অনুভবে আজো তুমি🍁🍁 পর্ব-২৪

0
502

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
পর্ব-২৪
ফাবিহা নওশীন

মেহের ফায়াজের পাশে বসে থাকতে পারছেনা।কাজের অজুহাত দেখিয়ে উঠে চলে গেলো।মেহের খাবারের দিকটা দেখছে।লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে।সবাইকে খাবারের জন্য ডাকছে।মিহু সাজতে বসার আগেই খেয়ে নিয়েছে তাই মেহের ওর বান্ধবীদের ডেকে নিয়ে এলো।
সবাই খেতে বসেছে।মেহের তদারকি করছে।ফায়াজের হাতের জন্য ওদের সাথে বসতে পারেনি।হাতের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।একটু কষ্ট করে চাইলেই নিজে ই খেতে পারবে কিন্তু মেহেরের হাতে খাওয়ার জন্য অসুস্থের ভান করে আছে।ফায়াজ মেহেরের আশেপাশে থাকতে ডাইনিংয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে।আর সবাইকে এটা সেটা বলছে।হটাৎ মেহের খেয়াল করলো মিহুর বান্ধবী দুইটা ফায়াজের দিকে তাকাচ্ছে আর একে অপরের সাথে ফিসফিস করে কিছু বলছে।এটা দেখে মেহেরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।
মেহের মনে মনে গালাগাল দিচ্ছে।
বদ মাইয়াগুলা,বিবাহিত ছেলেদেরও ছাড় দিস না।দেখছিস বউ আছে তবুও তাকে নিয়ে কানাঘুষা।বেয়াহা,নির্লজ্জ,ষ্টুপিড মেয়ে।আমার তো ইচ্ছে করছে এইগুলারে মরিচ খাওয়ায়াতে।কিন্তু মিহুর বান্ধবী দেখে পারছিনা।এখানে তো আরো ছেলে আছে ওদের দেখ।আমার বরকেই কেন দেখতে হবে।ওনি তো তোদের দিকে একবারো তাকায়নি।মেহেরের ইচ্ছে করছে ফায়াজের কলার ধরে পাঞ্জাবীর বোতাম লাগিয়ে দিতে।

মেহের ফায়াজকে সরানোর জন্য বললো,
–আপনি তো এখন খাবেন না,,মিহু একা আছে সেখানে যান।ওর সাথে গল্প করুন।

তখন মিহুর এক বান্ধবী বলে উঠলো,
–কেন দুলাভাইয়ের কি আমাদের সাথে খেতে সমস্যা?

ফায়াজ কিছু বলতে যাবে তখনই মেহের বললো,
–না সমস্যা নয়।তবে তোমাদের সামনে ওনি আমার হাতে খেতে লজ্জা পাবে।ওনার হাত কাটা।তাই নিজের হাতে খেতে পারেনা।

–আমরা আছি না,,আসুন দুলাভাই আমরা আপনাকে খাইয়ে দেই।শালিকা থাকতে বউকে এতো কষ্ট কেন দিবেন।
বলেই দুজন হাসতে শুরু করলো।

ফায়াজ হেসে হেসে বললো,,না,,গো শালিকারা তোমাদের কষ্ট করতে হবে না।আমার বউ আমার জন্য এটুকু কষ্ট করতে পারবে।বউয়ের হাতে না খেলে তৃপ্তি মিটেনা।

ফায়াজকে বসতে বলে মেহের মিহুকে দেখতে যাচ্ছে।ফায়াজ পিছনে থেকে মেহেরকে দেখে রেগে গেলো।জোরে জোরে পা চালিয়ে মেহেরকে টেনে একপাশে রুমে নিয়ে গেলো।ফায়াজের এমন কাজে মেহের ভয় পেয়ে গেলো।বাসা ভর্তি মেহমান ফায়াজ যদি উল্টো পাল্টা কিছু করে।মেহেরকে রুমে নিয়ে ছেড়ে দিলো।মেহের ভয়ে ভয়ে বললো,
–কি হয়েছে?
ফায়াজ মেহেরের শাড়ির আচল টেনে পিঠে উঠিয়ে বললো,
–মেয়েদের পিঠ বের করে দেখানো আমার পছন্দ না।
মেহের নিচুস্বরে বললো,
–ছেলেদের বুক বের করে রাখাও আমার পছন্দ না।
বলেই মেহের বের হয়ে গেলো।
ফায়াজ একটু হেসে পাঞ্জাবীর খোলা বোতাম লাগাতে লাগলো।

