সিঁদুর শুদ্ধি #নাফিসা মুনতাহা পরী #পর্বঃ৩৮

0
106

#সিঁদুর শুদ্ধি
#নাফিসা মুনতাহা পরী
#পর্বঃ৩৮
.

বিদ্যা একটু ওঠার চেষ্টা করতেই সামনে দেখলো, পাশে চেয়ার পেতে এক মহিলা বসে আছে। মহিলাটি আর কেউ নয়। সে ছিল অপুর মা দেবকী। কিন্তু বিদ্যা দেবকীকে চিনেনা। বিদ্যা চোখ বুজে আবার চোখ মেলে তাকাতেই দেবকী ভ্যানিস হয়ে যায়। এমন দৃশ্য দেখে বিদ্যা ধড়পর করে উঠে বিছানায় বসে পরে। এটা কি হল! কে ছিল সে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে
বিদ্যা আসে-পাশে চেয়ে দেখলো কেউ নেই। মনের ভুল হয়তোবা ছিল। বিদ্যা বিছানা থেকে নেমে পা বাড়ালো ব্যালকোনির দিকে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। ব্যালকোনিতে যাওয়ার জন্য থাইটা খুলতেই অবাধ্য দমকা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিয়ে চলে গেল। বিদ্যা কৌতুহলী চোখে এগিয়ে গেল। ব্যালকোনিতে দাড়িয়েই সে খানিকটা চমক খেল। চোখের সামনে বিচ আর তারপরে সেই স্বপ্নের বিশাল জলরাশি।
আমি এখানে আসলাম কি করে! আমি তাহলে এখন কোথায় আছি? প্রশ্নগুলো বিদ্যার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো।

হঠাৎ কেউ রুমে এসে লাইট জ্বালালো। বিদ্যা সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, অভি এসেছে।

বিদ্যা ভ্রু কুচকে বলল,

—” অভি?”

বিদ্যা পায়ে পায়ে চলে আসলো রুমে। অভিকে দেখে আগের রাগগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ও কেন এখানে এসেছে! ওকে তো আমার আর দরকার নেই! আমার জিবনে আর কাউকে দরকার নেই। আমার পৃথিবীতে কেউ নেই। মনে হয় আমি কোন অবৈধ সন্তান। মা-বাবা দায়িত্ব নিতে পারেনি বলে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। আর সেখান থেকে তারা কুড়িয়ে এনে আমায় মানুষ করেছে। কথাগুলো মনে মনে বলতেই চোখজোড়া ভরে উঠলো জলে।

অভি বিদ্যাকে দেখেও না দেখার ভান করে একটা বুক হাতে নিতেই বিদ্যা চিৎকার দিয়ে বলল,

—” তুমি! তুমি আবার কেন আমার জিবনে এসেছ! আমার তোমাকে চাইনা। আমিতো বেশ ছিলাম আমার জিবন নিয়ে। তাহলে কেন তুমি এলে আমার জিবনে?”

বিদ্যার কথা শুনে অভির মাথা আর ঠিক রইলোনা। মনে হচ্ছে মন, দেহ সব দিক দিয়ে রাগের ফোয়ারা ছুটছে। অভি দ্রুতই বিদ্যার কাছে গিয়ে বাম হাত দিয়ে বিদ্যার থিতি সহ চিবুক জোড়ে চেপে ধরলো। অভির চোখ-মুখ দিয়ে যেন রাগ চুয়ে চুয়ে পড়ছে। ঐ অবস্থায় বিদ্যাকে দেয়ালে চেঁপে ধরে বলল,

—” তোর সুইসাইড করার যখন এতই ইচ্ছা জেগেছে, তাহলে আমিই তোকে এখানে মেরে দেই! তোর মৃত্যু বলে কথাতো! হয়ে যাবে, জাষ্ট কয়েক সেকেন্ডের প্রয়োজন। তারপর সব সমস্যা সমাধান।”

