একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️ ||পর্ব~৫১||

0
590

‘ একদিন তুমিও ভালোবাসবে ‘ 🌸❤️
||পর্ব~৫১||
@কোয়েল ব্যানার্জী আয়েশা

৭৫.
আমি আর আদি আমাদের ঘরের ব্যালকনিতে থাকা দোলনায় বসে আছি। আদি আমাকে এক হাতে আগলে, বুকে জড়িয়ে নিয়ে বসে আছে। আমারও ইচ্ছা করছে না ওর বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হতে কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে আমরা একসাথে রয়েছি। কোয়েল হয়তো ফিরে আসবে এক্ষুনি। সেই ভেবে আমি মাথা তুলে একটু দূরে সরে আসার চেষ্টা করলেই আদি আমাকে আরো শক্ত করে ধরে। আমি আদুরে কণ্ঠে বলি,

মৌমিতা: আর কতক্ষণ এভাবে থাকবো আদি? কোয়েল চলে আসবে তো এবার। ছাড়ো আমাকে।

আদির কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না তাই মাথা তুলে তাকাতেই দেখলাম ও চুপচাপ স্থির দৃষ্টি নিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই একটু জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

মৌমিতা: কি হয়েছে? কি নিয়ে ভাবছো?

আদিত্য: হম?

আদি আমার চোখে চোখ রেখে মুচকি হেসে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো ফলে আমার ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠলো।

আদিত্য: এটাই ভাবছি যে…

মৌমিতা: যে?

আদিত্য: যে কত তাড়াতাড়ি তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসা যায়। (হেসে)

মৌমিতা: মানে?

আদিত্য: (কানে কানে) মানে এটাই যে আমি আর তোমার থেকে দূরে থাকতে পারছি না।

আমি আদির কথা শুনে ওর বুকে মুখ গুঁজে লাজুক স্বরে বললাম,

মৌমিতা: ধ্যাৎ! তুমি মিথ্যে বলছো। অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করছো তুমি, আমি জানি। বলবে না আমায়?

আমি মাথা তুলে প্রশ্নটা করতেই ওর মুখে চিন্তার ছাঁপ পরে গেলো আবার। আস্তে করে বললো,

আদিত্য: জিয়ার কথা ভাবছি।

মৌমিতা: ও আচ্ছা তো তুমি ওকে মিস করছো? সত্যি তো কালকে বেচারি কত কাছে ছিলো তোমার কিন্তু আমার জন্য…যাই হোক তাহলে আমি ওকে ডেকে দেবো?

আমি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে কথাগুলো বললে আদি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে শান্ত দৃষ্টিতে। আমি ভ্রু উঁচিয়ে ওকে আরেকবার জিজ্ঞেস করতেই ওর চোয়াল শক্ত হতে শুরু করে আর নিশ্বাস দ্রুত। কিন্ত মুখে একটাও কথা বলছেন না তাই আমি ভাবলাম হয়তো বলাটা ঠিক হয়নি কথাটা।

মৌমিতা: আরে, রাগ করছো কেন? মজা করছিলাম আমি। (হাসার চেষ্টা করে)

আদি ঝট করে উঠে গেলো আমাকে ছেড়ে আর ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়ালো। আমি অসহায় ভাবে কিছুক্ষণ বসে থেকে ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম,

মৌমিতা: আমি সত্যি মজা করছিলাম আদি। স্যরি!

আদি আমার হাত ছড়িয়ে আমার দিকে ঘুরে নীচের দিকে তাকিয়ে বললো,

আদিত্য: ঘরে যাচ্ছি আমি।

মৌমিতা: (ওর হাত ধরে আটকে) আদি প্লিজ, স্যরি বলছি তো? আমি সত্যি মজা করেছি, বিশ্বাস করো।

আদিত্য: (তাচ্ছিল্য হেসে) তুমি তো নিজেই আমাকে বিশ্বাস করতে পারনি এখনও তারপরেও বিশ্বাসের কথা বলছো?