🍀🍀

মেহের ফায়াজকে খাইয়ে দিচ্ছে।কিন্তু ফায়াজের দিকে তাকাচ্ছেনা।লজ্জায় অন্য দিকে চেয়ে ওকে খাইয়ে দিচ্ছে।ফায়াজ বিষয়টি লক্ষ্য করে বিরক্ত হচ্ছে।তারপর ইচ্ছে করে মেহেরের হাতে কামড় দিলো।
মেহের আহ,,করে একবার ফায়াজের দিকে চেয়ে পরেরবার আশেপাশে চেয়ে দেখলো কেউ দেখেছে কিনা।

–কি হলো?

–তোমার মনোযোগ কই?
আমি এখানে,আমাকে খাইয়ে দিচ্ছো কিন্তু তুমি আছো অন্য জায়গায়।আমার দিকে মনোযোগ দেও।

–মনোযোগ না থাকলে কিভাবে খাইয়ে দিচ্ছি?

–হুম মনোযোগের ঠেলায় আমার মুখ মাখিয়ে ফেলছো।
মেহের ফায়াজের মুখের দিকে চেয়ে হিহি করে হেসে উঠলো।বাচ্চাদের মতো করে খাবার দিয়ে মুখ মেখে আছে।

–হাসি বন্ধ করে মুখ মুছে দেও।
মেহের টিস্যু এনে ফায়াজের মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে আর আনমনে ভাবছে আমাদের সম্পর্কটা যদি এমন স্বাভাবিক থাকতো।যদি কোনো রাগ অভিমান ভুল বুঝাবুঝি না থাকতো।

–আবার কোথায় হারিয়ে গেলে?এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই।

মেহের কাচুমাচু হয়ে বললো,কোনসব?
–এই যে মিহুর বিয়ে,তোমার বাবা নিয়ে।
–ওওহ।

🌿🌿

মিহু আর আহিলকে পাশাপাশি বসানো হয়েছে।কাজিও এসে পড়েছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়ে পড়ানো হবে।মিহুকে লাল লেহেঙ্গায় রাজকুমারীর মতো লাগছে।মেহের চোখের কাজল দিয়ে টিকা দিয়ে দিয়েছে যাতে কারো নজর না লাগে।মিহু মেহেরকে ইশারা করছে।মিহুর ইশারায় মেহের ফোন হাতে নিয়ে বাবাকে ফোন করলো।দুবার রিং বাজতেই ফোন রিসিভ করলো।

–হ্যালো আব্বু।তোমার সাথে মিহু কথা বলবে।
অপরপাশ থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে বললো,
–মিহু!!মানে কি?
মেহের কিছু না বলে মিহুর হাতে ফোন ধরিয়ে দিলো।
মিহু ভয়ে ভয়ে শান্তস্বরে বললো,
–আব্বু আমি বিয়ে করছি।দোয়া করবেন।আর পারলে ক্ষমা করে দিবেন।
বলেই ফোন মেহেরের হাতে দিয়ে দিলো।
–মিহু,,এটা তুই করতে পারিসনা।আমার কথা একবারও ভাবলিনা।এটা তুই করিস না।বাসায় আয় একসাথে বসে কথা বলি।
মেহের বললো,
–এটা এখন আর সম্ভব নয়।সব রেডি কাজি এখনি বিয়ে পড়াবে।এই প্রথম তোমার অবাধ্য হলাম পারলে ক্ষমা করে দিও।
বলেই মেহের ফোন রেখে দিলো।
বোনের কাধে হাত রেখে বিয়ে পড়াতে বললো।মিহুর পক্ষে সাক্ষি হিসেবে সাইন করে দিলো।সবার দোয়ায় ওদের বিয়ে ভালোভাবে কমপ্লিট হলো।

