একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️ ||পর্ব~৩||

0
287

‘ একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️
||পর্ব~৩||
@কোয়েল ব্যানার্জী আয়েশা

৬.
ভরা লোকজনের আড়ালে আমি এক কোণায় পিঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি অসহায়ের মতো। না পারছি সরে যেতে আর না পারছি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। কাওকে বলার মতোও পরিস্থিতি নেই কারণ এই বিয়ে চলার মুহূর্তে কাকে বলবো যে আমার ব্লাউজের চেইনটা নীচে নেমে গেছে আর সেটা ধীরে ধীরে আরো নীচে নেমে যাচ্ছে। চারিপাশে লোকে ভর্তি, সরতেও পারছি না। না, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে সম্মানের আর কিছু থাকবে না যে করে হোক যেতেই হবে। দু-হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের ব্লাউজটা কোনোমতে চেপে ধরে এক পা এগাবো বুঝলাম, চেইনটা একদম শেষ প্রান্তে। চোখ বন্ধ করে এগোতে নিলেই পিঠে পুরুষালী শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম। ঘুরে তাকাবো সে সময় ব্যক্তিটি কানে কানে বললো,

‘চুপ করে দাঁড়ান। আমাকে দেখার প্রয়োজন নেই, আপনার সন্মান বাঁচাটা প্রয়োজন। আশা করছি আর অসুবিধা হবে না।’

কথা শেষ হতেই আমি পুরোপুরি ঘুরে গেলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না, পাশে তাকাতেই দেখলাম ভিড়ের মাঝে চলমান একটি লোক। তৎক্ষনাৎ নিজের পিঠে হাত দিয়ে দেখলাম চেইনটা লাগানো।

‘ভারী অদ্ভুত লোক তো!’

আর কথা বাড়ালাম না বিষয়টা নিয়ে কারণ আমি উনাকে দেখতে পাইনি যার ফলে ধন্যবাদ জানানোরও উপায় নেই। আমার দিদির বিয়ে শেষ হতেই আমি একটা ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। ওয়াশরুমে গিয়ে দেখলাম না সব ঠিকই আছে। আজ আমার জেঠুর মেয়ের বিয়ে ছিলো, টিউশনি থেকে ফিরে কোনোমতে রেডি হয়ে উপস্থিত হয়েছি তাই আজ এরকম অবস্থা। চেইনটা যে ঠিক করে লাগাইনি তার খেয়ালই ছিলোনা। ভাগ্যিস লোকটা হেল্প করলো, এক মিনিট! লোকটা কে ধন্যবাদ যে কীভাবে জানাই।

এই ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজা আটকে সামনে এগোতে নিলেই একজনের সাথে ধাক্কা লাগলো আর সে ধমক দিয়ে উঠলো। সামনে তাকিয়ে দেখলাম একটি ছেলে যার হাতে জুস ছিলো যা আমার সাথে ধাক্কা লাগায় ওনার গায়ে পরে গেছে।

‘শিট! এটাই হওয়া বাকি ছিলো।’

উনি নিজের ড্রেসের দিকে তাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘একটু দেখে চললে কি খুব দেরী হয়ে যেতো আপনার?’

‘আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি! আসলে আমি বুঝতে পারিনি।’

‘এখন আপনার স্যরি বলাতে তো আর আমার ড্রেসটা ঠিক হয়ে যাবে না তাই না? তাও আপনি যেহেতু স্যরি বলেছেন তাই ইটজ ওকে।’

ছেলেটি আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়েই চলে গেলো। আমি কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না কারণ দোষটা আমারই ছিলো। এমন সময় নীচ থেকে আমার ডাক পড়লে আমি সেদিকে চলে যাই। একে, একে বিয়ে, বৌভাত শেষ হয়ে যায়। এরপরে একদিন আমি টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফিরতেই দেখি একজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার বাবা আমাকে দেখিয়ে বলেন,

‘আমাদের একমাত্র মেয়ে মৌমিতা। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে গ্রাজুয়েশন করবে ঠিক করেছে। আমার তেমন সামর্থ্য নেই দেখে ও নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালায় স্কলারশিপ আর টিউশনি করিয়ে। পড়াশোনায় আগ্রহী দেখে যে ঘরের কাজ জানে না তা নয়, ঘরের কাজও সব জানে তা আপনারা ওর মায়ের থেকেই জানতে পারবেন।’