কথাগুলো বলে অভি বিদ্যাকে ফ্লোরে ফেলে দিল। বিদ্যার ডান দিকের ফর্সা চিবুকে অভির চার আঙ্গুলের স্পষ্ট দাগ উঠে গেছে। যার জন্য এত কিছু সেই আমাকে ভুল বোঝে বলেই অভি শূন্যতে একটা লাথি ছোড়ে। রাগে শরীর কেঁপে যাচ্ছে। এখানে থাকলেই নিশ্চয় কিছু একটা অঘটন ঘটে ফেলবে তাই অভি রুম থেকে বের হয়ে গেল।

কিন্তু বিদ্যা থামবার পাত্রী নয়। অভির এই ব্যবহারে ওর সাড়া শরীরে মনে হয় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে লাগলো। নিজের গালে নিজেই দু’টো চড় বসিয়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো বিদ্যা। সময় যেন তার শরীরে চাবুকের আঘাতের উপর আঘাত করছে তাকে। সে এই অদৃশ্য আঘাত কেমন করে সহ্য করতে পারবে? এ যেন বার বার মৃত্যু যন্ত্রনাকে আলিঙ্গন করা।

শর্মিষ্ঠার দাদা এই বাসায় এসেছে। সাজিত ওনাকে ডেকে পাঠিয়েছে। যে অন্যায় সে বৃন্দার সাথে করেছিল তার পাই টু পাই বদলা শর্মিষ্ঠার দ্বারা পেয়েই যাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু আজ ও যা করেছে, তার কোন ক্ষমা নেই। ওকে ক্ষমা করলে পুরো পৃথিবীর প্রতিটা সন্তান তার পিতা নামক পবিত্র সত্ত্বাকে প্রশ্ন করবে, বাবার কাছে কি সন্তানের ন্যায়-বিচারের আশা করা যায়না?

শর্মিষ্ঠার বড় দাদা মালয় বাবু গম্ভীর মুখে বসে আছেন। সামনে রাখা চায়ের কাপ থেকে গরম ধোয়া ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। সেদিকে তার বিন্দুমাত্র নজর নেই। মালয় বাবু গলা খেকারি দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে বললেন,

—” সাজিত, তুমি কি সত্যিই আমার ছোটবোনকে রাখতে চাচ্ছোনা!”

বাসায় মোটামুটি সবাই উপস্থিত রয়েছে। সবার সামনেই সাজিত তার ডিসিশন জানিয়ে দিল। সে শর্মিষ্ঠাকে ডির্ভোস দিতে চায়। অনেক হয়েছে, আর না। তার অনেক ভুল সাজিত এতদিন ধরে সহ্য করে আসছে। এবার এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। কারন সে এবার সাজিতের সবচেয়ে দুুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে। নিজের মনোবাসনা পুরুন করার জন্য বাসায় এক পিশাচসিদ্ধ নারীকে এনেছিল। যার জন্য একটা নিরাপরাধ মেয়ে মারা গেছে। সাথে দাদা আর আয়ানও তার শিকার হয়েছিল। বিদ্যা……, সাজিত আর কথা বলতে পারেনা। চোখ দিয়ে অজান্তেই সবার সামনে জল ঝরে পড়লো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে আবার বলল,

—” শুধু আপনার বোনের জন্য আমাদের অতি আদরের মেয়ে বিদ্যাকে সন্দেহ করে, তাকে অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। এমনকি তাকে মারার জন্যও পরিকল্পনা করেছে। জানিনা মেয়েটা বেঁচে আছে না ঐ পিশাচের শিকারে পরিনত হয়েছে।”

শর্মিষ্ঠা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে গিয়ে সাধনা দেবীর পা চেপে ধরে বলল,

—” দিদি আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনার সমস্ত কথা সাজিত শোনে। আপনি একবার তাকে বুঝান না! মেয়ে দু’টি বড় হয়ে গেছে। এই সময় এগুলো পাগলামো করতে নিষেধ করতে বলেন। আমি বলছিতো আমার ভুল হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আমি এমন কাজ কোনদিনও করবোনা। আমি একদম ভালো হয়ে যাব। এবারের মত ক্ষমা করতে বলুন।”

