অনুভবে আজো তুমি🍁🍁 পর্ব-৭ + ৮

0
211

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
পর্ব-৭ + ৮
ফাবিহা নওশীন

মেহের কিছু না বলে ফায়াজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে উপরে চলে গেলো।দরজা লক করে কাদতে লাগলো।
ফায়াজ ওর পিছু পিছু এলো।দরজায় কিছুক্ষণ কান পেতে রইলো।ও মেহেরের কান্নার শব্দ পেলো।
তারপর বাড়ির বাইরে গিয়ে দাড়ালো।রাতের বেলার চারদিক নিস্তব্ধ।এই নিস্তব্ধতা ফায়াজকে গ্রাস করে ফেলছে।হু হু করে বাতাস বইছে।খুব সিগারেটের পিপাসা পেয়েছে।ফায়াজ একটা সিগারেট নিয়ে জ্বালালো।এক টান দিয়ে ফেলে দিলো।ওর সিগারেট খেতেও ভালো লাগছে না।
চোখের কোনে পানি জমেছে।আংগুল দিয়ে চোখের কোন থেকে পানি এনে হাহা করে হেসে দিলো।
–মেহের তোমাকে কষ্ট দিতে আমারও কষ্ট হয় কিন্তু তুমি যে আমাকে বদলে দিয়েছো।আমি বলদে গেছি চাইলেও আর ফিরে আসতে পারবোনা।তোমাকে ভালোবেসেছিলাম আর তুমি আমাকে ব্যবহার করে চলে গেলে।কি দোষ ছিলো আমার?
পুরনো দিনের কথা মনে পড়লেই আমার বুকটা ফেটে যায়।তখন শুধু মনে হয় তোমাকে আমার কষ্টের ভাগিদার হতে হবে।যে আগুনে তুমি আমায় জ্বালিয়েছো তাতে তোমাকেও জ্বলতে হবে।

মেহের চোখেমুখে পানি দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো।চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো তারপর নিজেকে নিজে বলছে
–আমি আর ফায়াজকে নিয়ে ভাববোনা।ওর কাছে যখন আমার কোনো মূল্য নেই আমি আর ওকে নিয়ে ভাববো না।আমিই ভুল,ও আর আমাকে ভালোবাসে না।যদি ভালো বাসতো তবে অন্য মেয়েতে আসক্ত হতে পারতো না।অনেক হয়েছে,,আমি আর চেষ্টা করবোনা ওকে ফেরানোর।ও যা ইচ্ছে করুক।তবে অপেক্ষা করবো।কারণ আমার ভালোবাসায় ফায়াজ তুমি ছিলে,আছো,থাকবে।কেননা আমার #অনুভবে_আজো_তুমি আছো।

মেহের সকালে চুপচাপ নাস্তা বানিয়ে কফি দিয়ে নিজের কাজ করতে থাকে।ফায়াজ কয়েকবার আড় চোখে তাকালো।কিন্তু মেহের তার কাজে ব্যস্ত।
ফায়াজ নিজের সেই টিশার্ট ময়লার ঝুড়িতে কুটি কুটি করে কাটা অবস্থায় দেখলো।
–মেহের,,আমার টিশার্ট ময়লার ঝুড়িতে কেন?
মেহের সবজি কাটতে কাটতে বললো,
–অনেক ময়লা হয়েছে তাই।
–ময়লা হলে মানুষ ওয়াশ করে এভাবে কাটে?
মেহের আরও গম্ভীরমুখে বললো,
–অনেক ময়লা হয়েছিলো যা ওয়াশিং মেশিনে দিলেও সাফ হতো না তাই ফেলে দিয়েছি।কেউ যাতে ডাস্টবিন থেকে তুলেও না পড়তে পারে তাই কেটে ফেলে দিয়েছি।

