অনুভবে আজো তুমি🍁🍁 পর্ব-২১

0
470

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
পর্ব-২১
ফাবিহা নওশীন

এমন শব্দে মেহেরের কলিজা কেপে উঠলো।ওর মনে ভয় হচ্ছে ফায়াজ ভাংচুর করছেনা তো।
উফফ,,এই ছেলেটা কি শুধু ভাংতেই পারে??
মেহের বিছানা থেকে নেমে নিচে যাওয়ার জন্য হাটা ধরলো।মেহের সিড়ি দিয়ে নেমে প্রথমে লিভিং রুমের দিকে তাকিয়ে টিভি চেক করলো।কিন্তু না টিভি তো ঠিক আছে।তবে কি ভাংছে।ডাইনিং ও ঠিক আছে।কিচেনে গেলো।কিচেনের মেঝেতে সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আর তার মাঝে ফায়াজ বসে আছে।মেহেরের অনেক রাগ হচ্ছে,,কিছু বলতে যাবে তখনই মেহেরের ফায়াজের দিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করলো।ফায়াজ মাথা নিচু করে হাত চেপে ধরে আছে।ফায়াজের হাত দিয়ে রক্ত পড়ে ভেসে যাচ্ছে পাশেই মাছ,মাংস কাটার ছুড়ি।

মেহেরের মাথা ঘুরছে।মেহের চিতকার করলো,,
–ফায়ায়ায়াজজজ,,,
ফায়াজ মেহেরের চিতকার শুনে মেহেরের দিকে চেয়ে হালকা হাসি দেয়।মেহের দৌড়ে ওর কাছে যায়।ওর হাত ধরে দেখে হাতে বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কেটেছে।
মেহের কাটা স্থান দেখে আতকে উঠে।ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।তারপর সাহস করে চোখ মেলে ফায়াজের হাত চেপে ধরে রাখে।কাদতে কাদতে বলে
–কি করেছেন?পাগল হয়েছেন?আপনি একটা সাইকো।আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন।
উঠুন।ব্যান্ডেজ করতে হবে।অনেক রক্ত ঝড়ছে।
ফায়াজ মৃদুভাবেভহাসছে।মেহের ফায়াজের হাসি পাত্তা না দিয়ে ওকে ধরে দাড় করায়।ফায়াজ উঠে দাড়াতে পারছেনা।ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে।
–মেহের আমাকে ছাড়ো।আমি হাত কেটেছি নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য,ব্যান্ডেজ করার জন্য নয়।
মেহেরকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।মেহের কেদেকেদে মিনতির সুরে বললো,
–এমন করবেন না প্লিজ।আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি প্লিজ এখন তো,,
মেহের ওকে অনেক কষ্টে সোফায় নিয়ে বসায়।

তারপর চুটে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আসে।কাটা স্থান পরিস্কার করছে আর ভয়ে একবার চোখ বন্ধ করছে।
ফায়াজ ওর অবস্থা বুঝে বললো,
–ছাড়ো পরে আমি দেখে নিবো।
মেহের রাগী লুকে চেয়ে বললো,
–আরেকটা কথা বললে আমি আপনাকে খুন করবো।
এত রাগ কেন আপনার?আপনাকে তো দেখছি কিছুই বলা যায়না।কই আপনিও তো আমাকে কতকিছু বলেন আমি কয়দিন হাতপা কেটেছি।

–এসবের জন্য সাহস আর অভ্যাস লাগে।আমার এসব করার সাহস আর অভ্যাস দুটোই আছে।আর আমি রাগের বশে করিনি।আমি অকারণে তোমার হাত কেটেছি তাই নিজেকে শাস্তি দিয়েছি।
মেহের ফায়াজের দিকে চেয়ে আছে।কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আবারো ঢুকরে কেদে দিলো।
–তুমি কাদছো কেন?তোমার তো খুশি হওয়ার কথা।তোমার হাত যতটুকু কেটেছি তার পাচগুন কেটেছি।এখন খুশি তো?
–আপনার কি আমাকে অমানুষ মনে হয়?আমি কি মানুষ নই?কেন এমন করছেন?কেন?
ফায়াজ কোনো উত্তর দিলোনা।ফায়াজ মেহেরের চোখে ওর জন্য ভালোবাসা দেখছে।
মেহের ড্রেসিং করে,ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো কিন্তু অবাক করার বিষয় ফায়াজ হু হা কিছুই করেনি।
বিষয়টি মেহেরের ব্যান্ডেজ কমপ্লিট করার পর খেয়াল হলো।
–আপনার কি ব্যথা নেই?আপনি ও,আহ কিছুই করলেন না।আমি হলে কেদেকেটে ভাসিয়ে দিতাম।
–এখনো তো তাই দিলে?তুমিই তো কেদে কূল পাচ্ছোনা,,আমি কাদবো কি?
(আমিতো তোমাতে ব্যস্ত ছিলাম।তোমার চোখের দিকে চেয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম।তাই অন্য কিছু ফিল করার সময় পাইনি।কখন তুমি ব্যান্ডেজ করে ফেলেছো টেরই পাইনি।)
মেহের ফায়াজের কথায় কিছুটা লজ্জা পেলো।তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
–আপনি আগের মতোই আছেন।
যান রুমে যান।আমি আপনার খাবার নিয়ে আসছি।খেয়ে ওষুধ খাবেন।
মেহের আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কিচেনে চলে গেলো।
ফায়াজ ভাবছে ঠিকই বলেছো আমার তোমার প্রতি অনুভূতি গুলো আগের মতোই আছে।আমি শুধুমাত্র অনুভূতিগুলো কে এড়িয়ে চলতে চাই।

