সিঁদুর শুদ্ধি নাফিসা মুনতাহা পরী পর্বঃ ৪৯

0
347

#সিঁদুর শুদ্ধি
নাফিসা মুনতাহা পরী
পর্বঃ ৪৯
.

জুলিয়া কিছুতেই মেনে নিচ্ছেনা। আশিষের চিকিৎসা করার জন্য একজন ডক্টরকে রাখা হয়েছে। মা আমাকে একটা কথাও বললোনা! মা এটা কিভাবে করতে পারলো! জুলিয়ার ভিতরে ক্ষোভে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুখ দিয়ে টু শব্দও করছেনা। কারন সে নিজেই বাসার বড় বৌ। সে যদি সামান্য কিছুতে চিৎকার চেঁচামেচি করে তাহলে বাসার ছোটরা কি শিখবে? তাই তাকে এসব ব্যাপারে সংযত হতে হয়। আর তাছাড়া আশিষ সব কিছু জেনেও তার মাকে কেন বুঝালোনা? বরং ঐ মহিলা ডক্টরের সাথে তার খুব ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে। এত সব চিন্তা করতে করতে মাথা মনে হয় ফেটে যাচ্ছে। সবতো ঠিক ছিল। এই মেয়েটা এসে আবার জটলা পাকালো।

অভি ওর মায়ের রুমের সামনে এসে দাড়ালো। তারপর বলল,

—” মম, আসবো?”

—” দরজা খোলায় আছে অভি। ভিতরে এস….!”

বাবার কথা শুনে অভি রুমে ঢুকে দেখলো, তার বাবা মিটমিট করে হাঁসছে আর মম তার পাশে বসে মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। অভি রুমে আসতেই আশিষ কৌতুক স্বরে বলে উঠলো,

—” অভি! তুমি কি জানো? তোমার মা ইদিনিং আমাকে সন্দেহ করে। ঐ ডক্টরের সাথে নাকি আমি বেশি বেশি করে কথা বলি। তাই সেটা তার কষ্টের কারন হয়ে দাড়িয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে সে আমায় সন্দেহ করছে। ব্যাপারটা কোথায় থেকে কোথায় পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে দেখেছ! এই তার ভালোবাসা আমার প্রতি?”

আশিষের কথা শুনে জুলিয়া চোখমুখ গরম করে স্বামীর দিকে চাইলো। তারপর ক্ষোভের সাথে বলে উঠলো,

—” ছেলের সামনে কি শুরু করেছ? তোমার কি মান-সম্মান বলে কিছুই নেই? নিজেদের মধ্য কথাগুলো রাখতে পারোনা?”

অভির এবার ব্যাপক হাঁসি পেল। ও ওর বাবার পাশে গিয়ে বসে বলল,

—” ড্যাড, দিদার পছন্দ করা ডক্টর কেমন? সে তোমাকে কি মেডিসিন দিয়েছে? আমাকেও একটু বল। তোমার তাকে হঠাৎ এত পছন্দ হলো কেন?”

আশিষ বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—” দেখ বাবা, তুইও যদি মেয়েটার প্রসংসায় পঞ্চ মুখ হস তাহলে তোর মম আজ নিশ্চিত হার্ট এ্যাটাক করবে। তাছাড়া মেয়েটাকে আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। যদি তোর সাথে তার বিয়ে দিতে পারতাম তাহলে ভালো হত। আমার মনের ইচ্ছার কথাটা শুধু প্রকাশ করলাম। বাঁকিটা তোর ইচ্ছা। ওকে খুব ভালো লেগেছে তোর জন্য, তাই একটু বেশিই আলাপ করে ফেলেছি। এতেও তোর মমের সমস্যা।”

এই কথা ঘুরাবেনা একদম! তুমি কি এই কথাটি আগে আমায় বলেছ? তুমিতো অসভ্যর মত কিছু কথা বলেছ। তাহলে আমি কি ভাববো! কেন তুমি ঐ ধরনের কথা বললে আমায়! কথাগুলো বলেই তেঁতে উঠলো জুলিয়া।