ফায়াজ আর কিছু বললো না।রেডি হয়ে রাগে গজগজ করতে করতে অফিসে চলে গেলো।
বিকেল বেলায় মেহের পুলের পাশে বসে আছে।পানিতে বরাবরই ভয় পায় কারণ সাতার জানেনা।তাই কিছুটা দুরত্বে বসেছে।
একটা কালো গাড়ি গেইট দিয়ে ঢুকলো।মেহের বুঝতে পারলো ফায়াজ এসেছে।ওদিকে না তাকিয়ে পানির দিকে চেয়ে রইলো।
ফায়াজ গাড়ি থেকে নেমে মেহেরকে দেখে এগিয়ে আসছিলো তখনই একটা ফোন এলো।ফায়াজ ফোনে কথা বলতে বলতে পুলের পাশে গিয়ে দাড়ালো।
মেহের চোখের কোনা দিয়ে ফায়াজকে ফোনে কথা বলতে দেখে।
–জিএফদের সাথেই নিশ্চয়ই কথা বলছে।ওর জিএফকে যদি এই পানিতে চুবাতে পারতাম।উফফ ওই মেয়েদের কি বলবো।এই ব্যাটাকে চুবানো দরকার।
ফায়াজ কথা বলতে বলতে পুলের কিনারে এসে দাড়িয়েছে সে খেয়ালই নেই।সে তো ফোনে ব্যস্ত।কথা বলতে বলতে এক পা আগাতেই ধপাস করে পানিতে পড়ে গেলো।
মেহের চমকে ফায়াজের দিকে চেয়ে দেঝে ফায়াজ পড়ে গেছে।মেহের আর হাসি চাপিয়ে রাখতে পারছেনা।দাড়িয়ে হাহা করে হেসে দিলো।হাসি থামাতেই পারছে না।অপরদিকে পানিতে পড়ে ফায়াজের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে তারউপর মেহের হাসছে যা ওর মেজাজ আরও খারাপ করে দিলো।ইচ্ছে করছে মেহেরকে পানিতে ফেলে দিতে।
ফায়াজ মেহেরকে ডাকছে।
–মেহের তোমার ওই পাগলের মতো হাসা শেষ হলে আমাকে উঠতে সাহায্য করো।
মেহের অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে ফায়াজের দিকে এগিয়ে গেলো।
মেহের ফায়াজের দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিলো।ফায়াজ ওর হাত ধরে টান দিয়ে পানিতে ফেলে দিলো।
মেহের আআয়ায়াহ করে চিতকার করে পানিতে পড়ে গেলো।ওর ওড়না পড়ে পায়ের সাথে পেচিয়ে গেছে।এতটাই ভয় পাচ্ছে যে মনে হচ্ছে পানিগুলো ওকে খেয়ে ফেলবে।শ্বাস ও নিতে পারছেনা।নাক-মুখ দিয়ে পানিও ঢুকেছে।মেহের চিতকার করছে,
–ফায়াজ বাচাও,আমি সাতার জানিনা।ডুবে যাচ্ছি।
ফায়াজ বাকা হেসে বলে,
–এখানে এতটাও পানি নেই যে তুমি ডুবে যাবে।খুব মজা লাগছিলো না,,এবার মজা করো।
মেহের কোনো রকমে ফায়াজের কাছে এসে ফায়াজকে আঁকড়ে ধরলো।
–মেহের ছাড়ো,,
মেহের ফায়াজকে জরিয়ে ধরে ওর পিঠে খামচে ধরে রাখে যাতে ফায়াজ ওকে ছাড়াতে না পারে।
–ফায়াজ প্লিজ আমাকে ছাড়বেন না।আমার খুব ভয় করছে।আমি পানি খুব ভয় পাই।আমি বাথটাবে পর্যন্ত গোসল করিনা।আমি শ্বাস নিতে পারছিনা।
মেহের ফায়াজকে আরোও শক্ত করে ধরে কান্না শুরু করে দিলো।ওর মাথা ফায়াজের বুকে গুজে রাখলো,দুপা ফায়াজের পায়ের উপর রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
হটাৎ ফায়াজের কি হলো ও মেহেরকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।মেহের হাফাচ্ছে।তাই দ্রুত ওর নিশ্বাস উঠানামা করছে।ফায়াজের মনে হচ্ছে মেহেরের প্রতিটা নিশ্বাস ওর বুকের ভেতর গিয়ে বিধছে।প্রতিটা নিশ্বাস ওর সাথে মিশে যাচ্ছে।ফায়াজের ইচ্ছে করছে মেহেরকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে।মেহেরও এক ঘোরের মধ্যে চলে গেলো।ফায়াজের বুকের ধুকধুকানি মেহের স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।ফায়াজকে কখন থেকে জড়িয়ে আছে ওর খেয়ালই নি।হটাৎ ই মেহেরের খেয়াল হলো।চোখ মেলে চেয়ে ফায়াজকে ছেড়ে দিয়ে দাড়াতে গেলেই মেহের তাল না রাখতে পেরে পড়ে যেতে লাগলো।ফায়াজ ওকে ধরে ফেললো।ওর মুখের উপর ভিজা চুলগুলো দলা পাকিয়ে রয়েছে।ফায়াজ ওর মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে।ওর স্পর্শ পেয়ে মেহের চোখ বন্ধ করে ফেললো।মেহের ফায়াজকে চুম্বকের মতো টানছে।ফায়াজ ধীরে ধীরে মেহেরের কাছে এগুচ্ছে।
–আমাকে উপরে উঠিয়ে দিন প্লিজ।
মেহেরের কথায় ফায়াজের ঘোর ভাংলো।ফায়াজ মেহেরকে কোলে তুলে উপরে উঠিয়ে দিলো। উপরে উঠে ফায়াজকে লক্ষ্য করে বললো,
–আমার ওড়না।
–তুমি যাও আমি নিয়ে আসছি।
মেহের চলে গেলো।ফায়াজ ওভাবেই পানির মধ্যে দাড়িয়ে আছে।
–ফায়াজ হটাৎ কি হলো তোর?কি করছিলি তুই?আজ যা হয়েছে খুব খারাপ হয়েছে।তোর ভেতরে এমন ফিলিংস আনা উচিত হয়নি।এই ফিলিংস তোকে আবার মেরে ফেলবে।তাই সাবধান।শরীরের টান আর মনের টান এক নয়।আমার মেহেরের প্রতি যে ফিলিংস ছিলো সেটা শুধুমাত্র শরীরের টান ছিলো না।মনের টান ছিলো।
ফায়াজ পুলের কিনারে এসে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।

