#হৃদমাঝারে অন্তিম_পর্ব_২

0
56

#হৃদমাঝারে অন্তিম_পর্ব_২
#দেবারতি_ধাড়া

আয়ান একটু ধাতস্থ হয়ে যখন ওটা নিজের মনের ভুল মনে করে আরও একবার অপর প্রান্তে তাকালো, তখন আয়ানের কানের কাছে মুখ এনে, সে মুখ ঝামটা দিয়ে বললো,

-কী হলো প্রফেসর? মালাটা এবার পরাও? আর কতোক্ষণ শুভ দৃষ্টি করবে হ্যাঁ?!

শিয়ার মুখে প্রফেসরবাবু নামটা শুনেই আরও চমকে উঠলো আয়ান। ও ভাবলো, “শিয়া কীভাবে “প্রফেসরবাবু” নামটা জানলো? আমাকে এই নামে তো একমাত্র জিয়া-ই ডাকে। তাহলে কী!” তারপর এটাও ভাবলো, “তাহলে আমার পাশে যে মেয়েটি ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে কে? ওটাই তো জিয়া। চোখে জিয়ার মতোই কালো ফ্রেমের চশমা, চুলটা যদিও উঁচু করে খোঁপা বাঁধা আছে। কিন্তু জিয়ার স্টাইল করে কাটা চুলে তো এতো বড়ো খোঁপা বাঁধা সম্ভব নয়। তাহলে কী ওটাই শিয়া? আর আমার অপর প্রান্তে কনের বেশে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে, সে কী জিয়া? না না, সেটা কী করে সম্ভব হয়! কিন্তু আমি তো আমার নিজের চোখ, কান কোনোটাকেই অবিশ্বাস করতে পারছি না! কেন? কেন তুমি আমার সাথে এরকম করছো ভগবান? কেন আমার চারিপাশে আমি সবসময় শুধু জিয়াকেই দেখি? কেন বারবার আমি ওকেই অনুভব করি সবসময়? কই, জিয়া তো আমার জন্য এতোটা পাগল হয়নি! ও তো স্বাভাবিকভাবেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিয়া কীভাবে এতোটা স্বাভাবিক আছে? কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এটা? জিয়া কী তাহলে কোনোদিনের জন্য একটু হলেও ভালোবাসেনি আমাকে? আমি যে ওকে বললাম, অন্য কারোর সিঁথিতে সিঁদুর দানের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ওর জন্য অপেক্ষা করবো, সেই কথাটার কী কোনো দামই নেই ওর কাছে?” আয়ানের ভাবনাকে ভঙ্গ করে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ার সাজে শিয়া আয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো,

-এই যে প্রফেসর আয়ান! আপনি বোধহয় বাড়িতে ঢোকার সময় খেয়াল করেননি, যে ঢোকার মুখে আরুশি ওয়েডস আয়ানের জায়গায়, আধিরা ওয়েডস আয়ান লেখা ছিলো বলে।

শিয়ার মুখে কথাটা শোনামাত্রই আয়ান মনে করার চেষ্টা করলো তখন বাড়িতে ঢোকার সময়ের কথা। আসলে ও এই বিয়েটা নিয়ে এতোটাই অখুশী ছিলো, যে অন্য কোনো দিকে তাকানোর মতো ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিলো ওর মধ্যে থেকে। ওর ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে শিয়া বললো,

