তুমি_তাই অরিত্রিকা আহানা পর্বঃ১

0
222

তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ১

রেজোয়ান মুরসালীন। উদীয়মান, তরুণ ব্যবসায়ী। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। অ্যাকাডেমিক প্রোফাইল যথেষ্ট ভালো যাকে বলে কন্যা সম্প্রদানের জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্র। দেখতে শুনতেও মানানসই। কিন্তু সমস্যা একটাই, এই উপযুক্ত পাত্রটি বছর তিনেক আগে তিনি তাঁর সুন্দরী প্রেমিকার কাছ থেকে ধোঁকা এবং ছ্যাকা খেয়ে বেশি কিছুদিন ব্যাঁকা হয়ে ছিলো। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। বেশ ভালোভাবেই নিয়েছে। বর্তমানে সফল ব্যবসায়ীদের একজনই বলা চলে তাঁকে। যদিও তাঁর উচ্চাশার কাছে এখনকার প্রাপ্তি কিছুই নয়। তবুও ব্যবসায়ী মহলে তিনি বেশ জনপ্রিয়।

অফিসের সবাই খুব কমই হাসতে দেখেছে তাঁকে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে তিনি হাসেন না। বাড়িতে সবার সঙ্গেই তিনি ফ্রি। বিশেষ করে তিন্নি নামক ঝগড়ুটে প্রতিবেশিনীটির সঙ্গে একটু বেশিই ফ্রি। তিন্নির প্রধান কাজই হচ্ছে কারণে অকারণে রেজোয়ানকে বিরক্ত করা। তার অবশ্য একটা কারণ আছে। রেজোয়ানের মা মিসেস শায়লা মুরসালীন রেজোয়ানের জন্য মনে মনে তিন্নিকে ঠিক করে রেখেছেন। তিন্নিরও তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু রেজোয়ান এসব কানে তুলে না। তাঁর ধারণা তিন্নির এখনো বিয়ে, ভালোবাসা এসব বোঝার মতন বয়স হয় নি। তাছাড়া বিয়ে নিয়ে বিশেষ কোন মাথাব্যথাও নেই তাঁর। তিন্নিকে সে ছোট বোনের মতনই ভালোবাসে কিন্তু ঝগড়া করে দুজনে সমবয়সী ভাইবোনদের মত।
যাইহোক, এবার আসল গল্পে আসি,
আজ শুক্রবার, রেজোয়ানের হাফ ডে। অফিস করে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এসেছে সে। বিকেল বেলা হাওয়া খেতে ছাদে উঠেছিলো। ছাদের এককোনায় দাঁড়িয়ে তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিলো তিন্নি। তাঁকে দেখে ছুটে এসে কাঁদোকাঁদো মুখ করে বললো,’খবর শুনেছেন রেজোয়ান ভাই?’

-‘কি খবর?’

-‘আন্টি আপনাকে কিছু বলে নি?’

-‘না তো।’

-‘আপনার মামাতো ভাই ফুয়াদ আমাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে।’

খবরটা শুনে রেজোয়ান প্রথমে চমকে গেলেও পরে হাসি পেয়ে গেলো। শায়লা মুরসালীন একাই এই বিয়ে ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট। সুতরাং এতে তাঁর কোন কাজ নেই। আর তিন্নিরও ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ এত তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিয়ে দেবেন না তিন্নির মা তাসলিমা বেগম। কিন্তু তিন্নিকে খানিকটা রাগানোর জন্য ঠাট্টার সুরে বললো,’তোর সাথে ফুয়াদ ভাইয়ার বিয়ে হলে তো ভালোই হবে। তুই হবি আমার ভাবী, আমি হবো তোর দেবর। আমার তো ভাবতেই আনন্দ লাগছে। আমি তখন তোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে বাংলা সিনেমার নায়কদের মত গান গাইবো,
ভাইয়া তোমার বর!
আমি যে দেবর।
ভেবে দেখো ভাবী?
কার বেশি দাবি
কারে তুমি করবে আপন
করবে কারে পর?
ইন্টারেস্টিং না? তোর মত একটা পিচ্চি মেয়েকে ভাবী বলে ডাকতে হবে আমার! হায় কপাল!’