সাধনা দেবী কেঁদেই চলছেন। ছোট্ট একটা ভুলের জন্য সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে। কোন কিছু সমাধান হবার নয়। তবুও শেষ বার সংসার বাঁচানোর জন্য সাধনা দেবী সাজিতের নাম ধরে ডাকতেই সাজিত হুংকার ছেড়ে বলল,

—” চুপপপ, আপনি তো আমার সঙ্গে একদম কথা বলবেননা। আপনার সাথে কথা বলার রুচিটুকু আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি কারো কথা শুনতে চাইনা। আমার দু’টো মেয়ে। তারা ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে থাকতে পারে। আর যদি না থাকে তাহলে তাদের চলে যাওয়ার জন্য দরজা খোলা আছে। আর বাঁকি রইলো ডির্ভোস! শর্মিষ্ঠার সাথে আমার কোর্টে দেখা হবে।”

কথাগুলো বলে সাজিত হনহন করে বাসা থেকে বেড়িয়ে চলে গেল।

শর্মিষ্ঠার কথা বলার আর কোন ক্ষমতা রইলোনা। ওখানেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেল। তার তিলে তিলে গড়া সংসার এভাবে ভেঙ্গে যাবে সেটা শর্মিষ্ঠা কোনদিনও ভাবতে পারেনাই। চোখের সামনে সব ধুলিসাৎ হওয়ার পথে।

বাসার সবাই ধরাধরি করে শর্মিষ্ঠাকে ওর রুমে নিয়ে গেল। এই বাসা থেকে যেন দুর্দশা শেষই হচ্ছেনা।

রাত ৯ টা,

অভিরা কক্সবাজার এসেছে। এখানে একটা বৃদ্ধ দম্পতির বাসায় তারা উঠেছে। মি.জাফর আর তার স্ত্রী মিসেস.পারুল এই বাসার মালিক। বৃদ্ধ দম্পতীর ছেলেমেয়েরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের পেশায় কর্মরত রয়েছে। সাধারনত টুরিষ্টদের জন্য তাদের বাসা ভাড়া দেওয়া হয়।

মিসেস.পারুল তার কাজের মেয়েটার হাতে বিদ্যাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। মিসেস.পারুল মুখে হাসি টেনে বলল,

—” তোমরা অন্য ধর্মের লোক, তাই আমাদের খাবার খাবে কিনা সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। তোমার হ্যাসব্যান্ড বলে গেল সমস্যা হবেনা তাই সাহস করে নিয়ে এলাম খাবারগুলো। তোমার শরীর ভালো আছে তো মা?”

বিদ্যা বেড থেকে উঠে দাড়িয়ে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলল,

—” এত সবের দরকার ছিলোনা আন্টি। আমরাই করে নিতাম। এখানে তো সব আছে। আর আমার শরীর আগের থেকে অনেক বেটার। আন্টি বসুন।”

না মা আমার হাতে অনেক কাজ রয়েছে। অন্যসময় আসবো বলে মিসেস. পারুল বিদ্যার কাছে এসে ওর গালে হাত ছুয়ে দিয়ে বলল,

—” তুমি ভারী সুন্দর দেখতে মা! তোমার নাম কি?”

বিদ্যা ক্ষীন হাসি হেঁসে বলল,

—” বিদ্যা, মিসেস. বিদ্যা ভৌমিক।”

তুমি বিবাহিত কিন্তু তোমার সিঁথিতে সিঁদুর নেই কেন মা! শুনেছি তোমাদের বিবাহিত নারীদের খালি সিঁথি রাখতে নেই। সিঁদুর দিয়ে নিও মা বলেই মিসেস. পারুল রুম থেকে চলে গেল।

