তোর শহরে ভালোবাসা পর্ব-১০

0
149

#তোর_শহরে_ভালোবাসা💜
পর্ব-১০
ফাবিহা নওশীন

🍂🍂
পাখির কিচিরমিচির শব্দে সামুর ঘুম ভেঙে যায়।চোখ মেলে নিজেকে অপরিচিত জায়গায় আবিস্কার করে।পরক্ষনেই ওর মনে পড়ে ও তো আদির সাথে এসেছে।আদিকে খোজতে ঘাড় কাত করতেই দেখে আদি বেডের কর্ণারে পাশ ফিরে শুয়ে আছে।গতকাল রাতে যেভাবে শুয়েছিলো।সামু আদিকে দেখে মুচকি হাসি দেয়।নিজের গায়ে চাদর জড়ানো দেখে।

রাতে বৃষ্টি পড়েছে ওয়েদার কিছুটা ঠান্ডা ছিলো।তাই হয়তো আদি ওর গায়ে চাদর দিয়ে দিয়েছে।কিন্তু আদির গায়ে কিছুই নেই।এই গন্ডারের কি শীত লাগেনা।
সামান্তার ঘুম আসছেনা।ঘড়িতে ৭টা ২১বাজে।উঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।উঠার জন্য পা টান দিতেই অবাক।

–ছিঃ ছিঃ সামু তুই আদির পায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়েছিস?মাথা তো ঠিক জায়গায় আছে কিন্তু পা কিভাবে ওখানে গেলো?আদি যদি জানতে পারে আমাকে পচাতে ছাড়বেনা।

সামান্তা আস্তে-ধীরে পা সরিয়ে অতি সাবধানে বেড থেকে নেমে গেলো।তারপর গায়ের চাদর আদির গায়ে দিয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো।চুলগুলো এলোমেলো ভাবে চোখের উপর ছড়িয়ে রয়েছে।একদম কিউটের ডিব্বা।

–ইসস,,আমার বাব্বিটা কি সুন্দর!!একদম বাচ্চাদের মতো কিউট।মাই ডেয়ার কিউট হাসব্যান্ড তুমি যতই কিউট হওনা কেন,,এত তাড়াতাড়ি তোমাকে ধরা দিচ্ছিনা।

সামান্তা ফ্রেশ হয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালো।যতদূর দেখা যাচ্ছে গাছপালা কোনো বাড়িঘর নেই।কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারছেনা।সামান্তা নিচে গিয়ে পুরো বাড়ি চক্কর দিলো।পুরো বাড়ি ঘুরে যেটা বুঝতে পারলো আদি প্রায়ই এবাড়িতে আসে।তবে একা নয়।টেবিলের উপর এলোমেলো গ্লাস আর ড্রিংক ওয়াইনের বোতল বোতল দেখেই বুঝতে পারছে।
কিচেনে গেলো।যদি খাওয়ার জন্য কিছু পাওয়া যায়।খুব ক্ষুদা পেয়েছে।কাল রাতে একটু কোক খেয়েছে।পুরো কিচেন তন্নতন্ন করেও কিছু পেলোনা।কয়েকটা কফির প্যাকেট ছাড়া।সামান্তা তাড়াতাড়ি কফি বানিয়ে নিলো।

কফির মগ নিয়ে গ্লাসের পাশে গিয়ে দাড়ালো।কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর বাইরেটা দেখছে।সামনেই গার্ডেন।গার্ডেনে অসংখ্য ফুল ফুটে আছে।পাখিরা কিচিরমিচির করছে,রোদেরা আলোছায়ার খেলা করছে।সামুর মনে হচ্ছে ও ওর গ্রামে আছে।কতদিন এমন পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পায়নি।কফি খাওয়া শেষ এখন কি করবে একা একা?
আদি ঘুমাচ্ছে।ওকে ডাকবে?ওকে ডেকে ঝামেলা বাড়ানোর দরকার নেই।এটা সেটা বলে বিরক্ত করবে।তারচেয়ে ঘুমাক একা একাই বসে থাকা ভালো।

হটাৎ আদির ঘুম ভেঙে যায়।ঘুম ভেঙে নিজের গায়ে চাদর জড়ানো দেখে যেটা রাতে সামুকে দিয়েছিলো।আদি পাশ ফিরে সামুকে খোজে কিন্তু বিছানা ফাকা।আদি লাফ দিয়ে উঠে পড়ে।ওয়াশরুম চেক করে কিন্তু সামু নেই।তাই দৌড়ে নিচে যায় সেখানেই সামুকে দেখতে না পেয়ে জোরে জোরে ডাকে।

–সামু,,সামু!!হয়ার আর ইউ?