তিন্নি দাঁতমুখ খিঁচে রাগত স্বরে বললো,’জি না। একদম ইন্টারেস্টিং না। কারণ এত সহজে আমি আপনাকে ছাড়ছি না। সংস্কৃতে আছে, দেবর মানে দ্বিতীয় বর। সেই হিসেবে আপনি আমার বর! বাসরটা আমি আপনার সঙ্গেই করবো।’

রেজোয়ানের আচমকা কাশি উঠে গেলো। কাশতে কাশতে চোখে পানি এসে গেলো তাঁর। সেটা দেখে তিন্নি মুখটিপে হাসলো। ইচ্ছে করে রেজোয়ানকে ভড়কে দিয়েছে সে। লজ্জায় রেজোয়ানের গালদুটো পাকা টমেটোর মত লাল হয়ে গেছে। তিন্নির মুখে লাগাম নেই। যখন যা খুশি বলে দেবে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,’তোর লজ্জা শরম নেই কেনো রে তিন্নি? দেবর মানে দ্বিতীয় বর? ছিঃ! এসব অশ্লীল কথাবার্তা কোথা থেকে শিখেছিস তুই? জানিস না ভাবি মায়ের সমান? তোর কথা শুনে তো পৃথিবীর কোন দেবর আর কোনদিন লজ্জায় তাঁর ভাবির দিকে তাকাতে পারবে না। আমিও না।’

তিন্নি দুপা এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত সাহসের সহিত তাঁর কলার চেপে ধরে ফিসফিস করে বললো,’ভাবির দিকে তাকানোর দরকার টা কি শুনি? আপনি শুধু আমার দিকে তাকাবেন। এই যে আমি আপনার সামনেই আছি। আমাকে দেখুন!’ রেজোয়ানের দৃষ্টি আটকে গেলো। না চাইতেও অপলক কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো তিন্নির কিশোরী সুলভ মিষ্টি মুখখানার দিকে। চোখ ঝলসানো রূপ নেই তিন্নির, কিন্তু অদ্ভুত মায়া আছে! ভালোবাসায় ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু রেজোয়ান এসব থেকে দূরে থাকতে চায়। আত্মসংবরণ করে নিয়ে বললো,’ছাড় আমাকে। এসব কি অসভ্যতা!’

-‘ছাড়বো না।’

-‘ছাড়! মা এসে পড়বে।’

-‘আসুক। আন্টি সব জানে। শুধু আন্টি কেন এই ঢাকা শহরের সবাই জানে আমাদের মাঝে ইটিশপিটিশ চলছে!’

রেজোয়ান চোখ বড়বড় করে বললো,’কি চলছে?’

-‘ইটিশপিটিশ!’

-‘ইটিশপিটিশ মানে কি?’

তিন্নি মুখে কৃত্রিম লাজুক লাজুক ভাব এনে মৃদুস্বরে বললো,’প্রেম!’

হঠাৎ করেই রেগে গেলো রেজোয়ান। মৃদু ধমক দিয়ে বললো,’মারবো এক চড়! তুই প্রেমের কি বুঝিস হ্যাঁ? বয়স কত তোর? তোর মত একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে আমি প্রেম করবো এটা তুই ভাবলি কি করে?’

-‘বাড়িতে আমার বিয়ের কথা চলছে আর আপনি বলছেন আমি বাচ্চা?’

-‘ইঁচড়েপাকাদের এমনই নয়। সবাই জানে তোর দ্বারা পড়াশোনা হবে না। তাই বিয়ে দিয়ে আপদ বিদেয় করতে চাইছে। কিন্তু আমার বউ হবে আলাদা। তাকে আমার মতন পড়াশোনায় ভালো হতে হবে।’

-‘কেন? আপনি আর আপনার বউ কি ভাতের বদলে বইপুস্তক খাবেন?’

