গল্পঃ- পিচ্চি বউ পর্বঃ-১০

0
235

গল্পঃ- পিচ্চি বউ
পর্বঃ-১০
.
সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুমে ফিরলাম। খুশিতে আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। জামা কাপড় চেঞ্জ করে বসেছি, এর মধ্য মিথু চলে এসেছে। তাকে ধরেই নাচতে শুরু করলাম,
-এই কি করছ? ছাড়!
-আজকে কোনো কথা হবে না?
-হা হা, বলে কি পাগলটা!
-হুম। এত বড় একটা সু-সংবাদ। জানো, আজকে আমার থেকে খুশি মনে হয় এই জগতে আর কেউ নেই।
-তাই নাকি জনাব?
কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম, এর মধ্যে তার দুঃসম্পর্কের ভাই এসে নিচে ডাকল। সবাই নাকি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। চলে গেলাম। নানু, আম্মু আব্বু, শ্বশুড় শ্বাশুড়ি সহ আরো অনেকে বসে আছে। আমি মিথু কে বসিয়ে দিয়ে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম, একটু ঝেড়ে কাশি দিয়ে শুরু করলাম,
-শোন, সবাই, তোমাদের সবার জন্য একটা শুভ সংবাদ আছে। আমি বাবা হতে যাচ্ছি।
বলে একটা বিজয়ের হাসি দিলাম। কিন্তু এ কি? কেউ কোনো পাত্তাই দিল না। শুধু নানু উঠে এসে আমার কান মলে দিয়ে বলল,
-এ খবর আমরা সবাই জানি। এখন মিষ্টি খাওয়ানোর কথা কি আমাকে বলে দিতে হবে?
মক্কেল বনে গেলাম। তার কথা মতে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে, আমি বাদে সকলে এই খবর ভালো মত অবগত। মিথুর দিকে তাকিয়ে দেখি সে হাসছে। খুব দ্রুত করে মিষ্টি নিয়ে আসা হল, প্রথমে আম্মু উঠে এসে আমাকে মিষ্টি খাইয়ে দিল,
-দাদু হচ্ছি, বুঝেছিস? সেই খুশিতে…
তার পর এক এক করে সকলে আমাকে মিষ্টি খেরাপি দিয়ে গেল। বাড়িতে খুশির ধুম উঠেছে। তবে খুশির মাত্রাটা আমার থেকে কারো বেশি হবে না বাজি দিয়ে বলতে পারি।উচ্চ স্বরে গান বাজনা শুরু হয়েছে। একে তো মিথুর জন্ম দিন, তার উপর নতুন মেহমান আসছে। ব্যাপারটা অনেকটা আগুনে পেট্রল দেবার মত।
.
মিষ্টি খেরাপি হজম করে রাতে আর খাবার খেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও মিথু খাবার নিয়ে সোজা রুমে এসেছে। শুয়ে ছিলাম, তার উপস্থিতি টের পেয়ে উঠে বসলাম, সেও আমার পাশে এসে বসল,
-না খেয়ে রুমে চলে আসলে কেন? মন খারাপ?
-বলে কি পাগলীটা, যে থেরাপি হজম করতে হয়েছে, খেতে ইচ্ছে করছে না।
-তা বললে তো চলবে না।
-তুমি খেয়েছ?
-উহু।
প্লেট টা আমি হাতে নিলাম। সব সময় তো সে আমার খেয়াল রেখেছে। এখন থেকে না হয় আমিই একটু করি। তাকে খাইয়ে দিতে শুরু করলাম,
-মিথু,
-হু
-জানো, এইদিন টার জন্য কত দিন অপেক্ষা করেছি?
-তাই?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা, তোমার কি চাই ছেলে না মেয়ে?
-তোমার মত মিষ্টি আর লক্ষ্মী একটা মেয়ে
-কিন্তু মেয়েদের নাকি বাবাদের মত হলে ভালো হয়।
-উহু। আমার মেয়েকে আমি তার মায়ের মত শান্ত আর ধৈর্যশীল করে তুলব।
-হা হা, ঠিক আছে।
-তবে নাম নিয়ে কিন্তু আমি ঠিক করে রেখেছি।
