সিঁদুর শুদ্ধি নাফিসা মুনতাহা পরী পর্বঃ ৪১

0
344

#সিঁদুর শুদ্ধি
নাফিসা মুনতাহা পরী
পর্বঃ ৪১
.

অঞ্জনা দেবী দৌড়ে এসে বিদ্যাকে ঝাঁকাতে লাগলো। বিদ্যা ওঠ, কি হয়েছে তোর! তুই এমন করছিস কেন বলেই কাঁদতে লাগলো অঞ্জনা দেবী।

অঞ্জনা দেবীর কান্নায় যেন অভির হুস ফিরে এল। বিদ্যা বলেই অভি দ্রুত বিদ্যার দিকে চাইলো। দীঘল কালো কোকড়ানো চুল ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সিঁদুরটা লেপ্টে গেছে। মুখ দিয়ে এখরো রক্ত পড়ছে। অভি আর দেরী করেনা। বিদ্যাকে দ্রুত তুলেই খাটে সুইয়ে দিল। মুখের রক্ত গুলো একটা ভিজা কাপড় দিয়ে মুছে দিল। তারপর ধীরে সুস্থে নিজের শক্তি সঞ্চয় করে বিদ্যার শরীরে কিছু একটা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কোন যাদু-বিদ্যাই বিদ্যার শরীরে প্রবেশ করতে পারেনা। অভি বিশ্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে যায়। এটা কি করে সম্ভব, ওর শরীরে কোন মায়ায় প্রবেশ করছেনা? মনে হচ্ছে ওর পুরো শরীরে রক্ষা কবচে আবদ্ধ। বার বার ব্যর্থ হতেই অভি রেগে গিয়ে পিছন ফিরেই দেবকীর উপর ওর আক্রোশ ঝাড়ে। দেবকী অভির মায়া প্রয়োগে একদম নড়তে পারলোনা। এমনকি নিজের কোন মায়াবলেও নিজেকে মুক্ত করতে পারলোনা।

অঞ্জনা দেবী এমন অবস্থা দেখে অভিকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু অভির গায়ে হাত দিতেই ওর পুরো শরীরে কারেন্টের ঝটকা লাগে। অঞ্জনা দেবী আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ে। অপু, ও তোর জন্মদাত্রী মা হয়। মায়ের সাথে কখনো এমন ব্যবহার করে! কথাগুলো বলেই সেন্সলেস হয়ে যায় অঞ্জনা দেবী।

অঞ্জনা দেবীর বলা শেষ কথা অভির মনে বড়সড় ধাক্কা দেয়। সাথে সাথে ওর মায়া বন্ধ হয়ে যায়। অসহায়ের মত হাটু ভাজ করে নিচে বসে পড়ে। একদিকে বিদ্যা জিবন-মরনের সাথে লড়ছে আর অন্যদিকে অভির সামনে সমস্ত ঝট খোলার সম্ভবনা দেখা গেছে। এমন অবস্থায় অভি কি করতে পারে?

দেবকী অভির মায়া থেকে ছাড়া পেতেই অভির কাছে এসে ওকে ঠাস্ করে একটা চড় মেরে বলল,

—” গায়ের জোড় বেশি হয়ে গেছে! কার সাথে কি ব্যবহার করতে হয় সব ভুলে গেছ?”

অভির মা জুলিয়া ভৌমিক কোনদিনও অভির গায়ে হাত তোলেনি কিন্তু দেবকীর কড়া শাসনে অভির মুখ দিয়ে কোন কথায় বের হলোনা। মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো।

দেবকী প্রথমে ওর দিদিকে ঠিক করে বিদ্যার শিয়রে গিয়ে বসলো। তারপর বিদ্যার শরীরে কয়েকবার হাত বুলিয়েই হতবাক হয়ে গেল। কোন শক্তিশালী জ্বীন দ্বারা ওর শরীর বন্ধ করা আছে। এটা কি করে সম্ভব। ওর সাথে কি এমন ঘটেছিল যার জন্য একজন সামান্য নারীকে জ্বীনটা এতবড় সুরুক্ষা দান করেছে।
দেবকী চোখ বন্ধ করে অতীত দেখার চেষ্টা করে কিন্তু ধোয়াশা ছাড়া কিছুই দেখতে পারছেনা। দেবকী চমকের উপর চমকিত হয়ে যাচ্ছে এমন সব নতুর নতুন তথ্য জানতে পেয়ে। শেষে অঞ্জনা দেবীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

