি করলাম জীবনে? এই জীবন রেখে কি লাভ বল?

— চল, একসাথে বুড়িগঙ্গায় লাফ দেই।

— তাই করতে হবে। আমি ২৮ বছরের জীবনে যা করতে পারি নাই তা এই ১০ বছরের পুঁচকে ছেলে করছে। ভাবা যায় এসব? আহা, কি প্রেম! কি ভালোবাসা! আমি শিহরিত।

— তায়াং ভাইয়া যা তো আমার চোখের সামনে থেকে যা। কোথায় আমারে একটু সান্ত্বনা দিবো। তা না করে আমার মনের আগুনে আরো ঘি ঢালতাছে।

— বোইন আমারে একটু হাসতে দে। অনেকদিন এরকম বিনোদন পাই না।

— থাক তুই তোর বিনোদন নিয়া। আমি গেলাম। যত্তসব ফাউল কাজকাম। নাহ এবার ঐ পুঁচকে দুইটার বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতেই হইবো।

আমি রাগে বিরবির করতে করতে সোফা থেকে উঠে রুমের দিকে রওনা দিলাম। তায়াং ভাইয়া মোবাইল বের করে কাকে যেন কল করলো। তারপর হাসতে হাসতে বললো,

— দোস্ত তোর তো কপাল পুড়লো। তোর ভালোবাসায় এক খুদে প্রেমিক ভাগীদার হয়েছে। আজকে কি হয়েছে জানিস…..

আর কোন কথা শোনার মতো অবস্থায় আমি নেই। আমি তায়াং ভাইয়ার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে দ্রুত পায়ে রুমে চলে এলাম। কি কান্ডটা করলো আজ? এগুলো কি মেনে নেওয়া যায় বলেন?

💖💖💖

গোসল করে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বাইরে বের হলাম। শরীরটা আগের থেকে অনেকটা সুস্থ। মাথাটা মাঝে মাঝে একটু ঝিমঝিম করে। আর ঔষধ খেলে ঘুমে চোখ বুজে আসে। বর্তমানে এই দুটো প্রবলেম ছাড়া বাকি সব ঠিক আছে। তন্বী, খালামণিকে রান্নায় সাহায্য করছে। বারান্দায় জামা-কাপড়গুলো শুকাতে দিয়ে কিচেনের দিকে হাঁটা দিলাম। রুম থেকে বের হতেই দেখি তায়াং ভাইয়া পাঞ্জাবী,প্যান্ট,টুপি পরে নায়ক সেজে বেরুচ্ছে। এতো কড়া পারফিউম লাগিয়েছে যে তা গন্ধে আমার বমি এসে পরবে। কিরকম জানি চকলেট ফ্লেভারের একটা পারফিউম লাগায়। হালকা করে ঘ্রাণটা ভালোই লাগে। কিন্তু ভাইয়া অতিরিক্ত দিয়ে ঘ্রাণটাকে গন্ধে পরিণত করে।
আমি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— কিরে ভাইয়া, নায়ক সেজে কোথায় যাচ্ছিস?

— জুম্মার নামাজ পড়তে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— তুই আবার নামাজও পরিস?

— কেন তোর বিশ্বাস হয় না?

— তাই তো জিজ্ঞেস করছি। তুই কি সত্যি নামাজের জন্য যাচ্ছিস নাকি মসজিদে মিষ্টি দিবে তার জন্য যাচ্ছিস?

— ঐ আমি মিষ্টির জন্য মসজিদে নামাজ পরতে যাই?

— যে শুক্রবারের মসজিদে মিলাদ পরাবে, সে শুক্রবার তোকে মসজিদে যেতে দেখি। এছাড়া তো মসজিদের সামনেও তোকে দেখা যায় না। সেদিন তো আব্বুকে খুব করে বড় মুখে বলেছিলি মসজিদে নামাজ পরতে যাস। শুধু অসুস্থ ছিলাম বলে কোন টু শব্দ করিনি। নয়তো হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিতাম।

তায়াং ভাইয়া রেগে সামনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
— কিসের হাড়ি ভাঙতি তুই?