ওনারা চলে যেতেই নিজের খুব অসস্তি লাগছিল বিদ্যার। তাই ওয়াসরুমে গিয়ে লম্বা একটা সাওয়ার নিল। তারপর ওয়াসরুম থেকে বের হয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজের চেহারা বার বার দেখতে লাগলো। নিজের কাছে সিঁদুরও নেই যে সিঁথিতে সিঁদুর দিবে। শাড়ী বা জামা কিছু নেই। পাবেনা জেনেও আলমারী খুলতেই চোখ উপরে উঠলো। পুরো আলমারী ভর্তি লেডিস ড্রেস।
“বিচ কোট, লেডিস টপ গাউন, বিচ ড্রেস, হাই ওয়েস্ট টি-শার্ট, সামার প্যান্ট, লং টি-শার্ট, টি-শার্ট, ভেনিম ড্রেস, হাই ওয়েস্ট জিন্স, স্কার্ট। কি নেই এখানে!
আর সব বিদ্যার পছন্দের কালারের। বিদ্যা মাথাটা আস্তে আস্তে একবার এদিক ঘুরায় আবার অন্যদিকে ঘুরায় চোখ পিটপিট করতে করতে সব কিছু এক-এক করে দেখতে লাগলো।

অবশেষে, লং টি-শার্ট আর স্কার্ট পড়ে নিল। লম্বা লম্বা কোকড়ানো চুল নেমে গেছে কোমর অবদি। চুল দিয়ে টপটপ করে জল ঝড়ছে। ড্রেসিং টেবিলে একটা বক্স রাখা আছে। সেটা খুলতে দেখলো, সিঁদুরদানী, শাখা-পলা, লাল চুড়ি। এমন শাখা ও পলা বিদ্যা কোনদিনও দেখেনি। শাখার উপর রুপার পাতের বিভিন্ন নকশা। যা দেখে ওর মন ভরে গেল। বিদ্যা ওগুলো পড়ে নিল। তারপর অভির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। অনেক রাত হয়ে গেল তবুও অভির দেখা নেই। বিদ্যার অস্থিরতা যেন বেড়েই গেল।

অভি অন্ধকার বিচের বালুরাশির উপর বসে আছে। তবে ওর হাতে ছোট্ট একটা শিশি রয়েছে। শিশিটার ভিতর যেন জ্বল জ্বল করে আলো জ্বলছে। অভি শিশির মুখ খুলতেই সেখান থেকে সেই উজ্জ্বল আলো শিশির ভিতর থেকে বের হয়ে এল। তারপর সেটা একটা অবয়বের রুপ ধরে অভির সামনে বসলো।

অভি ঠান্ডা মাথায় অবয়বকে জিঙ্গাসা করলো,

—” তুমি আমার স্ত্রীর পাশে একটা মহিলার রুপ ধরে বসে ছিলে কেন? আমার স্ত্রীর সাথে তোমার কি সম্পর্ক!”

অবয়বটি কোন কথার জবাব দেয়না। শুধু চুপচাপ বসেই থাকে। অবয়বের নিঃস্তব্ধতায় অভি আরো ক্ষেপে উঠে বলল,

—” তুমি জানো, আমি এখুনি তোমার শক্তি কেড়ে নিয়ে তোমায় ভষ্ম করে দিতে পারি? আমার শক্তির সামান্য নমুনা তোমাকে দেখিয়েছি তারপরও তোমার ভয় হচ্ছেনা?”

অভির কথা শুনে অবয়বটি মুখ খুলল,

—” আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। আমি দেবকী মায়ের সন্তান। আমাদের মত অনেক জ্বীন বাচ্চাদের তিনি আগলে রেখে লালন-পালনের মাধ্যমে নিরাপত্তা দান করেছেন। উনি শুধু বিদ্যা দিদির খবর চাইছিলেন। আমি ওনার খবর নিয়েই দেবকী মায়ের কাছে চলে যাব। আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। আমার মা চিন্তা করবে আমার জন্য।”

অভি কিছুক্ষন চুপ করে রইলো তারপর বলল,

—” তোমার দেবকী মা বিদ্যাকে কিভাবে চিনেন?”

