একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️ ||পর্ব~৩৯||

0
208

‘ একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️
||পর্ব~৩৯||
@কোয়েল ব্যানার্জী আয়েশা

৫৮.
মৌমিতা: কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনি আমাকে? এটা তো হস্টেলের রাস্তা নয়? (ঘাবড়ে গিয়ে)

আদিত্য: তোমাকে কিডন্যাপ করেছি। (চোখ টিপ দিয়ে)

মৌমিতা: ধুর! মজা করছেন কেন? কোয়েলকে কোনো কিছু না জানিয়েই তো চলে এলাম। (মন খারাপ করে)

আদিত্য: কোয়েল জানে।

মৌমিতা: কোয়েল জানে? কিন্তু কীভাবে? (অবাক হয়ে)

আদিত্য: সবাই জানে যে ট্যুরের আগে বাড়ি যেতে হবে। তোমার বাড়ি কোনটা এটা কোয়েল ছাড়া আর কেই বা জানে?

মৌমিতা: আপনি, আপনি আমাকে আপনার বাংলোতে নিয়ে যাচ্ছেন?

আদিত্য: আমার না, আমাদের। (সামান্য হেসে)

আমি চুপ করে গেলাম ওনার কথায়। অবশ্য একদিকে ভালোই হবে, মা দেখা করতে বলেছিল সেটা হয়ে যাবে। আদিত্য গাড়ি থামালে আমি গাড়ি থেকে নেমে দরজার কাছে যাই আর কলিং বেল বাজাই। আদিত্য পাশে এসে দাঁড়ানোর কিছু সময়ের মধ্যেই মা দরজা খোলেন।

শ্বাশুড়ি মা: মৌ এসেছিস? যাক আসার সময় হলো তাহলে?

আদিত্য: ও আসেনি। আমি নিয়ে এসেছি। (আড় চোখেমৌমিতার দিকে তাকিয়ে)

আমি ওনাকে ভেংচি কেটে ভিতরে ঢুকতে গেলেই আদিত্য আমার হাত ধরে আটকে দেয় আর শ্বাশুড়ি মাকে বলেন,

আদিত্য: এমনিই ঢুকে যাবো? বরণ করবে না?

আদিত্যের প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে একবার তাকিয়ে মায়ের দিকে তাকালে মাও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আদিত্যের দিকে তাকান। আদিত্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেন,

আদিত্য: ইয়ে মানে হ..হরি কাকা বলছিলো তাই বললাম। এই বাড়িতে আগে মৌমিতা যতবার এসেছে ততবারই হরি কাকা আমাকে এটা বলেছে, আজ তুমি আছো দেখে মনে করলাম আর কি। (মাথা চুলকে)

শ্বাশুড়ি মা: এই ব্যাপার হরি?

হরি কাকা: না মানে… হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই বাড়িতে বউমাকে বরণ করে তুললে খুব ভালো হয় আর কি। বাড়ির লক্ষ্মী বলে কথা, তাই বলেছিলাম। আদি বাবা বলেছিল পরে একদিন মনে করিয়ে দেবে।

শ্বাশুড়ি মা: বেশ। যা গিয়ে তৈরী করে নিয়ে আয়বরণের থালাটা।

হরি কাকা: সব তৈরীই আছে। আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি।

শ্বাশুড়ি মা: এক মিনিট, তৈরী আছে কীভাবে?

