গল্পঃ-পিচ্চি বউ পর্বঃ- ২

0
225

গল্পঃ-পিচ্চি বউ
পর্বঃ- ২

প্রথমত নিজের রুম ছাড়া আমার ঘুম আসে না তার উপর না আছে কোলবালিশ। অথচ মিথিলা কি সুন্দর ঘুমোচ্ছে। ইচ্ছে করছে ওর বিছানায় কয়েকটা তেলাপোকা ছেড়ে দিয়ে আসি। কিন্তু এই মাঝ রাত্রে সেটাই বা পাবো কোথায়?
সেদিন আমার’ই ভুল হয়েছে, আম্মুকে যদি বলতাম আমার গার্লফ্রেন্ড আছে তাহলে আজকে এই দিন দেখতে হত না। আর মিথ্যা বলেই লাভ হত কি? যদি আম্মু দেখত চাইত? সাত পাচ ভাবতে ভাবতে উঠে বসলাম, ঘুম যেহেতু আসছে না শুয়ে থেকে পিঠ ব্যাথা করার মানে হয় না। কিছুক্ষণ পরে দেখি মিথিলাও জেগে উঠেছে,
.
-কি ঘুমাস নি? [মিথিলা]
-না [আমি]
-জানিস, আমারও ঘুম আসছে না
-তো আমি কি করতে পারি? মাথায় নিয়ে নাচব তোকে?
-থাক। ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না!
-তোর এই গুণ্ডামি স্বভাব ভালো হবে না?
-কি বললি?
-নাহ, কিছু না
বলেই সোফায় শুয়ে পরলাম,কোন মতে রাতটা পার করতে পারলে হয়।
.
কখন চোখ লেগে এসেছে খেয়াল করিনি, সকালে ঘুম ভাঙ্গল পাখির কিচির মিচির শব্দে। আড়মোড়া ছেড়ে উঠে দেখি মিথিলা আগেই ওয়াশ রুমে গিয়েছে ফ্রেস হতে। বারান্দার দিকে গেলাম, বাড়ির সামনে প্রচুর জায়গা, প্রকৃতি এত সুন্দর রুপ আগে এত কাছ থেকে দেখা হয় নি। মিথিলা বেড়িয়ে আমাকে ফ্রেস হয়ে নিচে আসতে বলে নিজে চলে যায়। যথারীতি নিচে গিয়ে দেখি সবাই নাস্তার টেবিলে উপস্থিত। আম্মু আব্বু, নানা সাথে আরো অনেক আত্মীয় স্বজন সবাই বাড়ি ফেরার আলোচনা করছে। চেয়ার টেনে বসলাম, খেয়াল করি নি পাশে মিথিলা বসে আছে। কোনো রকম নাস্তা শেষ করে নিজের রুমে দুঃখিত মিথিলার রুমে এসে বসলাম। আচ্ছা বউয়ের রুম কে কি নিজের রুম ভাবা যাবে? চিন্তা করার আগেই সে এসে হাজির। এ কি আমাকে শান্তি হিবে না?
-চল, সবাই নিচে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
-হ্যাঁ চল।
.
মামা বাড়ি দুঃখিত শ্বশুর বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় খেয়াল করলাম মিথু কি সাবলীল ভাবে গাড়ীতে উঠে বসল। সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমিও গাড়ীতে উঠে বসা মাত্রই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । অনেক দূরের পথ, আর রাতে ঘুম হয় নি তাই চোখ লেগে আসতে চাইছে। কিছুটা লেগেও এসেছে হঠাৎ আমার ঘাড়ের উপর কিছু একটা স্পর্শ করল, ফিরে দেখি মিথু ঘুমে টলে আসছে, বাঁধা দিলাম না, শত হলেও বিয়ে করা বঊ, আগে খেয়াল করি নি, দেখতে মিথু একেবারে পরীর মত।
.
ওকে ডাকলাম বাড়ি পৌঁছনোর পর। ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছিল দেখে কিছুটা বিব্রত বোধ করছিল। নতুন বউ বরণ করে নিতে সবার সে কি ফুর্তি। আমার বেশ বিরক্ত লাগছিল। সব শেষ করে নিজের রুমে এসে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পরলাম। মিথিলাও চলে আসল কিছুক্ষণ পর।
-তোর রুমটা এত অগোছালো কেন?
-তাকে তোর কি?
-আমার কি মানে?
-দেখ, এটা আমার রুম কিভাবে থাকবে সেটা আমি ঠিক করব।
-ওহ তাই?
-অবশ্যই