-‘দরকার হলে খাবো। বউয়ের হাতের বইও খাওয়া যায়।’

তিন্নি ভেংচি কেটে বললো,’আমার বয়েই গেছে আপনার মত একজন ছ্যাকাখোরকে বিয়ে করতে। আমার ফুপাতো ভাই বুয়েটে পড়ে। সে আমাকে বিয়ে করার জন্য একপায়ে খাড়া!’

মিথ্যে বলেছে তিন্নি। রেজোয়ানের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য এতবছর বাদে হুট করে তাঁর দশবছরের ছোট্ট ফুপাতো ভাইকে কাল্পনিক বুয়েটের স্টুডেন্ট বানিয়ে দিয়েছে। রেজোয়ান অবাক হয়ে বললো,’তোর কোন ফুপাতো ভাই বুয়েটে পড়ে? আমি তো কখনো শুনি নি?’

-‘আপনি কি করে শুনবেন? আপনি আমার বংশের সবাইকে চেনেন?’

-‘তা চিনি না। কিন্তু তুইও তো কখনো বলিস নি?’

-‘পড়ে পড়ে। আমার মেজো ফুপুর ছেলে ইমতিয়াজ, বুয়েটে আর্কিটেক্ট নিয়ে পড়ছে।’

-‘ও আচ্ছা। ভালো।’

-‘উনি আমাকে সেই ছোটবেলা থেকে পছন্দ করে।’

-‘তাই নাকি? দাঁড়া আমি আন্টিকে এক্ষুনি গিয়ে বলছি তুই পড়াশুনা বাদ দিয়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছিস।’

-‘ভালোই হবে। এমনিতেও ইমতিয়াজ ভাইয়া সবাইকে বলতে লজ্জা পাচ্ছিলো। আপনি বললে আমাদের আর বলার প্রয়োজন হবে না। সবাই বিষয়টা এমনিতেই জেনে যাবে।’

-‘আমাদের মানে?’

-‘আমাদের মানে আমি আর ইমতিয়াজ ভাইয়ার।’

রেজোয়ান হাসলো। যদিও মনে মনে বিষয়টা নিয়ে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছে সে। কিন্তু তিন্নির কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করার মতন বোকামিও করলো না। মেয়েটা ইনস্ট্যান্ট মিথ্যা কথা বলে ফেলতে পারে। তাই সত্যিটা জানার জন্য আপনমনে ফন্দি আটলো। ছাদে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চট করে নিচে নেমে গেলো। সে চলে যাওয়ার পর তিন্নি একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হাসলো। ভীষণ শান্তি লাগছে তাঁর। বেশ করে কনফিউজড করে দেওয়া গেছে ছ্যাকাখোরটাকে। এবার ভাবুক সারাটাদিন তিন্নিকে নিয়ে!


তাসলিমা বেগম অগ্নিচক্ষু নিয়ে তিন্নির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,’কতদিনের সম্পর্ক তোদের?’

ভয়ে তিন্নির মুখটা একেবারে কাঁদোকাঁদো হয়ে গেলো। সংকিত কন্ঠে বললো,’কাদের কথা বলছো আম্মা? আমি তো কোন প্রেম টেম করি না। রেজোয়ান ভাই মিথ্যে বলছেন।’

-‘রেজোয়ান খামোখা তোর নামে মিথ্যে কথা বলতে যাবে কেন?’

রেজোয়ান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে থুঁতনি চুলকালো। পিচ্চিটাকে কেস খাইয়ে ভীষণ আনন্দ লাগছে তাঁর। এবার যা করার তাসলিমা বেগমই করবেন। মেরে গাল লাল করে দেবেন। মুচকি হেসে গলা পরিষ্কার করে তাসলিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো,’ আন্টি আপনি শান্ত হোন। তিন্নি বোধহয় বলতে ভয় পাচ্ছে। এসব তো আজকাল নরমাল ব্যাপার। এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আপনি আগে ঠান্ডা মাথায় শুনুন ও কি বলে।’

তারপর তিন্নির দিকে উদ্দেশ্য করে বললো,’ভয় পাচ্ছিস কেন তিন্নি? সত্যিটা বলে দে আন্টিকে!’