মৌমিতা: কে বললো আমি তোমাকে বিশ্বাস করিনা?

আদিত্য: করো না দেখেই বলতে পারলে কথাটা। ইউ নো আমি যতই ড্রাংক থাকি না কেন অন্য কোনো মেয়ের কাছাকাছি যাওয়ারর কথা ভাবতেও পারিনা সেখানে সুযোগ নেওয়া তো…

আদি কথাটা বলতে গিয়ে আটকে গেলে আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি,

মৌমিতা: আমি সত্যিই মজা করেছি আদি। নিজের চাইতেও বেশি বিশ্বাস করি আমি তোমায়। তোমাকে হার্ট করার কোনো ইচ্ছা ছিলো না আমার আ’ম স্যরি!

আমি জড়িয়ে ধরলেও আদি আমাকে জড়িয়ে ধরেনি প্রথমে কিন্তু ধীরে ধীরে আমার পিঠে হাত রাখলে আমি স্বস্তি পাই। এভাবে হঠাৎ করে আমার কথাটা বলা উচিত হয়নি।

আদিত্য: মে বি জিয়াই প্ল্যান করে আমাকে ড্রিংক করিয়েছে, যাতে আমার কাছে আসতে পারে।

আমি আদির কথা শুনে সোজা হয়ে একটু বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকাই আর জিজ্ঞেস করি,

মৌমিতা: তোমারও তাই মনে হয়? আমারও এটাই প্রথমে মনে হয়েছে।

আদিত্য: হম, আমি কালকে রাতেই জিয়াকে যখন তুমি কথাটা বলেছো তখনই খেয়াল করেছি। ওর মাথায় কিছু না কিছু তো চলছে কিন্তু সেটা কতটা পরিমাণ সাংঘাতিক এটাই আন্দাজ করতে পারছি না। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে ও আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি করার চেষ্টা করছে। তাই জন্যেই বললাম, আমাদের মধ্যে যদি বিশ্বাসটাই না থাকে তাহলে…

মৌমিতা: আমি বলছি তো আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি। (ছলছল চোখে)

আদি আমাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললো,

আদিত্য: আই ক্যান্ট লুজ ইউ মৌ! আই ক্যান্ট। ইফ আই লুজ ইউ দ্যান আই উইল ডাই। (কাঁপা কণ্ঠে)

মৌমিতা: শশশ! আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না আদি।

ওর চোখে আমাকে হারানোর তীব্র ভয় দেখতে পাওয়ায় আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। ভাবিনি কোনোদিন যেই মানুষটা একদিন আমাকে নিজের জীবনেই চায়নি, সেই মানুষটারই জীবন হয়ে উঠেছে আজ আমি। আমাকে হারানোর ভয়টা তাঁর মধ্যে এতটাই তীব্র যে আমাকে চোখের আড়াল করতে চায় না সে তার জন্যে নিজের জীবন বাজি রাখতেও রাজি সে। আজ মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস বাবা-মার কথা রেখেছিলাম নাহলে এতো ভালোবাসা আমি পেতাম না। ভালো কিছু পেতে গেলে হয়তো একটু কষ্ট, একটু অপেক্ষা করতে হয়।

৭৬.
কোয়েল একটা ঢালু, সবুজ ঘাসভরা মাটিতে পা লম্বা করে বসে আছে আর দূরের উঁচু, মেঘে ঢাকা পাহাড় দেখছে। সূর্য রশ্মি কোয়েলের শরীরে এসে পড়লে তা আলোকছটায় পরিণত হচ্ছে। রাজ দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে কোয়েলের উপর ক্যামেরা আনতেই এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যায়। ঘাসের উপর সূর্য রশ্নি পড়ায় যেমন সেগুলো চিকচিক করছে, উজ্জ্বল লাগছে ঠিক তেমন কোয়েলও একটা নক্ষত্রের মতো ঝলঝল করছে। সেইসময় মৃদু শীতল হাওয়া কোয়েলের শরীর ছুঁয়ে দিলে কোয়েল চোখটা বন্ধ করে, মুখ উঁচু করে তা অনুভব করে। তৎক্ষণাৎ এই মুহূর্তটা ক্যামেরা বন্দী করে নেয় রাজ আর কোয়েলের দিকে এগিয়ে যায়। কোয়েলের কাছে গিয়ে কোনো শব্দ না করে কোয়েলের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে রাজ।

কোয়েল: কি হলো? এভাবে এসে শুয়ে পড়লে যে?