—” দিদি, ছোট বেলায় বিদ্যার সাথে কিছু ঘটেছিল? যা জান আমাকে লুকিও না। এখানে বিদ্যার জিবন-মরনের সমস্যা। আমাকে সব খুলে বল।”

অঞ্জনা দেবী মাথা নিচু করে বলল,

—” অপুর সাথে বিদ্যাকে বিয়ে দেওয়া হয় অপুর দোষ কাটানোর জন্য। তখন বিদ্যার ৬ বছর বয়স ছিল। সেই দোষ কাটানোর জন্য তোর জামাইবাবু একদল অঘোরীদের নিয়ে আসে বিদ্যাকে বলি দেওয়ার জন্য। কিন্তু যজ্ঞে হিতে-বিপরীত হয়ে যায়। আমার অপু মারা যায় আর বিদ্যা ওদের মাঝেই সুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকে। পড়ে তোর জামাইবাবু ওকে বাসায় নিয়ে আসে।”

কথাগুলো বলে অঞ্জনা দেবী কাঁদতে লাগলো। অভি সমস্ত কথা শুনে বিদ্যার দিকে একবার চাইলো। ওহ্ গড, এ তোমার কেমন খেলা? একই জন্মে দু’বার জন্ম নেওয়া আর ঐ একজনকেই স্ত্রী রুপে পাওয়া এটা কোন সাধারন ব্যাপার না। এই কাহিনী গুলো কোন তান্ত্রিক বা অশরীর কাছে পৌছায় তাহলে ওরা হয় আমাকে ধরবে না হয় বিদ্যাকে ধরে বলি দেবে। এতে যদি তারা সাফল্য হয়! তাহলে তারা বহুশক্তির মালিক হয়ে যাবে। আমাদের মত জুটি কয়েক হাজার বছরে একবারই আসে। অভি কথাগুলো ভাবতেই দেবকী অভির দিকে চেয়ে বলল,

—” অভি, তুমি বিদ্যার ব্যাপারে এ সম্পর্কে কিছু জানো? জানলে বলো, এতে আমি কিছু হয়ত করতে পারবো। তাছাড়া সকল পথ বন্ধ।”

অভি ফ্লোর থেকে উঠে বিদ্যার পাশে বসেই ওর শরীরে হাত দিতেই বিদ্যার শরীরের চারপাশে অতিসুক্ষ্ণ আলোকরশ্মির জ্বলে উঠলো। অভি আর ছুতে পারলোনা বিদ্যাকে। আবার চেষ্টা করলো কিন্তু আঘাত ছাড়া কিছুই পেলোনা অভি। অভির ইচ্ছা করছে পুরো দুনিয়া ভেঙ্গেচুরে শেষ করে দিতে। বুকের ভিতর কষ্টের স্রোত যেন হুহু করে বয়ে চলছে। নিজেদের ভূলের মাষুল বিদ্যাকে দিতে হল। এখন সে কি করবে?

অভির ভাবনার মাঝখানে দেবকী এসে ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল,

—” এত চিন্তা করছো কেন? আমি তাহলে এখানে কেন আছি। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। শুধু মাত্র নিদিষ্ট সময় চলে যাওয়ার অপেক্ষা।”

অভির কি হল ও নিজেই বুঝতে পারলোনা। দেবকী দেবীর কোমড় জড়িয়ে ধরে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগলো। যেন ছোট্ট বালক তার প্রিয় জিনিসটি হারিয়ে ফেলেছে আর তার মায়ের কাছে তা ফেরত পেতে আবদার করছে।
দেবকী নিজের আবেগকে শক্ত মনে দমন করতে জানে। কিন্তু নিজ পুত্রের কান্নার সেই শক্ত মনকে চুরমার করে দিল। চোখ দিয়ে কয়েকফোটা অশ্রু অভির মাথায় পড়লো। চট করে চোখের জল মুছে বলল,

—” আমি আছিতো, বিদ্যার কিছু হতে দিবোনা। আমার এত তন্ত্র-মন্ত্র যদি তোমার প্রিয় মানুষটাকে বাঁচানোর কাজে না লাগে তাহলে এতদিন ধরে আমি কি শিখেছি?”