জুলি…. বলে বেশ কঠিন গলায় নিজ স্ত্রীর নাম ধরে ডেকে উঠলো আশিষ। এতেই জুলিয়া একদম চুপ। মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো জুলিয়া। হয়তোবা চোখে পানি ছলছল করছে। ছেলের সামনে নিজের অভিমানও দেখাতে পারছেনা। মায়ের এমন অবস্থা দেখে অভি উঠে গিয়ে ওর মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। কারন সময়টা এখন তার বাবা-মায়ের। তাই এখানে না থাকায় বেটার।

বাবার রুম থেকে বের হয়ে অভি ওর রুমে আসতেই বিদ্যার রুমের দিকে নজর পড়ল। অভি কৌতুহলী হয়ে সে দিকে পা বাড়ালো। বিদ্যা ব্যালকোনিতে দাড়িয়ে কিছু একটার সাথে যোগাযোগ করার জন্য সংকেত ছাড়ছে। বিদ্যা কারও সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে বলেই অভি একদম বাসার নিচে চলে গেল। যাতে বিদ্যা ওকে দেখতে পায়। হ্যা, বিদ্যা ওকে দেখতে পেল। অভিকে দেখে বিদ্যা দ্রুত ব্যালকুনি থেকে সরে গেল। তারপর নিজেই নিজেকে শাসন করতে লাগলো।উফ্, অভি যদি কিছু বুঝে ফেলত তাহলে সব শেষ করে দিত। অহ্ বিদ্যা, তোকে এবার সাবধানে কাজ করতে হবে। যাতে অভির চোখে যেন তুই না পরিস।

এভাবেই দিন শেষে রাত নেমে গেল। বিদ্যাকে খাবারের জন্য ডাকা হল। কিন্তু ও খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নামলোনা। বরং বলল, ওর খুদা নেই। বিদ্যা খাবার খাবেনা মানে এই সময়টা ও কাজে লাগাতে চায়। বিদ্যা, তুমি আবার কোন খেলায় মেতে উঠেছ? অভি কথাগুলো শুধু মনে মনেই বলল। কিন্তু খাবার ছেড়ে উঠে যেতে পারলোনা।

এই সুযোগটায় বিদ্যা নিল। বাসার অশরী পাহারাদার আর মানুষ পাহারাদারদের বোকা বানানো খুব সহজ। কিন্তু অভিকে বোকা বানানো সহজ নয়। তাই অনেক পরিকল্পনা করেই এই সময়টা বেছে নিয়েছে বিদ্যা। তাই আর দেরি না করে বিদ্যুতের গতিতে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। দুর থেকে মনে হবে এক আলোকবিন্দু ছুটে চলছে তার আপন গতিপথে। একটা বিশাল ঝাউগাছের জঙ্গলের এসে হাজির হল বিদ্যা। তারপর কিছু সংকেত ছাড়তেই পাঁচ সর্পভাইগন গাছ থেকে সড় সড় করে নিচে নেমে আসলো। এরপর তারা বিদ্যাকে ঘিরে অবস্থান নিলো। ওদের দেখে বিদ্যা খুঁশি হয়ে বলল,

—” আমার বাচ্চারা, এভাবেই সবসময় এক হয়ে মিলেমিশে থাকবে তোমরা। মনে রাখবে, আমরা কিন্তু অচেনা এলাকায় প্রবেশ করেছি। তারা আমাদের কিছুতেই মেনে নিবেনা। তাই আমাদের সাবধান থাকতে হবে। সবসময আমাদের সজাগ থাকতে হবে। তারা যেকোন সময়ে আমাদের উপর আক্রমন করতে পারে।”

