অনুভবে আজো তুমি🍁🍁 পর্ব-২৬

0
508

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
ফাবিহা নওশীন
পর্ব-২৬

ফায়াজ দু’হাতে চোখ মুছছে।ফায়াজকে এভাবে কাদতে দেখে মেহেরের ভিতরটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে।ও আর সহ্য করতে পারছেনা।ভালোবাসার মানুষ যতই কষ্ট দিকনা কেন,তাকে কষ্টে থাকতে দেখলে কলিজা পুরে যায়।মেহেরেরও তেমনই হচ্ছে।

মেহের ফায়াজের দুগালে হাত রেখে বললো,
–তুমি কেদোনা।তুমি যা চাইবে আমি তাই দেবো।সব দেবো।কি চাও তুমি বলো?একবার বলো?তোমার জন্য আমি হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দিতে পারি।প্লিজ তুমি কেদোনা।

ফায়াজ মেহেরের দুবাহু চেপে ধরে বললো,
–কি দিবি তুই?যা দেওয়ার তো দিয়েই দিয়েছিস।ধোকা দিয়েছিস।কম ভালোবেসেছিলাম তোকে?কি ছিলো না আমার?কিসের লোভে আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলি?কেন এতবড় ধোকা দিলি?কেন মিথ্যে ভালোবাসার অভিনয় করেছিস?

মেহের কাদতে কাদতে বললো,
–ফায়াজ আমি তোমার সাথে এক বিন্দু অভিনয় করিনি।আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসে ছিলাম।আজো ভালোবাসি।

ফায়াজ চোখমুখ লাল করে বললো,
–আচ্ছা তবে ধোকা কেন দিলে?কেন?কেন বিয়ে করে নিলে?

–আমি বিয়ে করতে চাইনি।আব্বু জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়েছিলো।তোমাকে আমি আর কতবার বলবো?আমি নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করিনি।

–নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করোনি?এক বছর এক বছর যাবত তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে ছিলো।এটা তুমি আমাকে জানাওনি।এই জন্যই তুমি প্রথমে আমার সাথে রিলেশনে যেতে চাওনি।কিন্তু যখন দেখলে আমি তোমার পিছ ছাড়ছিনা তখন নিজের সেইফটির জন্য আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করলে আর আমি যখন লন্ডন গেলাম তখনই বিয়ে করে নিলে?কি অদ্ভুত তাই না?

–আমি আমার বিয়ের কথা জানতাম না।বিশ্বাস করো।আমি জানলে তোমাকে জানাতাম।সেদিন রাতে তোমার সাথে আমার শেষ কথা হয় আর তার পরেরদিন আমার বিয়ে,,,

–হুম।তাই তো।সারারাত আমার সাথে কথা বললে আর পরেরদিন আব্বুর কথায় নাচতে নাচতে বিয়ে করে নিলে?আমাকে বোকা পেয়েছো তুমি?আমি সব জানি,সব।

–তুমি কিছুই জানোনা,,না জেনেই আমাকে দোষারুপ করছো।আমি সত্যিই জানতাম না।আমাকে একটু বিশ্বাস করো।কেন বিশ্বাস করতে চাইছো না?

–কারন তুই একটা মিথ্যাবাদি।আজ যদি তোর আগের হাসব্যান্ড বেচে থাকতো তাহলে তো তার সাথে সুখের সংসার করতি।এখন সে নেই তাই আমাকে ফুসলিয়ে হাতে নিতে চাইছিস?

–ফায়াজ,,

–চুপ আর একটা কথাওনা।সেদিন যদি বিয়ে না করতি তাহলে আজ আমাদের জীবন অন্য রকম হতো।সুন্দর একটা সংসার হতো।একটা বাচ্চা থাকতো।খুশিতে ভরপুর থাকতো আমার জীবনটা।কিন্তু তুই সব শেষ করে দিলি,,

মেহের আবারো কান্নায় ভেঙে পড়লো।
–কেন বিশ্বাস করছোনা?আমি সত্যিই জানতাম না।হটাৎ করেই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়,,

–আর তুই বিয়ে করে নিলি,,
একজনের সঙ্গে প্রেম অন্য জনের সাথে বিয়ে।
আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোকে ক্ষমা করার কিন্তু ওইদিন গুলোর কথা মনে পড়লে তোকে ঘৃণা হয়।তুই জানিস আমি যাওয়ার পর কি করেছিলাম।কিভাবে ছিলাম?কি হয়েছিলো আমার সাথে?খোজ নিয়েছিলি একবারো আমার?আমি মরে গেছি না বেচে আছি নিয়েছিলি?