সামু আদির চিতকার শুনে মনে মনে বলে,
উঠতে ষাড়।আমাকে এখানে আটকে রেখে এভাবে চিতকার করার মানে কি?
সামান্তা সাড়াশব্দ না দিয়ে ওভাবেই বসে রইলো।আদি খোজতে খোজতে সামুকে পায়।দেখে সামু ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে।সামুকে দেখে ওর রাগ উঠে যায়।

–এই মেয়ে কখন থেকে ডাকছি আর তুমি এখানে বসে আছো?

–কেন ডাকছেন?

–কেন ডাকছি মানে?ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমি নেই।

–আর তাই আপনি ভাবলেন আমি পালিয়ে গেছি??হাও ফানি।আপনি আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন আমি কিভাবে পালাবো?

–তুমি যে মেয়ে তোমাকে আটকে রাখা যায় নাকি?বিশ্বাস নেই।
যাইহোক কখন উঠেছো?আমাকে ডাকো নি কেন?

–১ঘন্টা,আপনাকে ডাকবো কেন?আপনি যতক্ষণ ঘুমাবেন ততক্ষণ আমার শান্তি।আপনি আমাকে প্রচুর জ্বালাতন করেন।

আদি সামান্তার কাছে গিয়ে বললো,কি জ্বালাতন করেছি?
আদি সামান্তার দিকে আগাচ্ছে।সামান্তা ভয় পেয়ে তোতলিয়ে বললো,,
–আআমা,,র খুউব ক্ষুধা পেয়েছে।খাবারের অভাবে কিছুক্ষণ পর মারা পরবো।প্লিজ কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করুন।

আদি দূরে সরে গেলো।ঠিকই তো গতকাল ওকে কোচিং থেকে তুলে নিয়ে এসেছি।রাতে একটু কোক খেয়েছে।তাতে কি হয়,,নিশ্চয়ই অনেক ক্ষুধা পেয়েছে।আমিও না,,তাড়াহুড়ায় খাবার এ আনি নি।

–কিছুক্ষন পর ই খাবার চলে আসবে।তুমি আরেকটু কষ্ট করো।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আদি ফ্রেশ হতে চলে গেলো।সামুর পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে।

আদি ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে সামু পেটে হাত দিয়ে বসে আছে।আদি ওর পাশে গিয়ে বসে বললো,,
আমি ফোন করেছি।১০মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে।আরেকটু কষ্ট করো।আই এম রিয়েলি সরি।আসলে তাড়াহুড়ায় এমন,,

সামান্তা শুকনো হাসি দিয়ে বললো,
আমার তেমন ক্ষুধা পায়নি।

আদি জানে ও মিথ্যে বলছে।সময় কাটানোর জন্য বললো,
ঘুম কেমন হলো?
–ভালো।

আদি বাকা হেসে বললো, তা তো হবেই।আমার পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে ঘুমিয়েছো।

সামু তো অবাক।
–আমি ইচ্ছে করে করিনি।

–বুঝেছি,বুঝেছি,,আমার মতো কিউট ছেলে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারোনি।

সামি ভ্রু কুচকে বললো, কিহ!!কিউট আর আপনি?আপনি একটা জিরাফ।

–জিরাফ!!

–জ্বী হা,জিরাফ!!ছয় ফুট হাইটের জিরাফ।

আদি ইনোসেন্ট মুখ করে বললো, আমার মতো কিউট, হ্যান্ডসাম ছেলেকে তোমার জিরাফ বলতে একটুও বাধলো না।এত বড় অবিচার!!