🌸🌸

মিহুর বিদায় দিচ্ছে।মিহু কাদছে।কিন্তু কান্নার সঠিক কারণ বুঝা যাচ্ছেনা।
–আপি,আব্বু আমাদের ক্ষমা করবে তো?
–মিহু,তোকে এখন এসব কে ভাবতে বলেছে?এসব ভুলে যা।কোনো বাবা মাই তার সন্তানের উপর রাগ করে থাকতে পারেনা।সে যত রুড বাবামাই হোক।শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিস এখন সেটা ভাব।সবার সাথে ভালো ব্যবহার করবি।বড়দের সম্মান করবি।এখন কান্না থামা নয়তো মেকাপ নষ্ট হয়ে পেত্নী লাগবে।
মেহের চোখ মুছিয়ে দিলো।মেহেরের চোখ থেকেও একফোঁটা পানি পড়লো সেটা বোনের বিদায়ের জন্য নয়।বোনের ভালোবাসার পূর্ণতায়।
মিহু ফায়াজের সামনে গিয়ে দাড়ালো।

–ভাইয়া আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করবোনা।আপনি না থাকলে কিছুই সম্ভব হতো না।আমি এতটা সাহস দেখাতে পারতাম না।আপিকে অনেক সাপোর্ট করেছেন তাই আপিও সাহস দেখাতে পেরেছে।

–আমি কিছুই করিনি,তোমার আপি কিছু করতে দিলে তো।যাইহোক দোয়া করি অনেক সুখী হও।
মিহু ফায়াজের সাথে হাগ করতে গিয়ে থেমে গেলো।
ফায়াজ অবাক হয়ে বললো,
–এটা কি হলো?
–আমি তো আমার হ্যান্ডসাম দুলাভাইয়ের সাথে হাগ করতে চাই কিন্তু আমি যদি আপনাকে হাগ করি তাহলে আপি আমাকে মারবে।এখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে আমি আপির হাতে মার খেতে চাইনা।
মেহের চোখ বড়বড় করে বললো,
–ওই,,আমি কি তোকে হাগ করতে মানা করেছি?আর আমি তোকে কবে মারলাম?

–আমি বুঝি সবি বুঝি,,আপি তুমি অনেক হিংসুটে হয়ে গেছো।ভাইয়ার পাশে কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারোনা।আমাকেও না।
ফায়াজ দুবোনের কাহিনী দেখছে।
–ঠিক আছে,ঠিক আছে।বুঝেছি মিহু এসো হাগ কর তোমার আপি কিছুই বলবেনা।
মিহু ফায়াজকে হাগ করলো।
–ভাইয়া দোয়া করবেন।আপনারাও ভালো থাকবেন।
অতঃপর মিহুর বিদায় হয়ে গেলো।

মিহু আর ফায়াজ একসাথে রুমে যেতেই ফায়াজের ফোন বেজে উঠলো।যদিও ফোনটা মিহুর বিয়ের সময় থেকেই বেজে চলছে কিন্তু মেহেরের কথায় ফায়াজ ফোন তুলেনি।মেহেরের বাবা ফোন করছে।
ফায়াজ মেহেরের দিকে তাকাতেই মেহের বললো,
–লাউড স্পিকারে দিন।
ফায়াজ ফোন তুলতেই মেহেরের বাবা বলে উঠলো,
–ফায়াজ তুমিও?ওরা নাহয় ছোট বয়স কম,আবেগের বশে এসব করেছে কিন্তু তুমি?তুমি তো বাচ্চা ছেলেনা,বাইরের জগৎ সম্পর্কে তোমার যথেষ্ট ধারণা আছে।আমি তোমাকে যথেষ্ট বুদ্ধিমান একটা ছেলে ভেবে ছিলাম আর তুমি এমন ইমম্যাচুয়েটের পরিচয় দিলে?এমন একটা ষ্টুপিডের মতো কাজ করলে?