মেহের চুপ করে আছে।এর জবাব ওর জানা নেই।

–কি হলো বল?বিয়ের পরের দিন তো তোর হাসব্যান্ড মারা গিয়েছিলো।তারপর,,তারপর কই ছিলি?আমার খোজ নিয়েছিলি?

–আমি সেরকম অবস্থায় ছিলাম না।

–রাইট,তুমি তো নিজের শোক পালনে ব্যস্ত ছিলে।নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলে।আমার কথা মনে ছিলো তোমার?ছিলো না।ফায়াজ নামে কেউ ছিলো এটাই মনে ছিলো না।

–তুমিও তো নেওনি।তুমি আমার খোজ নিয়েছিলে?নিলে ঠিকই জানতে পারতে।

–কিভাবে নিবো খোজ।ঠিকানা পাল্টে পুরো ফ্যামিলি পালিয়েছিলে।

–পালাবো কেন?পালানোর মতো কি করেছি আমি বা আমার পরিবার?আমরা আমাদের ফার্ম হাওজে ছিলাম।সেটারও কারন ছিলো।

ফায়াজ মেহেরকে ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল।তারপর আবারো দু-চোখে হাত দিয়ে কাদছে।
আর বলছে,
–অনেক চেষ্টা করেছি,অনেক।নতুন করে সব শুরু করার।তোমাকে ভালোবাসার,তোমাকে কাছে টানার।কিন্তু তোমাকে দেখলেই আমার পুরনো ক্ষতের কথা মনে পড়ে।তোমার দেওয়া আঘাতের কথা মনে পড়ে, তোমার করা প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে, যেগুলো তুমি একটাও রাখোনি।ঠকিয়েছো আমায়,

–তুমি ঠকাওনি?তুমি তো নিজের ভালোবাসাকে সত্য মানো।তাহলে তুমি কি করে পারলে অন্য নারীতে আসক্ত হতে?তুমি তো বলেছিলে তোমার মনে আর বুকে মেহের ছাড়া আর কারো জায়গা নেই।তাহলে ওই মেয়েগুলো,,,,আর তোমার রুমডেট?সেগুলো কি??

ফায়াজ চোখের পানি মুছে উঠে দাড়ালো।তারপর মেহেরের ঘাড়ে দুহাত রেখে টেনে কাছে এনে বললো,
–আমি আমার প্রতিশ্রুতি রেখেছি।আমি তোমার মতো নই।আমি আমার বুকে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে জায়গা দেইনি।ওরা আমার কেউ না।না আমার ওদের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে বা ছিলো।ওগুলো জাস্ট তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ড্রামা ছিলো।
আমি আর এভাবে বাচতে পারছিনা।তুমি শুধু একবার স্বীকার করো তুমি আমাকে ভালোবাসো নি।আমি এ বোঝা আর বইতে পারছিনা।আমি এসব থেকে মুক্তি চাই।তুমি সত্যি স্বীকার করলে আমি তোমাকে দ্বিতীয় চান্স দেবো।প্লিজ স্বীকার করো।আমি এই মিথ্যার মধ্যে বসবাস করতে পারছিনা।প্লিজ।

মেহের ক্লান্ত হয়ে গেছে বলতে বলতে কিন্তু ফায়াজ ওর চেয়ে ওর বন্ধুদের কথা বেশি বিশ্বাস করছে।তবুও শেষ বারের মতো শক্ত গলায় বললো,
–আমি তোমাকে ঠকাইনি।

ফায়াজ মেহেরকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।তারপর চিতকার করে বললো,
–আমি তোকে আর দ্বিতীয় চান্স দেবোনা।তুই তার যোগ্যই না।তোর মতো মিথ্যাবাদি আমার ভালোবাসা নয় ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য।আমি তোকে ঘৃণা করি।শুধুমাত্র ঘৃণা।
মেহের ফায়াজের চোখের দিকে চেয়ে আছে।ওর চোখে ঘৃণাই দেখতে পারছে।ফায়াজ রুম থেকে বের হয়ে গেলো।মেহের মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো।

