তোমার_প্রেমে_পড়েছি পর্ব_০৯

0
97

তোমার_প্রেমে_পড়েছি
পর্ব_০৯
#Rimy_Islam

নমনী অবাক হয়ে গেল। ছোঁয়াচে মেয়ে! কোথাও একটা ঝামেলার ইঙ্গিত পেলো সে। মেয়েটাকে নিয়ে সবার এতো জড়তা কেন? কঠিন কোনো ব্যাপার তাকে নিয়ে পূর্বে এ বাড়িতে ঘটেছে কি?

আমিরার বোনের নাম নদী। দুপুর নাগাদ সে পৌঁছে গেল। নবনী তাকে প্রথম দেখায় রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। দু’ বোনের চেহারায় নব্বই ভাগ মিল রয়েছে। লম্বা, দোহারা গড়নের মেয়েটাকে নির্দ্বিধায় সুন্দরী বলা যায়। যেহেতু নদী এ বাড়িতে পূর্বেও এসেছে, সেহেতু সবার সাথে চিরচেনা আচরণ করলেও নমনীর কাছে এসে সে থেমে গেল। সুতীক্ষ্ণ চোখে নমনীর পা থেকে মাথা পরিমাণ নিবিড় গবেষণা শেষে সে ফল প্রকাশ করলো।
— হুম…. নেত্র এই মেয়েকে বিয়ে করছে? মুখ বাঁকিয়ে অপকৃষ্ট ভঙ্গিতে বললো নদী।
আমিরা সাথে সাথে বোনের বাহুতে চিমটি কাটে। নদী চুপ হয়ে যায়। এদিকে তার কথা শুনে নমনী হা হয়ে গেল। মেয়েটা কথা বলছে পুরো ভদ্রভাষায়। পরিধানের কাপড়েও বেশ আভিজাত্যের ছোঁয়া। কোথাও একটা এই মেয়েকে হঠাৎ দেখলে ধনীর দুলালী বলে ভ্রম হয়। দুপুরের খাবার টেবিলে সবাই একত্রে অনেক গল্প করলো। একমাত্র মধ্যাহ্নে সবাই একত্র বসে খাবার গ্রহণ করে। সকাল কিংবা রাতে যার যার মতো খেয়ে নেয়। সেখান থেকে নদীর ব্যাপারে অনেক কিছু জানতে পারে নমনী।

নদী আগে এ বাড়িতেই বেশি থেকেছে। তথাপি এ বাড়ির লোকজনের সাথে গলায় গলায় ভাব হওয়ার বদলে ওর সাথে পুরো পরিবারের দা-কুমড়োর সম্পর্ক। নীলুফা বেগমের তাকে ছোঁয়াচে নামকরণের পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যখন সে এখানে থেকেছে তখন তার প্রধান কাজ ছিল নেত্র’র পেছনে ছোঁয়াচে চিপকু আঠার মতো লেগে থাকা। বাড়িতে এ খবর কানাকানি হতেই আমিরাকে বলে নদীকে বিদায় করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মেয়েটার দুই দুইবার বিয়ে হয়ে আবার ভেঙেও গেছে। এখন নদী পুরোদমে অবিবাহিত। যা নবনীর জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতে চিন্তায় ওর ঠিকমতো ঘুম এলো না। এতকাল পর মেয়েটা আবার না নতুন কোনো কুকীর্তি করে বসে! নিজের ঘর ভেঙে এখন তার সংসারটাও না গুঁড়িয়ে দেয়!

