একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️ ||পর্ব~৪||

0
292

‘ একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️
||পর্ব~৪||
@কোয়েল ব্যানার্জী আয়েশা

(বিঃদ্রঃ প্রত্যেক দিন রাতে এই সময় একটা করে পর্ব দেবো। সবাই গ্রুপটা চেক করবেন।)

৯.
‘জিয়া যা করেছে ঠিকই করেছে, আমি এখানে কোনো ভুল দেখতে পাচ্ছি না কোয়েল। স্যরি টু সে দ্যাট!’

কোয়েল বিস্ময় নিয়ে আদিত্যের দিকে তাকিয়ে আছে আদিত্যের কথা শুনে যার ভ্রূক্ষেপ আদিত্য করছে না। সে নিজের মনে ফোন ঘাটছে। আজকে জিয়া যেই ব্যবহারটা মৌমিতার সাথে করেছে সেটা আদিত্য কে জানানোটা ঠিক মনে করেছিল কোয়েল তাই জানাতে এসেছে কিন্তু ভাবেনি আদিত্য এরকম কথা বলবে। কোয়েল নিজের রাগ সংযত করে আদিত্য কে বললো,

‘আমি তোমার থেকে এরকম প্রতিক্রিয়া আশা করিনি আদিত্য দা। আমি ভেবেছিলাম তুমি জিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে কিন্তু না! আমি ভুল ছিলাম। আসলে ভুলে গিয়েছিলাম জিয়া তোমার গার্লফ্রেন্ড তাই ওর বিরুদ্ধে তুমি কোনো কথাই বলবে না।’

কোয়েল কথাটুকু বলে চলে যাচ্ছিলো সেসময় আদিত্য কোয়েলের হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো, কোয়েল সমানে আদিত্যের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, সেই দেখে আদিত্য হেসে বললো,

‘তুই শুধরাবি না তাই না? এতো কিসের জেদ তোর?’

‘ছাড়ো আমার হাত আমার সময় নেই।’

‘আচ্ছা? তো এতক্ষন কীভাবে কথা বলছিলিস? তখন অনেক সময় ছিলো নাকি?’

কোয়েল চেষ্টা থামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আদিত্য ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে, কোয়েলের হাত ছেড়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘কি এমন দেখেছিস বল তো তুই মেয়েটার মধ্যে যে আসার প্রথম দিন থেকে ওকে সাপোর্ট করছিস? যেই তুই কি না কাওর সাথে কথা বলতি না প্রয়োজনের বেশি সেই তুই সারাক্ষন ওর সাথে থাকছিস। কি ব্যাপার?’

‘আমি যা দেখেছি, তুমি যদি সেটা দেখতে পেতে তাহলে আজ জিয়া কে সাপোর্ট করতে পারতে না আদিত্য দা। মেয়েটার সাথে মিশে দেখো, বুঝতে পারবে মেয়েটা কতটা সাধারণ। এইসব বড়লোকের মাঝে না শুধু অহংকার, হিংসে, স্বার্থপরতা, ইগোর লড়াই আছে যা ওর মধ্যে ছিঁটেফোঁটাও নেই। সাধারণ একটা মেয়ে ও, যে কি না শুধুমাত্র পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের স্বপ্নপূরণ করতে চায়। কি অস্বাভাবিক মনের ইচ্ছে শক্তি যে, এতো অল্প বয়সে বিয়েটাও ওকে হার মানাতে পারেনি।’

‘ব..বিয়ে?’

‘হ্যাঁ, বিয়ে হয়ে গেছে ওর।’

‘কার সাথে কিছু জানিস?’

‘না। সেসব কিছু বলেনি, বলেছে বর নাকি মেনে নেয়নি বিয়েটা।’

‘ওহ।’

কোয়েলের কথা শুনে আদিত্য জানো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। প্রথমে কোয়েলের মুখে মৌমিতার বিয়ের কথা শুনে শ্বাস আটকে গেছিলো আদিত্যের। ভেবেছিল মৌমিতা হয়তো ওর কথা রাখেনি, বলে দিয়েছে কোয়েল কে সবটা। কিন্তু না, এখন ও আশ্বস্ত হলো যে মৌমিতা কথা রেখেছে, কিছুই বলেনি কোয়েল কে। কৌতূহল বশত আদিত্য কোয়েল কে জিজ্ঞেস করে বসলো,

‘আর কি কি জানিস ওর ব্যাপারে তুই?’