তিন্নি ঝাঁঝালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,’আপনি আমাদের বাসায় কি করছেন হ্যাঁ? কাজ নেই আপনার? অফিস টফিস নেই? এই করে করে আপনি ব্যবসা সামলাবেন?’

তাসলিমা বেগম ঠাস করে মেয়ের গালে এক চড় বসিয়ে দিলেন। বজ্রকন্ঠে ধমক দিয়ে বললেন,’অসভ্য বেয়াদব মেয়ে। ওর কাজের খবর নেওয়ার তুই কে? আগে নিজেকে কি করেছিস সেই খেয়াল আছে?’

রেজোয়ানের সামনে চড় খেয়ে ভয়ানক প্রেস্টিজ লাগলো তিন্নির। রাগে, ক্ষোভে সামনের টি টেবিলের ওপর রাখা ফ্লাওয়ার ভাসটা তুলে রেজোয়ানের দিকে তাক করে বললো,’এক্ষুনি আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান বলছি। নইলে এটা দিয়ে বাড়ি মেরে আপনার মাথা ফাটিয়ে দেবো আমি।’

তাসলিমা বেগম আবার সপাটে চড় মারলেন তিন্নির গালে। ক্রুদ্ধ স্বরে চেঁচিয়ে উঠে বললেন,’রাখ এটা। রাখ বলছি। বেয়াদব মেয়ে, লাই পেয়ে পেয়ে একবারে মাথায় উঠেছিস।’
হাতের ফ্লাওয়ার ভাসটা রেখে শব্দ করে কেঁদে ফেললো তিন্নি। অনুনয় করে বললো,’বিশ্বাস করো আম্মা, আমি একফোঁটাও মিথ্যে বলছি না। জাবের মাত্র ক্লাস থ্রিতে পড়ে! ওর সঙ্গে আমি কি করে প্রেম করবো তুমিই বলো?’

তাঁর স্বীকারোক্তিতে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠলো রেজোয়ানের ঠোঁটে। সত্যিটা তিন্নি নিজ মুখেই স্বীকার করে নিয়েছে। তাঁর কোন ফুপাতো ভাই বুয়েটে পড়ে না।
রেজোয়ানের কাজ হাসিল! কিন্তু তাসলিমা বেগম এর আগাগোড়া কিছুই বুঝলেন না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রেজোয়ানের দিকে চাইলেন। রেজোয়ান তাঁকে আশ্বস্ত করে বললো,’আপনি ভেতরে যান আন্টি। তিন্নির সঙ্গে আমি কথা বলছি।’

-‘আপনার সঙ্গে আমি কোন কথা বলবো না।’, রাগে তেতে উঠলো তিন্নি। কিন্তু তাসলিমা বেগমের চোখ রাঙানির ভয়ে আবার শান্ত হয়ে বসে যেতে হলো। উনি চলে গেলে রেজোয়ান হাসতে হাসতে বললো,’আন্টিকে আমি তোর কোনো ফুপাতো ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেসই করি নি। তুই নিজের মুখেই সব স্বীকার করে নিয়েছিস। তোর কোন ফুপাতো ভাই বুয়েটে পড়ে না। চাপা মেরেছিস তুই!’ কথা শেষ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সে। তিন্নি ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কেবল। কে বলবে এই অহংকারী, সদাগম্ভীর,নিরামিষ প্রকৃতির মানুষটা যাকে কিনা অফিসের সবাই জমের মত ভয় পায় সে তিন্নির মত একটা নিষ্পাপ, মাসুম মেয়ের পেছনে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা লেগে থাকে! কেউ তো বিশ্বাসই করবে না!