রাজ: এমনি। তুমি একা একা বসে আছো তাই কোম্পানি দিতে এলাম।

কোয়েল: হুহ!

কোয়েল রাজের কাছ থেকে রাজের ক্যামেরাটা নিয়ে নেয়। প্রথম যেই ছবিটা দেখতে পায় সেটাই কোয়েলের কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তে তোলা ছবি। কোয়েলের নিজেরও বেশ পছন্দ হয় ছবিটা তাই সামান্য হাসে। আস্তে আস্তে অন্য ছবিগুলো দেখতে দেখতে থাকে ও। রাজ হঠাৎ করে, ঘুরে কোয়েলের পেটে মুখ গুঁজলে কোয়েল একটু নড়েচড়ে বসে। আস্তে করে রাজের চুলে হাত রেখে বলে,

কোয়েল: আর কতক্ষণ থাকবো? এবার আমাদের ফেরা উচিত তাই না?

রাজ: উঁহু, পরে।

কোয়েল: নাহ রাজ, অনেকক্ষণ একসাথে আছি আমরা। এইবার আমাদের ফেরা উচিত। ব্রেকফাস্ট এর টাইম হয়ে গেছে তো?

রাজ ঝট করে উঠে বসে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে,

রাজ: আমার সাথে থাকতে আর ভালো লাগছে না বললেই হয়। ঘুরিয়ে বলার কিছু ছিল না এতে। (অভিমানের সুরে)

কোয়েল: আরে, আমি সেটা কখন বললাম? আমি এটা বলতে চাইনি রাজ, শুধু শুধু ভুল বুঝছো আমায় তুমি। উফ!

রাজ: (তাচ্ছিল্য হেসে) এতোটুকুতেই বিরক্ত তুমি, কদিনই বা আমাকে সহ্য করতে পারবে তুমি?

কোয়েল অবাক হয়ে যায় রাজের ব্যবহারে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কোয়েল ভাবেইনি রাজ এই সামান্য কথাটাকে এভাবে ঘুরিয়ে ধরবে। কিন্তু এখন বুঝতে যখন পেরেছে তখন জমরাজের মান ভাঙানো তো লাগবেই। তাই কোয়েল রাজের বাহু একহাতে জড়িয়ে ওর কাঁধে মাথা রেখে বললো,

কোয়েল: এখন যদি না ফিরি তাহলে সবার সাথে ঘুরতে কীভাবে বের হবো রাজ? তোমার আর আদিত্যদার উপর তো সব দায়িত্ব, তোমরা যদি না যাও তাহলে কি করে হবে? আমি সেইভেবেই কথাটা বলেছি। এতো সেনসিটিভ কবে থেকে হলে তুমি? হম?

রাজ কোয়েলের কথা শুনে কোয়েলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বলে,

রাজ: যেদিন তোমার থেকে দূরে গেছি সেদিন থেকে। তোমাকে চোখের আড়াল করতে মনই চায় না, মনে হয় সবসময় নিজের কাছে আগলে রাখি।

রাজের এমন কথা শুনে কোয়েলের চোখ ছলছল করে ওঠে। একটা চাপা কষ্ট নিয়ে যে রাজ কথাটা বলেছে তা অনুভব করতে পেরেছে কোয়েল। এখন সে বুঝতে পারছে তাঁর সাথে সাথে রাজও কষ্ট পেয়েছে। কোয়েল বেশিক্ষণ রাজের চোখে চোখ রাখতে না পেরে চোখ নামিয়ে নিলে, রাজ কোয়েলের কাছ থেকে নিজের বাহু ছাড়িয়ে কোয়েলকে বুকে আগলে নেয়।

কোয়েল: রাজ, গতকাল রাতে কারা তোমাদের জোর করেছিলো ড্রিংক করার জন্যে?