আমি বুঝলাম না এদের কাছে আমার এতো তথ্য দেওয়ার কারণ। বড়দের কথার মাঝে কথা বলতে নেই তাই কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। কিন্তু আমি ভাবিনি আমার সব প্রশ্নের উত্তর আসা ভদ্রলোকের একটা কথাতেই পেয়ে যাবো। উনি বাবা-মার দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘মৌ মা যদি ঘরের কাজ না’ও পারে তাতে কোনোরকম অসুবিধা আমাদের নেই। ওকে আমরা ঘরের বউ নয় মেয়ে করে নিয়ে যেতে চাই। প্রথম দেখাতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম ওকেই আমাদের বাড়ির বউ করবো তাই আপনারা দয়া করে উদ্বিগ্ন হবেন না।’

আমি বিস্ফারিত চোখে একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছি তো আরেকবার মায়ের। মা এসে আমায় উপরে যেতে বললো। আমার ঘরে আসতেই আলমারি থেকে একটা ভালো শাড়ি বের করে দিয়ে বললো,

‘চটপট সুন্দর করে শাড়িটা পরে তৈরি হয়েনে। আমি চাই ওদের সামনে তুই একটু সুন্দর ভাবে সেজে যাস। আমি একটু খাবারের আয়োজন করতে যাচ্ছি। তুই কিন্তু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়েনে বলে দিলাম।’

আমি মুখ দিয়ে ‘টু’ শব্দটুকু করতেও হয়তো ভুলে গেছি। হঠাৎ এই বিয়ের খবর জানো আমার পুরো পৃথিবীটাই ওলট পালট করে দিয়েছে। আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝে মা কাঁধে হাত দিয়ে আমায় বললো,

‘আমি জানি তোর এখন বিয়েতে মত নেই কিন্তু তুই বিশ্বাস কর ওনাদের থেকে ভালো পরিবার আমরা আর পাবো না তোর জন্য। ওনারা নিজে তোকে পছন্দ করেছে সুপ্রিয়ার বিয়েতে। এক সপ্তাহ পর একটা ভালো বিয়ের তারিখ আছে, সেদিনই বিয়ে ঠিক হয়েছে।’

‘মা, এসব তুমি কি বলছো? আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। এভাবে হুট করে বলা নেই কওয়া নেই আমি বিয়ে করে নেবো? কার সাথে বিয়ে করছি তাকেই তো চিনি না আমি।’

‘সব চিনে যাবি। ওনারা পুরোহিত মশাইয়ের থেকে দিনক্ষণ ঠিক করেই এসেছেন। বুঝতে পারছিস কতটা পছন্দ হয়েছে তোকে। তুই অনেক ভালো থাকবি মা দেখিস, আমাদের এই অভাবের সংসারে আর তোকে কষ্ট করতে হবে না। তুই তো জানিস তোর বাবার অবস্থা, তোর বিয়ে নিয়ে প্রচুর চিন্তা ছিলো আমাদের। এখন বিয়েটা করে নিলে তা আর থাকবে না কারণ ওনারা বলেছেন কিচ্ছু নেবেন না, আমরা যা সাজিয়ে দেবো মেয়েকে তাতেই হবে। আর এভাবে বাড়ি বয়ে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তাদের তুই ফিরিয়ে দিবি? আমাদের কথা ভেবেই রাজি হয়ে যা মা, আমি বলছি তুই খুব ভালো থাকবি।’

মা চলে গেলো, আমি কিছুই বলতে পারলাম না মায়ের মুখের উপর। সত্যি তো, এই অভাব অনটনের সংসারে এরকম প্রস্তাব আসা হাতে চাঁদ পাওয়ার থেকে কম কিছু না। আজ অবধি বাবার উপর কোনো কথা বলিনি তাই এবারও বলবো না। এটাই আমার ভাগ্যে ছিল ভেবে মেনে নিলাম সবটা।