মেহের ফ্রেশ হয়ে বের হয়েও ফায়াজকে কোথাও দেখতে পেলো না।ভাবলো ফায়াজ হয়তো অন্য রুমে চেঞ্জ করছে।মেহের চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো।ফায়াজকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।মেহের পুলের দিকে চেয়ে চমকে গেলো।ফায়াজ এখনো উঠে নি।
–এই ছেলের সমস্যা কি?এখনো উঠেনি কেন?ঠান্ডা লেগে যাবে সেই খেয়াল আছে।
মেহের বারান্দা থেকে ফায়াজকে ডাকছে।কিন্তু ফায়াজের পাত্তাই নেই।তাই মেহের নিচে নেমে বাইরে গেলো।
–ফায়াজ,,
ফায়াজের কোনো সাড়া নেই।মেহের কোনো উপায় না দেখে ওর মাথায় হালকা করে ধাক্কা দিলো।ফায়াজ চোখ মেলে মেহেরের দিকে বিরক্তি নিয়ে চেয়ে বলে,
–কি হয়েছে?
–না,মানে অনেক ক্ষন যাবত ডাকছি কোনো রেসপন্স নেই।
–বেচে আছি,মরি নি।
–এভাবে বেশিক্ষণ পানিতে থাকলে ঠান্ডা,জ্বর লেগে যাবে।উঠুন।
–আমাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবেনা।যাও এখান থেকে।বিরক্ত করোনা।
মেহের আর কিছু না বলে চলে গেলো।কিন্তু ওর কিছুতেই শান্তি লাগছেনা।খুব টেনশন লাগছে।ফায়াজ এখনো আসেনি।এতক্ষণ পানিতে থাকলে শরীর খারাপ করবে।ফায়াজ প্রায় এক ঘন্টা পর মেহেরের ওড়না হাতে রুমে ঢুকলো।ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুনা খেয়েই শুয়ে পরলো।২ঘন্টা পর উঠে হালকা ড্রিংক করে আবার শুয়ে পরলো।মেহের খাবারের কথা বলতে খাবে না বলে জানিয়ে দিলো।

