তোমাতেই পূর্ণ আমি #পর্ব -৭

0
170

#তোমাতেই পূর্ণ আমি
#পর্ব -৭(নতুন পর্ব)
#লেখিকাঃআসরিফা সুলতানা জেবা

ক্যাম্পাসের পিছনের দিকে পুকুরের পাড়ে বসে আছি আমি আর প্রিয়ু।পুকুরের পাশের এই দিক টা খুব নিরিবিলি থাকে।মাঝে মাঝে এক দু’জন কাপল দেখা যায়।বকুল ফুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে আছে চারদিক টা।এক সময় খুব ইচ্ছে ছিল বকুল ফুলের মালা গেঁথে হাতে,,গলায়,,কানে দুল বানিয়ে পড়ব। ইচ্ছে টা আমার ছিল বললে ভুল হবে। সেই আড়ালে থাকা মানুষটার ইচ্ছে ছিল আমায় এই রুপে দেখার। কিন্তু সময়ের সাথে ইচ্ছে গুলো হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে ঠিক সেই মানুষটার মত। প্রিয়ু একটু পর পর আমার হাত খোচাচ্ছে।ভয়ে আঁতকে আছি এখনও দুজন তূর্য ভাইয়ার ঐ রাগী রূপ টা দেখে। আমাদের এই দশা না জানি নিশি আপুর কি হয়েছে!!ওনার এমন রূপের কথা শুধু লোক মুখে শুনেছিলাম এখন তো নিজ চোখে সকাল থেকেই দেখে যাচ্ছি।

আমি এতিম বলে,, কোনো বড়লোক বাড়ির মেয়ে না বলেই কি নিশি আপুর এতো ক্ষোভ? তূর্য ভাইয়া কে অপমান করেছি বলে কি আমার প্রতি এতো ক্ষোভ? কই এসব কিছুই তো মনে হচ্ছে না।আমার কেন যেন মন বলছে ওনার ক্ষোভ অন্য কোনো কারণে এবং সেটা হয়তো আমাকেই ঘিরে!!আচ্ছা তূর্য ভাইয়া সামান্য একটা কারণে ওনাদের ফ্রেন্ডশিপ কেন নষ্ট করলেন?ওনার তো আরও খুশি হওয়ার কথা যে নিশি আপু আমায় শাস্তি দেওয়ার জন্য ওনাকে সুযোগ করে দিয়েছে তবে তিনি কেন এতো রাগ দেখালেন?তখন থেকেই প্রশ্নগুলো বার বার ঘুর ঘর করছে আমার মনের ভিতরে।

আমার প্রশ্নের জবাব পেলাম প্রিয়ুর কথায়।চোখে মুখে ভয় নিয়ে প্রিয়ু বলে উঠল,,,

—আগে নুসাইবা আপুর মুখে শুনেছিলাম তূর্য ভাইয়া কতো ডেঞ্জারাস। কিন্তু আপুর মোবাইলে ভাইয়ার পিক দেখে কখনো বিলিভ করি নি আমি।এতো স্মার্ট একটা ছেলে এতো মায়ায় ভরা তার চেহারার মানুষের এতো রাগ কি করে হতে পারে বল?তাই আপুকে বলতাম তুমি মিথ্যা বলো যেন আমি তোমার ক্রাশের উপর ক্রাশ না খায়।তখন আপু বলতো একবার সামনা সামনি দেখিস তবেই বুঝবি তূর্য ভাইয়া কি জিনিস। ভালো হয়েছে আপুর উদয় ভাইয়ার সাথে বিয়ে হয়ে গেছে নয়তো এই লোকের পিছে সারাজীবন ঘুরলেও তার মন পেত না উল্টো জ্বলে পুরে ভস্ম হয়ে যেত।

প্রিয়ুর কথায় আমি হাসব না কাঁদব এই ভাবছিলাম তখনি আবার প্রিয়ু বলল,,,

—জানিস আপু বলেছিল তূর্য ভাইয়া ওনার আর ওনার শত্রুর মাঝে অন্য কারো ইন্টারফেয়ারেন্স পছন্দ করেন না।ওনার শত্রুদের ওনি নিজেই হ্যান্ডেল করতে পছন্দ করেন।তার মানে তুই বুঝতে পারছিস শ্রেয়া? (বড় বড় চোখ করে)

প্রিয়ুর মুখে উচ্চারিত বাক্যে আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে আমি ওনার শত্রু।আমার আর ওনার মাঝে নিশি আপু বা হাত ঢুকিয়েছে তাই ওনার এতো রাগ উঠেছে। হয়তোএই কারণেই তখন ওইসব কথা বলছিলেন। নিজের দোষেই আজ এমন জালে ফেঁসে গেছি আমি।কি দরকার ছিল ওনার সাথে টক্কর নেওয়ার! না জানি আরো কত কিছু ভোগ করতে হয় আমার।

পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ফিরে তাকালাম আমি।মুখে মুচকি হাসি নিয়ে দাড়িয়ে আছে আয়ুশ ভাইয়া। আয়ুশ ভাই কে দেখেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল প্রিয়ুর মুখ টা।বুঝতে আর বাকি নেই বান্ধবী আমার কঠিন অসুখে ভুগছে।যার নাম প্রেমাসুখ।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি।আল্লাহ যেন আমার ভয় টা সত্যি না করে।কোনোভাবেই যেন আমার জন্য এই মেয়েটা কষ্ট না পায়।আয়ুশ ভাইয়া যেন কখনও সেই মানুষ টা না হোক।প্রিয়ুর ভালোবাসা যেন প্রিয়ুর ই হয়।মুচকি হেসে আয়ুশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম আমি।হাতের বইটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে।অবাক চোখে তাকাতেই ওনি ইশারা করলেন বই টা নিতে।বইটা নিয়ে নিলাম আমি।হাতে নিয়ে দেখলাম এটা তো আমারই বই।গতকাল লাইব্রেরি থেকে নিয়েছিলাম।তূর্য ভাইয়ার ভয়ে ওনাদের ক্লাসেই রেখে চলে আসছি।ভালোই হয়েছে আয়ুশ ভাইয়া নিয়ে এসেছেন নয়তো জরিমানা দিতে হতো আমার।যা এই মুহূর্তে কোনোভাবেই সম্ভব না।হাতে এক টাকা ও নেই।অন্যের থেকে ধার করা ৫০০ টাকাই আছে। খাতা যেহেতু কিনি নি রীতি আপুর টাকা উনাকেই ফিরত দিয়ে দিব।বেচারির নিজের ও অনেক আর্থিক সমস্যা। একটু হেসে আয়ুশ ভাইয়া কে ধন্যবাদ জানালাম।হাসলেন তিনি।সামনের বেঞ্চিতে বসে এক নজর তাকালেন আমাদের দু’জনের দিকে।

—আপনাদের দু’জনের সাথে কি এক কাপ চা খাওয়া যাবে?(হেসে)

আয়ুশ ভাইয়ার কথায় একে অপরের দিকে তাকালাম দুজন।প্রিয়ু চোখের ইশারায় রাজি হয়ে যেতে বলল।কিন্তু ভীষণ অস্বস্তি তে পড়ে গেলাম আমি।আয়ুশ ভাইয়া নিঃসন্দেহে ভালো ছেলে কিন্তু ওনার চোখের চাহনি আমায় কেন যেন অন্য কিছু প্রকাশ করে।মনে হয় ওনি আমায় পছন্দ করেন।সত্যি কি তাই নাকি এটা শুধু সন্দেহ অথবা বুঝার ভুল।

—সমস্যা নেই। না খেতে চাইলে ইটস ওকে।তোমার বইটা দিতে এসেছিলাম।দুজন একা বসে আছো তাই ভাবলাম এক কাপ চা খাওয়া যাক তোমাদের সাথে আর তোমাদের সম্পর্কে ও জানলাম।তাহলে আমি আসি।

আয়ুশ ভাইয়া যেতে নিলেই হুড়মুড়িয়ে বলে উঠল প্রিয়ু,,,

—আমরা চা খেতে চাই ভাইয়া।কিন্তু শ্রেয়া ক্যান্টিনে যাবে না।
–ঠিক আছে।চা এখানেই চলে আসবে।

কিছুক্ষণ ধরে কথা বলে যাচ্ছে আয়ুশ ভাইয়া আর প্রিয়ু। আমি এদিক সেদিক তাকাচ্ছি বার বার।আমার মন বলছে কেউ গভীর নজরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আয়ুশ ভাইয়া নাকি অন্য কেউ!! আয়ুশ ভাইয়ার দিকে তাকাতেই সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি।চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম আমি।একটু পরেই ক্লাস আছে।প্রিয়ু ও আয়ুশ ভাইয়া কথা বলতে বলতে এগোচ্ছে। আমিও তাদের সাথে সাথে চলতে লাগলাম।


ক্লাস শেষে বইটা লাইব্রেরিতে ফিরত দিতে যাবো তখন বইয়ের ভাজ থেকে একটা কাগজ গড়িয়ে পড়ল ফ্লোরে।কাগজ টা তুলে দেখলাম সেই অচেনা মানুষটার লিখা চিরকুট। একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়ায়।বুকটা ধুক করে উঠল প্রিয়ুর দিকে তাকিয়ে। বইটা তো আয়ুশ ভাইয়া দিয়েছেন। তার মানে ওনিই চিরকুট লেখক! তবে কি আমার ভয় টা সত্য প্রমাণিত হলো! চিরকুট টা প্রিয়ু দেখার আগেই ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম আমি।মনের মধ্যে কান্না গুলো দলা পাকিয়ে আসছে।ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আয়ুশ ভাইয়া চিরকুট লেখক হলে কীভাবে আমি সহ্য করব ওনাকে প্রিয়ুর পাশে?আর ওনিই বা মেনে নিবেন কি প্রিয়ু কে?মানুক বা না মানুক আমি কখনও আর কারো হচ্ছি না।আমার একটাই পরিচয় আমি শ্রেয়সী।কোনো চিরকুট লেখক বা আয়ুশ ভাইয়া কারো পরিচয় আমার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেই মানুষ টা কে যে আমি ভীষণ ভালোবাসি।।ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে চিরকুট লেখক। কিন্তু কখনও আর আপনার হওয়ার ভাগ্য আমার নেই। কোনোমতে কান্না আটকিয়ে প্রিয়ু কে বললাম,,,