রাজ: ওই তো আমাদের ক্লাসমেটরা। কেন?

কোয়েল: আমার কেমন জানো মনে হচ্ছে ব্যাপারটা ইচ্ছা করে করা কারণ আমি সৌভিকদাকে দেখেছি তোমাদের ক্লাসমেটদের সাথে কথা বলতে। হয়তো ও শিখিয়ে দিয়েছে?

রাজ: হতে পারে কারণ ওরা খুব ভালো ভাবে জানে আমি বা আদি কেউই ড্রিংক করিনা। বাট এতে লাভটা কি হলো ওদের? বরং আমাদেরই লাভ হলো। (হেসে)

রাজ কোয়েলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে কোয়েল রাজের কথার মানে বুঝতে পারে। ভেবে দেখে রাজ ভুল কিছু বলেনি তাই ও নিজেও হাসে। আরো কিছুক্ষণ গল্প করে, সময় কাটিয়ে ওরা গেস্ট হাউস ফিরে আসে। গেস্ট হাউসে ফিরে এসে চলে যায় যে যার নিজের ঘরে।

কোয়েল: এই মৌ! শোন না? কই তুই?

আমি ব্যালকনিতে বসে ফোন ঘাটছিলাম, বলা ভালো আদির সাথে চ্যাট করছিলাম তখন কোয়েলের গলার আওয়াজ পেলাম। উঠে ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

মৌমিতা: কি হয়েছে বল।

কোয়েল: তোকে আমার কিছু বলার আছে কালকে রাতের ব্যাপারে।

মৌমিতা: হম, হম শুনবো তো। কি করে আমার বান্ধবীর মন গললো জানতে হবে তো নাকি।

কোয়েল: (লাজুক হেসে) উফ! সেটা না, ধুর তুইও না।

মৌমিতা: বাহবা! লজ্জা দেখো মেয়ের। (হেসে) আচ্ছা বল কি বলবি।

কোয়েল: জানিস কালকে রাতে রাজ আর আদিত্যদাকে জোর করে ড্রিংক করিয়েছে ওদের ক্লাসমেটরা?

মৌমিতা: হম জানি। জিয়ার কাজ হতে পারে এটা কারণ কালকে রাতে জিয়া ওর সাথে ছিলো যখন ও বেরিয়ে গেছিলো গেস্ট হাউস থেকে। আমি গিয়ে দেখি জিয়া ওর কাছে আসার চেষ্টা করছে ওর বারবার বারণ করা সত্বেও। তাই আদিও বলছিলো এটা ওর কাজ হতে পারে।

কোয়েল: শুধু জিয়া না, সৌভিকদাও আছে এই বিষয়ে জড়িত। কারণ আমি দেখেছিলাম সৌভিকদাকে রাজ আর আদিত্যদার ক্লাসমেটদের সাথে কথা বলতে সবার আড়ালে।

মৌমিতা: তারমানে ওরা চেষ্টা করছে আমাদের ক্ষতি করার। খুব সাবধানে থাকতে হবে আমাদের।

কোয়েল: জিয়া না হয় আদিত্যদাকে ভালোবাসে তাই তোর ক্ষতি করতে চায়। পরেশবাবু জিয়ার বাবা, জিয়ার কষ্টের জন্য আদিত্যদাকে দায়ী করে এবং নিজের অপমানের বদলা নেওয়ার জন্য আদিত্যদার ক্ষতি করতে চায়। এতদূর অবধি ঠিক আছে কিন্তু রাজ? রাজের ক্ষতি কেন করতে চায় পরেশবাবু? শুধু আদিত্যদার সাথ দিয়েছে তাই? আচ্ছা সেটাই মেনে নিলাম। সৌভিকদার কি লাভ এসবে জড়িয়ে? ও কেন ওদের সাথে যোগ দিয়েছে? ওর তো কোনো রাগ থাকার কথা না তোদের উপর কারণ ও এতোটাও জিয়াকে প্রায়রিটি দেয় না। ও তো খুব স্বার্থপর আমার জানামতে।