রেজোয়ান হাসি থামিয়ে বললো,’যাই হোক,ছোট হয়ে বড়দের সাথে যখন চালাকি করতে গেছিস তখন এমনই হবে। খুব আমাকে ছ্যাকাখোর বলছিলি না তখন? দেখলি কেমন শোধ নিলাম? শাস্তিস্বরূপ আন্টির হাতে কষে দুটো চড় খেয়েছিস তুই! বেশ শান্তি লাগছে এখন। কলিজা একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। এবার শান্তিতে একটা ঘুম দেওয়া যাবে।’
তিন্নি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঠেলে রেজোয়ানকে ঘর থেকে বের করে দিলো। তারপর রেজোয়ানের মুখের ওপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ভাবতে বসে গেলো কি করে রেজোয়ানকে জব্দ করা যায়।

(বিঃদ্রঃ আগের গল্পটা আপাতত বন্ধ রাখছি। গুছিয়ে লিখতে পারলে আবার কন্টিনিউ করবো।)

#তুমি_তাই
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ২

বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরছে নিলি। আজকে একটা চাকরীর ইন্টার্ভিউ আছে তাঁর। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরার কথা। কিন্তু পা চলছে না। সেই ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে অসুস্থ বাবাকে নাস্তা খাইয়ে দুটো টিউশনির জন্য বেরিয়েছে। টিউশনি শেষ করে বাজার নিয়ে তবে বাড়ি ফিরছে কিন্তু এতটা সময় পর্যন্ত পেটে একফোঁটা দানাপানিও পড়ে নি তাঁর। খিদেয় সমস্ত শরীর নুইয়ে আসছে। মাথা ঘুরছে। গায়ে একবিন্দুও জোর পাচ্ছে না।

আধঘন্টার রাস্তা একঘন্টা লাগিয়ে বাড়িয়ে ফিরলো সে। চুলায় তরকারি বসিয়ে তাড়াহুড়ো করে রাতের রেখে আধপঁচা পান্তাভাত গ্রোগ্রাসে গিলে নিলো। তারপর গোসল সেরে রেডি হয়ে নিলো ইন্টার্ভিউ দিতে যাওয়ার জন্য।
নিলির বাবা নিজামউদ্দিন বিছানায় শুয়ে কাঁতরাচ্ছেন। গত দুইবছর যাবত শয্যাশায়ী তিনি। একমাত্র ছেলে নাইমকে হারিয়ে তাঁর এই অবস্থা। সংসারের দায়িত্ব এখন নিলির ঘাড়ে। সংসার বলতে সে আর নিজামউদ্দিন সাহেবই আছেন। মা সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছেন।

বাবাকে খাইয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লো নিলি। অফিসে পৌঁছাতে দেড়ঘন্টার মত সময় লেগে গেলো। ভাগ্য ভালো নিলির সিরিয়াল তখনো আসে নি। নইলে ইন্টার্ভিউটা মিস হয়ে যেতো তাঁর।


ইন্টার্ভিউ বোর্ডে গম্ভীরভাবে চেয়ারে বসে আছে রেজোয়ান। নতুন কিছু প্রোডাক্ট লঞ্চ করেছে তাঁর কোম্পানী। তাই কাজের চাপ আগের চাইতে তিনগুণ বেড়ে গেছে। সেই জন্য জরুরি ভিত্তিতে কর্মচারী নিয়োগ দিতে হচ্ছে।
এই পর্যন্ত অফিসে যতজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সবার ইন্টার্ভিউর সময়ই রেজোয়ান উপস্থিত ছিলো। ব্যবসার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস সে। নিজে দেখে শুনে লোক নিয়োগ দেয়। আজও তাঁর ব্যতিক্রম হলো না। সকাল থেকে ইন্টার্ভিউ বোর্ডে বসে আছে সে। একেরপর এক ক্যান্ডিডেট দের ইন্টার্ভিউ নিয়ে চলেছে। লাঞ্চের আগে তিনচারজন বাকি ছিলো। তাদের ইন্টার্ভিউ শেষ করে তারপর লাঞ্চে যাবে ভাবছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনবছর আগের সেই চিরচেনা মুখটা দেখে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো সে। বেমালুম ভুলে গেলো লাঞ্চের কথা! জ্বালাময়ী, বিশ্বাসঘাতী, ঘৃণিত সেই মুখ! আবার দেখা দিয়েছে। এতদিন বাদে পুরোনো ক্ষত আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভয়ানক রাগে চোখজোড়া লাল হয়ে গেলো তাঁর। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। আকস্মিক গর্জন করে উঠে বললো,’তুমি!’

