তুমি_তাই অরিত্রিকা আহানা পর্বঃ১৯

0
88

#তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ১৯

শায়লা মুরসালীনের মেজাজ অত্যাধিক খারাপ। রাগে গরগর করছেন। রেজোয়ান মৌনমুখে তাঁর পাশে বসে আছে। চোখের দৃষ্টি উদাস, চেহারা বিষন্ন। মনে হচ্ছে কত রাত্রি নিদ্রাহীন কাটিয়ে এসেছে। গতকালই হস্পিটাল থেকে রিলিজ পেয়েছে সে। আসার পর থেকে সারাক্ষণ চুপচাপই ছিলো। একটু আগে হঠাৎ শায়লা মুরসালীনকে উদ্দেশ্য করে বললো,’আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি মা। এই দেশে আর থাকবো না। সব বেচে দিয়ে বিদেশে স্যাটেল হবো।’

শায়লা মুরসালীন অবাক হলেন। রেজোয়ান মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে এখন বলছে বিদেশে চলে যাবে। কি বলছে ও এসব? তেঁতে উঠলেন। ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,’কেন?’

-‘আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে।’

-‘ভালো লাগছে না? কেন? ঐ মেয়েটার জন্য? আর কত কষ্ট দিবি তুই আমাকে? নিজেও শান্তিতে থাকবি না আমাকেও শান্তিতে থাকতে দিবি না। এত কষ্ট করে ব্যবসা দাঁড় করালি এখন বলছিস সব ছেড়েছুঁড়ে বিদেশে স্যাটেল হবি। কেন রে? তোর কোন লজ্জাবোধ নেই? একটা মেয়ের জন্য তুই নিজের মাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস? বুঝতে পারছিস কতটা অন্যায় করছিস?’

মায়ের রাগের বিপরীতে অসহায় দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইলো রেজোয়ান। নিজের ভেতরে যন্ত্রণা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। অসহ্য বেদনায় ক্রমাগত বুক ভারী হয়ে আসছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ কেউ তাঁকে বুঝতে পারছে না। সবাই ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

হাটুমুড়ে মায়ের সামনে বসে পড়লো সে। মাথাটা তাঁর কোলের ওপর রেখে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত গলায় বললো,’প্লিজ মা, আর কোনদিন কিচ্ছু চাইবো না তোমার কাছে।’

শায়েলা মুরসালীন জবাব দিলেন না। তবে নরম হলেন। মায়ের মন সন্তানের বেদনায় ব্যথা পায়। বললেন,’ঠিক আছে। কিন্তু তুই আগে আমাকে একটা কথা দে। আমার গা ছুঁয়ে শপথ কর, আর কখনো ঐ মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবি না।’

রেজোয়ান প্রথমে কিছুক্ষণ কোন কথা বললো না। মরার মতন শায়লা মুরসালীনের পায়ের ওপর পড়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে বললো,’তোমার গা ছুঁয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্যি কথাটা বলার সাহসও সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেন নি মা। শপথ অনেক দূরের কথা। নিজের ওপর ভরসা থাকলে তোমাকে নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আমার নেই।’

শায়লা মুরসালীন মনে মনে খুশি হলেন। তবে শংকামুক্ত হতে পারলেন না। একবার মনে হলো রেজোয়ান তাঁকে ফাঁকি দিচ্ছে, আবার মনে হলো মায়ের কাছে মিথ্যে বলার ছেলে রেজোয়ান নয়। অতঃপর মুখ কালো করে বললেন,’তুই আমাকে ফাঁকি দিচ্ছিস রেজোয়ান। মাকে কষ্ট দিচ্ছিস তুই।’

-‘না মা। আমি তোমাকে ফাঁকি দিচ্ছি না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। নিলির সঙ্গে আমার আর কখনো যোগাযোগ হবে না। আমি আর কখনো ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবো না।’

শায়লা মুরসালীন আর কিছু বললেন না। ছেলের ওপর তাঁর বিশ্বাস আছে। অন্যদিকে নিলিও রেজাকে বিয়ে করছে। তাই বিয়েটা হয়ে গেলে রেজোয়ান চাইলেও আর যোগাযোগ করতে পারবে না। অতএব এই বিষয় নিয়ে আপাতত মাথা ঘামানো বন্ধ।


একসপ্তাহের ভেতর রেজোয়ান বাইরে যাওয়ার সব কাগজপত্র রেডি করে ফেললো। প্রোপার্টি যা আছে সব নিলামে উঠে গেলো। বিক্রি হলেই আর দেরী করবে না। জাহিদ বেশ দৌড়াদৌড়ি করছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেরে ফেলার জন্য। তাঁর ওপর দায়িত্ব দিয়ে রেজোয়ানও বেশ নিশ্চিন্তে আছে।

বাসার গোছগাছও সব শেষ। তিন্নি প্রায়ই দেখা করতে আসে শায়লা মুরসালীনের সঙ্গে। রেজোয়ানের সঙ্গেও দেখা হয় কিন্তু কথা বলে না। রেজোয়ানও আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যায় না। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

বলা প্রয়োজন, তিন্নির এখন আর আগের মতন রাগ নেই রেজোয়ানের ওপর। বরঞ্চ মনে মনে কষ্ট হয় রেজোয়ানের জন্য। মানুষটা কাছে পেয়েও ভালোবাসার মানুষকে আবার হারালেন। ভালোবাসার মানুষটা ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তাঁকে, একবারও তাঁর মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে নি। এসব ভাবলে তিন্নির কষ্ট হয়। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।