পরের দিন সকালে মেহের কফি নিয়ে রুমে এসে দেখে ফায়াজ এখনো শুয়ে আছে।মেহের ওকে ডাকেনি হয়তো অফিসে যাবেনা,কাজ নেই তাই ঘুমাচ্ছে ভেবে আর ডাকেনি।
দুপুর হয়ে যাচ্ছে তবুও ফায়াজ উঠছে না দেখে মেহেরের একটু চিন্তা লাগছে।
মেহের ফায়াজকে অনেকবার ডাকলো কিন্তু সাড়া পেলোনা।তারপর ডাকার জন্য শরীরে হাত দিতেই মেহের অবাক,,,

চলবে,,,

(আগামীকাল অতীত থেকে ঘুরে আসবো।ঘুরে আসতে কয়েকদিন সময় লাগবে।আপনারা সময় নিয়ে আসবেন।😐😐)

#অনুভবে_আজো_তুমি🍁🍁
পর্ব-৮
ফাবিহা নওশীন

মেহের ফায়াজের গায়ে হাত দিয়ে প্রচন্ড গরম অনুভব করলো।তারপর কপালে,গলায় হাত দিলো।মেহেরের আর বুঝতে বাকি রইলো না ফায়াজের প্রচন্ড জ্বর।মেহের ভয়ে আতকে উঠলো।কি করবে বুঝতে পারছেনা।কেমন অস্থির লাগছে।
ফায়াজের দুগালে হাত রেখে কিছুটা ঝাকিয়ে ফায়াজকে ডাকতে লাগলো।ফায়াজ আদো আদো করে চোখ মেলে তাকালো।মেহের উত্তেজিত হয়ে বললো,
–আপনি ঠিক আছেন?
ফায়াজ চোখ বন্ধ করে বললো, হুম।

মেহের তাড়াতাড়ি থার্মোমিটার নিয়ে এসে ফায়াজের মুখে রাখলো।চেক করে দেখলো ১০৩ডিগ্রি।তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন করলো।
ডাক্তার আসতে আসতে মেহের জলপট্টি দিচ্ছে।
ডাক্তার এসে একটা ইঞ্জেকশন পুশ করে কিছু মেডিসিন প্রেসক্রাইভ করলো।মেহের ওয়াচম্যানকে দিয়ে ওষুধ আনিয়ে নিলো।

মেহের স্যুপ বানিয়ে এনে ফায়াজকে উঠে বসতে বললো।ফায়াজ উঠছে না।
–কি হলো উঠুন।
–আমার কিছু প্রয়োজন নেই।বিরক্ত করোনা।ঘুমাতে দেও।
–স্যুপটা খেয়ে মেডিসিন নিয়ে তারপর শুয়ে থাকুন।
–এই মেয়ে তুমি এতো বিরক্ত করছো কেন?
মেহের ফায়াজের সামনে স্যুপ ধরলো।
ফায়াজ রাগে ছুড়ে ফেলে দিলো।তারপর রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
–তোমার কাছে আমি এই ঘাসলতা খেতে চেয়েছি?শুধু বলেছি আমাকে বিরক্ত করোনা।যাও এখান থেকে।

মেহের আনমনে বলে উঠলো,
তেজ কতো??শরীরে এত জ্বর নিয়ে এতো তেজ কই পায়?জানলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আসতাম।
–তুমি আবার আমাকে মনে মনে বকছো?
–আমি স্যুপ নিয়ে আসছি।স্যুপ খেয়ে,মেডিসিন নিয়ে সুস্থ হয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।

মেহের আবার স্যুপ নিয়ে এলো।তারপর ফায়াজকে জোর করে আধশোয়া করে স্যুপ খাওয়াচ্ছে।যদিও ফায়াজ খেতে চাইছেনা।
ফায়াজ স্যুপ খেয়ে গরগর করে মেহেরের উপর বমি করে দিলো।মেহের হা হয়ে ফায়াজের দিকে তাকালো।ফায়াজ অপরাধীর দৃষ্টিতে মেহেরের দিকে তাকালো।মেহেরের অনেক মায়া হলো ফায়াজের চেহেরা দেখে।ফায়াজের চেহেরা দেখে মেহের ফিক করে হেসে দিলো।ফায়াজ অবাক হয়ে মেহেরের হাসি দেখছে ও ভেবেছিলো হয়তো মেহের চিল্লাচিল্লি করবে।কিন্তু সেটা না করে মেহের ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।তারপর ফায়াজকে পরিস্কার করে ওষুধ দিয়ে রান্না করতে চলে গেলো।কাজ করে এসে ফায়াজকে ডাকতে লাগলো।