আদিত্য: (মনে মনে– কাম সেরেছে। হরি কাকা গো, ম্যানেজ দাও।)

হরি কাকা: ওই আদি বাবা বলে গেছিলেন আজকে বউমা কে আনবেন তাই তৈরী করে রেখেছিলাম। আমি নিয়ে আসছি।

হরি কাকা হুড়মুড়িয়ে ওখান থেকে চলে গেলেন। এতক্ষণের সব ঘটনাই আমি খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য করেছি। যতদূর মন বলছে আদিত্যেরই কাজ এসব কারণ উনিই বলেছিলেন প্রথমদিন, পরে একদিন বরণ করে তোলার কথা। ইতিমধ্যে হরি কাকা বরণের থালা নিয়ে আসলে মা আমাদের দুজনকে একসাথে বরণ করে ঘরে তোলেন। ঘরে ঢুকে আদিত্য ফ্রেশ হতে গেলে আমি আর মা গল্প করতে থাকি। বেশ কিছুক্ষণ পর,

মৌমিতা: মা, আমি একটা কথা ভাবছিলাম।

শ্বাশুড়ি মা: হ্যাঁ, বল না।

মৌমিতা: অনেকদিন বাবা-মায়ের সাথে কথা হয় না, দেখা হয় না। এই ছুটিটা আমি আমার বাড়িতে কাটালে হয় না? (অনুরোধ করে)

শ্বাশুড়ি মা আমার কথায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিছু সময় পর উত্তর দিলেন,

শ্বাশুড়ি মা: ঠিক আছে। আগামীকাল সকালে আদি না হয় তোকে কলকাতা পৌঁছে দেবে। কেমন?

আমি খুশি হয়ে মাকে কিছু বলবো তার আগেই মায়ের পিছনে সদ্য এসে দাঁড়ানো আদিত্যর দিকে চোখ গেলো। মুখটা শুকনো লাগছে কিন্তু কেন? এই তো বেশ ঠিক ছিলেন। আমার হঠাৎ চুপ করে যাওয়া দেখে শ্বাশুড়ি মা পিছন ফিরলেন।

শ্বাশুড়ি মা: এই তো আদি, তুই আগামীকাল সকালে মৌকে একটু কলকাতায় ওর বাড়িতে পৌঁছে দিস তো। অনেকদিন ওর বাড়িতে যাওয়া হয় না। ঠিক আছে?

আদিত্য: হম।

উনি কোনোরকম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে চলে গেলেন। শ্বাশুড়ি মা পিছন থেকে ডেকে বললেন,

শ্বাশুড়ি মা: আদি কোথায় যাচ্ছিস? খাবি তো, আয় এদিকে।

আদিত্য: আমি খাবো না মম। খিদে নেই আমার, তোমরা খেয়ে নাও।

এরপরেই ঘরের দরজা বন্ধের আওয়াজ পেলাম। শ্বাশুড়ি মা আমাকে বললেন,

শ্বাশুড়ি মা: যা মৌ, ফ্রেশ হয়ে কিছু একটু খেয়েনে। ডিনার করতে এখনও অনেক দেরী আছে।

মৌমিতা: হ্যাঁ, মা আমি যাচ্ছি। (মনে মনে- কি ব্যাপার? এরকম হঠাৎ করে মুড অফ হয়ে গেলো কেন ওনার? আমি কি কিছু ভুল…উনি আমার বাড়ি যাওয়া নিয়ে মুড অফ করলেন? তাই হবে, যায় ফ্রেশ হয়ে একটু কথা বলে আসি।)

অন্যদিকে,

আদিত্য: তোর মাথা খারাপ হয়েছে? তুই কি বলছিস তুই জানিস কোয়েল?

কোয়েল: তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো আদিত্যদা। আমি ঠিক সময় সোমবার সকালে পৌঁছে যাবো।

আদিত্য: কিন্তু…

কোয়েল: ওফ ওহ! এটা প্রথমবার নয় যে আমি একা যাচ্ছি কোথাও। খামোখা চিন্তা করছো তুমি।

আদিত্য: ফাইন! খেয়াল রাখবি নিজের আর ঠিক করে খাওয়া-দাওয়া করবি।

কোয়েল: আজ্ঞে। এবার আমি রাখি ফোনটা?

আদিত্য: হমম।

কোয়েল ফোন রাখলে আদিত্যও ফোন হাতে নিয়ে চিন্তিত ভাবে পিছন ফেরে।

আদিত্য: তুমি? কিছু বলবে?