সর্পগুলো তাদের মায়ে কথা মনযোগ দিয়ে শুনলো। কিন্তু কনিষ্ঠ জন একটু বেশিই চঞ্চল স্বভাবের। সে ওখানেই দাড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে লেজটা বের করে তার লেজ দিয়ে বরফ গোল করেই বড় ভাইয়ের দিকে ছুড়ে মারল। সাথে সাথে বাঁকি চার ভাই ওর দিকে তাকালো। বিদ্যার আর বুঝতে দেরি রইলোনা তারা ইতিমধ্য কি করে ফেলেছে। অজানা ভয়ে বিদ্যার বুক কেঁপে উঠলো। এমনিতেই অপিরিচিত জায়গা। সেখানে এরা পুরো জঙ্গলে তাদের শক্তির তান্ডপ দেখিয়েছে এতক্ষনে। তার পূর্বভাস কনিষ্ঠজন ইশারা করে তার মাকে জানালো। হয়ত এতক্ষনে তাদের অবস্থান সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন এদের নিয়ে সে কি করবে? যতই তারা শক্তিশালী হোকনা কেন? অপিরিচিত জায়গায় বাঘকেও বিড়াল সাজতে হয়। বিদ্যা যখন সর্পগুলোর দিকে তাকালো, তখন ওরা অপরাধ বোধে মাথা নুয়ে রইল। এদের শাসন পরে করা যাবে। এখন সুরুক্ষা কবচ তৈরি করতে হবে। এসব ভাবতেই মনে হল বিকট শব্দে গাছের ডাল ভাঙ্গার শব্দ হতে লাগলো। দলে দলে সাদা ধুয়া ছুটে আসছে তাদের দিকে। বিপদের গন্ধ পেতেই পাঁচ সর্প বিদ্যাকে আগলে রেখে বিশাল বিশাল ফোনা তুলে হিসহিস করে গর্জন করতে লাগলো। বিদ্যা যেটার ভয় পেয়েছিল সেটাই হল। ও কিছু করার আগেই অত্যান্ত হিমশিতল একটা সচ্ছ চাদরের আস্তরন ওদের শরীরে এসে পড়ল। এটাই সাপদের কাবু করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এত কষ্টের ভিতরও পাঁচ ভাই নিজেদের সমস্ত শক্তি দিয়ে হা করে মুখ থেকে আগুন নিক্ষেপ করতেই ৫টা বরফের মুখোশ এসে ওদের মুখ বন্ধ করলো। ওরা আর কিছু করতে পারলোনা। আস্তে আস্তে ওদের শক্তি শেষ হয়ে যেতে লাগলো। ওরা একদম সাধারন সাপে পরিনিত হলো। এখন ওদের মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবেনা। কারন ওদের মুখের লাগামের শিকল এক বরফ অশরীর হাতে আবদ্ধ রয়েছে। এদিকে বিদ্যা বরফের সুক্ষ্ণ চাদর ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছে। তার সন্তানদের এমন পরিনিত দেখে সে রেগে পাগলপ্রায় হয়ে গেল। ও চোখ বন্ধ করতেই ওর পুরো শরীর উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বতর হয়ে গেল। পা দু’টো উল্টো দিকে ফিরে গেল। মাথার চুলগুলো নিচের বরফ ছুয়ে গেল। সমস্ত চুল সাদা ধবধবে পরিনিত হল। এটা ছিল বিদ্যার একেবারে অন্যরুপ। বিদ্যা চোখ খুলতেই চোখের ভিতর থেকে আলোর দ্যুতি ছুটে গিয়ে শত্রুদের বিনাশ করতে লাগল। অদ্ভুদ কান্ড, ওর শরীরে আলোর পরিমান বৃদ্ধি হতে লাগলো। মিষ্টি আলো অশরীদের জন্য প্রাননাশের কারন হয়ে দাড়ালো। আলো যত দুরে ছড়িয়ে পড়ছে ততদুর পর্যন্ত অশরীগন গায়েব হয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সব অশরীগন অদৃশ্য হয়ে গেল। তারা পালিয়ে গেছে দেখে বিদ্যা থামতেই ওর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝড়তে লাগলো। শরীরের উপর বেশি খাটনি পড়াতে ও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়লো।
বরফের উপর ধপ করে পড়ে গেল। বরফ রক্তে লাল হয়ে গেল। কিন্তু খেলা এখনো যে শেষ হয়নি। আবারও দ্রুত বাঁকি বেঁচে যাওয়া অশরীগন ফিরে আসলো। তারা সর্পদের মুখের শিকল ধরে জোড়ে একটা হ্যাঁচকা টান দিতেই তারা ছটপট করতে লাগল।