-দাড়া, আমি ফুপ্পি কে ডাকছি, ফুপ্পিইইইইইইইইইইইইইইইইইইহ
-এই থাম, মিথু, ঐ…
গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলাম। নিজের কাছেই কিছুটা বিব্রত লাগছে, সাথে সাথে আম্মু এসে হাজির।
-কি রে মা, কি হল? আর অভ্র, তুই মিথিলার মুখ চেপে রেখেছিস কেন?
ছেড়ে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
-দেখ না, ফুপ্পি, তোমার ছেলে বলেছে, আমাকে নাকি এই রুমে থাকতে দিবে না।
-কি? তুই এই কথা বলেছিস?
-না আম্মু, আমি আসলে বলছিলাম, ইয়ে মানে…
-থাক মা,তুই আমার সাথে আয়, অনেক মেহমান এসেছে, তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
.
সে আম্মুর সাথে চলে গেল। আমি নিজের বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে একখানা গল্পের বই হাতে নিয়ে পড়তে লাগলাম, কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেলাম।
রাতের খাবার শেষ করে নিজের রুমে এসে দেখি মিথিলা খুব সুন্দর করে রুম গুছিয়ে ফেলেছে। বিছানায় শুতে যাব তখন ঘটল যত বিপত্তি,
-এই থাম থাম! [মিথু]
-কি হয়েছে? [আমি]
-আমি বিছানায় ঘুমাব।
-তাই নাকি? ঘর টা কার?
-ফুপ্পিকে ডাকব?
-অবশ্যই…
-তুই না কত ভালো ছিলি আগে, এখন এমন করছিস কেন?
-এত কিছু বুঝি না, খাটে আমি ঘুমাচ্ছি, শুভ রাত্রি।
বলেই শুয়ে পরলাম। অসহায় হয়ে সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
-এই অভ্র
-হু
-শোন না
-বল
-তোর রুমে টেডি বিয়ার নেই?
-কি? এই জিনিস আমি কোথায় পাব?
-আমি টেডি বিয়ার ছাড়া ঘুমোতে পারি না! অন্তত তোর কোলবালিশ টা দে না।
-গত কাল দিয়েছিলি?
-প্লীজ দে না
-এক কাজ কর, চাইলে বেড শেয়ার করতে পারিস
ও কিছু একটা ভাবল, ভাবনা শেষে পাশে শুয়ে পড়ল,
-কিন্তু লাইট অফ করতে পারবি না।
-লাইট অফ করে কি তোর হাতে শহীদ হব? [আস্তে বললাম]
-কি করলি তুই?
-কিছু না তো। ঘুমা…
.
একপাশে ও আরেক পাশে আমি মাঝখানে কোলবালিশ। মোটামুটি শীত পড়তে শুরু করেছে। শেষ রাতে বেশ ঠাণ্ডা পরে, তাই কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে পরলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল, বেশ ঠাণ্ডা লাগছে, উঠে দেখি পুরো কম্বল মহারানী একা দখল করে বসে আছে। ওর গায়ে টাচ করবো সে সাহসও পাচ্ছি না। ওকে ডাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম
-মিথিলা
-হু
-এই মিথু
-কি হয়েছে? গরুর মত চিল্লাচ্ছিস কেন?
-আমি গরু?
-গরুর ও কিছুটা জ্ঞান আছে
-কম্বল দে আমার
-আমি কি করব তাহলে?
-কিভাবে বলব?
-তুই এত কেয়ারলেস ক্যান?
-আমি কেয়ারলেস?
-নয়ত কি? বউয়ের জন্য একটু শীত সহ্য কতে পারবি না?
-বউ? তুই? তাও আমার?
-বিয়েটা কেন করেছিলি?
.
কিছু না বলে শুয়ে পরলাম। ওর সাথে কথা বলে কোনো লাভ নাই। প্রচন্ড একরোখা টাইপ মানুষ। । গায়ে কিছুটা উষ্ণ ভাব লাগছে। কিছুটা কম্বল আমাকে দিয়েছি তাহলে। যাক যতটা গুণ্ডি ভেবেছিলাম ততটা নয় তাহলে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না। অথচ মিথু বারবার ডেকেই যাচ্ছে,
-এই অভ্র, অভ্র…