আজ দেবকীর ওর স্বামীর কথা খুব করে মনে পড়ছে। অপুর বাবাও এমন কষ্ট পেলে নিজ স্ত্রীর কোমড় জড়িয়ে চুপ করে থাকতো। অঞ্জনা দেবী দুর থেকে এদের মা-পুত্রের ভালোবাসা দেখে চোখের জল ফেলছে। আজ যদি অপু বেঁচে থাকতো তাহলে ও এই অঞ্জনা দেবীর কোলই খুঁজতো। এমন সময় অঞ্জনা দেবীর ফোন বেজে উঠলো। ফোনের দিকে চেয়ে দেখলো, রনক কল দিয়েছে। বাসার কেউ কিছু জানেনা অপুর ব্যাপারে। শুধু এখানে এসে রনককে একবার কল দিয়েছে। অঞ্জনা দেবী ফোন নিয়ে অন্য রুমে গিয়ে চোখের জল মুছে কল রিসিভ করে বললেন,

—” হ্যাঁ রনক বল! তোরা সবাই ভালো আছিস তো?”

—” তুমি কেমন আছো তাই জানতে কল দিলাম। বৌদি ভালো আছে তো?”

অঞ্জনা দেবী দরজার ফাঁক দিয়ে বিদ্যার নিথর দেহ দেখে গলা ধরে আসলো। মেয়েটা নিঃস্তব্ধতার কাছে নিজেকে যেন সঁপিয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে এই মাত্র সে ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটার কপালে বুঝি সুখ নেই। কথাগুলো ভাবতেই রনক মাঝখানে ফোড়ন কেটে বলল,

—” মা, বৌদিকে একটু ফোনটা দিবা? আমি ওনার সাথে একটু কথা বলতাম।”

—” তোর বউ আছে, সন্তান আছে তবুও বিদ্যার সাথে তোর কি দরকার? শুধু তোর এসব উল্টা-পাল্টা কাজের জন্যই মিতা বিদ্যাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করার সুযোগ পায়। কেন এমন করিস হ্যাঁ! ওকে কি শান্তিতে থাকতে দিবিনা?”

মায়ের কথা শুনে রনক চুপ হয়ে গেল। সে কোনদিনও বিদ্যার দিকে খারাপ চোখে তাকায় নি। এমন কি, কোন সংকেতও দেয়নি যে রনক তাকে কত ভালোবাসে। সে মনের কোঠরে পবিত্র ভালোবাসাটা লালন করে রেখেছে। সারাজিবন বিদ্যাকে সম্মান দিয়ে এসেছে। কেউ কোনদিনও বলতে পারবেনা, সে বিদ্যাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু আজ তার মাও কথা শুনাতে ছাড়লোনা। চোখের কোনে জল চিকচিক করতেই মিশু এসে বাবার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে বলল,

—” দিদা, তুমি কোথায় গেছ? আমাকে বলে যাওনি কেন?”

—” তুই ঘুমাচ্ছিলি মিশু! তাই তোকে আর বলে আসতে পারিনি। আমি তোর বিদ্যা জেঠির বাসায় এসেছি।”

—” জেঠি, আমাকে কেন বলোনি! আমিও জেঠির কাছে একেবারে চলে যেতাম। তুমি খুব পঁচা। জেঠিকে দাও তুমি, আমি জেঠির সাথে বথা বলব।”

অঞ্জনা দেবী এবার কাঁদো কণ্ঠে বলল,

—” তোর জেঠি খুব অসুস্থরে। প্রার্থনা কর জেঠি যেন জলদি ঠিক হয়ে যায়।”

জেঠি অসুস্থ বলতেই রনক ছেলের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ওর মাকে বলল,