মৌমিতা: আব, হ্যাঁ আসলে…

আদিত্য: ভিতরে আসো।

আমি ভিতরে গিয়ে ওনাকে জিজ্ঞেস করি,

মৌমিতা: কে ফোন করেছিল? কোয়েল?

আদিত্য: হ..হ্যাঁ। ও বাড়ি যাচ্ছে একা তাই আর কি। তুমি কি বলবে বলছিলে?

মৌমিতা: (মনে মনে– উনি কি কোয়েলের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইছেন? থাক, এই বিষয়ে আর কথা বলার এখন দরকার নেই তাহলে।) বলছি, আপনি যাবেন তো কালকে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে?

আদিত্য: (মাথা নিচু করে) হম।

মৌমিতা: আপনার কি কালকে কোনো কাজ আছে?

আদিত্য: নাহ, কেন?

মৌমিতা: আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আপনার ইচ্ছা নেই আমাকে পৌঁছে দেওয়ার। তাই জিজ্ঞেস করলাম।

আদিত্য: (মনে মনে– ঠিকই ধরেছো, আমার একদম ইচ্ছা নেই তোমাকে নিজের চোখের আড়াল করার। তোমাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ ছিল প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে নিজের চোখের সামনে রাখা। কিন্তু আমি ভুলে গেছিলাম তুমি চাও না সর্বক্ষণ আমাকে নিজের চোখের সামনে দেখতে।) না, তেমন কিছু না।

মৌমিতা: ত..তাহলে আপনিও তো আমার সাথে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারেন?

চোখ মুখ খিঁচে নিজের মনের কথাটা বলেই ফেললাম। কিন্তু এবার চোখ তুলে তাকানোর সাহস হচ্ছে না। কাঁচুমাচু করে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম উনি একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,

মৌমিতা: না মানে আপনার খুব একটা অসুবিধা হবে না। আসলে বিয়ের পর আপনি অষ্টমঙ্গলাতেও তো গিয়ে থাকেননি তাই বলছিলাম।

কথা শেষ করতেই আমি নিজের হাতে ওনার হাতের স্পর্শ পেলাম। ওনার দিকে তাকাতেই দেখলাম উনি হাসি মুখে আমাকে বসার জন্য ইশারা করলেন। আমি বসতেই উনি বললেন,

আদিত্য: ঠিক আছে। আমি কালকের দিনটা থেকে পরেরদিন চলে আসবো কারণ ট্যুরের সবকিছুর আয়োজন আমাকে আর রাজকে করতে হবে। আমি না থাকলে রাজের উপর অনেক চাপ পরে যাবে। আমি আবার না হয় শনিবার দিন সকালে গিয়ে থেকে রবিবার দিন বিকেলে তোমাকে নিয়ে আসবো। চলবে?

মৌমিতা: (খুশি হয়ে) তাহলে আমি মা-বাবাকে জানিয়ে দি?

আদিত্য: অবশ্যই।

আমি খুশি হয়ে চলে আসতে নিলে আদিত্য আমার হাত আটকে বলেন,

আদিত্য: কোথায় যাচ্ছো? আজকে মা আছে তুমি আলাদা ঘরে শুলে কি ভাববে?

মৌমিতা: (চিন্তিত হয়ে) তাহলে?

আদিত্য: তোমার বাড়ি গেলেও তো আমাদের এক ঘরে শুতে হবে তাই না? আমি সোফায় শুয়ে পড়ছি, তুমি বেডে শুয়ে পরো।

মৌমিতা: আপনি সোফায় শোবেন? অসুবিধা হবে তো আপনার।

আদিত্য: আমি বেশিরভাগ সময় পড়ার টেবিলে ঘুমাই আর নাহলে সোফায়, তাই অসুবিধা হবে না। (হেসে)

মৌমিতা: (হেসে) আচ্ছা। আপনি আজকে আমাকে একটু হেল্প করবেন?