-কি?
-আয়েশা মেহজাবিন ।
-ইহিতা দিয়েছিল নামটা তাই না???
কি বলব বুঝতে পারছি না। কথাটা যে মিথ্যা তাও না, তাই হাল ছেড়ে দিলাম,
-হ্যাঁ। তোমার পছন্দ হয় নি?
-সেটা বলি নি। তাছাড়া নামটা অনেক সুন্দর। আর যদি ছেলে হয় তাহলে আহনাদ রনওক।
চুপসে গেলাম। এই নামটাও ইহিতা দিয়েছিল। আমি বুঝতে পারছি, মিথু মেয়েটা এত ধৈর্যশীল কেন? আর কেনইবা ইহিতার পছন্দ অপছন্দ গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে। এতটা বেশি ভালোবাসে মেয়েটা আমাকে?
.
আজকে কেন যেন সকাল সকাল উঠে পরলাম। মিথু এখন ঘুমিয়ে আছে তাকে ডাক দিলাম না। গত কাল সারা রাত অনেক ফুর্তি হয়েছে। কেউ এখনো ঘুম থেকে জেগে উঠে নি। ফ্রেস হয়ে কিচেন রুমে চলে গেলাম। দু-কাপ কফি বানিয়ে আবার চলে আসলাম। তাকে ডাক দিলাম,
-মিথু, ওঠ না।
সে আমার কথা শুনে হুড়মুড় করে উঠে গেল,
-আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলে? অন্যান্য দিন তো ডেকে তুলতে হয়।
-এমনি। কফি নাও
-আরেহ বাবা, আপনি কফি বানিয়েছেন আমার জন্য? নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।
-কেমন হয়েছে?
-অসাধারণ।
-চলো বিকেলে ঘুরে আসি।
-আগে বের হয়ে দেখি।
বিকেল বেলা শ্বশুড় মশাইয়ের বাইকখানা নিয়ে বের হলাম। পিছনে মিথু। প্রায় ৬ বছর পরে বাইক নিয়ে বের হয়েছি। ইহিতার সাথে সব কিছু শেষ হবার পরে আর কোনো দিন বাইক নিয়ে বের হই নি। তার খুব পছন্দ ছিল বাইকে ঘোরা। আজকে কেন জানি না মিথুকে নিয়ে বের হতে ইচ্ছে হল। মিথু আমাকে জড়িয়ে বসে আছে। আর আমি খুব সাবধানে চালিয়ে যাচ্ছি। একটা পার্কে গিয়ে বসলাম। জায়গাটা অতি চমৎকার। ভালো লাগছে হাঁটতে। মিথু জোর করে ফুসকা খেল। যদিও আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না, তবুও তার জোরাজুরির কারণে শেষ পর্যন্ত খেতে হল।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, বাড়ীতে ফিরতে হবে। তাকে নিয়ে রওনা দিলাম। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। আমি নিশ্চিন্তে যাচ্ছি। হঠাৎ সামনে থেকে দ্রুত গতির একটি গাড়ি এসে আমাদের ধাক্কা দিল। শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে গিয়ে পরলাম রাস্তার পাশে।শুধু মিথু বলে শেষ একটা চিৎকার দিয়েছিলাম। তারপরে আর কিছু মনে নেই।
.
চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা। মাথায় সহ হাত পায়ে বেশ কয়েক জায়গায় ব্যান্ডেজ। মিথুর কথা মনে পরতেই বুকের বা-পাশটা চিন চিনে ব্যাথা শুরু হল। নার্সকে ডাকলাম।নার্সের প্রায় সাথে সাথে আব্বু কেবিনে চলে আসল,
-আব্বু, মিথিলা কোথায়?
-সে ভালো আছে।
-কোথায় সে?
-পাশের কেবিনে।