৭.
রাত হয়ে গেছে। চোখের জলটা মুছে জানলাটা বন্ধ করে সামনে ফিরলাম। দেখলাম কোয়েল এখনও একভাবে শান্ত চাহুনি নিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি সেটা খেয়াল না করার ভান করে পড়ার টেবিলে আমার বইগুলো সাজাতে লাগলাম। এতক্ষণ ওকেই নিজের অতীত সম্পর্কে বলছিলাম। বিয়ে অবধিই জানালাম, আদিত্যের ব্যাপারে কিছু জানাতে ইচ্ছে করলো না। ওটা না হয় গোপনই থাক আদিত্যের কথা মতো। কিছুক্ষন পর কোয়েল আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার বই সাজাতে সাজাতে ভাঙা কণ্ঠে বললো,

‘আমার মনে হয় তুই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিকই করেছিস। বাবা-মা আমাদের জন্য যেই সিদ্ধান্ত নেয় তা আমাদের ভালোর জন্যেই নেয়। বাবা-মা যেমন কিছুসময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তেমন আমরাও যে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিই তা কিন্তু নয়। আমরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল প্রমাণিত হই। যাই হোক, আমি একটু আসছি।’

কোয়েল কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে চলে গেলো ঘর থেকে। ওকে দেখে মনে হলো ও জানো অনেক কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বললো।

‘কোয়েল এভাবে কেন বললো কথাগুলো? ওরও কি কোনো অতীত আছে? জানার চেষ্টা করতে হবে আমায়।’

রাতে ডিনার সেরে নিলাম আমি আর কোয়েল মিলে। কোয়েল ঠিক ব্যবস্থা করে নিয়েছে আমাদের একসাথে থাকার তাও আবার সকালেই। ম্যামদের সাথে যখন কথা বলছিল তখন দেখলাম ম্যামরা ওকে খুব স্নেহ করে। তাই হয়তো খুব তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলেন আমার ঘরটা চেঞ্জ করে দিতে। আমি শুতে যাচ্ছিলাম এমন সময় কোয়েল বললো,

‘চল একটু গল্প করি, তারপর ঘুমাবো।’

আমি জানো এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলাম। এই সুযোগেই কোয়েলের থেকে ওর অতীত সম্পর্কে জানতে হবে।

‘কি রে? কি ভাবছিস এতো? টায়ার্ড লাগলে ঘুমিয়ে পর, অসুবিধা নেই।’

‘আরে না না। চল আমিও ভাবছিলাম গল্প করবো।’

‘তাহলে এতো কি ভাবছিলি?’

‘ওই গল্পের টপিক। আচ্ছা তুই তোর সম্পর্কে কিছু বল, ভবিষ্যতে কি করবি?’

‘আমি? আমার ইচ্ছে আছে একটা ভালো জায়গায় জব করার। ব্যাস আর কিছুই না।’

‘তোর বাবা মা, ভাই-বোন?’

‘কলকাতাতে থাকে বাবা-মা। ভাই-বোন নেই আমি একাই। ব্যাস এটুকুই পরিচয় আমার। আর কিছুই না।’

‘আর? বয়ফ্রেন্ড?’

কোয়েল চুপ করে কিছুক্ষন জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি ওর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কোয়েল আস্তে করে বললো,

‘এইসব প্রেম-ভালোবাসা আমার কপালে নেই। আসলে আমি কাউকে বিশ্বাস করিনা রে তাই এইসব জড়াতে ভয় লাগে। এসব ছাড়, কালকে ভার্সিটিতে যেতে হবে তো?’

‘হমম। না জানি কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।’

‘আরে মৌমিতা…

‘মৌ, মৌ বলে ডাকতে পারিস আমায়। এটা আমার ডাকনাম, সবাই এই নামেই ডাকে আমায়।’

‘আচ্ছা। সো, তুই চিন্তা করিসনা। যা হবে দেখা যাবে এখন একটু শান্তিতে ঘুমা। দেখবি সকালে উঠে ফ্রেশ লাগবে। গুড নাইট!’

‘গুড নাইট!’