নিলি থমকে গেছে। সমস্ত পৃথিবী ঘুরছে তাঁর! চারপাশে সবকিছু ঝাপ্সা মনে হচ্ছে। শারীরিক ভারসাম্যহীনতা ঠেকাতে দরজা হাতল চেপে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর! এতদিন বাদে আবার সেই মানুষটার সঙ্গে দেখা! কি ভয়ানক ক্রোধ নিয়েই না তাঁর দিকে চেয়ে আছে মানুষটা!

বাকিরা সবাই হতবম্ভ। রেজোয়ানের আকস্মিক ক্রোধের কারণ কেউ বুঝতে পারছে না। সেক্রেটারি জাহিদের ডাকে হুঁশ ফিরলো রেজোয়ানের। নিজেকে সামলে নিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো সে। বুকের ভেতর পিনপিন করছে! অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে উঠানামা করছে হৃদপিন্ডটা।

অনেকটা সময় নিরবে কেটে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো নিলি। হাতের ফাইলপত্র টেবিলে জমা দিলো। যদিও সে জানে চাকরীটা তাঁর হবে না। তবুও শেষ চেষ্টা করলো। এইছাড়া তাঁর হাতে আর কোন উপায় নেই। এই বাজারে চাকরী পাওয়া খুবই মুশকিল। তারপর অধিকাংশ জায়গায় তো সে ইন্টার্ভিউই দেওয়ার সুযোগ পায় না। আজ অনেকদিন বাদে যাও একটা সুযোগ পেয়েছে তাও এভাবে পুরোনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠবে সে ভাবতেই পারে নি।

কিন্তু রেজোয়ান দমলো না। ফাইলপত্র দেখে সিউর হয়ে নিলো তাঁর অফিসে ইন্টার্ভিউ দিতেই এসেছে স্বার্থপর, লোভী মেয়েটা। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো সে।

গম্ভীর মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। জাহিদকে উদ্দেশ্য করে বললো,’উনাকে আমার রুমে পাঠিয়ে দাও। আমি পার্সনালি উনার ইন্টার্ভিউ নেবো।’

রেজোয়ানের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে নিলি। একটু পর পর অতি সন্তর্পণে চোখ মুছছে। রেজোয়ান চুপচাপ তাঁর সিভি পড়ছে। নিতান্ত কৌতূহল বশতই কাজটা করছে। হঠাৎ কি কারণে এত বড়লোক স্বামীর ঘর ছেড়ে তাঁর অফিসে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে নিলি, কারণটা তাঁর জানা দরকার। পড়তে পড়তে হুট করে একটা জায়গায় চোখ আটকে গেলো। ফর্মে নিলির স্বামীর নামের ঘরে মৃত লেখা। থমকে গেলো রেজোয়ান। গলার স্বর আটকে গেলো। হতবিহ্বল, বিস্মিত চেহারা নিয়ে নিলির দিকে চাইলো।