এবার অবয়ব একদম মুখে কুলুপ আটলো। অভির কোন কথায় অবয়বের মুখ খুলতে পারলোনা। অভি নিজেও চেষ্টা করলো কিন্তু সে কিছুই জানতে পারলোনা। শেষে অভি অবয়বকে আবার শিশির ভিতর বন্দী করে বলল,

—” তুমি যদি তার প্রিয় সন্তান হয়ে থাকো তাহলে তোমার মা অবশ্যই তোমাকে উদ্ধার করতে এখানে আসবে। আমি তার অপেক্ষায় থাকবো। আমাকেও জানতে হবে বিদ্যার সাথে তার কি সম্পর্ক রয়েছে।”

কথাগুলো বলে অভি হাতের ইশারায় শিশিটি ভ্যানিস করেই বাসার দিকে রওনা দিল। বাসায় পৌছে কেবল নিজেরদের ফ্লাটের দরজা খুলবে এমন সময় মিসেস. পারুল পিছন থেকে অভিকে ডাকলো। অভি দরজা আর না খুলে মিসেস.পারুলের দিকে ফিরে তাকালো।

মিসেস. পারুল মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলল,

—” আজ এত দেরি হল যে অভি?”

অভি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,

—” একটু কাজ ছিল আন্টি। এর পরের বার এত লেট করে কখনো বাসায় আসবোনা। স্যরি আন্টি।”

ওকে, এখানে তোমাদের কিছু সমস্যা হলে আমাকে বলো। আর হ্যাঁ, আমার ছোট বোনের বাসায় কাল একটা দাওয়াত রয়েছে। আমার বোন তোমাদেরও যেতে বলেছে। বিদ্যা ঘুমিয়ে ছিল আর তুমি বাসায় ছিলানা তাই ইনভাইট কার্ডটা তোমাদের দিতে পারিনি বলে মিসেস.পারুল অভিকে কার্ড দিয়ে বলল,

—” কাল সন্ধায় বের হব। আমরা একসাথে যাব।বিদ্যাকে নিয়ে রেডী থেক কেমন!”

অভি মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়িয়ে ওনার কথার সম্মতি জানিয়ে বলল,

—” জ্বী আন্টি।”

আচ্ছা তুমি যাও। বিদ্যা হয়তো তোমার অপেক্ষায় আছে বলে মিসেস. পারুল সেখান থেকে নিজেদের ফ্লাটে চলে গেলেন। অভিও দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে ভালো করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর বড় একটা শ্বাস ফেলে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে রুমের ভিতর এসে দেখলো, বিদ্যা খাটের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। বিদ্যার ঐ নিষ্পাপ মুখ দেখে অভির সমস্ত ক্লান্তি দুর হয়ে গেল। অভি বিদ্যার খুব কাছে এসে বিদ্যার দিকে একটু ঝুকতেই বিদ্যা চট করে চোখ খুলে বলল,

—” এই, আমাকে কিন্তু তুমি একদমই ছুবেনা।”

অভি সাথে সাথে সোজা হয়ে দাড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—” ছুইলে কি করবি?”

অভির এমন কথায় বিদ্যা বসা থেকে চট করে হাটুর উপর দাড়িয়ে কপাল জড়িয়ে বলল,

—” কি করবো আবার! তোমাকে ঘাচাং করে একে বারে খুন করে ফেলবো।”

অভি তাচ্ছিল্য সহকারে হাসি দিয়ে বলল,

—” হুমহ্, তুমি আমাকে খুন করবা! খুন করে দেখাও।”

অভি বিদ্যার দিকে এগুতেই বিদ্যা বলল,

—” খবরদার আমার কাছে আসবেনা। আসলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।”

দেখি কি খারাপ হয় বলে অভি বিদ্যা খুব কাছে এসে ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলল,

—” তুমি আমার বড্ড জেদি বউ। কিন্তু তোমাকে সামাল দিতে আমারও অনেক টেকনিক আছে। টেকনিকগুলো কি খাটাবো?”