কোয়েলও সব বলতে লাগলো আদিত্য কে যা মৌমিতা কোয়েলকে বলেছে। সবটা শোনার পর আদিত্যের মধ্যে তীব্র অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করলো যা হয়তো আদিত্য কাওকে বোঝাতে পারবে না। আদিত্য কে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কোয়েল জিজ্ঞেস করলো,

‘হঠাৎ কি হলো তোমার?’

‘হ..হমম? না, কিছু না। তুই যা, আমি জিয়ার সাথে কথা বলবো। তোকে যেমন কেউ ডিস্টার্ব করে না মৌমিতা কেও করবে না আজকের পর থেকে।’

‘ও হ্যালো! তোমার জন্য আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করে না এমনটা নয় ওকে? ওই তো এসেছিলো আজকে তোমার একটা ফ্রেন্ড আমাকে টোন করতে…

‘কে করেছে? নামটা বল, কে করেছে?’

হঠাৎ করেই আদিত্য কে রেগে যেতে দেখে কোয়েল হকচকিয়ে গেলো। ভুলেই গেছিলো সে আদিত্য কেমন রিয়াক্ট করতে পারে কোয়েল কে টোন করার কথাটা শুনে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বললো,

‘আদিত্য দা কাম ডাউন! একবার জেনে নিয়ো আমি কি উত্তর দিয়েছি। তোমার জিয়াও হাসছিলো। সো…

‘কোয়েল প্লিজ, তুই খুব ভালো ভাবেই জানিস আই ডোন্ট লাইক জিয়া! তারপরেও কেন সব সময় “তোমার জিয়া” বলতে থাকিস?’

‘তাহলে কেন তুমি ওর সাথে কথা বলো? আমার একদম পছন্দ না তোমার ওর সাথে কথা বলা।’

আদিত্য মুচকি হেসে বললো,

‘তো তোর কি পছন্দ?’

‘জিয়া কে এভয়েড করো নাহলে আমি তোমাকে এভয়েড করবো।’

‘আমি নিজে থেকে যাই না ওর সাথে কথা বলতে জানিসই তো তুই। ও নিজেই বেহায়ার মতো পরে থাকে আমার পিছনে কি করবো বল? আর ও কার মেয়ে জানিসই তো। ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করলে উৎপাত আরো বেশি করবে ও।’

‘তা কতদিন তুমি এই নাটক টা করবে জিয়ার সাথে?’

‘দেখা যাক। ও যেমন নিজের স্বার্থের জন্য আমার পিছনে পরে আছে তেমন আমিও আমার স্বার্থ যতদিন ততদিন ওকে রাখবো। এর মধ্যে যদি ও ভুলেও তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করার কথা মাথায় আনে না তাহলে ওটাই ওর শেষ দিন হবে।’

‘আ..আচ্ছা তুমি শান্ত হও। আমাকে কেউ টিজ করেছে এসব শুনলে এতো হাইপার হয়ে যাও কেন বলো তো তুমি? আমি আমার দিকটা ম্যানেজ করতে জানি আদিত্য দা। যেটা মৌও শিখে যাবে। শুধু সময়ের প্রয়োজন। আমি বললাম তো মেয়েটা ব্রিলিয়ান্ট!’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে। ওর তারিফ করা বন্ধ কর আর যা নিজের ক্লাসে যা।’

‘আগে বলো, কেন এতটা হাইপার হয়ে যাও তুমি?’

আদিত্য কোয়েলের চোখে চোখ রেখে তাচ্ছিল্য সুরে বললো,

‘তুই কি সত্যি জানিস না? তোর খেয়াল আমি কেন রাখ..’