সামু আদির ফেস দেখে হেসে দিলো।তারপর কিচেনে গিয়ে ৫মিনিট পর আদির জন্য কফি নিয়ে ফিরলো।
আদিকে কফি দিয়ে বললো,আপনি এখানে প্রায়ই আসেন তাই না,,,(কিছুটা থেমে) কফি খেতে??

আদি কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে গেলো।সামান্তা যে ওকে কি মিন কতেছে সেটা ও ভালোই বুঝতে পারছে।কফির নাম নিয়ে যে খুচা মেরেছে সেটাও বুঝতে পারলো।
আদি কিছুনা বলে কফিতে চুমুক দিলো তারপর বললো,
তোমাকে মিথ্যে বলবোনা,আমি এখানে প্রায়ইশ আসি বন্ধুদের নিয়ে।আড্ডা দেই,একসাথে বসে ড্রিংক করি।তুমি জানো আমি ছেলেটা তেমন ভালো না।কি যেনো বলেছিলে লাফাঙ্গা,,হুম ওটাই।তবে এসবের মধ্যে একটা কথা হলো আমার মেয়ে দোষ নেই।আর সবচেয়ে বড় সত্যি হলো তোমার প্রতি আমার যে ফিলিংস সেটা মোহ,মায়া কোনোটাই নয়।তাহলে এতদিনে কেটে যেত।বিয়ের ৫মাস রানিং।৩মাস যাবত আমি তোমাকে ফিল করি।এর আগে কখনো কোনো মেয়ের প্রতি এমন ফিলিংস হয়নি।অনেক মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করেছি,পিছে ঘুরিয়েছি,
ডেটিংএ গিয়েছি।বাট কেউই বেশিদিন টিকে নি।কাউকে ছুতে ইচ্ছে করেনি,পেতে ইচ্ছে করেনি,কেউ আমাকে এতটা টানেনি তুমি যতটা টানছো।তোমাকে আমি সারাজীবনের জন্য চাই।তুমি চাও আর না চাও তোমাকে,,,

কলিং বেল বেজে উঠলো।আদির কথায় ব্যাঘাত ঘটলো।সামান্তা মনোযোগ দিয়ে আদির কথা শুনছিলো ওর ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলো।আদি হালকা হাসি দিয়ে দরজা খোলতে চলে গেলো।
সামান্তা ভাবছে,
এই ছেলেটা এত সুন্দর করে হাসে কেন?এই হাসিই তো আমাকে দূর্বল করে দিবে।এই হাসিতে যে আমি ফিদা হয়ে যাই সে কি জানে??হয়তো জানে না।

দু’জন ছেলে এসে টেবিলের উপর বড়বড় ৪টা প্যাকেট রাখলো।ছেলেগুলোকে বিদায় দিয়ে আদি প্যাকেটগুলো খোলে টেবিলে খাবার রাখছে।
–সামু চলে এসো।তোমার খাবার রেডি।
সামান্তা টেবিলের সামনে গিয়ে চোখ বড়বড় করে চেয়ে আছে।
–আপনার এখানে কদিন থাকার ইরাদা আছে বলুন তো?
–দুপুরেই আমরা বেরিয়ে যাবো।বিকেলের মধ্যে বাসায় পৌছে যাবো।
–তাহলে এত খাবার কেন?
–সব তোমার জন্য।যেটা ইচ্ছে খাও।
–দেখুন এটা সত্যি যে আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে তার মানে এই নয় আমি রাক্ষস।আপনি আমাকে এইভাবে অপমান করছেন?
–আরে বোকা মেয়ে আমি তো তোমার ফুড চয়েজ জানিনা তাই অনেক আইটেম অর্ডার কিরেছি।নেও খেয়ে নেও।

সামান্তা একটা চিকেন ফ্রাই,স্যান্ডউইচ আর এক গ্লাস জুস খেয়ে বললো আমার হয়ে গেছে।
আদি তা দেখে বলে,,ব্যাস!!এই তোমার ক্ষুধা?
তাই তো এমন স্লিম বডি।তোমরা মেয়েরা এভাবেই স্লিম থাকো তাইনা।না খেয়ে খেয়েই এমন হও।
আমাকে দেখো,আমাকে দেখে খাওয়া শিখো।খেয়েদেয়ে গলুমলু হলে আমার প্রব্লেম নেই।নিশ্চিন্তে খেতে পারো।