আদিত্য: ইংলিশে?

মৌমিতা: হ্যাঁ।

আদিত্য: ওকে।

৫৯.
আমাদের ছুটি শেষ। চোখের নিমিষে ছুটিটা শেষ হয়ে গেলো, বেশ ভালো কাটছিল বাবা-মায়ের সাথে সময়টা। আদিত্য ওনার কথা মতোই যেদিন গেছিলেন সেদিনও থেকেছেন আর আসার সময় একদিন থেকে নিয়ে এসেছেন। এখন বসে বসে ট্রলিতে জামাকাপড় গোছাচ্ছি আর উনি ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছেন। এই সময় শ্বাশুড়ি মায়ের গলার আওয়াজ পেলাম।

শ্বাশুড়ি মা: ও জামাকাপড় গোছানো শুরু করে দিয়েছিস?

মৌমিতা: হ্যাঁ মা, এই তো শুরু করলাম।

শ্বাশুড়ি মা: তা তোর আর আদির জামাকাপড় একসাথেই নিচ্ছিস তো?

আদিত্য মায়ের কথা শুনে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমিও ওনার দিকে তাকিয়ে আছি কি উত্তর দেওয়া উচিত এই ভেবে। উনি আমাকে চোখ দিয়ে চুপ থাকার ইশারা করে বললেন,

আদিত্য: মম আমি আর মৌমিতা একসাথে থাকবো না তাই আলাদাই লাগেজ করছি। আসলে এটা ভার্সিটি ট্যুর তো…

শ্বাশুড়ি মা: ভার্সিটি ট্যুর তো কি হয়েছে? তোরা তো স্বামী-স্ত্রী এটা জানে তো সকলে তাই না? তাহলে একসাথে থাকলে অসুবিধা কি?

শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় উনি আমার দিকে তাকালে আমি চোখ নামিয়েনি। আমার তো কিছু বলার নেই এখানে, উনিই সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন প্রথম দিনেই।

শ্বাশুড়ি মা: কি হলো চুপ করে গেলি যে? তোদের মধ্যে তো এখন সব ঠিক হয়ে গেছে তাই না? তাহলে কেন আলাদা আলাদা থাকবি?

আদিত্য: মম প্লিজ, ওটা ট্যুর। ওখানে এরকম ভাবে থাকলে হবে না। মৌমিতা আমার সাথে থাকলে কোয়েল একা পড়ে যাবে। তাই আমি ঠিক করেছি আমি আর রাজ একসাথে থাকবো যেহেতু আমরা ট্যুরের দায়িত্বে আছি আর কোয়েল, মৌমিতা একসাথে থাকবে কারণ ওরা হস্টেলেও তো একসাথে থাকে।

শ্বাশুড়ি মা: আমি তো এটাই বুঝতে পারি না মৌমিতা এখনও কেন হস্টেলে থাকে। ও তো এখানেই থাকতে পারে তাই না?

মৌমিতা: ক..কোয়েলের জন্য! কোয়েলের জন্যই আমি থাকি ওর সাথে, ওকে কোম্পানি দেওয়ার জন্য। আমারও ভালো লাগে, এখানে তো একা হয়ে যাবো।

শ্বাশুড়ি মা: যা ভালো বুঝিস তোরা। আমি যাই ডিনার রেডি করি।

মা চলে গেলে আদিত্য আমার দিকে তাকান আমি সেটা উপেক্ষা করে নিজের কাজে লেগে পড়ি। আড় চোখে খেয়াল করি আদিত্যও তেমন কিছু না বলে নিজের কাজে লেগে পরেন। কি বা বলার আছে ওনার?

রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম কারণ অনেক ভোরে উঠতে হবে। আমি ভোরে উঠে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আদিত্যকে ডাকতে গেলে দেখলাম উনি সোফায় নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন একহাতে সিগারেট নিয়ে।

মৌমিতা: সাদ সকালে বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে বুঝি? (কোমরে হাত দিয়ে)

আমাকে দেখে আদিত্য হুড়মুড়িয়ে পিছন ফিরে বললো,

আদিত্য: তুমি, তুমি কখন এলে? আমি আসলে, আসলে…

মৌমিতা: অতো আসল নকল আমি জানি না। সোজা কথা বলুন। (রেগে)

আদিত্য: আব, এটা আমার হ্যাবিট। মাথা যন্ত্রণা করলে এটার দরকার পরে। (হাতের সিগারেট দেখিয়ে)

মৌমিতা: বাহ! অসাধারণ। মাথা যন্ত্রনা করলে মানুষে কফি খায় আর উনি সিগারেট খান। আজব!

আদিত্য: (নিশ্চুপ)

মৌমিতা: (মনে মনে– সকাল সকাল এভাবে রাগ দেখানোটা ঠিক না। মানুষের অভ্যেস তো থাকতেই পারে তাছাড়া কালকে মায়ের কথাগুলো শোনার পর তেমন একটা কথা বলেননি। এখন আমার এভাবে রিয়াকট করাটা ঠিক না।) আচ্ছা যান, ফ্রেশ হয়ে নিন। (নরম ভাবে)

আদিত্য: ব..বলছি একটু ব্ল্যাক কফি করে দেবে?

মৌমিতা: রাত থেকেই যখন মাথাটা ধরেছে তখনই বলতে পারতেন তাহলে তেল মালিশ করে দিতাম। আচ্ছা আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি ব্ল্যাক কফি করে আনছি।

উনি ফ্রেশ হতে গেলে আমি নিচে যাই ব্ল্যাক কফি বানাতে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম হরি কাকা উঠে গেছেন।

মৌমিতা: আপনি এতো ভোরে উঠে পড়েছেন কাকা?

হরি কাকা: হ্যাঁ আসলে তোমরা যাবে তো তাই। কর্তামা এখনও ঘুমাচ্ছেন। তোমার আর যদি বাবার জন্য কফি করে দেই আমি?

মৌমিতা: আপনাকে কিছু করতে হবে না আমি করে নিচ্ছি। আপনি যান, গিয়ে একটু শুয়ে পড়ুন আমাদের বেরোতে এখনও দেরী আছে। বেড়ানোর আগে আপনাকে ডেকে দেবো আমি।

হরি কাকা: না না সে কি…

মৌমিতা: একটাও কথা না। এই শীতের মধ্যে এত সকালে উঠে পড়েছেন, বয়স হয়েছে তো নাকি? যান, গিয়ে একটু রেস্ট নিন।

আমি জোর করে হরি কাকাকে ঘরে পাঠিয়ে ওনার জন্য কফি আর আমার জন্য চা বানিয়ে নিলাম। বানিয়ে ঘরে যেতেই দেখি উনি চুপচাপ সোফায় বসে আছেন আর চুল দিয়ে জল পড়ছে। হে ভগবান! এই শীতের সকালে এভাবে চুল ভিজিয়ে বসে আছেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো এমন করলে?

মৌমিতা: আপনি এভাবে চুল ভিজিয়ে বসে আছেন কেন?

আদিত্য: এ..এমনিই। তুমি রেডি হয়ে নাও।

উনি মাথা তুলে আমার দিকে তাকাতেই দেখলাম ওনার চোখ গুলো লাল হয়ে গেছে। ইশ! এতটা মাথা যন্ত্রনা করছে আগে টের পেলে ওনাকে এভাবে কষ্ট পেতে হতো না। আমি সঙ্গে সঙ্গে টাওয়াল নিয়ে এসে ওনার সামনে দাঁড়ালাম। উনি মাথা উঠাতেই চুলটা মুছাতে শুরু করলাম।

