শিশির_ভেজা_রোদ্দুর Part_37

0
424

শিশির_ভেজা_রোদ্দুর
Part_37
#Writer_NOVA

তন্বী আজ দুই ক্লাশ করে কোথায় জানি চলে গেলো। আমাকে ভালো-মন্দ কিছু বললো না। শুধু বললো চলে যাচ্ছি। তারপর রাস্তার দিকে ছুটলো। ওর এমন অদ্ভুত আচারণে আমি একটু নয় বরং অনেক বেশি অবাক হয়েছি।কলেজ ছুটি হয়েছে মিনিট দশ আগে।শারমিনকে বিদায় জানিয়ে গেইট পার হতেই এনাজের সাথে দেখা। বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে রওনকের সাথে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছে। আমি তাদের সামনে যেতেই রওনক বড় করে একটা সালাম দিলো।

— আসসালামু আলাইকুম।

— ওয়া লাইকুমুস সালাম।

— তা কেমন আছেন ভাবী?

ভাবী ডাক শুনে বিস্মিত চোখে রওনককে জিজ্ঞেস করলাম,

— ভাবী! কে ভাবী?

এনাজ ওর দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করতেই বেচারা থতমত খেয়ে বললো,
— ওফস সরি। বড় আপু হবে।

— জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?

— আলহামদুলিল্লাহ ভালো। দিনকাল কেমন যাচ্ছে আপনার?

— বিন্দাস। তা আপনি আজকাল থাকেন কোথায়?

— কেন বাসায়?

— আরে ধূর তা না। আপনাকে যে আজকাল কলেজে দেখি না তাই জিজ্ঞেস করলাম।

— প্রয়োজন ছাড়া খুব বেশি একটা আসি না। গত সপ্তাহে মোবাইল চালাতে চালাতে রাস্তা পার হতে গিয়ে ম্যানহোলে পরে গিয়েছিলাম৷ পায়ে ভীষণ ব্যাথা পেয়েছি। বাসায় ফুল রেস্টে ছিলাম। তাই এতদিন দেখেননি।

— একদম ঠিক হয়েছে। রাস্তা পার হওয়ার সময়ও কি মোবাইল চালাতে হয়? এবার বুঝুন ঠেলা।

— হ্যাঁ, আমি নিজেও স্বীকার করি দোষ আমার। আচ্ছা আসি তাহলে। এনাজ ভাই আসছি। আজ আবার বিকেল তিনটায় আমাদের ছাত্র সংসদের মিটিং আছে। তার বন্দবস্ত করতে হবে।

এনাজ ওর কাঁধে হালকা চাপর মেরে বললো,
— সাবধানে যাস।

রওনক হালকা পা খুড়িয়ে খুড়িয়ে কলেজের ভেতর দিকে চলে গেল। আমি এক পলকে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। এনজিও সংস্থা চোখের সামনে তুড়ি বাজাতেই আমার ধ্যান ভাঙলো।

— এই যে মিস টিডি পোকা। হারালে কোথায়?

— কই কোথাও না। আজ হঠাৎ আপনি এখানে?

— কেন আসতে পারি না?

— তা কখন বললাম?

— চলো আমার সাথে।

— কোথায়?

— আজ আমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে প্রপোজ করবো। তুমিও আমার সাথে থাকবে।

কথাটা শোনার সাথে সাথে সারা শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেলো। মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য চোখে এনাজের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হচ্ছে আমি ভুল শুনেছি। এখুনি এনাজ বলবে, “আসলে তেমন কিছু নয়। তোমার সাথে মজা করছি।” কিন্তু আমার ভাবনা ভুল করে দিয়ে এনাজ আমাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো,

— কি হলো চলো?

— আমি যাবো না।

— কেন?

— আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।

— সেকি কথা! কি হয়েছে তোমার? তুমি ঠিক আছো তো? কোন সমস্যা হয়েছে কি?

— এমনি ভালো লাগছে না। আমআমি বাসায় যাবো।

— না, এটা তো হতে পারে না। তুমি সেদিন কফি হাউসে বলেছিলে আমাকে সাহায্য করবে। এখন পালাতে চাইলে তো হবে না। তোমাকে আমার সাথে যেতেই হবে। তুমি সব ব্যবস্থা করবে বলে আমি কিছু করতে চাইছি না। আর এখন এরকম কথা তো আমি মানছি না।

— প্লিজ আমাকে জোর করবেন না। আপনি যান। আপনাদের নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইলো।

— এটা কিন্তু ঠিক নয় টিডি পোকা। তুমি কিন্তু তোমার কথার বরখেলাপ করছো। তুমি বলেছিলে প্রপোজ করার সময় তুমি আমার সাথে থাকবে। তাহলে এখন না যাওয়ার কথা কেন আসছে?