‘দরকার নেই আমার খেয়াল রাখার। নিজের খেয়াল নিজে রাখতে আমি জানি। সো প্লিজ, আগেও বলেছি এখনও বলছি তুমি ভুল করছো আদিত্য দা। নিজের জায়গা টা নষ্ট করো না তুমি।’

এটুকু বলেই কোয়েল গটগট করে হেঁটে চলে গেলো। আদিত্য শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু-হাত পকেটে গুঁজে বললো,

‘আর কতদিন এভাবে অবুঝ হয়ে থাকবি বল তো কোয়েল? না জানি কি অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতে।’

কিছুক্ষন আগে কোয়েলের কথাগুলো মনে করে আদিত্য দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেঁকে বসে পড়লো। তাকালো কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে।

১০.
‘কি রে কোয়েল? কোথায় গায়েব হয়ে গেছিলি তুই? কতক্ষন ধরে খুঁজছি আমি তোকে।’

কোয়েল আদিত্যের কাছ থেকে এসে মৌমিতার কাছে এসে ক্যান্টিনে বসলো আর বললো,

‘একটু কাজ ছিলো। তুই কি করছিস এখানে?’

‘এই একটু বই পড়ছিলাম। আজকে আর ক্লাস করতে ইচ্ছে করছে না।’

‘কেন? ঘুরতে মন চাইছে না কি?’

মৌমিতা হেসে দিলো কোয়েলের কথা শুনে, হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলো,

‘তুই কীভাবে বুঝলি?’

‘আরে স্বাভাবিক ব্যাপার। নতুন জায়গায় এসেছিস ঘুরতে তো মন চাইবেই। আর এখন সবে পড়া শুরু তাই চাপটাও কম। ব্যাস, আইডিয়া করে ফেললাম। শুধু কি তুই ব্রিলিয়ান্ট নাকি?’

‘কে বললো আমি ব্রিলিয়ান্ট?’

‘ওমা? নাচতে জানিস, ড্রয়িং করতে জানিস, পড়াশোনায় এতো ভালো, ঘরের কাজ জানিস। এত কিছু জেনেও বলছিস তুই ব্রিলিয়ান্ট না?’

‘ধুর! বাদ দে এসব আর আমাকে ঘুরতে নিয়ে চল।’

‘যো হুকুম ব্রিলিয়ান্ট সাহেবা স্যরি রানী সাহেবা।’

‘ধ্যাৎ! মারবো একটা গাট্টা!’

আমি আর কোয়েল হালকা খুনসুটিতে মেতে উঠে বেরিয়ে গেলাম যাদবপুর ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে। যাক, এটুকু কপাল ভালো আমার যে প্রথমদিন থেকেই ভার্সিটিতে এসে একজন মনের মতো বান্ধবী পেয়েছি। কিন্তু এই মেয়েটার মনটা বুঝে উঠতে পারছি না আমি এখনও। কেন যে সবার থেকে এতো আলাদা হয়ে থাকে, জানতে হবে আমায়।

আমি আর কোয়েল ভার্সিটি থেকে বেরোলে, কোয়েল আমায় রাস্তা চেনাতে শুরু করে। ভার্সিটির পাশে থাকা ওলি-গলি চিনতে চিনতে ঝালমুড়ি খাওয়া শুরু করি আমরা দুজন। কিন্তু…

‘এই কোয়েল, আমার কেমন জানো মনে হচ্ছে কেউ আমাদের পিছু করছে।’

‘কি? কোথায়?’

কোয়েল হুট করেই পিছন ঘুরে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ ওকে ওদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমি আলতো ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করলাম,

‘কাওকে দেখতে পেলি নাকি? একভাবে তাকিয়ে রয়েছিস যে?’

কোয়েল চমকে উঠে আমাকে বললো,

‘ক..কই না তো। তোর ভুল মনে হয়েছে। কেউ নেই আমাদের পিছনে। চল, চল।’

কোয়েল সামনে এগিয়ে গেলো কথাটুকু বলে কিন্তু আমার কেমন জানো মনে হলো ও কিছু লুকিয়ে গেলো আমার থেকে। তাই কোয়েল যেদিকে তাকিয়ে ছিলো সেদিকে উঁকি ঝুঁকি করতে লাগলাম আর সে সময় কোয়েল ডাকলো। যেহেতু কাওকে দেখতে পেলাম না তাই কোয়েলের কাছে চলে গেলাম।

‘হমম, কিছুক্ষন আগের কথাগুলোতে কাজ হয়েছে তাহলে। ভালো লাগলো দেখে।’

‘কি রে, আমাকে ডেকে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একা একা হাসছিস কেন?’