–কোনো দরকার নেই,,আপনি রাক্ষসের মতো খেয়ে মুটো হন আর পাথরের মতো শক্ত শরীর বানান।

আদি সামুকে ক্ষেপানোর জন্য বললো,
–তোমার শরীর যে এত নরম সেটা কালকে বুঝেছি।কি যে সফট ইচ্ছে করছিলো খেয়ে ফেলি,,,উফফ।

সামান্তা চোখ বড়বড় করে দুহাতের আংগুল খিচে রাগ ঝেড়ে চোখমুখ খিচে বেরিয়ে গেলো।আদি দরজার লক খোলেছে তাই বাইরে বেরিয়ে গেলো।আদি ওর পিছু পিছু হাটা ধরলো।বলা তো যায়না যদি চলে যায়।

সামান্তা বাগানে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছে।আদি দূর থেকে দাঁড়িয়ে সামুকে দেখছে।সামান্তার গালের উপর রোদ পড়ে চকচক করছে।সামান্তাকে মোহিত লাগছে।পাশেই একটা পুকুর।পুকুর পাড় শান বাধানো।সামান্তা সিড়িতে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে দিলো।গ্রামের কথা মনে পড়ছে।মনে হচ্ছে গ্রামেই আছে।পানিতে পা ডুবিয়ে বাচ্চাদের মতো খেলছে।
আদি ওর পাশে গিয়ে পা ডুবিয়ে বসে পড়লো।
সামু একবার সেদিকে চেয়ে নিজের খেলায় মন দিলো।

তারপর আদিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
জায়গাটা অনেক সুন্দর।আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।

–তুমি আরো থাকতে চাও?

–থাকতে ইচ্ছে করছে কিন্তু থাকা যাবেনা,,আমার ভার্সিটি আছে।অন্য সময় আসবো।
আবার কিন্তু আসবো হু,,(বাচ্চাদের মতো বায়না করে)

–কার সাথে আসবে?

–কেন আপনার সাথে।

–আমার সাথে কেন আসবে?
আদির কথায় সামান্তা থমকে গেলো।
,(তুই আমার জামাই তাই আসবো,এটা আবার বলা লাগে)
–ঠিক আছে আসবোনা,,আপনি না নিয়ে আসলে কি করার?
আদি সামান্তার আরেকটু কাছে গিয়ে ঘেঁষে বসলো।তারপর বললো,
–আমি তো আসতেই চাই,তুমিই তো চাওনা।আচ্ছা আমাকে কি তুমি করে বলা যায়না?
–উহু।
–কেন?
–জানিনা।
–কেন জানোনা?এখনি তুমি করে বলবে।বলো।
–না,,বলবোনা।
–তাহলে পানিতে ফেলে দিবো।
–ফেলে দিন।
আদি সামান্তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।ওর ধারণা গ্রামের মেয়ে সাতার জানে।সামান্তা ভাবতেও পারেনি আদি এমন একটা কাজ করতে পারবে।ওর ইচ্ছে করছে আদির মন্ডু ফাটিয়ে দিতে।হটাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেললো মাথায়।ও ডুবে যাওয়ার ভান করছে।আর চিতকার করছে আমি সাতার জানি না।
আদি ওর চিতকারে ভয় পেয়ে গেলো।নিজের চুল নিজের ছিড়তে ইচ্ছে করছে।কেন ফেললো ওকে।আদি পানিতে লাফ দিয়ে সামান্তার কাছে যেতেই সামান্তা ডুব দিয়ে কিনারায় চলে এলো।
আদি তো হতবাক।সামান্তা হেসে কুটিকুটি।আদি রাগে ফেটে যাচ্ছে।
আদি ওর সামনে গিয়ে দাড়ালো।আদিকে দেখে সামান্তার হাসি উবে গেলো।চোখ মুখ শক্ত করে ওর সামনে দাড়িয়ে আছে।

–তুমি মজা করছো হা?আমার ভয়ে জান যায় আর তুমি মজা করো?কি করে পারো?আমাকে কি তোমার মানুষ মনে হয়না?তুমি জানো আমি কি পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম??

