তুমি_তাই অরিত্রিকা আহানা পর্বঃ২৩

0
188

#তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ২৩

ফুয়াদ অফিস থেকে এসেছে আধঘণ্টা হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে বেডরুমে শুয়ে টিভি দেখছিলো। তিন্নি শ্বাশুড়ির সঙ্গে রাতের রান্নাবান্না সেরে ঘরে এলো।
তিন্নির ঘরকন্না দেখলে সত্যিই বোঝার উপায় নেই এই সংসারে তার অনাগ্রহ। শ্বাশুড়ির সঙ্গে রান্না করা, শ্বশুরের ওষুধপত্রের খেয়াল রাখা, সময়মত ফুয়াদের সব কিছু রেডি রাখা এসব দেখে যে কেউই ভাববে বাড়ির আদর্শ বউ সে। দুমাস হয়েছে কেবল এই সংসারে এসেছে। এর মাঝেই সবার মন জয় করে নিয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত তিন্নি। দিনের পর দিন সবার সঙ্গে মিথ্যে ভালো থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে সে।

ভেতরে ঢুকে এসে দেখলো টিভি খামোখা চলছে, দেখার কেউ নেই। ফুয়াদ ফোন নিয়েই ব্যস্ত। এলো চুলগুলো হাতখোপা করে নিতে নিতে বললো,’নিচে খেতে ডাকছে।’

ফুয়াদ ফোন থেকে চোখ তুললো। তিন্নিকে সামনে দাঁড়ানো দেখে ভ্রুজোড়া অটোমেটিক কুঁচকে গেলো তাঁর। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললো,’আজকে এত তাড়াতাড়ি?’

-‘কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। মা খালাম্মার বাসায় যাবেন। তাই সবাইকে তাড়াতাড়ি খেতে ডাকছেন।’

ফোন পকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়ালো ফুয়াদ। স্মিত হেসে বললো,’ঠিক আছে চলো।’

-‘আমি খাবো না। আপনি যান।’

-‘কেন খাবে না কেন? শরীর খারাপ?’

-‘শরীর ঠিক আছে। খিদে নেই। আপনি যান।’

ফুয়াদ জোরাজুরি করলো না। চুপচাপ খেতে চলে গেলো। তিন্নি বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আজকে মনটা বড্ড অস্থির হয়ে আছে। ছুটে পালিয়ে যেতে মন চাইছে এই দমবন্ধকর সংসার জীবন থেকে থেকে।

অন্ধকারে চোখ দিয়ে গলগল করে পানি পড়ছে তাঁর। এতগুলো দিন হয়ে গেছে অথচ ফুয়াদের সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছে না সে। বারবার মনে হচ্ছে জেনে বুঝে ইচ্ছাকৃত ভাবে ফুয়াদ ঠকাচ্ছে। মিথ্যে ভালো থাকার অভিনয় করছে। তিন্নি মাঝেমাঝে মনে হয় ফুয়াদ অনেককিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে। ইচ্ছে করেই তিন্নি নিজের মত করে থাকতে দিচ্ছে সে।

এদিকে খেতে বসে আজকে আর ফুয়াদ ভাবছে কখন রুমে যাবে সে। এই প্রথম তিন্নিকে একা ফেলে খেতে চলে এসেছে ফুয়াদ। গত দুমাসে এমনটা কোনদিন হয় নি। তাই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস আজকে তিন্নির কাছ থেকে একটা না একটা রিয়েকশন সে পাবেই পাবে। কারণ অতিরিক্ত কেয়ার পেলে মানুষ হঠাৎ করে সামান্যতম অবহেলাও সহ্য করতে পারে না। এছাড়া তিন্নিকে বিগত দুমাস যাবত পর্যবেক্ষণ করছে ফুয়াদ। তাঁর এই নিরামিষ প্রকৃতির পিচ্চি বউটির মনের মধ্যে কোন একটা গোপন রহস্য আছে। যেটা চাইলেও ফুয়াদকে বলতে পারছে না সে। কিন্তু ফুয়াদ থেমে থাকবার পাত্র নয়। অনেক হয়েছে পার্সোনাল স্পেস দেওয়া। এবার সময় এসেছে আস্তে আস্তে তিন্নির পেট থেকে সব কথা টেনে বের করার।

অস্থিরতা চেপে, ইচ্ছে করেই দেরীতে ঘরে গেলো সে। গিয়ে দেখলো ঘর অন্ধকার। পা টিপে টিপে ভেতর ঢুকে দেখলো। তিন্নি শুয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুমায় নি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোঁপাচ্ছে। অবাক হলো ফুয়াদ। এইটুকুতেই এত কান্না? মেয়ে মানুষের জাতটা এমন কেন? এত কান্না তাদের আসে কোথা থেকে?