— এই যে এটাই। তুই সেদিনই নামাজ পরতে যাস যেদিন মসজিদে মিলাদ পরায়। মিলাদের পর তো হয় মিষ্টি, বিরিয়ানি কিংবা খিচুড়ির প্যাকেট দিবে। সেই আশায় আমার ভাই সবার আগে মসজিদে গিয়ে বসে থাকে। এক মিনিট, এক মিনিট।এবার বুঝতে পারছি। এই কথাটা তো আগে খেয়াল করিনি।আমি জানি তুই বন্ধুদেরকে কল করে আগে জেনে নিস মসজিদে মিষ্টি দিবে কিনা। দিলে নামাজ পরতে যাস। না দিলে যাস না। তাই তো তোকে সব জুম্মার নামাজ পরতে যেতে দেখি না।

— লাত্তি খাইতে না চাইলে সামনে থিকা সর😤।

— উচিত কথার ভাত নাই। সত্যি কথা বলতাছি তো, তাই গায়ে লাগতাছে।

ভাইয়া এগিয়ে এসে মুঠ করে কতগুলো চুল ধরে জোরে টান দিয়ে বললো,
— ভালো করে বলছি ভালো লাগে নাই। তুই আসলেই ভালো কথার মানুষ না।

— দূরে যা ভাইয়া। পারফিউমের গন্ধটা সহ্য হচ্ছে না। পুরো বোতল কি শরীরে ঢেলে দিছিস? কয়দিন ধরে গোসল করিস না? নামাজ পরতে যাবি গোসল করে যেতে কি সমস্যা? ওফস সরি আমি তো ভুলে গেছিলাম। তুই তো মিষ্টির জন্য যাচ্ছিস। নামাজ পরতে না।

ভাইয়া চুল ছেড়ে জোরে নাক টেনে বললো,
— নাকটা কি বেশি বড় হয়ে গেছে। আর তোকে কে বলছে আমি গোসল করি না। একটু আগে গোসল করে এলাম। চুল ধরে দেখ এখনো ভেজা।

— হো বুঝছি। আগে আমার নাক ছাড়।আহ ভাইয়া নাক ছাড়। ব্যাথা পাইতাছি তো। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। খালামণি, ও খালামণি। তোমার দামড়া পোলাডারে কিছু কও। আমার চুলগুলো টাইনা টাইনা ছিঁড়া আমারে টাক বানায় ফালাইলো। আমি আমার কিউট জামাইয়ের টেকো বউ হতে চাই না। খালামণি দেখে….

তায়াং ভাইয়া আমার নাক ছেড়ে মুখ আটকে বললো,
— চুপ কর। আরেকটা শব্দ করলে চুল কিন্তু সত্যি ছিড়বো। ভালো হয়ে যা কইতাছি।

— উম উম উম!

— উম উম করিস কেন?

ভাইয়া মুখ ছেড়ে দিলো। আমি একটা খাইয়া ফালামু লুক দিয়ে বললাম,
— আমার মুখ আটকে রাখলে আমি উম উম করবো না তো কি গান গাইবো?

— সর রাস্তা ছাড়! আরেকটা কথা বললে আবার মুখ চেপে ধরবো। এবার এমনভাবে ধরবো যে মুখ বাঁকা হয়ে যাবে।

— সাহস থাকলে ধরে দেখ। এমন জোরে কামড় দিবো যে গোশত উঠিয়ে ফেলবো।

— সাহস থাকলে দিয়ে দেখা। কান টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।

—আমি কি ছেড়ে দিবো নাকি?

তায়াং ভাইয়া দুই কদম আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো,
— কি করবি তুই?

আমি পেছনে পিছাতে পিছাতে বললাম,
— এমন দৌড় দিবো তুই ধরতেই পারবি না।

কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলে দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে পুরো কিচেনে। ওকে অনেক রাগানো হয়েছে। এর থেকে বেশি রাগালে আমার কপালে আজকে শনি, রবি, সোম চলে আসবে।

💖💖💖

তায়াং ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমাদের পেটে ইদুরে ড্রাম পেটানো শুরু করছে। কিন্তু পাঠা-টার
আসার নামও নাই। খালামণি অবশ্য আমাকে খেয়ে ঔষধ খেতে বলছে।কিন্তু আমি শুনিনি। তিন ভাই-বোন একসাথে খাবো বলে অপেক্ষা করছি। তন্বী একটু আগে গোসলে ঢুকছে। এখনো বের হয়নি। তায়াং ভাইয়া আসেনি।সত্যি বোধহয় আজকে মসজিদে মিষ্টি দিবে। যার জন্য আমার ভাই এখনো অপেক্ষা করে বসে আছে। বেচারাকে আজ যা রাগিয়েছি। ওকে রাগাতে আমার হেব্বি লাগে। মিনিট পাঁচেক পর কোলিং বেল বেজে উঠলো। আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। তায়াং ভাইয়া দরজার সামনে শপিং ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— ভাইয়া মিষ্টি দেয় নাই?

— না বাইরানি দিছে। খাবি?