সামান্তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
–সরি,,আমি বুঝতে পারিনি,,,।

–তুমি বুঝবেওনা।কখনোই বুঝবেনা।

আদি পুকুর থেকে উঠে গেলো।
সামান্তা উঠে আদির সাথে যাচ্ছে।আলমারি থেকে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে নিবে তখনই আদিও ওয়াশরুমে ঢুকতে যাচ্ছে তখনই দুজনে ধাক্কা।আদি ওর দিকে চেয়ে আছে।ভিজা জামাকাপড় গায়ে লেপ্টে আছে।ভিজা চুলগুলো গালে,গলায় লেপ্টে আছে।

–সরুন।আমি আগে যাবো।তারপর আপনি।

আদির ঘোর ভাংলো।বাকা হেসে বললো,
–চলো একসাথে যাই,,,।চেঞ্জের সাথে রোমান্স ও হয়ে যাবে।

সামান্তা আদিকে ধাক্কা মেরে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা লক করে দিলো।আদি হেসে অন্য রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।

দুপুরে খেয়েদেয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো।আদি আর সামু পাশাপাশি সিটে বসে যাচ্ছে।সামু বারবার আদির দিকে তাকাচ্ছে আর গতদিনের কথা ভাবছে।

–দেখো আমি জানি আমি অনেক কিউট।তাই বলে এভাবে চেয়ে থাকবে,,আমার কিন্তু লজ্জা লাগছে।
সামান্তা হকচকিয়ে গেলো।আমতা আমতা করে বলল,
–আমি আপনাকে কেন দেখতে যাবো??
–আমাকে আবারো আপনি করে বলছো?দাড়াও তোমাকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার,,।
আদি সামুকে টেনে মুখের কাছে নিয়ে এলো।
সামু ভয় পেয়ে বললো,
–কি করছেন?এটা রাস্তা,ড্রাইভ করছেন,,এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে।
–যা খুশি হোক,দুনিয়া জ্বলেপুড়ে যাক,,আমাকে তুমি করে বলো নয়তো এইভাবেই ড্রাইভ করবো।
গাড়ি কিভাবে ব্রেক করছে।আর আদিও ওর মুখের দিকে আরো আগাচ্ছে।কেমন উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে।
সামান্তা ভয় পেয়ে বললো,বলবো বলবো।
–আগে বলো।
–তুতু,,,মি।
–সুইট করে বলো।
–তুমি।
–এইতো গুড গার্ল।
আদি ওকে ছেড়ে দিয়েই গাড়িটা ব্রেক কশে অন্য গাড়ির সাথে ধাক্কা খেতে যাবে তখনই আদি ব্রেক ধরে গাড়িটা সরিয়ে নেয়।
সামান্তা ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে আদির দিকে কটমট করে চেয়ে বললো,
পাগলামির একটা লিমিট থাকা উচিত।কি করতে যাচ্ছিলেন?নিজেও মরতেন আমাকেও মারতেন।সোজা হয়ে গাড়ি চালান।আর একটা কথা বললে আপনার খবর আছে।

–আচ্ছা আচ্ছা সরি।(এ মেয়ে আমাকে কোনোদিনও তুমি বলবেনা)

আদি গাড়ি চালাচ্ছে সামান্তা বাইরেটা দেখছে।গ্রামের মতো নিরিবিলি রাস্তা।গ্লাস খোলে দিলো। বাতাস বইছে।সামান্তার চুলগুলো উড়ছে।তখনই আচমকা সামনে থেকে একটা গাড়ি এসে ধাক্কা দিলো।আদি সামান্তার সামনে নিজের বামহাত রেখে গাড়ি সাইডে নেওয়ার চেষ্টা করছে।সামান্তা চিতকার করে উঠে।গাড়িটা একটা গাছের সাথে লেগে থেমে যায়।সামান্তার মাথা আদির হাতের উপর।সামান্তা চোখ খোলে মাথা তুলে আদির দিকে তাকালো।আদি স্টিয়ারিংয়ে মাথা নিচু করা অবস্থায়।সামান্তা আদিকে এভাবে দেখে ভয় পেয়ে গেলো।অজানা ভয়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।এক হাতে আদির হাত চেপে ধরে অন্য হাত মাথায় রেখে বলল,
–আদি,,,,,!!