কোয়েলের কথাগুলো একদম যুক্তিযুক্ত। কিছুদিন আগে যখন কোয়েল রাজদার সম্পর্কে বলছিল সেই কথাগুলো মনে করে আমি ওকে বললাম,

মৌমিতা: তুই তো বলেছিলি রাজদার উপর সৌভিকদার একটা ক্ষোভ আছে, হয়তো সেটা থেকেই…?

কোয়েল: হতে পারে কিন্তু সেদিন পরেশবাবু রাজকে কি বলেছিলেন তা আজও রাজ বলেনি।

মৌমিতা: ধৈর্য রাখ কোয়েল। সবে তোদের সম্পর্কটা ঠিক হয়েছে এক্ষুনি এসব চিন্তা করে ঘেঁটে ফেলিস না বিষয়টা। সময় দে রাজদাকে, নিজেদের সম্পর্ককে। একটু সহজ ফীল করা রাজদাকে দেখবি সব নিজে থেকেই বলে দেবেন। আর তুই তো ছোটবেলা থেকে ওনাকে চিনিস, এখন আবার সবথেকে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিস। তোকে বলবে না তো কাকে বলবে?

কোয়েল শুধু হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। এরপর আমরা সবাই ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে সবাই মিলে একসাথে আড্ডা দিয়ে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরেনি। তারপর রেডি হয়ে একটু ঘুরতে বের হই। বেড়ানোর পর থেকে আদি আমার সাথেই আছে, এক মিনিটের জন্য আমাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। আর এইসবই যে জিয়া নজরে রেখেছে তা আমার নজর এড়ায়নি। ওদিকে কোয়েল এসে আমাকে বললো ওকে আর রাজদাকে সৌভিকদা নজরে রেখেছে যেটা জানার পরেই রাজদা রেগে গেছেন। তাই ও গেছে রাজদার পিছনে। একটা পাথরে হেলান দিয়ে এসব ভাবছিলাম, এসব ভাবনার মাঝেই পিছন থেকে আদিত্য আমার গলা জড়িয়ে ধরলো দু-হাত দিয়ে। কানের কাছে এসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো,

আদিত্য: কি ভাবছো এত? আমার কথাও তো ভাবতে পারো মাঝে মধ্যে এমন মন দিয়ে?

মৌমিতা: (হেসে) ইশ! বয়েই গেছে আমার তোমার কথা ভাবতে।

আদিত্য: আচ্ছা তাই? তারমানে এখন আমি কেউ না?

মৌমিতা: (নিজেকে ছাড়িয়ে) আজ্ঞে না, কেউ না।

আদিত্য: তাহলে তো কেউ হয়ে উঠতে হচ্ছে…

কথাটা বলেই ও আমাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। আমি চোখ বড়ো করে ওর দিকে তাকালেও ও কোনো পাত্তা দিলো না। আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে নিলেই ও বললো,

আদিত্য: লাভ নেই, পারবে না আমার থেকে নিজেকে ছাড়াতে।

মৌমিতা: আশেপাশে কতো লোক আছে দেখেছো? ভার্সিটির কেউ দেখলে কি ভাববে বলো তো? ছাড়ো আমায়।

আদিত্য: ভার্সিটির সবাই জানে তোমার আমার সম্পর্কে। আমার বউয়ের সাথে যা ইচ্ছা তাই করবো আমি, কে কি বলবে? হম? আমি চাইলে তোমার কথা বলাটাও এক্ষুনি বন্ধ করে দিতে পারি, সেটাই চাইছো?