–বাবা আমি,,,

–তুমি আর কথাই বলোনা।তোমার কাছে আমি এটা আশা করিনি।

মেহের ফোন কেরে নিয়ে বললো,
–আব্বু,,যা বলার আমাকে বলো।এসবের মধ্যে ফায়াজকে জড়িওনা।কারণ ও এসবের সাথেও ছিলোনা পাচেও ছিলোনা।যা করার আমি একা করেছি।ও বরং আমাকে এসব করতে নিষেধ করেছিলো।আমিই শুনিনি।তাই ওকে কিছু বলোনা।ওকে দোষী ভেবোনা।

–আচ্ছা।এখন তাহলে স্বামীর অবাধ্য হওয়া হচ্ছে?এই শিক্ষা দিয়েছি?
এভাবে বদলা নিলি?মিহুকে গুটি বানিয়ে এভাবে শোধ তুললি?

মেহের অবাক হয়ে বললো,কিসের বদলা?তুমি আমার বাবা,তোমার সাথে আমার কিসের শত্রুতা?

–কিসের?বুঝতে পারছিসনা?তুই ফায়াজকে বিয়ে করতে চাসনি।তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছি তাই আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মিহুকে বিয়ে দিলি।

–আমি ফায়াজকে বিয়ে করতে চাইনি এটা ভুল।একচুয়েলি আমি কোনো দিন বিয়েও করতে চাইনি।আমার জীবন আমার সাথে যে মজা করেছে,,,।যাইহোক সেসব নাই বলি।বিয়ে দিয়েছো আমি ভালো আছি।এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই।আমি কোনো বদলা নেইনি।আমি শুধু আমার বোনকে সুখী দেখতে চেয়েছি।ব্যাস।
প্লিজ আব্বু,,

–তুই আমাকে আর আব্বু বলবি না।আজ তুই যা করেছিস তার পর তুই আমার মেয়ে হতে পারিস না।আমি তোকে কখনো ক্ষমা করবো না।
বলেই খট করে ফোন রেখে দিলো।

মেহেরের বুক ফেটে কান্না আসছে কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করে ফায়াজের হাতে ফোন দিয়ে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
ফায়াজ মেহেরের চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পেয়েছে কিন্তু আটকায়নি।ওকে কিছুক্ষণের জন্য একা থাকতে দেওয়া উচিত এটা ভেবে আর কিছু বলেনি।

মেহের ছাদে গিয়ে দাড়ালো।ঘুটঘুটে অন্ধকার।ছাদের লাইট অন করে দিলো।তবুও অন্ধকার ঘিরে ধরেছে।কেমন বাতাস বইছে,আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।কিছুক্ষণ পর পর দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।মেহের দুহাত মেলে চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে রইলো।

অনেক্ষন হলো মেহেরের কোনো খোজ নেই।ফায়াজ মেহেরকে পুরো বাড়ি খোজে ফেলেছে কিন্তু মেহেরের দেখা নেই।সার্ভেন্টারাও কেউ দেখেনি।ফায়াজের রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে।তখনই জানালা দিয়ে দেখে বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।ফায়াজের তখনই ছাদের কথা মনে পড়লো।ফায়াজ দৌড়ে ছাদে গেলো।ছাদে গিয়ে দেখে বৃষ্টিতে মেহের ছাদের ফ্লোরে হাটুর উপর মাথা রেখে বসে আছে।ফায়াজ দৌড়ে মেহেরের কাছে গিয়ে ওর পিঠে হাত রাখলো।মেহের মাথা তুলে ফায়াজকে দেখতে পায়,,,

চলবে,,,

(রোজা থেকে,পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে,তারাবি পড়ে,কোরআন শরীফ পড়ে এর চেয়ে বেশি লিখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়না।সেখানে ২পার্ট তো অনেক কিছু।দুঃখীত।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here