ফায়াজ কিছুটা বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে বললো,
–আবার কি?দেখো আমার ভালো লাগছে না।
মেহের কিছুটা ইতস্তত হয়ে বললো,
–ডাক্তার আপনার শরীর হালকা গরম পানিতে মুছতে বলেছে।
–আমার উঠার মতো এনার্জি নেই।
বলেই কম্বল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো।মেহের কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে,,
মেহের বালতিতে করে পানি এনে বেডের পাশে রাখলো।তারপর ফায়াজের মুখের উপর থেকে কম্বল সড়িয়ে দিল।ফায়াজ বিরক্তের সাথে কিছুটা করুন সুরে বললো,
–প্লিজ মেহের,,আমার সত্যিই অনেক খারাপ লাগছে।এভাবে আমাকে জ্বালতন করোনা।

–দেখুন,ডাক্তারের কথামতো চললে আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন।তাই কষ্ট হলেও মানতে হবে।তাছাড়া আপনাকে এভাবে বেডে শুয়ে থাকা মানায় না।আমার ভালো লাগছে না।
ফায়াজ বললো,
–তোমার কেন ভালোলাগছে না?
মেহের উত্তরে কিছু না বলে বললো,
–শার্ট খুলুন।
ফায়াজ শার্টের গুতাম খুলতে লাগলো।মেহের অন্যদিকে চোখ ফুরিয়ে নিলো।তারপর ভাবতে লাগলো,
–হায় আল্লাহ,,আমার তো এখনি আনইজি লাগছে।আমি ওনার শরীর কিভাবে মুছিয়ে দেবো।

ফায়াজ শার্ট খুলে বললো,
–আমার শার্ট খোলা শেষ।তোমার ধ্যান শেষ হলে কাজ শুরু করো।
মেহের ফায়াজের দিকে ঘুরতে পারছেনা।মেহের উঠে গিয়ে একটা কাপড়ের টুকরো এনে চোখে বাধতে নিলে ফায়াজ টান মেরে নিয়ে নেয়।তারপর বলে,
–এতো ঢংয়ের দরকার নেই।আমার শরীর তোমার মুছাতে হবে না।আমার শরীরের দিকে তাকালে ওনার চোখ ক্ষয় হয়ে যাবে।গলে গলে পড়বে।
ফায়াজ শার্ট পড়তে শুরু করলো।মেহের ওকে থামিয়ে দিলো।তারপর তোয়ালে ভিজিয়ে ফায়াজের মুখ,গলা,শরীর মুছিয়ে দিচ্ছে যদিও মেহেরের অনেক অস্বস্তি লাগছে কিন্তু কিছু করার নেই।মেহের ফায়াজের মাথায় পানি দিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছে।মুছানোর অজুহাতে বারবার ফায়াজের চুলগুলো নাড়ছে।ফায়াজের চুলগুলো অনেক সফট,সিল্কি।মেহেরের খুব ভালো লাগছে।
–তুমি কি বাচ্চাদের মতো আমার চুল নিয়ে খেলতে শুরু করে দিলে?
মেহের হাসি হাসি মুখে বললো,
–আপনার চুলগুলো খুব সুন্দর।
–সে আমি জানি।কেউ একজন বলেছিলো আমার চুল খুব সুন্দর।তার নাকি খুব ভালো লাগে।
হটাৎ করেই মেহেরের মুখ কালো হয়ে গেলো।ও ফায়াজের চুল ছেড়ে দিলো।তারপর খাবার খাইয়ে মেডিসিন দিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেলো।

অতীত,,৪বছর আগে,,

ডিসেম্বর মাস,
মেহের সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।মেহেরের মনের ভিতর এক চাপা উত্তেজনা কাজ করছে।আজকে ওর ভার্সিটির প্রথম দিন,প্রথম ক্লাস।সকাল সকাল উঠে রেডি হচ্ছে।বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু কি পড়ে যাবে,কিভাবে যাবে তাই ভেবে চলেছে।তারপর অনেক ভেবে চিন্তে তার পছন্দের লাল রংয়ের ড্রেসটা চয়েজ করেছে।মেহের ফ্রেশ হয়ে লাল লং টপস,কালো জিন্স,স্টাইল করে কালো স্কাপ বেধে ফেলল।তারপর বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছে।