আহত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু সে কি জানে আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। সেই পোড়া গন্ধ তার নাকে যাচ্ছে না? যাবে কি করে? সে তো অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাহলে কেন আমাকে তার প্রতি দূর্বল করলো? আবারো কষ্ট পাওয়ার জন্য। এনাজ আমার কোন কথা শুনলো না। হাত ধরে টেনে নিয়ে বাইকে বসিয়ে দিলো। আমার চোখের পানিগুলো টলমল করছে। এই বুঝি অবাধ্য হয়ে ঝরে পরবে। আজ তার কাঁধে হাত দেওয়ার মতো সাহসটা আমার হচ্ছে না। কাঁপা কাঁপা হাতে তার কাঁধে হালকা করে হাতটা রাখতেই উনি বাইক চালু করলো।

💖💖💖

সময় এখন বিকেল সাড়ে তিনটারো বেশি হবে। এই এনাজের হাবভাব আমার সন্দেহজনক লাগছে। সেই দুপুর দুটোর দিকে আমাকে কলেজ থেকে নিয়ে আসলো। তারপর একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেলো। কিন্তু আমার গলা দিয়ে কি খাবার নামে? তবুও মুখে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে রেখে কোনরকম খেয়ে উঠে গেছি। তারপর আবার বাইকে করে রওনা দিলাম। নদীর পাড়ে এসে বাইক থামলো। যতদূর চোখ যায় নদীতে টলটলা পানি। নদীর পাড়টা বালি আর বালি। সেখানে থোকায় থোকায় সাদা কাশফুল ফুটে আছে। পড়ন্ত রোদের আলোতে চারিদিকটা অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। অন্য সময় হলে আমি খুশিতে টিডি পোকার মতো লাফাতাম। কিন্তু এখন সেই মুডে নেই। মনটা ভীষণ খারাপ।

এনাজ বাইক থেকে নেমে কারো সাথে মোবাইলে কথা বললো। তারপর কথা বলতে বলতে আমার হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। একবার হাত সরিয়ে নিলেও আরেকবার নিজে আমার হাত টেনে নিয়ে শক্ত করে ধরে হাঁটতে লাগলো। আমি আর কোন দ্বিধা করলাম না। ঝরঝরা বালুতে হাঁটতেও বিরক্ত লাগছে। রোদ না থাকলেও বালু বেশ গরম। ছনের চালা বিশিষ্ট একটা ছোট ঘরের কাছে এসে থামলাম। শুধু ছনের চাল আছে। আর কিছু নেই। বাঁশের সিড়ি দেওয়া বেশ উঁচু জায়গাটা। এনাজ খুব সাবধানে আমার হাত ধরে সেখানে নিয়ে গেলো। আমি আশেপাশে কাউকে না দেখে জিজ্ঞেস করলাম,

— তায়াং ভাইয়া, আপনার বন্ধু কাউকে যে দেখছি না। তারা কোথায়?

— এখুনি চলে আসবে।

মিনিট দুই পর আমার মাথার ওপর ফুলের পাপড়ি আর জরি পরতে লাগলো। ওপরে তাকিয়ে দেখি মাথার ওপরে থাকা বেলুনগুলো আপনাআপনি ফেটে আমাদের গায়ের ওপর ফুলের পাপড়ি, জরি পরছে। মন খারাপ থাকায় ওপরের দিকেও খেয়াল হয়নি। একসময় হৈ হৈ করে তিনজন এসে হাজির। তায়াং ভাইয়া, তওহিদ ভাইয়া তাদের সাথে রওনককে দেখে বেশি অবাক হলাম। আমি রওনককে জিজ্ঞেস করলাম,

— আপনার না মিটিং আছে। তাহলে আপনি এখানে কি করেন?

রওনক শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,
— বড় ভাই তার ভালোবাসার মানুষকে প্রপোজ করবে। আর আমি থাকবো না। তা কি হয় বলো?

আমি কোন উত্তর দিলাম না। আমার কিছুই ভালো লাগছে না। আমাদের দুজনকে এক গ্লাস করে ঠান্ডা লাচ্ছি দিলো। আমি ধীরে ধীরে সেটা খাওয়া শেষ করলাম। তারপর সেখান থেকে নেমে নদীর পাড়ে নিয়ে গেলো। সেখানে লাইন বাই লাইন কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হলাম।ইমরান হাশমি ভাইয়া, শাহেদ ও রায়হান ভাইয়া হাতে বড় একটা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার একবার মনে হচ্ছে এসব আমার জন্য। আবার মনে হয় না আমার জন্য নয়। আমি এনাজকে জিজ্ঞেস করলাম,

— আপনার ভালোবাসার মানুষটাকে যে দেখছি না।

এনাজ মুচকি হেসে বললো,
— চলতে থাকো তাহলেই দেখতে পাবে।

তায়াং ভাইয়া মুখ টিপে হেসে বললো,
— কিরে শাঁকচুন্নি কেমন লাগছে?