আদি চোখ মুখ কুচকে মাথা তুলে সামুর দিকে তাকালো সামুর চোখে পানি।মেয়েটা ভয় পেয়েছে খুব।
–তুমি ঠিক আছো?
–আরে আমি ঠিক আছি।আপনি ঠিক আছেন কিনা বলুন।
–হ্যা,,
সামু আদির কপালে রক্ত দেখতে পেলো।রক্ত দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়লো।রেগে গিয়ে বললো,
–আপনার কপালে রক্ত।কপালে কেটে গেছে।আপনাকে আমি বারবার বলছি মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালান।মনোযোগ দিন।ফাইজলামি বন্ধ করুন।কিন্তু আপনি তো আমার কোনো কথাই শুনছেন না।

আদি কপালে হাত দিয়ে সামনে এনে দেখে রক্ত।সামুকে বলে,,
–ট্রাস্ট মি,,এবার আমার কোনো দোষ নেই।আমি ঠিক ভাবেই চালাচ্ছিলাম।ওই গাড়িটাই মনে হচ্ছে নেশা করে চালাচ্ছে।
সামান্তার মেজাজ সপ্ত আসমানে।গাড়ি থেকে নেমে সামনে থামনো গাড়ির কাছে গেলো।একটা ছেলে বসে আছে সেও হয়তো সামান্য আহত হয়েছে।দেখে মনে হচ্ছে হুশে নেই।

–ওই বের হ।তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হ।
ছেলেটা ভ্রু কুচকে সামুর দিকে তাকালো।
–কে রে?বের হবো কেন?
–তোর জম।
সামু গাড়ির দরজা খোলে ছেলেটার কলার ধরে বের করে আনে।ছেলেটা নেশাগ্রস্ত থাকায় সুবিধা হয়েছে।
–ওই গাড়ি চালাস না প্লেন?রাস্তা কি তোর দাদার যে মদ খেয়ে টাল হয়ে গাড়ি চালাবি আর অন্যের গাড়ি উড়িয়ে দিবি?
–ছাড় বলছি।
–শালা,,,সরি না বলে ছাড়তে বলিস?দাড়া।
সামু ওকে ছেড়ে দিয়ে কিছু খোজতে লাগলো। গাছের একটা ডাল পেয়ে গেলো।সেটা তুলে ছেলেটাকে মারতে লাগলো।
–তোর জন্য আমার বরের কপাল কেটেছে৷ কতগুলো রক্ত বের হয়েছে।তোর ও ততখানি রক্ত বের করেই শান্ত হবো।তার আগে নয়।

ছেলেটা ছটফট করছে।
–মারছেন কেন?আমি ইচ্ছে করে করিনি।

আদি গাড়িতে বসে সামুর কান্ড দেখে কপালে হাত।এ কি মেয়েরে বাবা।একে না থামালে মার্ডার করে দিবে।আমার সংসার করার স্বপ্ন শেষ।আদি তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে সামুর সামনে গেলো।
ছেলেটা বলছে,
আপু সরি,,মাফ করে দিন।আর এমন হবেনা।
–কিসের সরি??তোকে আজ আমি খুন করবো।মদ খাবি,,টাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারবি?চিনিস আমাকে?আমি সামান্তা সেহনুজ চৌধুরী।আজকের পর আমার নামটা আজীবন মনে রাখবি।
–জ্বী আপু কোনো দিন ভুলবোনা।আজীবন মনে রাখবো।
সামান্তা ঘেমে নেয়ে গেছে।কিন্তু থামছেনা।আদি ওকে টেনে নিয়ে এলো।সামান্তা আদির থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
–ছাড়ুন,,ওকে আজ আমি মেরেই ফেলবো।এইসব লোকের জন্য আজাইরা ফুর্তির জন্য কত এক্সিডেন্ট হয়।কত মানুষ মারা যায়।যদি আজ আপনার কিছু হয়ে যেতো।