কাছে গিয়ে গলা খাঁকারি দিলো ফুয়াদ। আস্তে করে তিন্নিকে ডাক দিলো,’ঘুমিয়ে পড়েছো?’
তিন্নি জবাব দিলো না। ফুয়াদ আবার ডাক দিলো,’ঘুমিয়ে পড়েছো?’

-‘না। আপনার কিছু লাগবে?’

ফুয়াদ ইতস্তত করে বললো,’না মানে। আসলে আমি সরি। তোমাকে রেখে খেতে যাওয়াটা আমার একদমই উচিৎ হয় নি। আমি কি ভাত নিয়ে আসবো?’

-‘না।’ সংক্ষিপ্ত জবাব তিন্নি।

-‘কেন? রাতে না খেয়ে থাকা ভালো না।’

-‘আমার খিদে নেই।’

ফুয়াদ সাবধানে বিছানায় বসলো। তিন্নি ঠিক রেগে আছে নাকি অভিমান করেছে বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকারে তাঁর চেহারাও দেখতে পারছে না।

তিন্নি পাশ ফিরে বললো,’আপনি শুয়ে পড়ছেন না কেন? কালকে সকালে তো অফিস আছে।’

-‘আছে। কিন্তু…!’

-‘কিন্তু কি?..’ ফের বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো তিন্নি।

ফুয়াদ বিপাকে পড়ে গেলো। উঠে গিয়ে লাইট অন করলো সে। লাইট অন করতেই দেখলো তিন্নি শুধু ফোঁপাচ্ছে না কাঁদতে কাঁদতে অলরেডি তাঁর চোখমুখ ফুলে গেছে।
সামান্য ভাত খাওয়া নিয়ে নিশ্চয়ই এত কান্না করার কথা নয়? ফুয়াদ চিন্তায় পড়ে গেলো। তিন্নির সামনে চেয়ার টেনে বসলো সে। আলতো করে কনুই চেপে ধরে বললো,’এই ওঠো। ওঠো। দেখি কি হয়েছে বলো আমাকে?’

তিন্নি তৎক্ষণাৎ চোখ মুছে নিয়ে বললো,’কিচ্ছু হয় নি। আপনি যান শুয়ে পড়ুন।’

ফুয়াদ তিন্নির হাত চেপে ধরলো। জোরপূর্বক তাঁকে শোয়া থেকে টেনে তুলে বললো,’না বলতে চাইলে আমি জোর করবো না। কিন্তু খাবে চলো। মা তোমার কথা বারবার জিজ্ঞেস করছেন। ডাকতেও চাইছিলেন আমিই বারণ করেছি। চলো খাবে চলো।’

তিন্নি দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠে বললো,’খাবো না আমি।’

-‘কেন খাবে না?

-‘আমি একজনকে ভালবাসতাম।’

ফুয়াদের হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেলো। তবে ছাড়লো না। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তিন্নির দিকে চেয়ে রইলো। তারপর খুব স্বাভাবিক ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলো,’বাসতাম মানে কি? এখন বাসো না?’

তিন্নি মুখে জবাব এলো না। এটা কি ধরণের প্রশ্ন করেছে ফুয়াদ? লোকটার কি মাথাটাথা গেছে? তাঁকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুয়াদ ফের একই প্রশ্ন করলো।

অনেকক্ষণ বাদে ধীরে ধীরে মুখ খুললো তিন্নি। বললো,’আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ভুল বুঝছেন। কিংবা আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না! আমি সত্যি বলছি বিয়ের আগে আমি একজনকে ভালোবাসতাম।’

-‘এটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না? তুমি আমাকে বলছো তুমি একজনকে ভালোবাসতে। এর মানে আমি কি ধরে নেবো? তুমি এখন তাঁকে ভালোবাসো না? এই তো?’

-‘সে আমাকে কোনদিন ভালোবাসে নি।’

-‘এটাও আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না। যাইহোক, এখন কি সেই দুঃখে কাঁদছো? আমি গিয়ে তাঁকে রিকোয়েস্ট করবো?’, ফুয়াদ চেহারা এবং কণ্ঠস্বর দুটোই স্বাভাবিক।

-‘আপনি আমার কথা কেন বিশ্বাস করছেন না? আমি ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট পাচ্ছি। আর পারছি না ভালো থাকার অভিনয় করতে।’

-‘তো আপনি আমাকে কি করতে বলছেন? আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। আপনি যদি চান তবে, ঐ ছেলেকে গিয়ে রিকোয়েস্টও করবো। শুধু মুখ দিয়ে বলতে হবে আমাকে। না বললে আমি বুঝবো না।’

তিন্নি কি করবে বুঝতে পারছে না। সে যতটা দুশ্চিন্তা নিয়ে কথাটা বলেছিলো ফুয়াদের কাছ থেকে ততটা রিয়েকশন পাচ্ছে না। নিতান্তই রাগ লাগছে তাঁর। সবাই কেন তাঁকে এমন হালকা ভাবে নেয়? আগে রেজোয়ান নিতো, এখন ফুয়াদ। এরা ভাবে টা কি? তিন্নি বাচ্চা? কান্না থেমে গেলো তাঁর। হতাশা এসে ভর করলো চোখের পাতায়।

ফুয়াদ তাঁর মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো,’কি ব্যাপার? আপনি কথা বলছেন না কেন?’