এবার বাঁকি একটা অশরী এসে বিদ্যার সামনে দাড়িয়ে বলল,

—” এবার যদি চালাকি করেছ! তাহলে এই সাপগুলোর আজই শেষ দিন হবে। এখন ভাব, তাদের বাঁচাবে না আমাদের মারবে?”

বিদ্যা অতি কষ্টে মাথাটা তুলে ওদের এমন করুন অবস্থা দেখে আবার উঠার চেষ্টা করলো। কিন্তু পিছন দিক থেকে কেউ একজন এসে আঘাত করলো ওকে। বিদ্যা মুখ থুবড়ে বরফের উপর পড়ে গেল। মাথায় প্রচন্ড আঘাত পাওয়ার কারনে মাথা আর উপরে তুলতে পারলোনা। ও ভাবেই সুয়ে রইলো বরফের উপরে। চোখের সামনে মায়ের নিথর শরীর পড়ে থাকা দেখে কনিষ্ঠ সর্প আর সহ্য করতে পারলোনা। মুখের লাগাম খোলার জন্য ছটপট করতে লাগলো। এটাই সুযোগ এক সাপকে মারার। ওর লাগাম খুলে পড়লেই ও মারা যাবে। তাই অশরী কনিষ্ঠের লাগাম খুলে দিল। ছাড়া পেয়েই দ্রুত তার মায়ের কাছে আসতেই সে বরফে জমে যেতে লাগলো। আস্তে আস্তে ওর শরীর বরফে পরিনিত হতে লাগলো। এমন দৃশ্য দেখে বড় চার সর্পগুলো ছুটাছুটি করতে লাগলো তাদের ভাইকে বাঁচাতে। এই সুযোগে ঐ অশরী বাঁকি সাপগুলোকে ছাড়তে মনস্থির করতেই বিদ্যা বাতাসের গতিতে ছুটে গিয়ে ওই অশরীকে ভক্ষন করেই একহাতে ৪জনের শিকল শক্ত করে চেপে ধরল আর অন্য কনিষ্ঠ সাপকে বুকে নিয়ে আর্তনাদে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো। বিদ্যার কান্নায় বাতাস সহ আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে গেল। বিদ্যার কান্নার শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং তা বহু দুরে গিয়ে মিলিয়ে গেল।

অভির খাওয়া এখনো শেষ হয়নি। ওর দিদা কোন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সবার সাথে আলোচনা করছে আর সবাই খাবার খাচ্ছে। এমন সময় বিদ্যার চিৎকার ওর কানে এসে যেন ধাক্কা দিল। অভি খাবার ছেড়ে সাথে সাথে উঠে পড়লো। কারো তোয়াক্কা না করে হাত না ধুয়েই ঐ অবস্থায় ছুটে বের হয়ে গেল। অভির এমন আচরনে সবাই হতবম্ভ হয়ে গেল। জুলিয়া পিছন থেকে ডাকলো কিন্তু কোন কথায় অভির কানে পৌছালোনা। ও ওর মত চলে গিয়েছে।