কোয়েল শুয়ে পড়লে আমিও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুয়ে পড়ি। আগামীকালের জন্য তো আবার প্রস্তুত থাকতে হবে। যেই মানুসটাকে দেখতে চাইনা তাকেই হয়তো বারবার দেখতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই আস্তে আস্তে চোখ এঁটে এলো আমার।

৮.
‘ওই যে চলে এসেছে আমাদের টিপিক্যাল বেহেনজি!’

আমি আর কোয়েল ভার্সিটিতে ঢুকছি এমন সময় আমাদের পিছন থেকে কয়েকজন টিজ করে আমাকে কথাটা বললো। কোয়েল আমার হাত ধরে বললো,

‘ক্লাসে চল। এসবে পাত্তা দিয়ে লাভ নেই।’

কোয়েলের কথামতো আমরা এগোতে নিলেই জিয়া আর ওর পাশে থাকা কয়েকজন ছেলে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো।

‘বাহ, ক্লাসে যাচ্ছো বুঝি আমার থেকে পালিয়ে? কিন্তু তাতেও লাভ হবে না কেন জানো নিশ্চই? তোমার সো কল্ড ফ্রেন্ড এটা অবশ্যই জানিয়ে দিয়েছে যে আমিও ইংলিশ অনার্স ডিপার্টমেনটে। তাই পালিয়ে আর যাবে কোথায়?’

বলেই জিয়া হাসতে লাগলো, পাশ থেকে একটা ছেলে বলে উঠলো,

‘তোমার বেশ ক্ষমতা আছে তো, এই ভার্সিটির সব চাইতে দেমাগী মেয়েকে প্রথম দিনেই বান্ধবী বানিয়ে ফেললে?’

আমি উত্তর দিতে যাবো তার আগেই কোয়েল উত্তর দিলো,

‘তা আপনিও মেয়ে হয়ে যান। আপনার সাথেও বন্ধুত্ব করে নেবো। কি বলেন? পারবেন?’

কোয়েলের কথা শুনে আমিসহ জিয়াও হেসে ফেললো। সেই দেখে ছেলেটা রেগে জিয়াকে ধমক দিলো,

‘জিয়া!’

জিয়া হাসি থামিয়ে কোনো মতে বললো,

‘টেক আ চিল পিল! কোয়েলের সাথে কথা বলছিস কেন? কথা বল এই মিডল ক্লাস্টার সাথে যার ড্রেসিং সেন্স নেই। আচ্ছা মিডল ক্লাস মানলাম বাট ড্রেসিং সেন্স তো ভালো হওয়া উচিত। না আছে ড্রেসিং সেন্স আর না আছে টাকা পয়সা তাই তো এরকম ড্রেস পড়ে এতো বড়ো ভার্সিটিতে পড়তে চলে এসেছো। কি ভেবেছিলে এখানে এসে কোনো বড়লোক ছেলে পটিয়ে নেবে? এরকম লুক দিয়ে? ওহ মাই গড! ছেলে তো দূর কি বাত এই ভার্সিটির মেয়েরাও তোমার কাছে ঘেঁষতে চাইবে না এই থিংক!’

কথাগুলো বলে সবাই হাসিতে ফেঁটে পড়লো। কোয়েল কিছু বলতে যেতে নিলে আমি থামিয়ে দিলাম সেই দেখে জিয়া আবার বললো,

‘কোয়েল, এতদিন নিজের এটিটিউড দেখানোর পর এইরকম চামচাগিরি করাটা ঠিক তোকে মানাচ্ছে না তাও আবার এরকম একটা ক্ষ্যাত মেয়ের হয়ে। লেটস গ গাইস, আবার পরে এর পিছনে সময় নষ্ট করবো।’

এই বলে ওরা হাসতে হাসতে চলে গেলো। আমি কোয়েলকে বললাম,

‘চল ক্লাসে।’

‘এটা যাদবপুর ইউনিভার্সিটি মৌ। একটু তো সহ্য করতে হবে এসব।’

‘জানি। এখন আর কোনো কিছুতেই আমার কোনো যায় আসে না। আমার দরকার পড়াশোনা নিয়ে, সেটা মন মতো করবো তাহলেই হবে পাছে কে কি বললো যায় আসে না।’

‘দ্যাট’স দ্য স্পিরিট! চল।’

[#ফিরে_আসবো_আগামী_পর্বে 🥀]

আইডি- কোয়েল ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here