🌺🌺

ফায়াজের ঘুম ভাংলো চুরির রিনিঝিনি শব্দে।চোখ খোলে দেখে মেহের হাসি হাসি মুখে ওর পাশে বসে আছে।পড়নে শাড়ি।দুহাত ভর্তি চুরি।ভিজা চুলে টিপটপ করে পানি পড়ছে।ফায়াজ অপলক নয়নে মেহেরকে দেখছে।হটাৎ ই ওর গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে।কিন্তু মেহেরকে দেখে ফায়াজ অবাক হয়ে যাচ্ছে।এ মেয়েকে দেখে মনে হচ্ছে গতকাল রাতে কিছুই হয়নি।ওরা নরমাল দম্পতি।ফায়াজ মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
মেহের হাসি মুখে বললো,
–কি হলো উঠবে না?আমি কখন থেকে কফি নিয়ে বসে আছি।
আর দেখো আমি কি সুন্দর সেজেছি।শুধু মাত্র তোমার জন্য।
ফায়াজ বেশ অবাক হলো তারপর বললো,
–আবার কি শুরু করেছো?মাথা ঠিক আছে?কি হয়েছে বলো তো।

–আরে বলবো বলবো,এত অস্থির হচ্ছো কেন?কিছুক্ষণের মধ্যেই সব বুঝে যাবে।দাড়াও তার আগে কফিটা খাই।গলা শুকিয়ে গেছে।
মেহের এক চুমুকে পুরো কফি শেষ করে ফেললো।
ফায়াজ মেহেরের কাজকর্ম কিছুই বুঝতে পারছেনা।শুধু মাত্র অবাকের পর অবাক হচ্ছে।
–কি করলে??
–ওপসস,,পুরোটা শেষ করে ফেলেছি।আসলে গলাটা বেশিই শুকিয়ে গিয়েছিলো।তুমি পরে খেয়ে নিও।
যাইহোক কি জানো বলছিলাম,ওহ হ্যা আমি কি করছি?
কি করছি,,নরমাল ওয়াইফরা যা করে।তুমি তো আমাকে ঘৃণা করো তাই না?
মেহের উঠে দাড়ালো।তারপর শাড়ির আচল নাড়িয়ে বললো,
–আজকে আমার লাল শাড়ি পড়তে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু তুমি তো মানা করেছো তাই খয়েরী রঙের শাড়ি পড়েছি।কেমন লাগছে বলো তো।
ফায়াজ বুঝতে পারছে কিছু একটা ঠিক নেই।কোনো গন্ডগোল আছে।
–কি হলো বলবে না?
–মেহের তোমার কি হয়েছে।এমন করছো কেন?
মেহের এবার স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো,
–আমি তোমাকে ভালোবাসি ফায়াজ কিন্তু তুমি আমাকে অবিশ্বাস করেছো,আমাকে ঘৃণা করো।
মেহেরের মাথা ঘুরছে।কেমন ঝাপসা ঝাপসা লাগছে।পড়ে যাবে তখনই ফায়াজ ওকে ধরে ফেললো।মেহের আর ফায়াজ ফ্লোরে বসে পড়ল।মেহের তখনো ফায়াজের হাতের উপর।
ফায়াজ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–কি হয়েছে?শরীর খারাপ লাগছে।
মেহের কেদে দিলো।তবে এ কান্নায় অনেক কষ্ট আর অভিমান মিশানো।
–ফায়াজ আমি হেরে গেছি।আমি তোমার ঘৃণা নিয়ে বেচে থাকতে চাইনা।আমি কফির সাথে পয়জন মিক্স করে খেয়েছি।আমাকে ক্ষমা করো।
মেহেরের কথায় ফায়াজের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
ফায়াজ চিতকার করে বললো,
–নো মেহের,নো।ইউ কান্ট ডো দিস।তুমি আমার সাথে এটা করতে পারোনা।প্লিজ ডোন্ট।তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারোনা।একবার চলে গিয়েছিলে,,আর নয়।আমি বাচতে পারবো না।
–সরি,ফায়াজ।
মেহের চোখ বন্ধ করে নিলো।ফায়াজ মেহেরকে কোলে তুলে রুম থেকে বের হয়ে চিতকার করে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললো।
গাড়িতে মেহেরকে নিজের কোলে নিয়ে কাদছে আর বলছে,
–মেহের চোখ খোলো প্লিজ।তোমার কিছু হলে আমি বাচতে পারবোনা।আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।রাগের মাথায় কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।তুমি তো জানো আমাকে,জানোনা?আমি রেগে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকেনা।তোমার কিছু হবেনা।আমি তোমার কিছু হতে দিবোনা।
সারারাস্তা ফায়াজ কাদতে কাদতে গেলো।