—” বৌদি অসুস্থ! কই তুমিতো আমাকে কিছুই বলোনি। তাকে দাও, আমি অল্প কথা বলেই রেখে দিব।”

বলি বৌদি বৌদি করে কি মরবে নাকি! তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, ঘরে বৌ রেখে বৌদি বৌদি করে মরো। আর আমার শাওড়িকেও বলি, এতই যখন ছেলের সাথে বড়ছেলের বৌয়ের ফষ্টিনষ্টি দেখার সখ ছিল তাহলে আমাকে কেন এ ঘরের বৌ করে আনলো হ্যাঁ! ওকেই আবার ঘরের বৌ করতো?

মিতার কথা বলার মাঝখানে রমেশ এসে বলল,

—” এতো চেঁচামেচি করছো কেন? কি হয়েছে?”

বড় ভাসুরের কথা শুনে মিতা মুখে কুলুপ এঁটে চুপ করে রইলো। কিন্তু অঞ্জনা দেবী ফস করে বলে ফেললেন, রনক তোর বউকে বলে দে, বিদ্যা বিবাহিত। ওর বিয়ে হয়ে গেছে। ওর এখন স্বামী হয়েছে তাই সে যেন অহেতুক কথাবার্তা না বলে। অনেক বলেছে সে। যা নয় তা বলে গেছে এতদিন ধরে। বিদ্যা শুধু মুখ বুজে সহ্য করেই গেছে। আর না। ওকে বলে দে, বিদ্যাকে নিয়ে যেন ও একটা কথাও না বলে।

মায়ের মুখে এমন কথা শুনে রনক মুচকি হেঁসে উঠলো। কিন্তু চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা জল পরে গেল। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে এক প্রকার চিৎকার দিয়েই বলল,

—” দাদা, বিদ্যা বৌদির নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। যাহোক এতদিন পর সে সুখের লাগাল পেল। আমি কোনদিনও দেখিনি তারমত ধৈর্য্যশীল নারীকে। যে এত কথার মাঝেও নিজেকে শক্ত অবস্থানে ধরে রেখেছিল।”

রনকের মুখে এমন কথা শুনে মিতার মুখ বন্ধ হয়ে গেল আর রমেশ এসে ফোনটা নিয়ে খুঁশিতে বলল,

—” মা, সত্যি বলছেন! আমাদের বিদ্যা খুঁকির বিয়ে হয়ে গেছে? ওর বর ভালতো! আমাদের অপুর মতই কি ওকে আগলে রাখবেতো? মা আমি আজ খুব খুঁশি। যাহোক মেয়েটা এবার সংসারী হয়ে উঠবে। মা ওকে কিন্তু অনেক উপহার দিয়ে আসবে। যা টাকা লাগবে আমাকে বলবেন। আমি পাঠিয়ে দিব।”

ছেলেদের খুঁশিতে অঞ্জনা দেবী খুঁশি হতে পারলেননা। তারমনে ভয় এসে বাসা বেঁধে ফেলেছে ইতিমধ্য। বিদ্যা বাঁচবেতো! অভিও কি দেবকীর মত তন্ত্র শক্তি জানে? তানাহলে ও দেবকীর মত মায়া প্রয়োগ করতে জানলো কিভাবে?

রমেশের বৌ লক্ষী এসেও শাশুড়ীর সাথে অনেক কথা বলল। তারা বিদ্যাকে দেখতে চাইলো, কথা বলতে চাইলো কিন্তু অঞ্জনা দেবী তাদের সাথে বিদ্যার যোগাযোগ করে দিতে পারলোনা। কিন্তু আজ রনকদের বাসায় একপ্রকার উৎসব বয়ে গেল। সবাই খুব খুশি কিন্তু রনকের বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যাথা করছে। সে তার ছোট্ট বেলার খেলার সাথী বিদ্যাকে বড্ড মিস করছে। হাজারো সমস্যা আর সামাজিক বন্ধন রক্ষা করার জন্য কিছু কিছু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এভাবেই চাপা পড়ে যায়। কেউ সেই ব্যাক্তিটির ক্ষত স্থান দেখেনা। বোঝেনা কেউ, তার ক্ষত থেকে যন্ত্রনা প্রবাহিত হওয়ার কষ্ট। তবুও এরা সবার সামনে হাসি-মুখে জিবন যাপন করে চলে। সমাজকে তো দেখাতে হবে, সে এসব কাজে কত খুঁশি। তেমনি রনককে তার ভালোবাসা বুকের মধ্য সারাজিবনের জন্য দাফন করে দিতে হল। নিয়তি তার থেকে প্রান ভরে কান্নার সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছে। সুখে থাকুক তার প্রিয় মানুষটা।