বিদ্যা অভির সাথে একপ্রকার ধস্তাধস্তি শুরু করে দিল। বিদ্যার ভেজা চুলের স্পর্শে অভি শান্ত হল কিছুটা। বিদ্যার হাত ছেড়ে দিয়ে বিদ্যাকে বুকের ভিতর টেনে এনে ওর চুলে মুখ গোজালো। তারপর বিদ্যার কানের পিঠ থেকে আলতো হাতে চুল সরিয়ে দিয়ে সেখানে কিস করলো। অভির সামান্য আদরে বিদ্যা স্তব্দ হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে অভির মুখের সাথে নিজের গাল বার বার স্পর্শ করতে লাগলো। অভির কিছু একটা মনে পড়তেই বিদ্যাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

—” দেবকী নামের কোন মহিলাকে চিনো তুমি?”

বিদ্যার রাগ এবার চরম পর্যায়ে উঠে গেল। অভিকে একটা ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে ব্যালকুনিতে চলে গেল।

অভি এবার জোড় গলায় বলল,

—” মিসেস. শ্যামল আমায় কল দিয়েছিল। তারা তোমাকে পাগলের মত খোজ করে বেরাচ্ছে। তাদের কাছে কি তুমি যেতে চাও!”

সাধনা দেবীর কথা শুনে বিদ্যা রুমে এসে অভির ফোনটা নিয়ে গায়ের শক্তি দিয়ে ফ্লোরে ছুড়ে মারলো।। তারপর সিম বের করে ভেঙ্গে ফেলে বলল,

—” ফার্দার যদি ওদের কথা আমাকে বলেছ তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে দিয়ে ইন্ডিয়াতে চিরদিনের জন্য ব্যাক করবো। তখন তুমি হাজার চাইলেও আমাকে আর পাবেনা।”

অভি ওর শার্টটা খুলে বলল,

—” সারা জিবন তো অপু অপু করে বড় হয়েছ। তুমি কি জানো, তোমার একটা ভয়ংকর অতীত আছে। যাকে তুমি কোনদিনও অস্বীকার করতে পারবেনা।”

আমি আর কিছু শুনতে চাইনা বলে বিদ্যা ফিকরে কেঁদে উঠলো। আমার নতুন করে কিছু শোনার আর ধর্য্য নেই। আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি অভি। ওদের সাথে কোন সম্পর্কই আমি রাখতে চাইনা। আমার আপন বলে পৃথিবীতে কেউ নেই।

অভির বিদ্যাকে টেনে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে সিঁদুরদানী থেকে সিঁদুর নিয়ে বিদ্যার সিঁথিতে বেশ অনেকটা সিঁদুর দিল। তারপর পিছনদিক থেকে বিদ্যার ঘাড়ে মাথা রেখে বলল,

—” কেউ থাকুক আর না থাকুক, আমার জন্য অবশ্যই তোমাকে থাকতে হবে। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবোনা। তাই তোমাকে সারাজিবন অভির সাথেই থাকতে হবে।”

বিদ্যা পিছন ফিরেই অভিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। যতটা আঘাত বিদ্যা পেয়েছে, সেই কষ্টগুলো চোখের জলে ভেঁসে দিচ্ছে বিদ্যা অভির বুকে।

অভি বিদ্যাকে বলল,

—” বিদ্যা তোমার সাথে যা হবার ছিল তাই হয়েছে। মিথ্যা বন্ধনে বেশিদিন কোথাও কেউ থাকতে পারেনা। সে তার গন্তব্য স্থানে একদিন পৌছাবেই। সেটা আজ হোক বা কাল হোক।”

অভির কথা শুনে বিদ্যা বলল,

—” অভি, তুমি প্রচন্ড বাজে ধরনের একটা ছেলে। যাকে বলে এক নাম্বারের লুজার।”

বিদ্যার কথা শুনে অভি তব্দা খেয়ে গেল। এই অবস্থায় এই ধরনের কথা! অভি বিদ্যাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

—” আমি বাজে! আমি লুজার?”

বিদ্যা আবার অভিকে জড়িয়ে ধরে বলল,

—” তুমি মাঝে মাঝে আমাকে ছেড়ে যাও কেন! তুমি কোথায় যাও আমাকে কিছুই বলে যাওনা। তাহলে তোমায় লুজার বলবোনাতে কি বলব?”