আদি সামান্তাকে জোর করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো।সামান্তা তখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
–আমি ঠিক আছি,,কিছু হয়নি আমার।
সামান্তা আদিকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো।ওর মনে হচ্ছিলো ও আদিকে হারিয়ে ফেলছিলো।সামান্তা শান্ত হলে ওকে গাড়িতে নিয়ে বসায়।আদি লুকিং গ্লাসে নিজের কপাল দেখে।রক্ত কপাল বেয়ে পড়ছে।আদি টিস্যু নিয়ে মুছতে গেলে,,
সামু ধমক দিয়ে বললো,
–আর ইউ ম্যাড?টিস্যু দিয়ে ক্ষতস্থান মুছবেন?টিস্যু কাটা জায়গায় আটকে থাকবে,,ইনফেকশন হতে পারে।মাথা এদিকে আনুন।

সামান্তার ওড়না টিস্যু কাপড়ের।তাই কামিজের কোনা দিয়ে ওর কপাল মুছে দিলো।আদির খুব ব্যথা লাগছে কিন্তু প্রকাশ করছেনা।কারণ এই ব্যথা তার কাছে মধুময় লাগছে।তার প্রেয়সী মলম লাগিয়ে দিয়েছে অলরেডি।

–গাড়ি স্টার্ট দিন।আর সাবধানে চালাবেন।

আদি মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দুলো।সামান্তা মুখে যাই বলুক না কেন ও যে আদিকে ভালোবাসে সেটা বুঝাই যাচ্ছে।

সামান্তা চুপ হয়ে গেছে।আদিও কিছু বলছেনা শুধু অনুভব করছে।একটা ফার্মেসী দেখে আদিকে বললো,
–স্টপ দ্যা কার।
আদি গাড়ি থামিয়ে সামুর মুখের দিকে চেয়ে বললো, কি হয়েছে?
–নামুন,,বলছি।
আদি সামুর কথামতো নেমে গেলো।সামান্তার পিছে পিছে গেলো।সামান্তা একটা ফার্মেসীতে গিয়ে একটা ছেলেকে বললো,
ভাইয়া,,ওনাকে একটু ব্যান্ডেজ করে দিন তো।
আদি বললো বাসায় গিয়ে করে নিলেই তো হতো।
–চুপ করুন।
আদি চুপচাপ ব্যান্ডেজ করে নিলো।

–তুমি আমার এতো কেয়ার করো জানতাম না তো?
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিতে।
–এখন এতো কথা না বলে গাড়ি চালান।
কিছুক্ষণ পর বললো, তুমি তো খুব ডেঞ্জারাস।আগে সন্ত্রাসী ছিলে নাকি?

–মি.মাথামোটা ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আমি আমার কলেজের গার্লস লিডার ছিলাম।কত ছেলেকে ধরে পিটিয়েছই জানেন।সব কটা আমাকে ভয় পেতো।যারা মেয়েদের বিরক্ত করতো তাদের বেধে পেটাতাম।অনেক ছেলেকে বিভিন্ন শাস্তি দিয়েছি।

–যেমন??

–শীতের সকালে কলেজে বিশাল পুকুরে ১০টা ডুব দেইয়েছি।কাউকে এ পাড় থেকে ওপারে সাতার কেটে যেতে বলেছি।কাউকে পুরো কিলেজের ওয়াল দিয়ে হাটিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি। কত্ত মজার ছিলো দিনগুলো।

–আমার তো এখন থেকে সাবধানে থাকতে হবে।কবে আমার হাত-পা ভেঙে দেও।আল্লাহ নোস।
তবে যাই বলো থ্যাংকস গড!!ভাগ্যিস আজকে এক্সিডেন্ট হয়েছিলো নয়তো জানতেই পারতাম না আমার বউ আমাকে এত্ত ভালোবাসে।

–কিসের ভালোবাসা? কোনো ভালোবাসা ণয়।

–তুমি যাই বলো না কেন,,ইউ লাভস মি,,একদিন স্বীকার করবে।

আদি আর সামু বাড়িতে ঢুকতেই নিশি দোড়ে এসে বললো,
–সামু কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?

–অনেক সুন্দর।এত সুন্দর যে আমার জান যায় যায় অবস্থা।

আদির মা এসে বললো,
–মানে?