বড় বোনের এমন কান্ড দেখে মিহু বিরক্ত হয়ে বললো,
–আপি,ভার্সিটি যাচ্ছো বিএফের সাথে ডেট করতে নয়।সো প্লিজ।
মেহের ঘুরে ভ্রু কুচকে বললো,
–তোর কোনো সমস্যা??তুই আমাকে এত হিংসে করিস কেন বল তো?
–উফফ,আপি।আচ্ছা এখন বলো তো পার্লারে থেকে মেয়ে নিয়ে আসি।তোকে সাজিয়ে দিবে।
–আমি কি বিয়ে খেতে যাচ্ছি নাকি?আমি কোনো সাজগোজ করবোনা।জানিস ই তো এসবে আমার কি পরিমাণ এলার্জি।
–আপি তাই বলে এভাবে?একটু কাজল,লাইট কালার লিপস্টিক দিবা না?
–উমম,,একটু কাজল লাগাতে পারি।তুই যখন এতো করে বলছিস।
মিহু হতাশ হয়ে বললো,
–আচ্ছা তাই লাগাও।
মেহের চোখে কাজল লাগিয়ে,হাতে হ্যান্ড ওয়াচ,পায়ে লেডিস সু,কাধে লেডিস ব্যাগ।ব্যাস।কিছুক্ষণ পর পর আয়নায় নিজেকে দেখেই চলেছে।

মেহের তোর আয়না দেখা শেষ হলে নাস্তা করতে আয়।নয়তো আয়না দেখতে দেখতেই ভার্সিটির ক্লাসের টাইম পেরিয়ে যাবে।সেই সকাল থেকে রেডি হচ্ছিস এখনো হয়না।
———মেহেরের মা বললেন।

–আম্মু এক্ষুনি আসছি।
মেহের শেষবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে নিচে চলে গেলো।নাস্তা করছে তখন ওর মা হলে উঠলো।
–মেহের ভালোভাবে থাকিস নতুন জায়গা,নতুন মানুষ।সাবধানে থাকবি।আর গাড়ি নিয়ে যাস।

–উফফ,,আম্মু।কালকে কি কথা হয়েছিলো??আমি এখন আর ছোট নই।ভার্সিটির স্টুডেন্ট।যথেষ্ট বড়।আব্বুকে এখন অন্তত আমার পিছ ছাড়তে বলো।আমি গাড়ি নিয়ে যাবোনা।নিজের মতো যাবো।

–আচ্ছা যাস।কিন্তু আজকে প্রথম দিন গাড়ি নিয়ে যা।নয়তো তোর আব্বু চেচামেচি করবে।
মেহের অসহায় ভাবে বললো,আচ্ছা।

মেহেরের গাড়ি ভার্সিটির সামনে এসে দাড়িয়েছে।মেহের গাড়ি থেকে নেমে বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।ভিতরে ঢুকতে কেমন জানি লাগছে।কিছুটা ভয় কিছুটা সংকোচ।এর আগে ভর্তি হতে বাবার সাথে এসেছে।সেদিন ক্লাসরুমও দেখে গেছে।যাতে পড়ে অসুবিধা না হয়।কিন্তু আজকে ভিতরে যেতে কেমন অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে।নতুন জায়গা,নতুন পরিবেশ,নতুন ক্লাসমেট,নতুন টিচার সব মিলিয়ে একটা অজানা ভয় কাজ করছে।মেহের অনেকটা সাহস সঞ্চার করে ভিতরে প্রবেশ করলো।ভিতরে প্রবেশ করতেই একজন বলে উঠলো,
–নিউ ফার্স্ট ইয়ার??
–জ্বী।
–ওখানে গিয়ে দাড়াও।
–কেন?
–রুলস ইজ রুলস।