—“নাহ্ তুমিতো! তুমিতো এধরনের কথা বলতেই পারো। একমাত্র তোমার মুখেই এধরনের কথা মানায়। তুমিতো তুমিই। জানিনা আমাদের সন্তান কেমন হবে। গড মাফ করো। আমাদের সন্তান যেন এই মহিলা বাদরের মত না হয়।”

অভির কথায় বিদ্যা ফোস করে উঠলো। রাগে ফুসতে ফুসতে বলল,

–“আমি বাঁদর!”

—“তোমার দেখছি রাগের ঘুর্নিঝড় আসতে দেরি করেনা। শুধু একটা কারন চাই। ব্যস হয়ে গেল। রাগের পাহাড় নিয়ে ধেয়ে আসবে আক্রমন করতে।”

বিদ্যা অভিকে ছেড়ে দিয়ে বেডে গিয়ে বসলো। আর মুখ দিয়ে কোন কথায় বের করলোনা। অভিও ওয়াসরুমে যেতে যেতে বলল,

—” বিদ্যা, খাবারগুলো রেডী করতো, খুব খুদা লেগেছে।”

অভির কথায় বিদ্যা মুখ ফুটে বলেই ফেলল,

—” পারবোনা আমি। এতক্ষন ধরে যার কাছে ছিলে তার কাছে গিয়ে খাবার চাওনা। খুবতো বাহিরে ছিলে এতক্ষন ধরে। যাওনা যাও, তাদের কাছে চলে যাও।”

অভি এবার পিছন ফিরে বিদ্যার দিকে চোখ বড় বড় করে চেয়ে হাতের আঙ্গুল তুলে ইশারা করলো খাবার রেডী করতে।

বিদ্যাও অভীর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো। কিন্তু উঠলোনা। অভি ওয়াসরুমে চলে গেল।

এবার বিদ্যা উঠে খাবার গুলো সুন্দর করে পরিবেশন করলো। কিন্তু এত সামান্য খাবারে ওর মন ভরলোনা। ফ্রীজে গিয়ে দেখলো, ডিম ছাড়া কিছু সবজি রয়েছে। তাছাড়া অভি হয়ত দুপুরে খাবারের অর্ডার করেছিল। সেগুলোও রয়েছে। তারমানে অভি কিছুই খায়নি। বিদ্যা ঝটপট খাবারগুলো গরম করে আনতেই দেখলো, অভি খাবারে কি যেন মেশাচ্ছে। বিদ্যা অভির কাছে যেতেই অভি সেটা লুকিয়ে ফেলল।

বিদ্যা সাথে সাথে বলল,

—” তুমি খাবারে কি মেশালে?”

অভি গম্ভীর গলায় বলল,

—” বিশ মিসিয়েছি। তুমিনা সুইসাইড করতে চাও তার জন্য।”

বিদ্যা খাবার গুলো রেখে সোজা অভির প্যান্টের পকেটে হাত চালিয়ে শিশিটি তুলে নিয়ে বলল,

—” এটা পয়জন? আগে বলবা তো?”

অভি ভ্রু কুঁচকে বলল,

—” আগে বললে কি হত!”

বিদ্যা অভিকে অবাক করে দিয়ে শিশির মুখ খুলে ভিতরের সবুজ নির্যাস তরল পদার্থগুলো এক নিমিষে মুখের ভিতর চালিয়ে দিল। তারপর সস্তির একটা শ্বাস ফেলে বলল,

—” কি আর হত! এমন হত। এখন আমি মারা যাচ্ছি। বিদায় অভি বিদায়।”

বিদ্যার এহেন কান্ডে অভির মাথায় হাত পড়লো। বিদ্যা তুমি এটা কি করলে? অহ্ গড, এই পাগল কে নিয়ে আমি এখন কি করবো? ওকে আমার উপযুক্ত করার জন্য ঐ নির্যাসটা একটু একটু করে খাওয়ানোর ট্রাই করছিলাম আর ও সেটা কিনা একবারে খেয়ে নিল! একবারও ভাবলোনা! এটা যদি সত্যিই পয়জন হত তাহলে কি হত?