–মানে,,আমি কোচিং শেষে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি তখন কেউ এসে মুখে রুমাল দিয়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় নিজেকে বন্ধ ঘরে আবিষ্কার করি।তারপর ওনাকে দেখি।আমাকে লক করে রেখে দেয়।

আদি ইশারায় বারবার না করছে কিন্তু সামু গরগর করে সব বলে দিচ্ছে।আদির মা এবার আদির দিকে চোখ পাকিয়ে চাইতেই আদি কপাল থেকে চুল সরিয়ে বললো,
এই দেখ এই কারণে ও আমার মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে।
–না মা মিথ্যা বলছে।এটা তো গাড়িতে এক্সিডেন্ট হয়েছে।
–কি বলছিস কিভাবে?
সামান্তা সব খোলে বললো।আদির মা আদিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

.
.
.
.

নিশি আর আদি বসে বসে গল্প করছে তখনই সামু ভার্সিটি থেকে ফিরছে।ওর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
নিশি সামুকে বললো,
সামু আজ রাতে আমরা পার্টিতে যাচ্ছি।তুই, ভাইয়া আর আমি।
সামু আদির দিকে চেয়ে মুখ ভার করে বললো, আমি যাবোনা আপু,,ভালো লাগছেনা।
সামান্তা ফ্রেশ হয়ে বের হতেই আদি ওকে চেপে ধরলো।সামান্তা আদিকে এভাবে দেখে ভয় পেয়ে যায়।
–কেন যাবেনা?আমি যাবো তাই? আমার সঙ্গে যেতে প্রব্লেম?
সামান্তা ঠান্ডা গলায় বলল,দেখুন আপনার যা ভাবার ভাবুন কিন্তু আজকে আমি ওই পার্টিতে যাবোনা।

–কেন ওই পার্টিতে কি প্রব্লেম?

–আমার ভালো লাগছে না আমি যাবোনা।আপনার যেতে হয় যান।
সামান্তা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

আদি মনে মনে বলছে,
এভাবে এভয়েড করছো?তোমাকে আগে খাচায় পুরি তারপর দেখবে আদি কি জিনিস,,,

সামু ভার্সিটি থেকে ফিরার সময়,
গেইট থেকে বের হয়েই দেখে রাজ দাঁড়িয়ে আছে।
–আপনি?আপনাকে না ভার্সিটি আসতে মানা করেছি?
–দুদিন যাবত তোমার খবর পাইনি তোমার ফোন অফ।তাই খোজ নিতে বাধ্য হয়েই এসেছি।
–আমি বেচে আছি।মরিনি।
–ফোন অফ কেন?
–প্রথমত বাসায় ছিলাম না।আর দ্বিতীয়ত আমাকে আর ফোন দিয়ে পাবেন না।
–মানে?
–মানে ওইদিন ই বলেছি আদি আপনার ফোন দেওয়া পছন্দ করে না।তাই সিম ভেঙে ফেলেছে।প্লিজ আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না।
–তুমিও সেটাই চাও?
–অবশ্যই কেন নয়?আমি বিবাহিত।আমাকে আমার হাসব্যান্ড শ্বশুর বাড়ির কথা মতো ই চলতে হবে।
সরি,মাফ করবেন।আমি আপনার সাথে ফ্রেন্ডশিপ রাখতে চাইনা।বায়।
সামু কথাটা বলেই চলে আসছিলো। রাজ পিছনে থেকে বললো,
–তুমি না চাইলেও আমি আসবো,তোমার খোজ নিবো।
সামু রেগে গেলো।
–মানে কি,,জোর জবরদস্তি নাকি?
–হ্যা তাই।
–তাহলে শুনে রাখুন,,এসব করলে ঝামেলায় পরে যাবেন।আদি ইস ক্রেজি এবাউট মি,,ও যদি জানে তবে খারাপ হয়ে যাবে।
রাজ চোখ মুখ শক্ত করে বললো, তো জানাও,,,কে নিষেধ করেছে?আদি যদি ক্রেজি হয় তবে আমিও ক্রেজি।যা হওয়ার হবে আই ডোন্ট কেয়ার।
সামু কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসে।
সামুর আদির কথাগুলো ভালো লাগেনি।তাই ওর থেকে দুরে থাকাই ভালো।আদি জানলেও ঝামেলা করবে তাই না জানানোই বেটার।

চলবে,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here