পরশু ফ্লাইট। ফুয়াদ এসেছে দেখা করার জন্য। শায়লা মুরসালীন জোর করে রেখে দিলেন। তিন্নিও আছে। প্রথমে এই বাসায় ফুয়াদকে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলো সে। পরে শায়লা মুরসালীনের কাছ থেকে জানতে পারলো ফুয়াদ তাঁর ভাইয়ের ছেলে। ফুয়াদ অবশ্য তাঁকে দেখে তেমন রিয়েক্ট করে নি। সামনাসামনি পড়ে গিয়ে একবার শুধু,’কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করেছে এইটুকুই। আর কোন কথা হয় নি।

অন্ধকারে ছাদের একপাশে একা দাঁড়িয়ে আছে রেজোয়ান। ফুয়াদ কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে বললো,’তোকে ফুপু নিচে ডাকছে। জাহিদ ফোন করছে। তোকে না পেয়ে নাকি ফুপুর নাম্বারে ফোন করছে। কি জরুরী কথা বলার জন্য।’

-‘ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেবো। সেই ব্যাপারে আলাপ করার জন্যই ফোন করেছে বোধহয়। তোমার কি খবর?’

-‘আমার আর কি খবর! ফুপু তো এখান দিয়ে এক ভেজাল লাগিয়ে দিয়েছে।’

-‘কি ভেজাল লাগিয়েছে?’

-‘আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তোদের নিচের ফ্ল্যাটে একটা মেয়ে আছে না তিন্নি? ওর বাসায় প্রস্তাব পাঠিয়ে দিয়েছে। বাবাকেও ফোন করে পাগল করে দিচ্ছে দেখতে আসার জন্য। বাবা তো ফুপুর কথা শুনেই অর্ধেক রাজী। আমার কোন কথাই শুনছেন না।’

রেজোয়ান অবাক হলো। শায়লা মুরসালীন ভেতরে ভেতরে এই কান্ড কখনো ঘটালো? একবারও তো তাঁকে বললো না? তবে যাই হোক না কেন ফুয়াদের সঙ্গে তিন্নির বিয়ে হলে খারাপ হবে না। অবশ্য তিন্নি যদি রাজি হয় তাহলে। কি জানি মেয়েটা রেজোয়ানের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে কি না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,’দেখো। মেয়ে দেখতে তো সমস্যা নেই। দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নাও। এখুনি এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।’

-‘ফুপু তোকে বলে নি?’

-‘কি?’

-‘মেয়ে আমি দেখেছি। কথাও বলেছি। সেজন্যই আমার মনে হচ্ছে আমার একে অপরের জন্য পার্ফেক্ট চয়েস না।’

ফুয়াদ সেদিনের ঘটনা একে একে সব খুলে বললো রেজোয়ানকে। সব শুনে রেজোয়ান কিঞ্চিৎ হাসলো। তিন্নি তাহলে এরমাঝেই এক কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। মেয়েটা কবে যে বদলাবে! পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বললো,’কে কার জন্যে পার্ফেক্ট চয়েস সেটা আমরা কেউ বলতে পারি না। একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো বলতে পারবেন তিনি কার জন্য কাকে ঠিক করে রেখেছেন। অতএব এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা বাদ দাও। চলো নিচে যাই।’

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পাসপোর্ট চেকিং শেষে লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করছে রেজোয়ান। তাঁর পাশে মেয়েকে নিয়ে গোমড়া মুখে বসে আছে শায়লা মুরসালীন। এই বুড়ো বয়সে নিজের দেশ ছাড়তে হচ্ছে দেখে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। এখন তাঁর নাতি নাতনী নিয়ে হেসেখেলে জীবন পার করে দেবার বয়স, এখন কিনা তিনি দেশছাড়া হচ্ছেন। ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

ফুয়াদ এসেছিলো সি অফ করতে। তাঁকে দেখে শায়লা মুরসালীন কম করে হলেও অর্ধ শতাধিক বার তিন্নির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আগামী সপ্তাহে তিন্নিকে দেখতে যাওয়ার কথা আছে ফুয়াদের বাবা মায়ের। সেখানে গিয়ে ফুয়াদ যেন কোন গণ্ডগোল না করে সেই বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন।

ফুয়াদ বাধ্য ছেলের মতন চুপচাপ সব শুনলো। শেষে শায়লা মুরসালীনকে আশ্বস্ত করে বললো,’আমি কোন গণ্ডগোল করবো না ফুপু। তুমি শুধুশুধু টেনশন করছো। বিয়ে যেহেতু সারাজীবনের ব্যাপার তাই আমি শুধু বলেছি তোমরা আরেকটু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও। কারণ মেয়ে যে একটু মেজাজি সেকথা তুমিও জানো আমিও জানি।

শায়লা মুরসালীন স্বীকার করলেন না। বললেন,’মেয়েমানুষের ওরকম একটু আধটু মেজাজ থাকে। এসব কিছু না। বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কি কম মেজাজ ছিলো? তোর বাবা জানে আমি কতটা মেজাজি ছিলাম। তাই বলে তোর ফুপার সঙ্গে আমি সংসার করি নি? কোনদিন হয়েছে আমাদের দুকথা?’

শায়লা মুরসালীনের নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাবে না বুঝতে পেরে ফুয়াদ চুপ করে গেলো। তিনি যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছে তাতে মনে হচ্ছে বিয়েটা দিয়েই ছাড়বেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here