অভি খুব দ্রুত সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল। তখন বিদ্যা আহত বাঘিনীর মত গর্জেই চলছে অশরীদের লক্ষ্য করে। আর ওর হাতে ৪টা সাপ শিকল দিয়ে বাঁধা আছে। যারা স্থির হয়ে পড়ে আছে। এদিকে অশরীরা আলোচনা করছে, শিকার এখন তাদের হাতের মুঠোয়। এখন তারা শিকারকে শেষ করতে চায়। এমন ভয়ঙ্কর শিকারকে বেশিক্ষণ বেঁচে রাখতে নেই। কারন তার শক্তি যদি আবার ফিরে আসে তাহলে সে সবকিছু শশ্মান করে দিবে। তাই এখুনিই তাকে সমাপ্ত করা দরকার। তারা নিজেরাও বিদ্যার কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে। অবশেষে তারা ১০জন কে নির্বাচন করে বিদ্যাকে শেষ করতে ওর কাছে পাঠায়।

ওরা বিদ্যার কাছে যেতেই কোন এক শক্তিশালী শক্তি এসে পরপর কয়েকবার ওদের শরীর ভেদ করে বের হয়ে এল। তারপর একদম বিদ্যার সামনে এসে দাড়িয়ে হুংকার ছেড়ে বলল,

—” আর একজনও যদি ওর শরীরে হাত দেওয়ার স্পর্দ্ধা দেখাও, তাহলে তার পরিনিতি এর থেকেও ভয়াভয় হবে।”

অভি কথাগুলো শেষ করতেই ১০ অশরীর শরীর কয়েকখণ্ড হয়েই অদৃশ্য হয়ে গেল। যা দেখে আশে পাশের সমস্ত অশরী একটু হলেও ভয় পেয়ে গেল।
এদিকে বিদ্যা অভিকে দেখে ভয়ে চুপসে যায়। তবুও নিজেকে ক্ষান্ত না করে রাগে বশীভূত হয়ে আবার সেই রুপ ধারন করতে উদ্যত হতেই অভি পাশ ফিরে বিদ্যা হাত ধরে ওকে ঝাঁকাতেই বিদ্যা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। অভি আর নিজের শক্তি ব্যবহার না করে উল্টা বিদ্যার শক্তিই ব্যবহার করলো। অভি নিচু হয়ে বিদ্যার পায়ের বৃদ্ধ আঙ্গুলে আস্তে করে স্লাইড করতেই ওর পায়ের ১০ আঙ্গুল থেকে নীল রশ্মি বের হয়ে ওদের চারপাশে গোল হয়ে অবস্থান নিল। একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি হল ওদের জন্য। অভি জানেনা, সাপগুলো কে ছিল। কিন্তু বিদ্যার আচরন দেখে বুঝতে পারলো, ওরা বিদ্যার চেনা কেউ। তাই নিজ শক্তিবলে ওদের মুক্ত করে দিল। অভি এবার বিদ্যার কাছে কনিষ্ঠ জনকে চাইতেই বিদ্যা আরো ওকে বুকের ভিতর লুকিয়ে রেখে মুখ অন্যদিকে করলো। অভি বিদ্যার সামনে এসে হাতটা বাড়িয়ে নরম স্বরে বলে উঠলো,

—” ওকে আমার কাছে দাও বিদ্যা। ওকে তো ঠিক করতে হবে, না হলে ও তো মারা যাবে। তুমি কি চাওনা, সে বেঁচে উঠুক।”

অভির কথায় বিদ্যার হুশ এল। অভির কাছে কনিষ্ঠ সাপটিকে দিয়েই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। অভি দ্রুত সাপটিকে নিচে রেখে চোখ বন্ধ করলো। তার খানিকক্ষণ পড়ে অভি ওর হাত দিয়ে বরফে ইশারা করতেই সেখানে থেকে বরফ সরে গিয়ে মাঝারি একটি সরোবর তৈরি হল। সেখান থেকে উষ্ণ জলের ধোঁয়া বের হচ্ছে। অভি সাপটিকে তার ভিতর ফেলে দিল। কনিষ্ঠ সাপের শরীর আস্তে আস্তে বরফমুক্ত হয়ে যায়। উষ্ণ জলের ছোয়ায় সে যেন জ্যান্ত হয়ে উঠল। সে চোখ খুলেই উষ্ণ পানি পেয়ে উল্লাসে জল নিয়ে মত্ত হয়ে গেল। পানির মধ্যই সে নিজের শরীর ভাঁসিয়ে দিয়ে পলট খেল। সে এতই খুঁশি হল যে লেজ দিয়ে অন্য ভাইদের গায়ে জল ছিটাতে লাগলো। অন্য ভাইরা একসাথে অভির দিকে চাইতেই অভি ওদের অনুমতি দিল সেখানে নামতে। অভির অনুমতি পেতেই ওরা আর দেরি না করে সরোবরে সড়সড় করে নেমে গেল।