ফায়াজ হসপিটালের কডিটোরে মাথায় হাত দিয়ে বসে বসে কাদছে।তখনই মুহুর ফোন।কাউকে কিছুই জানানো হয়নি মেহেরের বিষয়ে।তাই জানাতে হবে।ফায়াজ চোখ মুছে ফোন রিসিভ করলো।অপরপাশ থেকে মিহু চিতকার করে কাদছে আর বলছে,
–আমার আপি কোথায়?
ফায়াজ মিহুর কান্না আর কথা শুনে অবাক।মিহু কিভাবে,,
–সিটি হসপিটালে।
–আমার আপির কিছু হলে আমি আপনাকে ছাড়বো না।
মিহু বোনের অবস্থা শুনে দৌড়ে ওভাবেই বেরিয়ে গেলো।নিজের প্রেগ্ন্যাসির কথা ভুলেই গেছে।আহিল মিহুকে ওভাবে দৌড়ে বের হতে দেখে ওর পিছু পিছু আসছে।

মিহু হসপিটালের কডিটোর ধরে দৌড়াচ্ছে।হটাৎ হুচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলেই নিজের বেবির কথা স্মরণ হয়।তারপর দৌড় থামিয়ে জোরে জোরে হাটা ধরলো।ফায়াজকে দেখেই ওর রাগে মাথা গরম হয়ে গেলো।
ফায়াজের সামনে গিয়ে কড়া গলায় বললো,
–আপনি সেই না,যাকে আপি ভার্সিটি লাইফে ভালোবেসেছিলো।ইনফ্যাক্ট এখনো বাসে।আপনি আপির সাথে এত বড় নোংরা খেলা কি করে খেলতে পারলেন।আপি তো বলেছিলো আপনি নাকি তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন।এই আপনার ভালোবাসা?
আপনি আপনার এই নোংরা খেলায় আমাকেও জরিয়েছিলেন।ছি ছি।আমার আপির কিছু হলে আমি আপনাকে ছাড়বোনা।জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে।প্রতিটি কষ্টের শাক্ষি আমি।আপনিও শেষে এভাবে,,,

ফায়াজ চুপ করে আছে।তারপর মাথা নিচু করে জিজ্ঞেস করলো,
–তুমি কি করে,,,

মিহু একটা কাগজ ফায়াজের হাতে গুজে দিলো।ফায়াজ কাগজটা খোলে মেহেরের হ্যান্ড রাইটিং দেখে।একটা চিঠি লিখেছে মিহুকে।