-হু
-উঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল
-তো?
-উঠবি না তুই?
-উহু
.
ওর শব্দ থেমে গেল ভাবলাম হয়ত হাল ছেড়ে দিয়েছি, আবার গভীর ঘুমে ঢুব দিতে যাবো, তার আগে বান্দা আমার গায়ে এক জগ পানি ঢেলে দিল। হুমড়ি খেয়ে খাট থেকে পরে গেলাম, অন্য দিকে বউ আমার অট্টহাসিতে ফেটে পরল। ঠোঁটের পাশের তিল টা মুগ্ধভাবে তাকিয়ে দেখছিলাম, তার কথা বাস্তব জগতে ফিরে আসলাম,
-কি উঠতে বলেছিলাম না?
-আজকে তোর খবর আছে…
খুনসুটি সবে শুরু করেছে, পাগলীটার আরো কত পাগলামী সহ্য করতে হবে বুঝতে পারছি না…
.
নাস্তার টেবিলে গিয়ে বসলাম, পাশের চেয়ার টা আমার পিচ্চি বউ দখল করে নিয়েছে, কিছু বললাম না সবাই সামনে দেখে,
-অভ্র শোন।
-জ্বি আব্বু
-এই নে প্লেন টিকেট, কালকে সকালে তোরা হানিমুনে যাচ্ছিস থাইল্যান্ডে।
হালকা ধাক্কা খেলাম, এই মেয়েকে নিয়ে হানিমুন? কিভাবে সম্ভব? মিথু চোখে মুখে কিছুটা হাসি দেখতে পেলাম। সবাই হয়ত ভেবেছে ও খুব খুশি, কিন্তু আমি জানি, এ হাসি খুব ভয়ংকর। রুমে ফিরে চিন্তায় পরে গেলাম, আব্বু যেহেতু বলেছে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু একে নিয়ে তো মহা মুশকিল। আমার জীবন এই রকম বিচ্ছু আর গুণ্ডি মেয়ে দেখি নি। রুমে এসেই শুরু করল,
-তোর সাথে আমি হানিমুন যাব না!
-কেন গো?
-কেন মানে?
-থাম তুই, তোর জন্য আমার এই অবস্থা।
-কিছু একটা কর না!
-আব্বু বলেছে। কিছু করার নেই। ব্যাগ গুছিয়ে নে।
-আম্মু আমাকে নিয়ে যাও।
বলতে না বলতে মামীর দুঃখিত এখন তো সে আমার শ্বাশুড়ি। দিলেন ফোন, যদিও ফোন মিথুর, ধরলাম আমি,
-হ্যালো মিথু!
-না, অভ্র বলছিলাম! মামী।
-কেমন আছিস বাবা?
-ভালো মামী। আপনার মেয়ে অনেক ভালো রেখেছে।
পাশ থেকে মিথিলা এমন ভাবে তাকাচ্ছে মনে হয় তার দৃষ্টিতে ভষ্মীভুত করে ফেলবে।
-তা বাবা, এখন তো একটু আম্মা ডাকতে পারিস
-হ্যাঁ অভ্যাস করে নিব।
-তোরা নাকি কালকে হানিমুনে যাচ্ছিস?
-আপনার মেয়ে যাবে না! নিন মিথুর সাথে কথা বলুন।
.
ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। ছাদে চলে গেলাম। আকাশ টা খানিকটা মেঘলা, বৃষ্টি নামতে পারে। ভালোই হল, অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। দোলনায় বসতে না বসতেই বৃষ্টি নামতে শুরু করল, যাকে বলে কুকুর বিড়াল বৃষ্টি, গা ছেড়ে দিলাম। ভালোই লাগছিল, যতক্ষন না পর্যন্ত আমার গুণ্ডা বউ টা এসে হানা দিল।
-জানিস, অনেক দিন পর আজকে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হল, [মিথু]
-কেন?
-ইচ্ছে ছিল, বর কে নিয়ে কাঁক ভেজা ভিজব। তবে তোর মত ক্যাবলাকান্ত দিয়ে হবে না।
-তোর মত পিচ্চির সাথে ভেজার কোনো ইচ্ছে নেই
বলে নিচে চলে আসলাম। যাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে না, তার সাথে হানিমুনে যেতে হচ্ছে।
হে উপরওয়ালা, এই ছিল তোমার মনে..???

চলবে……..

পর্ব – ০৩
https://www.facebook.com/934291790106385/posts/1293932554142305/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here