দৌড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি মিথিলা শুয়ে আছে। পাশে গিয়ে বসে তার হাত ধরলাম। বাম হাত এবং পায়ে ব্যান্ডেজ ছিল। মিথুর এই অবস্থা দেখে নিজের বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। এর মধ্যে সবাই মিথুর কেবিনে চলে আসল, জানতে চাইছিলা সেদিন কি হয়েছিল, আব্বুর কথায় সারাংশ দাঁড়াল, সেদিন ব্রেক ফেল করা একটি গাড়ি আমাদের উদ্দেশ্যহীন ভাবে ধাক্কা দেয়। আশেপাশে লোকজন থাকায় তারা সাথে সাথে হসপিটালে নিয়ে এসে বাড়িতে খবর দেয়। আমার আঘাত টা একটু বেশি গুরুত্বর ছিল,মাথায় বেশ কয়েকটা শেলাই দিতে হয়েছে। মিথুর বাম হাতে বেশ অনেকটা কেটে গিয়ে বেশ রক্তক্ষরণ হয়ে অবস্থা আশঙ্ককা জনক হয়ে উঠেছিল। কোথায়ও তার গ্রুপের সাথে মিলে এমন রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অচেনা এক ব্যক্তি রক্ত দিতে সম্মতি জানায়।রক্তসংগ্রহ করে সবাই মিথুকে নিয়ে বুস্ত হয়ে পরেছিল হঠাৎ সেই মানুষটির কথা মনে হলে তার খোঁজ করা হয় কিন্তু পরে তাকে আর কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যায় নি। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, সেদিন রক্ত পাওয়া না গেলে হয়ত অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।
মিথুর জ্ঞান ফিরেছি কিছুক্ষন আগে,
আমি নিজের কেবিন বাদ দিয়ে তার পাশে বসে আছি, কোন দিন ভাবতে পারি নি তাকে এই অবস্থায় দেখতে হবে।
-মিথু, একটু ভালো লাগছে?
-কিছুটা। তুমি ঠিক আছো তো?
-হ্যাঁ। একদম।
বেশ কয়েকদিন হসপিটালে থাকার পরে আমাদের রিলিজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিথুর হাঁটতে এখনো বেশ কষ্ট হয়। পায়ের আঘাত টা অনেক বেশি ছিল। সব থেকে বেশি ভয়ে ছিলাম, বাচ্চার কোনো সমস্যা হবে কি না। তবে এবার মনে হয় কপাল টা একটু বেশিই ভালো ছিল। হালকা আঘাতের উপর দিয়ে বেড়িয়ে গেছি। বাচ্চার কোনো সমস্যা হবে না বলে ডাক্তার আশ্বস্ত করেছেন।
.
আরো কিছুদিন পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তবে সে দিনকার কালো দাগ টা এখনো মনের মধ্যে বসে আছে। মিথুর কিছু একটা হয়ে গেলে জানি না নিজেকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারতাম কি না।
ডাক্তার চেক আপ করে আরো কিছু দিন রেস্ট নিতে বলেছে।তাই আম্মু আর আব্বু বাড়িতে ফিরে গেছে। আমি আর সে তাদের বাড়ীতে আছি। মিথুকে নিয়ে ছাঁদে এলাম অনেক দিনপর, বিকেল পেড়িয়ে গোধুলী সময়, আকাশ টা পরিষ্কার, সূর্য্যের লাল আভাটা খুব সুন্দর লাগছে। সে বলল,
-আচ্ছা, সেদিন যদি আমার ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে যেত?
কথা শেষ করার আগে তার মুখে হাত দিলাম,
-এমন কথা আর কখনও বলবে না। তুমি চলে গেলে আমি কাকে নিয়ে থাকব?
-এতটা ভালোবাস আমাকে?
-হ্যাঁ! অনেক বেশি, নিজের থেকেও বেশি। কোথাও যেতে দিব না তোমাকে।
-তবে কোনদিন যদি নিয়তির কাছে আমাদের হেরে যেতে হয়??

চলবে….

শেষ পর্ব
https://www.facebook.com/934291790106385/posts/1301608220041405/?substory_index=0&app=fbl

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here