🌺🌺
মিহু,,
আমার কলিজা।আমি এই পৃথিবীতে যে দুইজন মানুষকে বেশি ভালোবাসি তার মধ্যে তুই একজন।আমি তোর জীবনটা নিজের হাতে গুছিয়ে দিতে পেরে যে কতটা খুশি তা আমি তোকে বলে বুঝাতে পারবোনা।দেখতে দেখতে রাজকন্যাটা কত বড় হয়ে গেছে।তুই এখন নিশ্চয়ই ভাবছিস আপি কি পাগল হয়ে গেছে??আমাকে এসব বলার জন্য চিঠি লিখেছে কেন?আসলে আমি তোকে কিছু কথা বলতে চাই যা সামনাসামনি বলা সম্ভব হচ্ছেনা।তুই শুধু আমার বোনই না।আমার প্রিয় বন্ধু,আমার পার্সোনাল ডাইরি।যে আমার জীবনের প্রতিটি কোনা জানে।যার সাথে আমি আমার জীবনের সবটা শেয়ার করি।কিন্তু আমি তোকে একটা কথা গোপন করেছি।সেটা কি জানিস, তোর ফায়াজ ভাইয়া।হুম ফায়াজ যাকে আমি এই পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি ভালোবাসি।তুই কি জানিস এই ফায়াজ আমার সেই ফায়াজ যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।ইনফ্যাক্ট এখনো বাসি।আজীবন বাসবো।জানবি কি করে তোকে তো জানাইনি।তাহলে এখন তুই ভাবতে পারিস,এই যদি আমার সেই প্রেম হয় তবে আমি সেদিন বিয়ে করতে চাইনি কেন?
কি করে চাইবো?ততদিনে আমার জীবনের সমস্ত রং হারিয়ে গেছে।এমন রংহীন জীবন আমি ওর উপর চাপিয়ে দিতে চাইনি।আর তাছাড়া আমি ওকে যতটুকু চিনি ও আমাকে স্বাভাবিক ভাবে বিয়ে করছেনা সেটা জানতাম।তবুও বিয়েটা হয়ে গেলো।সেটাই হয়েছে ও আমাকে স্বাভাবিক কারনে বিয়ে করেনি।ও বদলা নিতে চেয়েছে।ও ভেবেছে আমি ওকে ঠকিয়েছি।এতে আমি ওকে দোষ দিচ্ছিনা।ওর কি দোষ?ও তো জানেনা আমার সাথে কি হয়েছিলো।যদিও বলেছিলাম কিন্তু ও বিশ্বাস করেনি।ও তো শুধু আমাকে ভুল বুঝেছে।তবুও আমি হ্যাপি ছিলাম।ফায়াজ আমার ভালোবাসা আমার পাশে আছে।ভালোবাসার মানুষের সাথে দ্বিতীয় বার সংসার করার সুযোগ কতজনে পায়।ভেবেছিলাম আমার ভালোবাসা দিয়ে ওর মনের ঘৃণা মুছে ভালোবাসার ফুল ফুটাবো কিন্তু পারিনি।এ আমার ব্য্রর্থতা।আমি হেরে গেছি।আমি ওর চোখে আমার জন্য ঘৃণা দেখতে পেয়েছি।গতকাল রাতে ওর মনে অধিক মাত্রায় ঘৃণা দেখেছি যা আমি সহ্য করতে পারিনি।আমি ওর ঘৃণা নিয়ে বেচে থাকতে চাইনা।তাই চলে গেলাম।তবে এতে ফায়াজের দোষ নেই।ওকে এর জন্য দোষারোপ করবিনা।ভালো থাকবি।বেবির খেয়াল রাখিস।আবারো বলছি এর জন্য ফায়াজকে দায়ী করবিনা।আমি নিজেই এর জন্য দায়ী।আমার জীবনের উপর আমি খুবই তিক্ত,বিরক্ত।তাই মুক্তি দিয়ে দিলাম।ওকে বলিস আমি ওকে খুব ভালোবাসি।

তোর আপি মেহের।
🌸🌸

ফায়াজ চিঠি পড়ে ধপ করে বসে পড়ল।হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেলো।দু’হাতে মুখ চেপে কান্না করছে।
–এখন কেদে কি হবে?দোয়া করুন আপির যেন কিছু না হয়।আপনি আপির সাথে অনেক অন্যায় করেছেন।ঠিক করেন নি।
আপি আপনাকে ঠাকায়নি।সেদিন কি হয়েছিলো শুনুন।