মেহের কথা না বাড়িয়ে দেখানো জায়গায় গিয়ে দাড়ালো।সেখানে ওর মতো আরও অনেক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।একপাশে একদল ছেলে আর একপাশে একদল মেয়ে।সবার চেহারা থমথমে।মেহের বুঝতে পারলো এখানে কি হতে যাচ্ছে।সবার ভয়ার্ত চেহারা দেখে ওর ও ভয় হতে শুরু করলো।
তখনই ওর নজর গেলো গেইটের দিকে।একটা ছেলে সাদা টিশার্ট,নীল জিন্স,কালো সু,হাতে ওয়াচ,চোখে সানগ্লাস পরে হেটে হেটে এইদিকে আসছে।ওর সাথে আরও কয়েকটা ছেলে।মনে হচ্ছে তামিল মুভির হিরোর এন্ট্রি হচ্ছে।ছেলেটা টিশার্টের উপর কালো রঙের হুডি পড়া।যা পুরো মাথা ঢেকে রেখেছে আর কপালের উপর সিল্কি চুলগুলো হাটার সাথে সাথে আছড়ে পড়ছে।চুলগুলো একদল কোরিয়ান হিরোদের মতো।তবে বডি ফিটনেস,ফেসকাটিং তামিল হিরোদের মতো।ফর্সা মুখে খোচাখোচা দাড়ি।চোখগুলো খুব গভীর।মেহের ছেলেটার দিকে হা করে চেয়ে আছে।ছেলেটা যতই এগিয়ে আসছে মেহেরের বুকের ধুকধুকানি বাড়তেই লাগলো।ছেলেটা এসে পাকা করা বসার জায়গায় বসে পড়লো।মেহের খেয়াল করলো ওর সাথে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোও ছেলেটার দিকে হা করে চেয়ে আছে।ওর কেমন হিংসা হচ্ছে।মেয়েগুলোর চাহনি সহ্য হচ্ছে না।ছেলেটার কোনো দিকে খেয়াল নেই।সে একটা সিগারেট বের করে মুখে রেখে লাইটার দিয়ে জ্বালালো।কিছুক্ষণ টানার পর ধোঁয়া ছাড়তে লাগলো।মেহেরের ব্যাপারটা ভালো লাগলো না।এত সুন্দর একটা ছেলে সিগারেট খেয়ে মেহেরের মনটাই ভেঙে দিলো।হুট করেই ছেলেটার প্রতি ভালোলাগা উবে গেলো।মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো যে ক্রাশ খেয়ে ফেলে হজম করে দিয়েছে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করে সব উগরে দিবে।
একটা ছেলের কথায় ওর ভাবনায় ছেদ পড়লো।
–এই যে হিজাব কন্যা,,একটু ড্রান্স করো দেখি।
মেহের চোখ বড়বড় করে ছেলেটার দিকে তাকালো।
অন্য একটা ছেলে বললো,
–ওই দেখিস না আপুনি হিজাব পড়া।আপুনি তুমি একটা গান ধরো।হেব্বি একটা হিন্দি গান।
নেও নেও শুরু করো।মেহেরের ভয়ে গলা শুখিয়ে যাচ্ছে,,হাতপা কাপতে শুরু করলো।মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছেনা।
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।শুধু কাদছেই না,,কান্নার সাথে সাথে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলাচ্ছে।ছোট বাচ্চাদের যদি কেউ ধমক দেয় তখন বাচ্চাটি প্রথমে অভিমানী চেহেরা করে ঠোঁট ফুলায় তারপর কান্না শুরু করে।মেহের ও তাই করছে।
ফায়াজের এবার মেহেরের দিকে নজর পড়েছে।ওর ঠোঁট ফুলানো কান্না দেখে ফায়াজের হাতের সিগারেট পড়ে গেলো।ও দাঁড়িয়ে পড়লো। মেহেরের দিক থেকে ওর চোখ সড়ছেই না।মনে হচ্ছে অন্য জগতে হারিয়ে যাচ্ছে।অদ্ভুৎ ফিলিংস হচ্ছে।হার্টবিট হটাৎ করে বেড়ে গেলো।সারা শরীরে অজানা কারেন্ট বয়ে গেলো।বুকের বা পাশে হাত রেখে ধুকধুকানি অনুভব করে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
ওহহ,নো!!

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here