চোখের সামনে ভেসে উঠলো তিনবছর আগের সেই দিনটার কথা। টাকার লোভে রেজোয়ানকে ছেড়ে এক এমপির ছেলেকে বিয়ে করেছিলো নিলি।
নিলির বাবা নিজামউদ্দিন সাহেব ছিলেন এলাকার ছোটখাটো একজন রাজনীতিবিদ। সেই সুবাদে ছেলেকেও রাজনীতিতে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বিশেষ সুবিধা করে উঠতে না পেরে নিজের একমাত্র সুন্দরী মেয়েকে স্থানীয় এমপির ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নিজেদের আখের গুছাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তাতেও ভাগ্য বিপরীত। নিলির স্বামী মুবিন ছিলো নেশাখোর, মাতাল, চরিত্রহীন, লম্পট। বিয়ের ছয়মাস যেতে না যেতেই নিলিকে মেরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
এদিকে অল্পকিছু দিনের মধ্যেই মাদকের মামলায় জড়িয়ে পড়ে নিলির ভাই নাঈম। দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীদের গুলিয়ে নিহত হয়। তার তিনদিনের মাথায়ই নিলির কাছে খবর আসে মুবিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালাতে হয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করে মারা গেছে। নিজামউদ্দিন সাহেব একসঙ্গে সব হারিয়ে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেন। অধিক শোকে নিলি পাথর হয়ে গেলো। তারপর থেকে জরাগ্রস্ত সংসারটাকে একা হাতে টেনে চলেছে সে। রেজোয়ান এসবের কিছুই জানে না। সে কেবল জানে নিলি তাঁকে ধোঁকা দিয়েছে।

এতদিন বাদে রেজোয়ানকে দেখে বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে নিলির। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ যাচ্ছে। সেদিন জোর করে মুবিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলো বাবা। নইলে রেজোয়ানকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলো মুবিন এবং তাঁর পরিবার। লম্পট মুবিনের আগে থেকেই লোভ ছিলো নিলির প্রতি। নিলির বাবাও সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তাই বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হতে হয়েছিলো নিলিকে।ভয়ে রেজোয়ানকে সেসব কথা মুখ ফুটে বলতে পারে নি কারণ সত্যিটা জানলে রেজোয়ান কখনোই তাঁর পিছু ছাড়তো না। ফলাফলস্বরূপ যা হওয়ার তাই হয়েছে। রেজোয়ান তাঁকে ভুল বুঝেছে।


সিভি রেখে সোজা হয়ে বসলো রেজোয়ান। ভেতরে দুঃখবোধ চেপে রেখে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিলির হাজবেন্ডের কথা পুনরায় জিজ্ঞেস করলো। জবাবে নিলি চোখ মুছে শান্ত গলায় বললো,’তিনি মৃত!’

-‘সো স্যাড।’

অপরদিকের মানুষটা নিরব। রেজোয়ান থামলো না। তিরস্কারপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রশ্ন করলো,’তা টাকা পয়সা রেখে যান নি কিছু? আই মিন বিষয় সম্পত্তি?’

-‘সম্পত্তি টাকাপয়সা যা রেখে গিয়েছিলেন সেটা তাঁর পরিবার ভোগ করছে!’

অলসভঙ্গিতে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো রেজোয়ান। রিভেঞ্জ অব নেচার বলে একটা কথা আছে। যেই টাকার জন্য নিলি তাঁর পাহাড়সম ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করে অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলো সেই টাকার জন্যই আজকে তাঁকে রেজোয়ানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!

কিন্তু দুঃখজনক হলেও একথা সত্যি যে, নিলির এমন করুণ পরিস্থিতিতে রেজোয়ান খুশি হতে পারছে না। কারণ মৃত্যু কখনোই আনন্দদায়ক কোন ঘটনা হতে পারে না। সেটা যদি হয় পরম শত্রুরও, তবুও না।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিলো রেজোয়ান। নিতান্ত অবজ্ঞাসুরে জিজ্ঞেস করলো ,’তারমানে আপনি আর্থিক সংকটে আছেন? তাইতো?’