শ্যামল বাবু কোনদিনও তার স্ত্রীর সাথে কটু কথা বলেননি। কিন্তু বিদ্যার শাশুড়ীর সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য সে খুব রেগে আছে সাধনা দেবীর উপর। প্রতিটা জিনিসের একটা মাত্রা আছে। কোনটাই অতিরিক্ত মাত্রায় ভালো নয়। বাসায় শর্মিষ্ঠা আর সাজিতের ব্যাপারটা অনেকটা মিটে গেছে। থানায় বিদ্যার ব্যাপারে ডায়রী করার কথা উঠছিল কিন্তু শ্যামল বাবু কঠোর আদেশে তা নিষেধ করেছে। এখানে তার মেয়ের সম্মান জড়িত। যে যাই বলুকনা কেন, শ্যামল বাবুর বিশ্বাস, অভি অবশ্যই বিদ্যার কোন খোঁজ জানে। যদি অভি দেশে থাকে তাহলে অবশ্যই সে শ্যামল বাবুর সাথে যোগাযোগ করবে। শ্যামল বাবুও সেই আশায় বুক বেঁধে আছে। শুধু একবার অভির রেসপন্স চায় তিনি। এক মুহুত্বও সে দেরি করবেনা। একদম ছুটে চলে যাবে কার কলিজার কাছে। কিন্তু সময় যেন শেষ হচ্ছেনা।

সন্ধ্যায় ব্যালকুনিতে বসে চা পান করছিল শ্যামল বাবু। এমন সময় বিকট শব্দে ওনার ফোনটা বেজে উঠলো। শ্যামল বাবু আর দেরী না করে দ্রুত রকিং চেয়ার থেকে উঠেই ফোনটা রিসিভ করলো। অনেক আশা নিয়ে বলল,

—” অভি?”

—“দাদা, আমি দেবকী। যদি আপনার সময় হয় তাহলে এই ঠিকানায় জলদি আসবেন। বাসার কাউকে কিছু বলেননা প্লিজ।”

—” দেবকী শুধু একবার বলো, আমার মা টাকে কি পেয়েছ? শুধু একবার হ্যাঁ বলো। আমি তোমার মুখে হ্যাঁ শব্দটাই শুধু শুনতে চাই।”

—” জ্বী দাদা, আপনি আসুন।”

দেবকী কল কেটে দিতেই শ্যামল বাবুর চোখ চিকচিক করে উঠলো। আজকের মত এত খুঁশি সে খুব কমই হয়েছে। তাই সে আর দেরি না করে সেই রাতেই রওনা দিল।

লালপ্রভার সামনে টুইংকেল কে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে কয়েকদিন ধরে ঋষির কোন খোঁজ পাচ্ছেনা। ছেলেটা কোথায় গেল? আমাকে না বলেতো কোনদিনও কোথাও যায়না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই লালপ্রভার দু’চোখ লাল টুকটুকে হয়ে গেল। লালপ্রভা হুংকার ছেড়ে বলল,

—” অভির বাবা-মা কোথায় থাকে এখুনি বলে ফেল। না হলে এখানেই তোকে পঁচে মরতে হবে। বল জলদি।”

লালপ্রভার হুংকারে টুইংকেলের কোন পরিবর্তন এলোনা বরং সে আগের মতই চুপ করে রইলো। নাহ্ এবাবে হবেনা কথাটি বলেই লালপ্রভা ওর সামনে একটা আয়না দাড় করিয়েই বলল,

—” ওহে আমার বিদেশী মেহমান, দেখতো তাহাকে চিনতে পারো কিনা?”