— আচ্ছা নেত্র, আপনি ওই মেয়ের কান্ডে বিরক্ত হতেন না? সদ্য স্নান সিক্ত নমনী চা হাতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো। নেত্র সাত-সকালে উঠে বই প্রেমে মজেছিলো বিধায় নমনীর প্রশ্ন বুঝে উঠতে খানিক সময় ব্যয় করে। অতঃপর বলে,
— কে নদী? নাহ, বিরক্ত হব কেন? আমাদের এখানেই থাকতো, খোতো, কাজ করতো। বিশেষ করে আমার সব হুকুম ঝটপট মানতো।
নমনী মনাবদ্ধ রাগকে সংযত করে বললো,
— আপনার উপর এত দরদ করার কারণ বুঝেননি তো! উজবুক ছেলে, নদী আপনাকে পছন্দ করতো।
— উজবুক! আমি মোটেও উজবুক নই। সেটা তার প্রবলেম ছিলো। আমি কখনো অন্য নজরে তাকে দেখিওনি। নিজে ঠিক তো দুনিয়া ঠিক।
— এসব কথা বইয়ের পাতায় ভালো সাজে। সর্বপরি আপনি একটা ছেলে। এতদিন ধরে কোনো মেয়ে একটা ছেলের পেছনে আঠার মতো লেগে থেকেছে আর সে ছেলে কিনা কিছুই বুঝেনি! এ আমায় বিশ্বাস করতে হবে?
— তুমি নদীকে একবার যথোচিত নিরীক্ষণ করবে এবং নিজেকেও আয়নার সামনে খুঁটিতে দেখবে। আমার স্তর কোন পর্যায়ে বুঝে যাবে।

নেত্রকে ফেলে নমনী পার্শ্বের রুমে এসে অবক্রভাবে দর্পনের সামনে দাঁড়ায়। ঘরোয়া সাদা-মাটা আকাশী রঙা শাড়ি তার পরনে। বিয়ের পর একদিনের জন্যও সে শাড়ি ব্যতীত ভিন্ন কাপড় পরেনি। চুলগুলো উঁচুতে খোঁপা করেছিল সেই সকালে। এখনো খানিক জলসিক্ত থাকায় নবনী সেগুলো ছেড়ে দিতে তা কোমর অবধি ছড়িয়ে পড়লো। টানা চোখ, পাতলা ঠোঁটে খারাপ লাগে না ওকে। বরং বিধাতায় অপূর্ব সৃষ্টির মধ্যে তার এ শারীরিক সৌন্দর্য্যকে নগণ্য ঠাহর করা অনুচিত।
ভালোমতো দেখে আবারো ছুটে এলো নেত্র’র রুমে। লাজুক ঢং-এ সে এগিয়ে আসতেই নেত্র নচ্ছার হাসে। নমনী খুব আলগা পায়ে নেত্র’র সামনে গিয়ে টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
— আপনার শাড়ি ভালো লাগে নাকি সালোয়ার-কামিজ?
নেত্র ভারী অদ্ভুত হেসে বলে, — এ কেমন প্রশ্ন? বোধ হয় সবটায় তোমাকে ভালো লাগে।
— এটা কথা হলো? নির্দিষ্ট করে বলেন, যে কোনো একটা অপশন চুজ করতে পারবেন।
— সম্ভব না।
— কেন?
— এই যেমন: তুমি আমাকে ‘আপনি’ বলো। এটাকে এখন খুব মধুর ডাক লাগে। আবার আমার স্বপ্নে এসে ‘তুমি’ বলে আমায় সম্বোধন করো। ওটাও ভালো লাগে। তাই কি ডাকবে, কি পরবে সেটা ম্যাটার না। ভালোবেসে, মমতা মিশিয়ে যা পরবে বা ডাকবে, সব আমার প্রিয়।