আমি ওর কথা শুনে না বুঝতে পেরে ভ্রু কুঁচকালেই ও দুষ্টু হেসে আমার ঠোঁটের দিকে তাকায় আর আমি সাথে সাথে না বোধক মাথা নাড়ি। কিন্তু ও সেসব না শুনে আমার ঠোঁটের দিকে এগোতে নিলেই ওর হাতের বাঁধন একটু আলগা হয়ে যায় আর সেই ফাঁকেই আমি ওকে ধাক্কা দিতে ও দূরে সরে যায়।

__কি রে তোরা এখানে কি করছিস? স্যার, ম্যাডাম ডাকছে তো আদিত্যদাকে।

আমাদের ভার্সিটি থেকে আমার সমবয়সী একজন স্টুডেন্টকে আসতে দেখেই আমি ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। ও যে এতে রেগে গেছে তা ওই ছেলেটার কথায় কোনো উত্তর না দেওয়াতেই বুঝতে পেরেছি। ছেলেটা কথাটা জানিয়ে চলে গেলে আদিও চলে যেতে নেয় কিন্তু আমি ওর হাত ধরে বলি,

মৌমিতা: আমি বলেছিলাম কেউ দেখে নিলে কি হবে। ওকে আসতে দেখেই সরিয়ে দিয়েছি তোমায়, স্যরি!

আদিত্য: ইট’স ওকে। আমারও বোঝা উচিত সবসময় সবার মন থাকে না। তুমি হয়তো চাওনি আমি তোমার কাছে যাই। আমারই ভুল হয়েছে পারমিশন না নিয়ে কাছে যাওয়াটা, আর হবে না এমন স্যরি!

মৌমিতা: কি বলছো এসব? আমি কেন চাইবো না তুমি আমার কাছে থাকো হম? (আদির গালে হাত রেখে)

আদিত্য: চাওনা তাই জন্যেই তো আমাকে ছুটে আসতে হয় তোমার কাছে বারবার। তুমি একবারও প্রয়োজন মনে করো না আমার কাছে যাওয়ার। (অভিমান করে)

হে ভগবান! এই ছেলেটা এত্ত অভিমান করে আছে আর আমি টেরও পাইনি? ভাগ্যিস কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটা ঘটলো নাহলে তো টেরই পেতাম না। কিন্তু ওই তো আমাকে চোখের আড়াল করছে না, আমি আরকি যাবো ওর কাছে? বোঝাতে হবে ওকে এটা।

মৌমিতা: আচ্ছা তুমি কি আমাকে একটুখানির জন্যেও একলা ছেড়েছো? একলা ছাড়োনি দেখেই তো আমি কোনো সুযোগ পাইনি। তুমি আমার চোখের আড়াল হলে আমি যেতাম, যাইনি সেদিন রাতে? তুমি আমাকে চোখের আড়াল করেছো তারপর থেকে?

আদিত্য: নো, বিকজ আই লাভ ইউ! বাট ইউ ডোন্ট লাভ মি। (মুখ ঘুরিয়ে)

ওর কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য একপলকে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর সাথে সাথে উত্তর দিলাম,

মৌমিতা: আই অলসো লাভ ইউ আদি! (আলতো করে গালে ঠোঁট ছুঁয়ে)

আমি ওর গালে ঠোঁট ছুঁয়েই বুকে মাথা রাখতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো। যাক, ভাঙানো গেলো তাহলে বাবুর রাগ।

৭৭.
কোয়েল: রাজ প্লিজ, এতো মাথা গরম করো না তুমি। আমি তো বললাম ও আমাদের উপর নজর রাখছিলো শুধু আমার উপর ন…

কোয়েল কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো রাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে। সৌভিকের যেমন রাগ আছে রাজের উপর তেমন রাজেরও রাগ আছে সৌভিকের উপর। সেটা কোয়েল জেনেও যে কেন রাজকে কথাটা বলতে গেলো এটাই এখন কোয়েল ভেবে পাচ্ছে না। রাজ তো আর বাচ্চা নয় যে কোয়েল যা বোঝাবে তাই বুঝবে। কোয়েল কথাটা বলার পর রাজ নিজেই লক্ষ্য করেছে সৌভিকের চাহুনির উপর। সৌভিকের নজর কোয়েলের উপরেই ছিলো। নজর বললে ভুল হবে, বলা উচিত কুনজর। এটা কোয়েল নিজেও ভালোভাবে জানার পরও কি করে সৌভিকের হয়ে কথা বলছে রাজ বুঝতে পারছে না, আরো মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে যার জন্য।