মিহু বলতে শুরু করলো,,,
সেদিন আপি ভার্সিটি থেকে ফিরেছে,আমিও কোচিং থেকে ফিরেছি।দুজনের গেইটের সামনে দেখা।দুজন এক সাথে বাসায় ঢুকেই দেখি কোনো কিছুর তোরজোর আয়োজন চলছে।আমি আর আপি অবাক হয়ে আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম তখন ছোট ফুপিকে দেখলাম।তিনি বললেন ওনারা বেড়াতে এসেছেন,আগামীকাল বড় ফুপি তার ছেলেমেয়েরা,আমার মামা,খালারা সবাই আসবে তাই এ আয়োজন।আমরাও বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাইনি কারণ বছরে দু-এক বার সব আত্মীয়রা আসে আর ৭করে থেকে যায়।এমন আয়োজন চলে।রাতে ১২টার পর আপি আমার রুমে এসে বলে তার ভালো লাগছেনা আমার সাথে ঘুমাবে।তারপর আমরা দুবোন ঘুমিয়ে পড়ি।সকালে উঠে আমি ফ্রেশ হয়ে রেডি হচ্ছি কিন্তু আপির উঠার খবর নেই।আমি জিজ্ঞেস করতেই আপি বললো, তার মন খারাপ।সে আজ ভার্সিটি যাবেনা।কিছু একটার শোক পালন করছে।আমি রেডি হয়ে রুম থেকে বের হতেই আম্মু বললো, আমি যেন আজ বাড়ি থেকে বের না হই।আজ নাকি আপির বিয়ে।কথাটা শুনে আমি কয়েক মিনিটের জন্য অনুভূতি শূন্য হয়ে পরি।দৌড়ে গিয়ে আপিকে বলি।আপি ভেবেছে তার মন খারাপ তাই আমি তার মন ভালো করার জন্য এসব বলছি।কিন্তু আমি যখন কান্না শুরু করে দি তখন আপি ভয় পেয়ে যায়।আর তখনই আম্মু আসে।
আপি আম্মুকে জিজ্ঞেস করে কি চলছে।আম্মু বলে,
আজকে আপির বিয়ে।আপি যেন নাস্তা করে গোসল করে রেডি থাকে পার্লার থেকে সাজাতে আসবে।আম্মুর কথা শুনে আপি কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।আর কেন এমন করছে জিজ্ঞেস করে।কেন তাকে জানানো হয়নি।তখন আম্মু বলে,
জানা জানির মতো অবস্থা নাকি আপু রাখেনি।আর আপির নাকি ১বছর যাবত বিয়ে ঠিক।গত সপ্তাহে আব্বু বিয়ের ডেট ফিক্স করেছে।অথচ আমি কিংবা আপি কেউই কিছুই জানিনা।আমাদের জানানো হয়নি।আপি জিজ্ঞেস করে কি এমন হয়েছে যে ওনারা এমন করছে।তখন আম্মু বলে তোর আব্বুকে জিজ্ঞেস কর আর তোদের সব ফোন, ট্যাব,ল্যাপটপ আমার কাছে দে।এ বলে আম্মু আমদের দুবোনের সবকিছু নিয়ে যায়।আপি কাদতে কাদতে আব্বুর কাছে যায় আমিও পিছু পিছু যাই।
আপি জিজ্ঞেস করে কেন এমন করছে?
তখন আব্বু বলে,
তোকে জানানোর মতো পর্যায়ে তুই আছিস?আমি কি স্বাদে তোর বিয়ে এভাবে দিচ্ছি।তুই কি ভেবেছিস তুই ভার্সিটি গিয়ে কি করিস আমি কিছুই জানিনা।গুন্ডা বদমাশ ছেলেদের সাথে মিশিস,ওদের সাথে ঘুড়ে বেরাস।আর আমার কানে কিছুই আসবেনা।কবে কি করে বসবি,আমার নাক কান কাটবি।নিজের জীবন শেষ করে দিবি তাই মান সম্মান থাকতে যাদের আমানত তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি।
আপি বলে,
–তুমি তো আমাকে কোনো দিন বলোনি আমার বিয়ে ঠিক করা আছে।কার সাথে কি,কিছুই জানি না।আমি এ বিয়ে করবোনা।
আব্বু বলে,তোর জানতে হবেনা।আমি অযোগ্য কারো হাতে তোকে তুলে দিচ্ছিনা।ছেলে যথেষ্ট ভালো,শিক্ষিত,হাই সোসাইটির।
আপি তারপর আব্বুর পায়ে পরে যায়।আর কাদতে কাদতে বলে,আব্বু প্লিজ,আমি এ বিয়ে করতে পারবোনা।