-‘জি।’

-কিন্তু আপনার যেই কোয়ালিফিকেশন তাতে এমন নামকরা একটা কোম্পানিতে আপনাকে চাকরী দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’

নিলি জবাব দিলো না। মাথা নিচু করে বসে রইলো।রেজোয়ান এখনো তাঁর কথা শেষ করে নি। পরবর্তী বাক্যগুলো শোনার অপেক্ষা কেবল! তারপরই আবার
অন্য চাকরী খুঁজতে হবে নিলিকে!
রেজোয়ান নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলো। নিলিকে অপদস্থ করার এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলো না সে। স্বার্থপর লোভী মেয়েটার এখনো অনেক শাস্তি পাওয়া বাকি আছে। মুচকি হেসে বললো,’ঠিক আছে। আপনাকে আমি কিছু প্রশ্ন করবো। সঠিক উত্তর দিতে পারলে আপনার চাকরী কনফার্ম। ভেবে চিনতে বলবেন কিন্তু। ঠিক আছে?’

-‘জি ঠিক আছে।’

-‘প্রথম প্রশ্ন, হোয়াট ইজ রিলেশনশীপ?’

চমকে উঠলো নিলি। ইন্টার্ভিউ বোর্ডে এমন প্রশ্ন করার মানে কি! অস্বস্তিতে মুখ লাল হয়ে গেলো। তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ফেলার জন্য ইচ্ছে করেই এমন প্রশ্ন করেছে রেজোয়ান। কিন্তু উত্তর দেবে কিনা বুঝতে পারছে না নিলি। রেজোয়ান কি সত্যিই উত্তর চাইছে না মজা করছে! মুখটা করুণ হয়ে এলো নিলির। চাকরীটা না হলে আবার ছোটাছুটি করতে হবে তাঁকে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ম্লান কন্ঠে বললো,’লাভ। এভ্রি রিলেশনশিপ নিডস লাভ। ‘

রেজোয়ান ঠোঁট উল্টালো। নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো,’ওকে ফাইন। নাউ টেল মি হোয়াট ইজ লাভ?’

-‘ইট’স অ্যাবাউট লয়াল্টি!’

এবারে তাচ্ছিল্যভরে শব্দ করে হাসলো রেজোয়ান। ভ্রূ জোড়া ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বেঁকে গেলো। ভূতের মুখে রামনাম। হাসতে হাসতেই ঠাট্টারসুরে বললো,’ বাহ্! প্রেম ভালোবাসা নিয়ে তো দেখছি ভালোই জ্ঞান আছে আপনার। নট ব্যাড। প্রেমটেম করেছিলেন নাকি? বিয়ের আগে পরে মিলিয়ে নিশ্চয়ই তিনচারখানা হবে? নাকি আরো বেশি?’

নিলি নিশ্চুপ। অপমান গায়ে মাখলো না। তাঁকে বিব্রত করতে পেরে মনে মনে আনন্দ পাচ্ছে রেজোয়ান। কিন্তু এত অল্প শাস্তিতে তাঁকে ছেড়ে দিতে মন চাইলো না। তাই মুচকি হেসে মনে মনে নিলিকে চাকরীটা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে। অফিসে রেখে প্রতিদিন একটু একটু করে মারবে।
ভাবনা চিন্তা শেষে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,’আপনি কাল থেকে আমাদের অফিসে ক্লার্ক হিসেবে জয়েন দিতে পারেন।’

সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলো নিলি। পদমর্যাদা নিয়ে মাথা ঘামালো না। তার এখন যেই অবস্থা তাতে করে অফিসের সিঁড়ি মোছার দায়িত্ব দিলেও রাজি হয়ে যেতো সে।

তাঁর মুখে হাসি দেখে রেজোয়ান ভেতরে ভেতরে রেগে গেলো। বেহায়া নির্লজ্জ মেয়েটা ভাবছে রেজোয়ান তাঁকে দয়া করেছে। কিন্তু রেজোয়ান যে তার জন্য কতটা ভয়ংকর শাস্তির ব্যবস্থা করছে সেটা সে ভাবতেও পারছে না। রেজোয়ান তাকে বেরিয়ে যেতে বলে হাতঘড়ি চেক করলো। অলরেডি আড়াইটা বেজে গেছে। লাঞ্চ করতে হবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here