— না ওসব বাইরানি-টাইরানি আমি খাই না।(একটু থেমে)থাক ভাইয়া রাগ করিস না। একদিন মিষ্টি দেয়নি বলে তুই এরকম রাগ করতে পারিস না। তুই তোর বন্ধুদের কল করে জিজ্ঞেস করিস নাই আজকে মিলাদ পরাবে নাকি? নিশ্চয়ই ভুলে গেছিস। পরেরবার গেলে ওদের কল করে জেনে নিস। নয়তো তোকে রেগে আসতে হবে না।

— সামনের থেকে সরবি নাকি উষ্টা খাবি। তোরে আমি ঠুয়ামু। সুস্থ হইতে না হইতেই বাঁদরামি শুরু করছিস।

জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে ভাইয়া ভেতরে ঢুকে গেলো।খালামণিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— আম্মু, দেইখো কোনদিন জানি আমি ওরে বস্তায় ভইরা বুড়িগঙ্গায় ফালায় আসি। আমার সাথে শুধু শুধু লাগে। আমার ভালো ওর সহ্য হয় না।

খালামণি ওর কথা শুনে মুচকি হেসে বললো,
— দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র খালাতো ভাই তুই। তোর সাথে লাগবে না তো কার সাথে লাগবে। তুই বড় ভাই না। বড় ভাইয়ের সাথে তো ছোট বোন একটু আধটু মজা করবেই।

— এই শাঁকচুন্নি কি একটু আধটু মজা করে? আমার মান-সম্মান নিয়ে টান দেয়। সেদিন আমার বন্ধুদের সামনে তিনবার যা বলছে তাতে আমি শুধু পারি নাই ওরে কাঁধে উঠাইয়া ফিক্কা পানিতে ফালাইতে।

আমি ইনোসেন্ট ফেস করে খালামণিকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
— দেখছো খালামণি, দেখছো। তোমার সামনেই আমার সাথে এমন করে। তুমি না থাকলে তো আমাকে দেখতেই পারে না, অনেক মারে। দুপুরে জানো আমার চুল টান দিছিলো।

তায়াং ভাইয়া সোফায় মাত্র বসতে নিয়েছিলো।আমার কথা শুনে কটমট করে তাকিয়ে ধপ করে সোফায় বসে বললো,
— এখন আম্মুর সামনে ন্যাকা সাজা হচ্ছে?

খালামণি আমাদের কান্ড দেখে মিটমিট করে হাসছে। কাউকে কিছুই বলছে না। হঠাৎ খালামণি তায়াং ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলো,
— তোর হাতের শপিং ব্যাগে কি?

আমি ফট করে বলে উঠলাম,
— ভাইয়া মিষ্টি নাকি?

তায়াং ভাইয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
— এর মধ্যে পাঞ্জাবী। আরেকবার মিষ্টির কথা বললে তোকে ড্রেনের পানিতে চুবামু।

— আল্লাহ, ভাইয়া তুই এমন! দুই প্যাকেট মিষ্টির জন্য আরেকটা পাঞ্জাবী নিয়ে মসজিদে যাস। যাতে করে তোকে কেউ চিনতে না পারে? এক পাঞ্জাবী তে তো ধরে ফেলবে। এক প্যাকেটের বেশি মিষ্টি দিবে না। তাই দ্রুত একটা পাল্টিয়ে আরেক পাঞ্জাবী পরে আরেক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে আসিস। তুই এরকম মন-মানসিকতা নিয়ে চলিস? ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমি কখনো ভাবতেও পারিনি আমার ভাই এমন।

— আম্মু ওরে চুপ করতে বলো। নয়তো ওর কপালে মাইর আছে। শাকচুন্নিরে এটা বানাতে দিছিলাম। নামাজ শেষে দর্জি দোকান থেকে নিয়ে এলাম।

— হয়েছে আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে হবে না।

— ভাবছিলাম তোকে আর কিছু বলবো না। কিন্তু তুই তা হতে দিলি না। আজকে তোর খবর আছে। তুই শুধু একটু দাড়া।

ভাইয়া সোফা থেকে উঠে আমার দিকে দৌড়ে এলো। আমিও ততক্ষণে এদিক সেদিক ছুট লাগালাম। দুজন গোল গোল করে ঘুরতে লাগলাম। ভাইয়া যদি এখন আমায় ধরতে পারে তাহলে কাপড়ের মতো নিংড়ে রস বের করবে। আমি জানি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছি। এগুলো হলো অসুস্থ থাকা অবস্থায় আমাকে ধমকানোর উসুল। রিভেঞ্জ নিয়ে নিলাম। কিন্তু এখন ওর হাত থেকে বাঁচবো তো?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here