আব্বুর মন গলেনি।আব্বু আপিকে টেনে তুলে আম্মুর কাছে নিয়ে যায় আর বলে মেয়েকে সামলাও।উল্টো পাল্টা কিছু করলে তার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।আর ছোট ফুপিকে বলে আমাদের উপর নজর রাখতে যেন আমরা আজ এ বাড়ি থেকে বের হতে না পারি কিংবা বাইরে যোগাযোগ না করতে পারি।
আপি আমাকে জড়িয়ে অনেক কেদেছে।আর বলেছে,
আমি ওনাকে অনেক ভালোবাসি।আমি অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবোনা।ওনি যদি জানতে পারে আমার বিয়ে হয়ে গেছে তবে মরে যাবে।
আমি সেদিন অসহায় ছিলাম কিছুই করতে পারিনি।আমাদের উপর ফুপি সব সময় নজর রাখতো।অবশেষে আপি বিয়ে হয়ে গেলো।
আর বিয়ের পরেরদিন আমি যখন ওবাড়ি যাই আপি বলে আজ আমাদের বাড়িতে আসার পর সুযোগ পেলেই আপি পালাবে।আপনাকে সব বললে আপনি মেনে নিবেন,ফিরিয়ে দিবেন না।কিন্তু বৌভাত শেষ হতে না হতেই ওর হাসব্যান্ড হার্ট এটাক করে মারা যায়।তখন আমরা ওখানেই ছিলাম।ও বাড়ির সবাই আপিকে যা তা বলে।অলক্ষী,অপয়া বিভিন্ন আজেবাজে কথা বলে।আপি সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দেয়।আমি দেখে ফেলি।তারপর আপিকে রাতে হসপিটালে নেওয়া হয়।প্রায় পরের দিন আপির জ্ঞান ফিরে।আমাদের মানসিক অবস্থার কারণে আমরা ফুপির বাসায় কিছুদিনের জন্য শিফট করি।আপি শারীরিক ভাবে সুস্থ হলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।সাইকোলজিস্ট দেখালে ওনি বলে মানসিক আঘাতের ফলে এমন হয়েছে।ওনার চেঞ্জ প্রয়োজন।তাই আমরা সিলেটে আমাদের ফার্ম হাওজে শিফট করি।
আপি চুপচাপ এক জায়গায় বসে অপলক নিচের দিকে চেয়ে থাকতো,নড়তোনা।কারো সাথে কথা বলতোনা।খেতোনা।কিছুই করতো না।জোর করে মুখে দিলেও চাবাতোনা।সব সময় আপির পাশে বসে থাকতাম।জোর করেও কোথাও নিতে পারতাম না।মাঝে মসঝে ডুকরে কেঁদে উঠতো।মাঝরাতে হটাৎ করে চিতকার করে উঠতো।
প্রায় একবছর চিকিৎসার পর আপি সুস্থ হয়।আমরা ফিরে আসি।কিন্তু আপি আর আগের মতো হয়নি।চুপচাপ থাকতো।বেশি কথা বলতোনা।আব্বু আপিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ভার্সিটিতে এডমিশন করে দেয়।আস্তে আস্তে আপি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।তারপর আপনি আসেন।
আপির ভালোবাসার পূর্ণতা পায়নি তাই আমার বিয়ে আব্বুর ইচ্ছের বিরুদ্ধে দেয়।যাতে আমি আপির মতো কস্ট না থাকি।

ফায়াজ সবকিছু শুনে নির্বাক।ও হাটছে।শুধুই হেটে চলেছে।মিহুও আটকায়নি।ফায়াজ হেটেই চলেছে কিন্তু কোথায় যাচ্ছে জানেনা।

চলবে,,

((জানি আজকের পর্ব অনেকেরই পছন্দ হবেনা।কিন্তু আমি এভাবেই সাজিয়েছি।দুজনেই কষ্ট পেয়েছে কিন্তু মেহের একটু বেশি কষ্ট পেয়েছে।ফায়াজ ওর উপর অনেক মেন্টাল টর্চার করেছে।ভালোবেসেছে কিন্তু বিশ্বাস।ও কিছুটা হলেও শাস্তি প্রাপ্য।তাই ওকে কিছুটা শাস্তি দিচ্ছি।))

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here