কোয়েলের কাছে এসে কোয়েলকে হাসতে দেখে ওকে জিজ্ঞেস করতেই ও বললো,

‘আরে না রে তেমন কিছু না। ওই একটা হাসির কথা মনে পড়ে গেছিলো তাই।’

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর কোয়েল বললো,

‘তোকে তো একটা কথা বলাই হয়নি। সামনেই কলেজে ফ্রেশারস পার্টি আছে।’

‘তাই নাকি? কবে?’

‘এই তো দু-সপ্তাহ পর। আমার মনেই হয়েছিলো তুই জানবি না তাই বললাম। আসলে এইবার তেমন বড়ো করে ফ্রেশারস পার্টি হচ্ছে না কমপিডিশনের জন্য।’

‘কিসের কমপিডিশন আবার?’

‘নাচ নিয়ে। এইবার নাকি ফার্স্ট টাইম যাদবপুর ইউনিভার্সিটি তে এটা হচ্ছে। তাই ফ্রেশারস পার্টিটা একটু ছোটো করে করছে। শুনলাম ফ্রেশারসের কয়েকদিনের মধ্যেই কমপিডিশন।’

‘বাহ।’

‘এই মৌ! কমপিডিশনে নাম দিবি? তুই তো খুব ভালো নাচ করিস।’

কোয়েল বেশ উত্তেজিত হয়ে আনন্দের সাথে আমাকে প্রস্তাব দেওয়ায় আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। মুহূর্তেই নিজেকে স্বাভাবিক করে উত্তর দিলাম,

‘মাথা খারাপ হলো নাকি তোর? এসব কমপিডিশনের মধ্যে আমি নেই। চল চল, হস্টেলে ফিরে চল।’

আমার কথা শোনার পর এক নিমিষেই কোয়েলের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো এটা দেখে আমার খারাপ লাগলেও কিছু করার ছিলো না আমার। এখন শুধু পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই ব্যাস, আর কোনো স্বপ্ন বা ইচ্ছে নেই। কেন জানো সবটা শেষ হয়ে গেছে, আসলে আমিই শেষ হয়ে গেছি ভিতরে ভিতরে।

আমি আর কোয়েল হোস্টেলে ফিরে এলাম। ফ্রেশ হয়ে বই নিয়ে বসলাম ঘন্টাখানেক মতো তারপর উঠে জানলার সামনে দাঁড়ালাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম স্থির ভাবে, কেন জানি ভীষণ অস্থিরতা কাজ করছে মনের ভিতর। কিসের জন্য এই অস্থিরতা বুঝতে পারছি না। বাধ্য হয়ে চোখটা বুজলাম, সঙ্গে সঙ্গে আদিত্যের মুখ ভেসে উঠলো চোখের সামনে। তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে ফেললাম। এটাই কি আমার অস্থিরতার কারণ? হয়তো তাই! আচ্ছা আমার জীবনটাও তো বাকি বিবাহিত মেয়েদের মতো হতে পারতো? কেন হলো না? কেন আমার স্বামী আমাকে মেনে নিলো না? আমি কি খুব খারাপ? অযোগ্য? জানি না। হয়তো কপালে ছিলনা তাই।

‘কি রে কি ভাবছিস এত?’

কোয়েলের স্পর্শে আর গলার আওয়াজ ঘোর কাটলো। শুধু না বোধক মাথা নাড়লাম, কোয়েল চলে গেলো। একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, যার জন্য আমার অস্থিরতা সে তো আমাকে নিয়ে ভাবেই না তাই আমাকেও তাকে ভুলতে হবে।

[#ফিরে_আসবো_আগামী_পর্বে 🥀]

কোয়েল ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here