টুইংকেল চোখ মেলে সামনে দিকে চেয়ে দেখলো, তারা ইনাকে একটা জলন্ত অগ্নিকুন্ডের উপর দ্বার করে রেখেছে। আর তার চারপাশে অসংখ্য সাপ তাকে দংশন করেই চলেছে। সাপের প্রতিটা দংশনে ইনার আর্তচিৎকার টুইংকেলের কানে এসে ধাক্কা খেল। টুইংকেল আর থাকতে পারলোনা। সে চিৎকার দিয়ে বলল,

—” তোমরা আমার কাছ থেকে কি জানতে চাও! যা বলবা তাই আমি করবো।”

এইতো গুড গার্ল বলেই হাত দিতে ইশারা করতেই ইনার উপর অত্যাচার বন্ধ হয়ে গেল। এবার লালপ্রভা টুইংকেলের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বলল,

—” অভির বাবা-মাকে এখানে আহ্ববান করো। যদি তারা আসে তবেই তোমার মুক্তি। আমি ঝামেলা করতে চাইনা। তারা তাদের ছেলেকে এখান থেকে নিয়ে যাক। আর আমাদের কোন কাজে যেন বাঁধা দিতে না আসে। এই তো ব্যাস, এটুকুই….. আর কিছুইনা।”

আমার হাত ছেড়ে দাও। আমি তাদের আহ্ববান করছি বলতেই টুইংকেলের হাত ছেড়ে দেওয়া হল। টুইংকেল সেখানে বসেই হাত নেড়ে নেড়ে অভির মাকে সংকেত পাঠালো। কিন্তু সংকেত গ্রহন হচ্ছেনা ফলে বেশ কয়েকবার আবারো সংকেত পাঠানো হলো। এবার টুইংকেল বলল,

—” দয়া করে আমাকে তাদের সামনে দ্বার করাবেন না। অভির মা আমাকে তেমন একটা পছন্দ করেন না। তিনি এর আগেও আমাকে নিষেধ করেছেন তার ছেলের কাছ থেকে দুরে থাকতে। এবার আমাকে তারা আর ক্ষমা করবেননা।”

সেটা দেখা যাবে বলে লালপ্রভা আসনে বসে ঋষিকে বার বার আহ্ববান করে। কিন্তু ঋষির কোন খোঁজই তিনি পান না। অবশেষে কিছু একটা মনে হতেই তিনি দ্রুত তার রুমে গেলেন। আলমারি খুলে বক্স বের করে খুলে দেখলেন অশরী বিদ্যার বোতল নেই। কোথায় তিনি রেখেছিলেন বলে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলেন সব কিছু। যন্ত্র-মন্ত্র সব দিয়ে খুজলেন কিন্তু তিনি পেলেননা। ঋষি ওটা নিয়ে গেছে? না এ হতেই পারেনা বলে ধীরাজ কে ডাকতে লাগলেন। ধীরাজ কোথায় তুমি এখুনি আমার সামনে এসো।

লালপ্রভার ডাকে ধীরাজ এসে উপস্থিত হয়ে বলল,

—” একটা খারাপ সংবাদ আছে। ঋষি……”

—“ঋষি, ঋষির কি হয়েছে? আর আমি বোতলটাও খুঁজে পাচ্ছিনা।”

—“আহ্ প্রভা, তুমি বোতল বোতল করে পাগল হচ্ছো কেন! ওটাই তোমার কাছে বড় হলো? আমাদের ছেলে ঋষি আর নেই। ওকে কেউ যেন মেরে ফেলেছে। আর তোমার ছেলেই ঐ বোতল চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন বুঝছো! কে তোমার ছেলেকে মেরেছে?”