বিদ্যা ধুম মেরে বসে আছে খাবার রেখে। সমস্ত খাওয়া আজ মাটি হয়ে গেল। বিদ্যা একটু পর বলল,

–” অভি, আমি মারা যাচ্ছিনা কেন? আমিতো বিষ খেয়েছি তাহলে মরছিনা কেন?”

অভির মুখে কোন জবাব নেই। এই একটু পর বোমা বাষ্ট হল বলে। অভির মনের কথা শেষ না হতেই বিদ্যা ঝিমুতে ঝিমুতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,

—” এই অভি, আমি তোমাকে ডাবল দেখতে পাচ্ছি কেন? তোমার কি জময ভাই আছে নাকি? তুমি তো আগে সেই কথা বলোনি? ওয়াও অভি ওয়াও। তোমরা দু’জন দেখতে তো একই রকম।”

অভি বিদ্যাকে নিজের কাছে টেনে এনে ভাত মাখিয়ে বিদ্যার মুখে তুলে দিতেই বিদ্যা কামুক চোখে অভির দিকে চাইলো। তারপর কোন বাধা ছাড়াই অভির হাতে কিসের উপর কিস করতে লাগলো। অভি দ্রুত প্লেটে ভাত রেখে কোনমতে হাত ধুয়ে ব্যালকুনিতে গিয়ে থাই ওপাশ থেকে বন্ধ করে দিল মায়া বিদ্যায়।

বিদ্যা দৌড়ে অভির কাছে যেতে চাইলো কিন্তু কিছুতেই থাই খুলতে পারলোনা। বিদ্যা ব্যর্থ হয়ে থাইয়ের কাঁচে ওর ঠোট দুটি লাগিয়ে বলল,

—” অভি, প্লিজ একটা কিসি দাও।”

—“উমহু, নো কিসি। খাবার গুলো খেয়ে যাও ঘুমিয়ে পড়ো।”

—“নাহ্ আমি খাবোনা। প্লিজ অভি, এপার আসোনা। আচ্ছা আসতে হবেনা। একটা কিসি দাও ওপার থেকেই।”

অভি কিছু একটা ভেবে বলল,

—” ওকে, জাষ্ট একটাই কিন্তু কিস পাবা। কি রাজি তো!”

বিদ্যা ঝিমুতে ঝিমুতে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল,

—” জাষ্ট একটা আলিঙ্গন।”

বিদ্যা ওর ঠোট কাচের সাথে চেঁপে ধরে আছে। অভি ওপার থেকেই কেবল বিদ্যার ঠোটের জায়গায় ঠোট ছোয়াবে এমন সময় আগুনের এক ঝলকানিতে অভি ছিটকে গিয়ে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল।

সাথে সাথে রুমে ঋষি প্রবেশ করলো। তারপর অভির রুপ ধরে বলল,

—” তুই আমার জন্য বাসর সাজাবি সেটা আমি জিবনেও ভাবতে পারিনি। তোর প্ররিশ্রম আর আমার শান্তির ফল। এই রুপে বিদ্যা অবশ্যই আমার কাছে ছুটে আসবে। যেমনটা তোর কাছে গিয়েছে। তুইও জানিস আমিও ভালো করে জানি, আজ এই অবস্থায় বিদ্যার সাথে কোন অশরীর মিলন ঘটলে বিদ্যার মৃত্যু নিশ্চিত। আর বিদ্যার শরীর আমার খুব প্রয়োজন। আজ তুই আর আমার বাঁধন থেকে কোন ভাবেই নিজেকে মুক্তি করতে পারবিনা। বউ তোর কিন্তু বাসর আমার।”

[ চলবে……]

সরাসরি ওয়েবসাইট এ পড়ুন: https://nafisarkolom.com/2020/10/sidur-suddhi-20/

আমার ব্যক্তিগত ফেইসবুক একাউন্ট: https://www.facebook.com/nafisa.muntaha

চাইলে আমার গ্রুপে জয়েন করতে পারেন: https://www.facebook.com/groups/nafisarkolom

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here