— আমার আবার কেমন লাগবে? এসব তো আমার জন্য নয়।

কথাটা বলে মুখ গোমড়া করে রাখলাম। তায়াং ভাইয়াকে বলতে ইচ্ছে করছিলো ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে আমার। কিন্তু বলা হলো না। সামনে যেতেই শারমিন ও তন্বীকে দেখে বড়সড় একটা ঝাটকা খেলাম। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— কি রে তোরা এখানে?

শারমিন ভ্রু নাচিয়ে বললো,
— সারপ্রাইজটা কেমন লাগলো?

— তুই না বাসায় চলে গেলি?

— আবার চলে এসেছি।

ওদের হাতেও একিরকম সাদা শক্ত হার্ড কাগজ। সম্ভবত তাতে কিছু লেখা। কিন্তু উল্টো করে রাখায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি তন্বীকে জিজ্ঞেস করলাম,

— কাগজে কি লেখা?

তন্বী মুখ ভেংচি দিয়ে বললো,
— দেখাবো না। ভাইয়ার ভালোবাসার মানুষের আগে এগুলো কেউ দেখতে পারবে না।

— ওহ্।

নদীর দিকে চোখ যেতেই ফুলে সজ্জিত একটা নৌকা দেখতে পেলাম। নৌকার কিনারে ও ভেতরে নানা ফুলের সমাহার। এনাজ আমার এক হাত ধরে নৌকা উঠলো। আমি বোকার মতো সবকিছু দেখছি। কি হচ্ছে কিছুই বোধগম্য নয়। এনাজকে জিজ্ঞেস করলাম,

— আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?

এনাজ কথার উত্তর না দিয়ে নৌকার ওপর থেকে সবার মতো হার্ড কাগজটা নিয়ে এক হাঁটু মুড়ে বসে আমার দিকে মেলে ধরলো। আরেক হাতে কতগুলো গোলাপ বাড়িয়ে দিলো।কাগজে থাকা লেখাটা পড়ে আমার চোখ দুটো বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। পেছনে তাকিয়ে দেখি সবাই হাসছে। আর তাদের হাতের কাগজেও সেম লেখা। অবিশ্বাস্য চোখে সবার দিকে চোখ বুলিয়ে এনাজের দিকে তাকালাম। এনাজ কাতর গলায় কাগজে লেখা কথাটাই বললো,

— নোভা,will you be my পোলাপাইনের আম্মা?

এনাজ কথাটা বলার সাথে সাথে সবাই একসাথে “ওহো” বলে উঠলো। পার্টি স্প্রে দিয়ে পুরো সাদা ভুত বানিয়ে দিলো আমাদের দুজনকে।আমি এখনো শর্কডে আছি। আমি বোধহয় জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছি। নিজের গায়ে জোরে একটা চিমটি মারলাম। না, স্বপ্ন দেখছি না। বেচারা আমার উত্তরের আশায় এখনো উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এতকিছু তাহলে আমার জন্য ছিলো। আর এনাজের ভালোবাসার মানুষটা আমি। এতকিছু দেখেও আমি পুরো সিউর হতে পারলাম না। কিন্তু এখন আমার খুশি হওয়ার বদলে রাগ লাগছে। আমি ভেবেছিলাম সে অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাই এতকিছু ইনজয় করতে পারিনি। এখন উনি সারপ্রাইজ দিলো তো দিলো পুরো মাটি করেই দিলো। আগে একটু বললে কি হতো? তাহলে কি এত আনন্দ নষ্ট করতাম আমি। আমার এখন হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে😵। দাঁতে দাঁত চেপে তায়াং ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে কটমট করে বললাম,

— ভাই তোরা শুরু করছিস কি? আমাকে আগে থাকতে অল্প একটু জানালে কি হতো? নয়তো আমি এত সুন্দর সুন্দর মোমেন্টগুলো কি মন খারাপ করে বরবাদ করতে পারতাম? এখন তোরা আমারে এক গ্লাস আনারস না থুরি দুধ আর সাথে আনারস দে। খাইয়া, চিৎ হইয়া ভেটকাইতে ভেটকাইতে মইরা যাই।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here