ওরা নেমে যেতেই বিদ্যা হামাগুড়ি দিয়ে অভির পায়ের নিচে এসে বসে পড়ল। তারপর পা ধরে ওঠার চেষ্টা করতেই পড়ে গেল। কিন্তু এবার অভি ওকে ধরে ফেলল। বিদ্যার চোখ আর মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। বিদ্যা সেন্সলেস হওয়ার আগে অভিকে শুধু একটা কথায় বলে গেল। অভি, আমি আমার সন্তান হারিয়ে যতটা কষ্ট পেয়েছি তার থেকেও বেশি কষ্ট পাব, যদি এই সাপগুলোর কোন ক্ষতি হয়। প্লিজ তুমি ওদের ক্ষতি হতে দিওনা।

অভি দ্রুত নিজের গায়ের গরম কাপড়গুলো খুলে বিদ্যাকে পড়িয়ে দিতেই সাপগুলো বিদ্যার কাছে আসতে চাইলো কিন্তু ওরা ঐ সরোবর থেকে আর উঠতে পারলোনা। অভির মায়াবলে তারা বন্দী হয়ে গেছে।

বিদ্যার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল। অভি আগে বুঝতে পারেনি, বিদ্যা এতটা আঘাত পেয়েছে। অভি বিদ্যাকে তুলে দ্রুত বাসায় ফিরতে চাইলো। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সমস্ত অশরীর রোষানলে সে পড়ে গেছে। তাই অভি বাধ্য হয়ে ঐ কাজ করলো, যেটা করা ওর জন্য নিষিদ্ধ ছিল। অভি নিজের শরীর থেকে একটা হলুদ পাথর বের করে সেটা উপরে দিকে ছুড়ে মারলো। পাথরটি এবার ওর কাজ করতে শুরু করলো। অভির মাথায় একটা ক্রাউন তৈরি হতে লাগলো। আর সেটা হলুদ সচ্ছ কাচের তৈরি ছিল। আস্তে আস্তে তার দ্যুতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই সমস্ত অশরী মাথা নত করে সেখানেই হাটু গেড়ে বসে পড়ল। অভি দ্রুত সেই সময়টা কাজে লাগিয়ে বিদ্যাকে নিয়ে বাসায় চলে আসল।

বিদ্যাকে নিয়ে যখন অভি মেন দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো, তখন কুন্তি দেবী বিচলিত হয়ে বলল,

—” অভি, ঐ মেয়েটার কি হয়েছে! ওকে কোথায় পেলি? ও না রুমেই ছিল? বাহিরে কখন গেল?”

অভির কাকি আর ওর পিসি অভির দিকে টেরা চোখে চেয়ে রইলো। ওর পিসি বলেই ফেলল,

—” অভি, এই ডক্টরের সাথে তোমার কি সম্পর্ক? যার জন্য কারো কথা তোয়াক্কা না করে ও ভাবে দৌড়ে চলে গেলে?”

জুলিয়া এদের এমন কথা শুনে ছেলের উপর বেশ রেগেই গেলেন। কিছু বলতে যাবেন এমন সময় কুন্তি দেবী বেশ ক্ষোভের সাথেই বলে উঠলো,

—” কি হল, কথা বলছিসনা কেন? বল, এত রাতে ওকে কোথায় পেলি? আর ওর সাথে তোর কি সম্পর্ক?”