রাজ: আমাকে একা ছেড়ে দাও কুহু। নাহলে আমি কি বলতে কি বলে ফেলবো আর তুমি কষ্ট পাবে যেটা আমি চাই না। প্লিজ, লিভ মি অ্যালোন। (ফুঁসতে ফুঁসতে)

কোয়েল: আমি কোথাও যাবো না তোমাকে একা ছেড়ে। (কাছে গিয়ে)

রাজ: প্লিজ কথাটা শোনো আমার। এখন আমার মাথার ঠিক নেই।

কোয়েল: তাই জন্যেই তো তোমার কাছে থাকবো। এই অবস্থায় আমি তোমাকে একা ছেড়ে গেলে তুমি সৌভিকদার ক্ষতি করে দিতে দু-বার ভাববে না। এমন হলে…

রাজের মাথাটা জানো আরো গরম হয়ে গেলো কোয়েলের কথাটা শুনে। কোয়েলকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রাজ যেই গাছটার কাছে ছিলো সেই গাছটার সাথেই কোয়েলকে চেপে ধরে বললো,

রাজ: এতো কেন ভাবছিস তুই সৌভিকের ব্যাপারে? কে হয় ও তোর যার জন্য ওর এত চিন্তা করছিস? আমার থেকে বেশি ও জরুরি তোর কাছে যার জন্য ওর কথা ভাবছিস এখন?

কোয়েল: নাহ রাজ তেমন কিছু না।

রাজ: ছাড়, বুঝে গেছি যা বোঝার। ভাববি নাই বা কেন? আমি তো একটা অনাথ, সৌভিকের বাবার দয়াতেই বেঁচে আছি। আর সৌভিক? ও তো বড়লোক তাই না। ওর সাথে থাকলেই তোর সব উইস ফুলফিল হবে। আমি তো তোর যোগ্যই না ইনফ্যাক্ট আমি কোনো কিছুরই যোগ্য না। (কোয়েলকে ছেড়ে দূরে এসে)

কোয়েল সাথে সাথে রাজকে পিছন থেকে হ্যাঁচকা টানলে রাজ তাল সামলাতে না পেরে কোয়েলের অনেকটা কাছে চলে যায় আর গাছটা ধরে। কোয়েল রাজের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে,

কোয়েল: তোমার আমাকে এমন মেয়ে মনে হয় যে কি না শুধু টাকা ভালোবাসে?

কোয়েলের কথাটা শুনে রাজ মাথা নীচু করে নেয়। বুঝতে পারে সে রাগের মাথায় ভুল বলে ফেলেছে। এই জন্যেই তো বলেছিল সে কোয়েলকে যাতে চলে যায় এখন এখান থেকে। কোয়েল চলে না গিয়ে বরং এমন একটা কথা বললো যাতে রাজের মাথাটা আরো গরম হয়ে গেলো। কোয়েল রাজের উত্তর না পেয়ে রাজের দু-গালে হাত রেখে নিজের দিকে রাজের চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো,

কোয়েল: এখন তুমি যদি এখানে কোনো সিনক্রিয়েট করো তাহলে সেটা কি ঠিক হবে? এমনিতেই আমরা জানি না ওরা কি প্ল্যান করছে। হতেই তো পারে এটাই ওদের ফাঁদ, তোমাকে রাগানো দ্যান তুমি ওদের কাছে গেলে তোমার ক্ষতি করা? হতেই পারে এটা রাজ। এখন আমাদের মাথা গরম করলে চলবে না সে যাই করুক না কেন ওরা।