ধীরাজের কথা লালপ্রভার বুকে এসে বিঁধল। ঋষি নেই! ওকে ওরা মেরে ফেলেছে? লালপ্রভা ফ্লোরে বসে পড়ে ঋষি বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। আজ যার জন্য আমার ছেলে মরেছে তাকে আমি নিজেই চিতায় তুলবো। কত জ্বলার শখ হয়েছে ওদের সেটাই আমি দেখবো। মাকে খবর দাও। এক্ষুনি তাকে ডাকো বলে লালপ্রভা নিচে চলে আসলো। সে এখন সম্পূর্ন বাতাসে ভাসছে। তার আর হাটার প্রয়োজন নেই।

প্রায় সকাল হয়ে গেছে। দেবকী তার দিদিকে ইন্ডিয়ায় ফিরে যেতে বলে। কারন এখানে অনেক কিছু ঘটতে পারে। এতে তার দিদির জিবন বিপাকে পড়ে যেতে পারে। সকালের খাবারটা অবশ্যই অঞ্জনা দেবীই নিজ হাতে বানালেন। দেবকীকে ডেকে টেবিলে নাস্তা সাজাতেই দেবকী এসে বলল,

—” অভি কোথায়?”

—” সকালে বাহিরে গেল, আর ফিরেনি।”

—” দিদি, ও বাহিরে গেছে আমায় বলবে তো! ওর মাথা যে গরম। কি করতে কি করে ফেলে সেটা বলা যায়না। তুমি খাবার বাড়ো আমি ওকে ডেকে আনছি।”

কথাগুলো বলে দেবকী দেবী অভিকে খুঁজতে বের হয়ে গেল। সামনে বালুচর আর বিশাল জলরাশি। আর অপজিট দিবে ঝাউ গাছের ছোটবড় অনেক গাছ। অন্য দিকে শহরে যাওয়ার রাস্তা। দেবকী চোখ বন্ধ করে অভির অবস্থান জেনে সে দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার জন্য এতবড় চমক অপেক্ষা করবে সেটা সে জানেনা। অভির কাছে এক অর্ধনারী দাড়িয়ে আছে। যার কোমড় পযর্ন্ত মানুষের গঠন কিন্তু নিচ অবদি নীল ধুয়া। মহিলার শারিরীক কাঠামো দেখে বোঝা যাচ্ছে সে প্রচন্ড শক্তিশালী একজন কেউ।
কিন্তু কে উনি! মানুষতো নয় সে। দেখি সেখানে যাই। যা হওয়ার পরে হবে। দেবকী এগুতেই নারীটি সজাগ হয়ে যায়। অভি বালুরাশির উপর সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে।

দেবকী কিছু একটা ভেবেই অভির দিকে তাকাতেই অভি একদম বোতল বন্ধী হয়ে গেল। আর সেই বোতলটি দেবকীর কাছে আসতেই মহিলাটি ধরে ফেলল বোতলটি। মহিলাটি রেগে চোখ লাল করে দেবকীর দিকে চেয়ে বলল,

—” একজন সামান্য তান্ত্রিক হয়ে তুই আমার বিরুদ্ধে লড়তে আসিস? জিবনের মায়া থাকলে এখুনি এখান থেকে চলে যা।”

বেশি কারো শক্তি হলে সে মূর্খ হয়ে যায়। তাই সেই সামনে যাকে দেখতে পায় তাকেই ছোট ভাবে। আমি কি সেটা এবার এই যুদ্ধের ময়দানেই বোঝা যাবে। কথাগুলো বলেই দেবকী আসন পেতে শূন্যতে অবস্থান করলো।

এ যেন এক সন্তানের জন্য দুই মায়ের জমজমাট লড়াই। কেউ কাউকে চুল পরিমান ছাড় দিতে রাজি নয়।

[ চলবে…….]

বিদ্রঃ রিভিশন দেওয়া হয়নি। ভূলক্রটি মার্জনা করে পড়ে নিবেন। ব্যস্ততার কারনে এই মাসটাতে দু’দিন পরপর গল্প দেওয়া হবে। আগামী পার্ট ২৭ তারিখে দেওয়া হবে। সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন পরিবারবর্গদের নিয়ে। এটাই প্রভুর কাছে কামনা।
আমীন

সরাসরি ওয়েবসাইট এ পড়ুন:
https://nafisarkolom.com/2020/12/sidur-suddhi-41/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here