দিদা, তুমিও ওদের সাথে টালবাহানা করতে শুরু করলে? দেখছো মেয়েটা আহত। কোথায় তাকে নিয়ে ভাববে! তা না করে মেয়েটাকে নিয়ে পড়ে রইলে? অভি আর সময় নষ্ট না করে বিদ্যাকে নিয়ে রুমে ঢুকল। অভির পিছে পিছে বাঁকি সব লোকেরা যেতেই কুন্তী দেবী সবাইকে নিষধ করে বলল,

—” ওখানে ভিড় জমিয়ে কোন লাভ নেই। কাল সকালেই সব জানতে পারবে। তোমরা এখন ঘুমাতে যাও।”

সবাই যখন কুন্তী দেবীর কথা শুনে চলে গেল তখন কুন্তী দেবী অভির কাছে চলে গেল। কিন্তু গিয়ে যা দেখলো, তাতে ওনার হুশ উড়ে গেল। অভি মেয়েটার কাপড় বদলিয়ে দিচ্ছে। দিদার উপস্থিতি টের পেয়ে অভি দ্রুত বিদ্যার শরীর ঢেকে দেয়।

কুন্তী দেবী কেবল রুমে ঢুকবে এমন সময় জুলিয়া এসে বলল,

—” মা, আপনি ঘুমাতে যান। আমি ব্যাপারটা দেখছি।”

কুন্তী দেবী দ্রুত দরজা আগলে দাড়িয়ে বলল,

—” না না, তুমি যাও আশুর কাছে। দেখ, ছেলের কিছু লাগবে কিনা? আমি এদিকটা দেখছি। তাছাড়া অভিতো আছেই। যাও তুমি যাও……।”

শাশুড়ীর এমন আচরন বেশ সন্দেহ জনক। তিনি অভিকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। তাই অভির সমস্ত দোষ তিনি লুকিয়ে থাকেন। তারমানে রুমে এমন কিছু ঘটেছে যার জন্য তিনি তাকে ঢুকতে দিচ্ছেননা। ব্যাপার কি!

জুলিয়া ওখানেই দাড়িয়ে কথাগুলো ভাবতে লাগলো। কিন্তু এক পাও নড়লেননা। সেটা দেখে কুন্তী দেবী বেশ ঝাঝালো গলায় বলে ফেললেন,

—” আশুকে কি বলতে হবে! তুমি আমার কথা একদমই শোননা। ”

স্যরি মা, আমি এখুনি যাচ্ছি বলেই জুলিয়া সেখান থেকে দ্রুত চলে গেল। কুন্তী দেবী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তারপর তিনি রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিয়ে অভির কাছে আসলেন। ততক্ষনে অভি বিদ্যার পোশাক চেঞ্জ করে দিয়েছে। অভি টিসু দিয়ে বিদ্যার মুখের রক্তগুলো মুছে দিতেই কুন্তী দেবী ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে কৌতুক স্বরে বলল,

—” এই ডাক্তারের সাথে তোর কবে থেকে চক্কর চলছেরে অভি? যা দেখলাম, তাতে তো মনে হচ্ছে তোদের সম্পর্ক হ্যাসব্যান্ড-ওয়াইফের মত হয়ে গেছে। সত্যি করে বল, ও কে?”

অভি কোন সঙ্কোচ ছাড়াই বলে ফেলল,

—” আমার ওয়াইফ সে।”

কুন্তী দেবী কথাটি শুনে চমকের উপর চমক খেলেন। কি বলিস! এ তোর বউ? মা জানে এসব কথা? বা আশু জানে?