নমনী দু’ দিকে জোরালো মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়ে বললো,
— উহুম.. হলো না। মাত্র বললেন আপনার স্বপ্নলোকে আমি আপনাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করি। এর অর্থ আপনি সেই ডাকটাকেই পছন্দ করেন, শুনতে চান আমার মুখ থেকে। স্বপ্ন মানুষের অভ্যন্তর মনের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
— বেশ তবে এখন থেকে ‘তুমি’ করে বলো।
নমনী সে কথা কানে নিলো না। আপন গতিতে বললো,
— আচ্ছা, এবার বলেন আপনার স্তর কোন পর্যায়ে? নদী মেয়েটা যথেষ্ট সুন্দরী।
— তুমি তার চেয়েও বেশি। আমি নদীর জলে ডুবে মরতে চাই না। সাঁতার পারি না তো! আমি নমনীর নমনীয়তার চাদরে আরামে ঘুমোতে চাই। যে চাদর একই সাথে নম্র, শীতল। আবার চটপটে মশলার মতো রাংঝাল গরম। সর্বশেষ খুব আরামদায়ক! বুঝলে?

নমনী হি হি করে হেসে ফেললো। ছেলেটা ব্যাখ্যা দিতে পারদর্শী।

_____
বাড়ির পেছনের উঠোনে যথেষ্ট জায়গা থাকায় একটি দোলনা বসানোর পরিকল্পনা করছেন নীলুফা বেগম। এতকাল এ ভাবনা না আসলেও ছেলেদের বউ ঘরে এসে তিনি দিন দিন বেশ সৌখিন হয়ে উঠছেন। কোথায় কিভাবে করা যায় তার দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছে নমনী এবং মুমু। দেখা গেলো দু’ জনের মধ্যে পর্যাপ্ত মতভেদ রয়েছে। এত ঝামেলার মাঝে নীলুফা বেগম তিক্ত হয়ে উঠলেন। বললেন,
— বাদ থাক। দেখা যাবে তোমাদের মধ্যে এ নিয়েও ঝগড়া লেগে যাবে।
নীলুফা বেগম চলে গেলেন। মুমু হেসে এবার বললো,
— ভালো হয়েছে চলে গেছেন। তোর সাথে জরুরি কথা বলতেও সুযোগ পাচ্ছি না। নদীর খবর রেখেছিস? মেয়েকে খুব কৌশলী। কোন হাতে না তোর থেকে নেত্রকে কেড়ে নেয়!
— তোমার মুখে ভালো কথা নেই? যখন পারো তখনই আমার মনটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ো।
— আহা, রাগ করলে হবে! নিলয় কাল বলছিল, নেত্রকে ফাঁদে ফেলতে কিছু বাদে না মেয়েটার। খুব সাবধান।
— চিন্তা করো না। আমি থাকতে কেউ নেত্র’র হৃদয়ে এন্ট্রি নিতে পারবে না।

নব্য অতিথি নদীর সকল কর্ম তালিকা দাঁড় করালো নমনী। খাতা, কলমে টুকে নিলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে। নদী বর্তমানে থাকছে নিচ তলার একটা রুমে। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে বসে জমে বোনের সাথে খোশ গল্পে। কোনো কাজ কমাতে না পারলেও বাড়াতে ভীষণ পটু। গতদিন শাশুড়ী মায়ের ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে মূল্যবান শো পিচ ভেঙেছে সে। এছাড়াও নমনী এবং মুমুর জন্য নীলুফা বেগম নিজ হাতে কারুকার্য খচিত পুঁতির হাতব্যাগ তৈরি করেছিলেন। সেটার মধ্যে থেকে একটা উধাও। এতদিন চুরি যায়নি। নতুন করে এসব ঘটার পেছনে মূল নদী এমনটা সবার ধারণা। এ ধারণা থেকেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে সে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ভাসিয়েছে। অবশেষে জিজ্ঞাসাবাদের সেখানেই ইতি। দিনের অধিকাংশ সময় তার কাটে নমনীদের ঘরে উঁকিঝুঁকি মেরে। হয়তো উদ্দেশ্য নেত্রকে দেখা। এ কাজটি সে করে নমনীর অনুপস্থিতিতে। বাদ বাকি সময় সে নিজ ঘরে থেকে অতিবাহিত করে। নমনীর এখন ভাবনার বিষয় কিভাবে নদীকে তাড়ানো যায়।

চলবে……….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here