আদিত্য: আরে, ঠিক আছে আমি।

মৌমিতা: চুপ একদম! কোনো কথা বলবেন না।

আমি ধমক দিতেই উনি চুপ করে গেলেন। মাথা মোছাতে মোছাতে ওনার স্পর্শে তৎক্ষণাৎ শিউরে উঠলাম। অনুভব করলাম আমার কোমর দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন। আমি সামান্য হেসে আস্তে করে বললাম,

মৌমিতা: মায়ের কথা নিয়ে এতো ভাবার কিছুই হয়নি। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে এখন সেসব নিয়ে ভেবে মাথা ব্যাথা না করাই ভালো। নিন, কফিটা খেয়ে নিন।

আমি সরে এসে ওনাকে কফিটা এগিয়ে দিতেই দেখলাম উনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

মৌমিতা: ঠান্ডা হয়ে যাবে তো কফিটা। জলদি কফি খেয়ে রেডি হয়ে বসুন।

আদিত্য: এতো তাড়াতাড়ি?

মৌমিতা: যেটা বললাম চুপচাপ করবেন।

জোর দিয়ে কথাটা বলে আমি নিজের ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যাবো তার আগেই উনি পিছন থেকে বললেন,

আদিত্য: কাবার্ডে একটা প্যাকেট রাখা আছে। ওটা দেখে নাও একবার।

আমি ওনার কথা মতো কাবার্ড খুলতেই প্যাকেট দেখতে পেলাম। প্যাকেট খুলে দেখলাম চুড়িদার। ঠিক যেমন চুড়িদার আমার পছন্দ তেমন। প্যান্টটা ফিটিংস আর জামাটা শর্ট যেমনটা আগে পরা হতো। আমি খুশি মনে প্যাকেটটা নিয়ে রেডি হতে চলে গেলাম। রেডি হয়ে এসে দেখি উনি সোফায় মাথা পিছন দিকে হেলিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছেন চোখ বন্ধ করে। আমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে একটু সেজে নিলাম। তারপর বাম হাতে নিয়ে ওনার মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে কপালে লাগিয়ে দিয়ে মাথার দু-পাশ ম্যাসাজ করতে শুরু করলাম। উনি আদো আদো গলায় বললেন,

আদিত্য: থ্যাংক ইউ… বউ!

থ্যাংক ইউ অবধি তো ঠিকই ছিলো কিন্তু তারপরের দু অক্ষরের শব্দটা শুনে জানো আমার শরীর দিয়ে একটা শীতল শিহরণ বয়ে গেলো। আমি যে কিছু বলবো সেটাও পারছি না, কোনো শব্দই খুঁজে পাচ্ছি না বলার মতো। বেশ কিছুক্ষণ ওনার মাথাটা টিপে দেওয়ার পর আমি গিয়ে বিছানাটা গুছিয়ে সোফায় ওনার পাশে বসলাম। পাশে বসতে না বসতেই উনি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন আর বললেন,

আদিত্য: সাতটায় বেড়াবো।

আমি ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম ৬টা বেজে ১০ মিনিট। ভাগ্যিস আমি তাড়াতাড়ি উঠে গিয়েছিলাম নাহলে অতো তাড়াতাড়ি ওঠার কথা ছিলো না। না উঠলে উনি কিচ্ছুটি বলতেন না আমায় আর একা একা কষ্ট পেতেন। এরপর তো আবার আরেকটা হেডেক। এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ওনার চুলে হাত প্রবেশ করিয়ে ফেলেছি খেয়াল করিনি। খেয়াল হতেই দেখলাম উনি বাচ্চাদের মতো চুপটি করে শুয়ে আছেন। আমি হাত না বের করে ওনার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বাঁ হাত দিয়ে কোয়েলকে ফোন করলাম। দেখি খোঁজ নিয়ে, ওর কতদূর। কুম্ভকর্ণর নাতনি কি না, দেখা গেলো ঘুম থেকেই ওঠেনি।

[#ফিরে_আসবো_আগামী_পর্বে🥀]

আইডি- কোয়েল ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here