আপাতত জানেনা, তবে জানতেও বেশিদিন লাগবেনা। তুমি এখন রুম থেকে বের হয়ে যাও। আমার কিছু কাজ আছে ওর সাথে। তুমি যাও এখন। কথাগুলো বলে অভি অলিবয়েল এনে বিদ্যার পায়ে ঘষতে লাগলো আর বিদ্যা, বিদ্যা বলে কয়েকবার ডাকলো।

কুন্তী দেবীর আরও কথা জানার আছে তাই তিনি সেখান থেকে নড়লেননা। বরং অভির দিকে প্রশ্ন ছুড়লেন,

—” তার মানে তোর বউ, পরিচয় লুকিয়ে এই বাসায় ঢুকেছে। কি সাহস মেয়েটার। তোর মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তার প্রিয় জিনিস নিয়েই তার সাথে খেলায় মেতে উঠেছে।”

অভির আর সহ্য হলোনা। বিছানা ছেড়ে উঠেই ওর দিদাকে পাজাকোলে করে নিয়ে একদম দরজার বাহিরে রেখে বলল,

—” অনেক রাত হয়েছে, তাই তুমি ঘুমাতে যাও। আর আমার কাজ আমাকে করতে দাও।”

কুন্তী দেবী ভ্রু জোড়া উপরে তুলে বললেন,

—” তুই ওর সাথে একই রুমে থাকবি? তোর মাকে কি ডাকবো আমি! এমনি তোর মা খুব কৌতুহলী এই বিষয় নিয়ে। কি ডাকবো তাকে?”

অভি দু’হাত জোড় করে ওর দিদাকে বলল,

—” আমার মন মেজাজ খুবই খারাপ। তোমার মনে যা ইচ্ছা হয় তাই করো। প্লিজ, আমাকে আর বিরক্ত করোনা।”

—” আমি কিন্তু তোর মাকে ডাকবো!”

—” আমি নিষেধ করেছি তোমায়! যাওনা ডেকে আনো তাকে।”

কথাগুলো বলে অভি দরজা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় আবার কুন্তী দেবী নিচু গলায় বলল,

—” মেয়েটাতো অসুস্থ। ওকে ডাক্তার দেখাতে হবেতো! ওভাবে রুমে রেখে কি করবি?”

এমনি অভির মেজাজ বিগরে আছে। তার ভিতর তার দিদার রসিকতাপূর্ন কথাবার্তা যেন ওকে আরও পাগল করে ফেলল। অভি চট করে দরজা খুলো মুখটা বের করে কিছুক্ষন ওর দিদার দিকে চেয়ে রইলো। তারপর লজ্জার হুমকি দিয়ে বলল,

—” বউকে নিয়ে বাসর করবো। তুমি জানোনা, বউকে ঘরে নিয়ে থাকলে কি করে? আর দশটা মানুষ যা করো আমিও তাই করবো। এবার বুঝেছ আমার কথা?”

অভির কথাগুলো বিশ্বাস করে কুন্তী দেবী মুখ ভাড় করে ফিসফিসিয়ে বলল,

—” মেয়েটা অসুস্থ, আর এই অবস্থায়……..। ”

দিদা, তুমি যদি আর একটা কথা মুখ দিয়ে বের করেছ তাহলে আমি নিজেই গিয়ে মমকে জানিয়ে আসবো, আমি আমার বউকে নিয়ে রাত্রিযাপন করছি। যদি আমার মুখ না খুলাতে চাও তাহলে ঐ দিক দিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে যাও আর আমার কাজ আমাকে করতে দাও। কথাগুলো বলে কুন্তী দেবীর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিল অভি।

[ চলবে….]

বিদ্রঃ “জল সমাধি” বইটি প্রি-অর্ডার করতে নিচের লিংক-এ গিয়ে ফরমটি পূরণ করে সাবমিট করুন :
.
https://docs.google.com/forms/d/e/1FAIpQLSfMkPPayni-cyzXQKOvfWO8-ZxNIzVCdjiz2ye1fZ3aU_yiRQ/viewform

কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা বুঝতে না পারলে এই আইডির ইনবক্সে মেসেজ করুন বা কল করুন : 01979 002737

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here