রাজ: তোর আইডিয়া নেই সৌভিক কতো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে এইভাবে। এসব জেনে আমি কীভাবে তোর উপর ওর মতো একটা ছেলের কুনজর পড়তে দিই? তুই শুধু আমার আর তোর উপর নজর দেওয়া থেকে নিয়ে শুরু করে সবকিছুর অধিকার শুধু আমার।

রাজ কোয়েলের কোমর ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে, কোয়েলের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলে। ফলে, কোয়েলের কিছুক্ষণ যে পরিমাণ খারাপ লেগেছিল তাঁর দ্বিগুন পরিমাণ ভালো লাগা কাজ করছে এখন। রাজের চোখ রাগে লাল হয়ে ছলছল করছে। সবুজ মণির চোখগুলো লাল বর্ণ ধারণ করলে ভয় লাগার কথা কিন্তু কোয়েলের ভয় লাগছে না, কষ্ট হচ্ছে। রাজের কষ্টটা সে অনুভব করতে পারে। রাজের মধ্যে থাকা চাপা কষ্টটা আজ বেরিয়ে এসেছে। রাজের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়লেই কোয়েল সেটা মুছে দিয়ে রাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,

কোয়েল: কে বলেছে তুমি অনাথ রাজ? আমি আছি তো? আমি সবসময় তোমার সাথে ছিলাম, আছি আর থাকবো, তোমার ছায়া হয়ে! তাছাড়া এই কথাটা দাভাই শুনলে কি হবে ভাবতে পারছো? আর কখনো নিজেকে অযোগ্য মনে করবে না রাজ।

কোয়েল সোজা হয়ে রাজের চোখে চোখ রাখলে রাজ কোয়েলের কোমর পেঁচিয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসে আবার।

কোয়েল: আমি মনে করি না তুমি কাওর থেকে কম। কাওর দয়ায় তুমি বেঁচে নেই রাজ। তুমি নিজের জোরে বেঁচে আছো। আমি কি জানি না তুমি এর জন্যে কতটা পরিশ্রম করেছো ছোটো থেকে? নিজের পরিশ্রমের জোরে আজ তুমি এই জায়গায় নাকি কাওর দয়ায়। আমার বিশ্বাস এই চার বছরে তুমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছো যেটা আমি সবসময় চেয়েছিলাম।

কোয়েলের কথায় রাজের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলে কোয়েল বোঝে সে ঠিক কথাই বলেছে। এতে ওর নিজের মনেও শান্তি পায়। এইভেবে যে কিছু তো সূত্র পেলো রাজের চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে। রাজ কোয়েলের কপালে কপাল ঠেকালে,

কোয়েল: আর কখনও নিজেকে অনাথ বলবে না রাজ। কেন এমন বলো? আমি মরে গেছি? আমি মরে গেলেও…

কোয়েলের মুখের কথা মুখে রেখে দিয়েই রাজ কোয়েলের ঠোঁটজোড়া নিজের ঠোঁটের ভাঁজে নিয়ে নিলো। কোয়েল প্রথমে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে যায়, মরে যাওয়ার কথা আসার কারণেই রাজ এমন আক্রমনাত্মক হয়ে উঠেছে। রাজ এক হাতে কোয়েলের কোমর জড়িয়ে আরেক হাত দিয়ে কোয়েলের মাথাটা আরো কাছে টেনে আনলে কোয়েল আবেশে চোখ বুজে নেয়। গাছটার মধ্যে পুরোপুরি হেলান দিয়ে একহাত রাজের কাঁধে রেখে অন্য হাত রাজের চুলের ভিতর প্রবেশ করিয়ে রাজকে ধীরে ধীরে আঁকড়ে ধরে। এর ফলে রাজের উন্মাদনা আরো বেড়ে যায়। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শটা ওরা দুজনেই পুরোপুরি উপভোগ করতে চায় তাই রাজও ধীরে ধীরে নিজের আক্রমণাত্মক ভাব কমিয়ে, রাগ, অভিমান সব মিটিয়ে কোমলতায় নেমে আসে।

[#ফিরে_আসবো_আগামী_পর্বে 🥀]

আইডি- কোয়েল ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here