–আমি একটু ওয়াশরুমে যাবো প্রিয়ু।তুই যা আমি আসছি।
–ঠিক আছে দোস্ত।


ওয়াশরুমে এসে চোখে মুখে পানি দিলাম আমি।সত্যিই কি আয়ুশ ভাইয়া আপনি আমার সেই ভালোবাসার মানুষ টা?যদি হয়েই থাকেন তবে আবার কেন ফিরে এলেন আমার জীবনে।চলেই তো গিয়েছিলেন আমাকে একা ছেড়ে। একবারও আসেন নি আমার জন্য একবারও না। অন্যের হতে দিয়েছেন আমায়।স্বামী নামক নরপশু টা শেষ করে দিয়েছে আমার জীবন।কেন ভালোবাসা দেখিয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন আমার জীবনটা।কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলাম আচমকাই লাইট অফ হয়ে অন্ধকার ছেয়ে গেল জায়গাটায়।সামনের দিকে এগোতে যাবো দু’হাতে আমার কোমড় আকড়ে ধরে নিজের একদম কাছে নিয়ে নিল কেউ। আমার দু হাত গিয়ে ঠেকল মানুষ টার বুকে।সেই স্পর্শ,,,সেই পুরোনো অনুভূতি। আরেকটু শক্ত করে জরিয়ে ধরে নিজের একদম কাছে নিয়ে নিল আমায়। নিমিষেই ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে লাগল সারা শরীর জুড়ে।আয়ুশ ভাইয়া নয়তো?কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,,,,

—আয়ুশ ভভাইয়া আপনি???আপপপনি কি আয়য়ুশ ভাইয়া?প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন।

সাথে সাথেই লোকটা রাগী কন্ঠে বলে উঠল,,,,,

—একদম চুপ।মুখে সারাক্ষণ ছেলেদের নাম নিয়ে ঘুরিস তাই না?ছেলেদের সাথে কথা বলিস,,ঘুর ঘুর করিস।বিধবা হয়েও তোর স্বাধ মিটে নি তাই না?পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছিস।লাজ লজ্জা কিছুই নেই তোর ।তোর এই কন্ঠই আমি রাখব না কোনো ছেলের সাথে কথা বলার জন্য।

কথাটা বলেই লোকটা সাথে সাথে আমার গলা চেপে ধরল।এতো শক্ত করে ধরেছে মনে হচ্ছে এই বুঝি নিঃশ্বাস টা বন্ধ হয়ে যাবে।হাত দিয়ে ছাড়াতে চাইলাম কিন্তু পেরে উঠলাম না তার শক্তির সাথে।উপায় না পেয়ে তার বুকে দুই হাত দিয়ে ঠেলতে লাগলাম।আমার গলা ছেড়ে দিল লোকটা।কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে আমার।কিছুটা দূরে সরে আসতেই হাত টা টেনে একদম নিজের সাথে শক্ত করে বুকে জরিয়ে নিল আমাকে।জোর করে আমার মাথা টা বুকে চেপে ধরে রাখতেই ওনার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি আমার কানে এসে বারি খেতে লাগল বার বার। লোকটার হৃদপিন্ডের হৃদস্পনদন গুলো কেমন ঘোরে নিয়ে যেত লাগল আমায়।আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে লোকটা বলে উঠল,,,,

—আ’ম সরি জান।কিন্তু এই শাস্তি টা তুমি ডিজার্ভ করো।আর কখনও যদি কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে দেখেছি তবে তোমায় খুন করেই দম নিব আমি।আই থিংক বুঝতে পেরেছ তুমি।

লোকটার কথায় আঁতকে উঠলাম আমি।জীবনে একের পর এক কষ্ট,,কঠিন বাস্তবতা ঘিরে ধরছে আমায়। এ কেমন খেলায় মেতে উঠল সবাই আমার জীবনটা কে নিয়ে! আমার কাছে আসলে একদম স্লো ভয়েসে কথা বলে লোকটা।তবুও আজ কন্ঠ টা খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। ইনিই কি তবে আয়ুশ ভাইয়া!!!!

একের পর এক আমার গালে, কপালে চুমু দিতে লাগলেন মানুষ টা।শিহরিত হচ্ছি আমি প্রতিবার।কান্না আসছে বুক ফেটে।কাঁদতে কাঁদতে চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে উঠল সবকিছু।ধীরে ধীরে লুটিয়ে পড়লাম ওই মানুষটার বুকে,,,

চলবে,,

(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here