মেহের এক হাতে কিচেনের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে আর ভাবছে,
–ফায়াজ,তুমি এখনো আগের মতোই আমাকে ভালোবাসো কিন্তু স্বীকার করতে চাওনা।ভালোলাগা,ভালোবাসাকে এড়িয়ে চলতে চাও।আর তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটাও বুঝতে চাওনা।তুমি কেন বুঝো না আমি তোমাকে আজো ভালোবাসি।আমার প্রতি তুমি অনেক অন্যায় করেছো তবুও আমার এই বেয়াহা মন তোমাকে ভালোবাসে।
এসব ভেবে মেহেরের চোখ থেকে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।

ফায়াজ হাতের ব্যান্ডেজের উপর কিস করে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো।বারান্দায় সব সময় বাতাস বইতেই থাকে।ফায়াজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করছে।
মেহের খাবার নিয়ে এসে দেখে ফায়াজ রুমে নেই।বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়।ফায়াজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে চোখ বন্ধ করে।ওর কোরিয়ার হিরোদের মতো সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।বারবার কপালে বাড়ি খাচ্ছে।মেহের অপলক নয়নে চেয়ে আছে ফায়াজের দিকে।চোখ যেন সরাতেই পারছেনা।
নীরবতা ভেঙে মেহের বললো,
–খেতে আসুন।
ফায়াজ চোখ মেলে মেহেরকে দেখে মেহেরের পিছু পিছু ঘরে চলে এলো।মেহের খাবার দিয়েছে কিন্তু ফায়াজ চুপচাপ বসে আছে।ফায়াজকে এভাবে বসে থাকতে দেখে মেহের জিজ্ঞেস করলো,
–থ মেরে আছেন কেন?স্ট্যাচু হওয়ার ইচ্ছে জেগেছে।তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।ওষুধ খেতে হবে।
ফায়াজ মুখ কালো করে বললো,
–আমি বা হাতে খেতে পারিনা।
মেহের ভাবছে,আমি তো খেয়ালই করিনি।ওনি তো আমাকে জ্বালানোর জন্য ডান হাত কেটে বসে আছে।
মেহের সামনে গিয়ে ভাত মাখিয়ে বললো,
–আপনি আসলে আমাকে জালানোর জন্যই হাত কেটেছেন।কি আর করবো কামলিগিরী করি।হা করুন।এই দাসী আপনার সেবায় রত হোক।
–খোটা দিচ্ছো?
–খোটা কেন দেবো?আমার সে যোগ্যতা আছে নাকি?
মেহের মুখের সামনে ভাত নিলে ফায়াজ মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
–আমি কারো দয়া চাইনা।ভাত রাখো।
মেহের আর কথা না বলে হাত কাজে লাগায়।ফায়াজের থুতনি ওর দিকে ঘুরিয়ে চেপে ধরে বললো,
–হ্যা করুন।আপনি জানেন আমার বা হাতে ব্যথা।আমি আপনার গাল এভাবে টানতে পারবোনা।সো প্লিজ!!
ফায়াজ মাথা নাড়িয়ে হা করে।সে তৃপ্তি মিটিয়ে ভাত খাচ্ছে মেহেরের হাতে।মেহেরের ভিতরেও অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করছে।নিজের স্বামীকে নিজ হাতে খাওয়াচ্ছে।
–তোমাকেও তো ওষুধ খেতে হবে।নয়তো ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারবেনা।তুমি খাবেনা?
–আপনাকে খাইয়ে নিচে গিয়ে খাবো।
–তুমি এখনো তুমি,আপনি মিলিয়ে বলো।উম,
এখান থেকেই খাও।আমি এতটাও রাক্ষস নই যে এত খাবার একা খাবো।
মেহের ইতস্তত করে বললো,
–না দরকার নেই,
ফায়াজ ধমকে বললো,খাও।
মেহের ফায়াজের কথায় নিজেও ফায়াজের সাথে খাচ্ছে।তারপর বলে উঠলো,
–যদি আপনি আমার ডান হাত ধরতেন তবে খাওয়ানোর জন্য লোক বাইরে থেকে আনতে হতো।ভাগ্যিস বা হাত,,
বাই দ্যা ওয়ে,,এখন যদি কেউ আসে আর জিজ্ঞেস করে,দুজনের হাত কিভাবে কাটলো তখন কি উত্তর দিবে?
–তোমাকে জিজ্ঞেস করলে কি বলবে?
–উমম,,,,বলবো চোর এসেছিলো উহু ডাকাত এসেছিলো।
–বলদ মাইয়া,, ডাকাত এসে দুজনের হাত কেটে চলে গেছে?
মেহের মুখ বাকিয়ে বললো, তাহলে আপনিই বলুন কি বলবেন?
–বলবো আমাদের দুজনের তুমুল ঝগড়া বেধেছিলো রাগের মাথায় একজন আরেক জনকে কুপিয়েছি।তারপর একে অপরকে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি।
কথাটা শুনা মাত্রই মেহের হাহা করে হেসে দিলো।হাসতে হাসতে চোখে পানি এসে পড়েছে কিন্তু হাসি থামারই নাম নেই।মেহেরে হাতের প্লেট নিচে রেখে হাত নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু হাসির জন্য পারছেনা।হাসির চুটে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।ফায়াজও হাসছে তবে অল্প।সে হাসির চেয়ে মেহেরকে দেখায় বেশি ব্যস্ত।

চলবে,,,

(ছোট করে এক পার্ট দিলাম।রাতে আরেক পার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো।সবার অনুরোধে গল্প পর্ব বাড়ানোর চেষ্টায় আছি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here