-‘বলবো না আমি আপনার সঙ্গে কথা।’

-‘ও আচ্ছা। তা,আপনি কি খাবেন? নাকি আমি শুয়ে পড়বো?’, ফুয়াদ বিছানার ওপর পা তুলে বসলো।

-‘আপনি আমাকে আপনি করে বলছেন কেন?’,

ফুয়াদ তাঁর প্রশ্নের জবাব দিলো না। স্থিরভাবে তিন্নির মুখের দিকে চেয়ে অল্প হাসলো। তিন্নি অস্বস্তিতে জড়সড় হয়ে বললো,’তাঁর সঙ্গে কিন্তু আমার কোন প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না।’

-‘তো?’

-‘না মানে ভালোবাসাটা একতরফা ছিলো।’

-‘আচ্ছা।’

ফুয়াদ শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিলো। তাঁর ঠান্ডা রিয়েকশন তিন্নির মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণ কি করছে সে নিজেও জানে না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নিজ হাতে সংসারটা ভেঙ্গে দিতে চলেছে সে! নতুবা ফুয়াদ এমন শান্ত আচরণ করবে কেন? নিশ্চয়ই তিন্নিকে ত্যাগ করার পরিকল্পনা করছে সে! তাই যদি হয় তবে বাবা মাকে কি জবাব দেবে তিন্নি? অকস্মাৎ ভয়ে কেঁদে ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেললো। ফুয়াদ বাধা দিলো না।
উঠে গিয়ে চুপচাপ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে। কিছুক্ষণ বারান্দায় কাটিয়ে এসে তিন্নির পাশে বসলো। বললো,’তাঁকে যখন এতই ভালোবেসেছো তখন আমাকে বিয়ে করেছো কেন?’

-‘তাঁর প্রতি এখন আর আমার কোন ফিলিংস নেই।’

-‘তারমানে তুমি বলতে চাইছো এখনো আমার একটা সুযোগ আছে?’

তিন্নি অবাক হলো ফুয়াদের প্রশ্ন শুনে। সে মোটেও এমন কিছু বলতে চাই নি। সে শুধু সত্যিটা জানিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু পরিণতির কথা ভাবে নি। তাঁর রিয়েকশন দেখে ফুয়াদের হাসি পেয়ে গেলো। তিন্নির সম্পর্কে রেজোয়ানের কাছ থেকে অল্পবিস্তর জেনেছে সে। মেয়েটা ভীষণ ইমোশনাল! খামখেয়ালিও। আবেগ চেপে রাখতে পারে না। হাসি ঠেকিয়ে বললো,’কি তাইতো?’,

-‘আমার মনে হয়েছিলো সত্যিটা আপনার জানা দরকার। আপনাকে অন্ধকারে রেখে আমি ভালো থাকতে পারছিলাম না।’
তিন্নি মাথা নিচু করে হাতদুটো মুঠো করে ফেললো।

-‘এখন বয়স কত তোমার?’

-‘জানুয়ারিতে উনিশ হবে।’

-‘বাহ! তাহলে তো ভালোই ইঁচড়েপাকা তুমি। একেবারে আণ্ডাবাচ্চা থাকতেই প্রেম ভালোবাসা বুঝে গেছো। গুড। ভেরি গুড।’

তিন্নির এবার রাগ লাগছে। গম্ভীরমুখে প্রতিবাদ করে বললো,’প্রেম ভালোবাসার কোন বয়স হয় না। আমি তাঁকে সত্যিই খুব ভালোবাসতাম।

-‘আমার বয়স কত জানো? একত্রিশ বছর, চার মাস, দশ দিন। আমাকে এসব প্রেম ভালোবাসা বোঝাতে এসো না। যা বলছি মনযোগ দিয়ে শোনো, এখন থেকে লক্ষ্মী মেয়ের মত মন দিয়ে সংসার করবে। পুরোনো প্রেমিকের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, ওসব বাচ্চাকালের প্রেম ভালোবাসা সকলেরই দুচারখানা থাকে। তাই বলে জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। পড়াশোনায় মনোযোগ দাও। আর বাকিটা আমার দায়িত্ব। আমি যতদিন বেঁচে আছি,ততদিন মনে মনেও আমার স্ত্রীকে দ্বিচারিণী হতে দেবো না। এত ভালোবাসবো যে, দিনরাত চব্বিশঘন্টা শুধু আমার নামই জপ করবে।’
কথা শেষ করে ফুয়াদ তিন্নিকে কোন প্রতিউত্তর করার সুযোগ দিলো না। জোরপূর্বক তাঁকে টেনে ভাত খাওয়াতে নিয়ে গেলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here