-কী হলো আয়ান? নিন, এবার আপনার জিয়ার গলায় মালাটা পরিয়ে দিন? আপনি আপনার জিয়াকে এতো ভালোবাসেন, অথচ কোনটা আসলে জিয়া, আর কোনটা শিয়া সেটা বুঝতেই এতো কনফিউসড হয়ে পড়লেন? তাহলে সারাজীবন সবক্ষেত্রে আপনার নিজের মানুষটাকে চিনে নেবেন কী করে শুনি? আমি জিয়ার মতো সেজেছি ঠিকই, কিন্তু আমি আপনার জিয়া নই আয়ান। আপনার জিয়া আপনার সামনে বধূবেশে আপনাকে মালা পরানোর জন্য মালা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে।
-কিন্তু তাহলে আপনি…
-আর কোনো কিন্তু নয় আয়ান, বিয়ের লগ্ন যে এবার পেরিয়ে যাবে! তাড়াতাড়ি মালাবদলটা শুরু করুন। বিয়ে শেষে আমি নিজে আপনাকে সবটা খুলে বলবো। এখন আমি আপনাদের এই সুন্দর মুহূর্ত গুলোকে ক্যাপচার করছি। তবে আমি কিন্তু আপনার ফটোগ্রাফার বউয়ের মতো অতো সুন্দর ফটোগ্রাফি করতে পারি না! এতেই একটু মানিয়ে নেবেন প্লিজ…

আয়ান আর কিছু বলার আগেই জিয়া এগিয়ে এসে মালাটা পরিয়ে দিলো ওর গলায়। তারপর আবারও একবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে দিলো ও। আয়ানও আর কিছু না ভেবেই লাজুক মুখে ওর জিয়ার গলায় মালাটা পরিয়ে দিলো। তারপর পুরোহিত মশাইয়ের কথা মতো একে একে বিয়ের সমস্ত নিয়ম পালন করলো আয়ান আর জিয়া দুজনে মিলে। এখন সেই শুভ মুহূর্ত এসে উপস্থিত হয়েছে। এবার আয়ানের হাতের লাল সিঁদুরে রাঙা হয়ে উঠবে ওর প্রেয়সীর ফাঁকা সিঁথি। পুরোহিতের কথামতো আয়ান জিয়ার সিঁথির কাছে সিঁদুর ভর্তি কুনকেটা নিয়ে গিয়ে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে জিয়ার সিঁথিটা রাঙিয়ে দিলো লাল রঙা সিঁদুরে। সঙ্গে সঙ্গে ভালোলাগার আবেশে জিয়া নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। ওর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা আনন্দাশ্রু। ওদের সামনে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিয়ার চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা নোনতা জল। সেটা কারোর চোখে পড়ার আগেই নিজের দুই আঙুল দিয়ে মুছে ফেললো শিয়া।

বিয়ে শেষ হওয়ার পর জিয়া আর আয়ান সব গুরুজনদের প্রণাম করে সবার আশীর্বাদ গ্রহণ করলো। তারপর ডিনার সেরে বাসর ঘরে গিয়ে উঠলো। ওখানে বসেই শিয়া সবটা বলতে শুরু করলো সবাইকে,

-যেদিন আমার আর আয়ান বাবুর আশীর্বাদ ছিলো, সেদিন আশীর্বাদের শেষে সবাই রাতে খাওয়া-দাওয়া করে যখন বাড়ি ফিরে গেলো, তখন আমি ঘরে গিয়ে দেখি জিয়া বারান্দার আরাম কেদারাটায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে। সারা ঘর আর বারান্দা তখন মদ আর সিগারেটের তীব্র গন্ধে ভরে আছে। সন্ধ্যেবেলা আমাদের পাড়ার একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখেছিলাম জিয়াকে। তারপর এখন জিয়ার এই অবস্থা দেখে বুঝলাম ওই ছেলেটাকে দিয়েই নিশ্চয়ই জিয়া এই সব আনিয়েছে। আমি জানতাম জিয়া শিলিগুড়িতে থাকাকালীন মাঝে মাঝেই ড্রিংক করে, কারণ ওখানে ঠান্ডার কারণে সবাই-ই প্রায় ড্রিংক করে থাকে শরীর গরম রাখার জন্য। আর স্মোকিংটা তো ও অনেক ছোটোবেলা থেকেই করে। কারোর বারণ শোনে না। তবে এখানে এলে ও এসব খায় না কখনও। আমি অপছন্দ করি তাই। কিন্তু হঠাৎ করে জিয়া এখানে ওসব খাওয়াতে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম সেদিন। তবে আমি ভেবেছিলাম আজ আমার জীবনে এতো বড়ো একটা খুশির দিন, তাই হয়তো ওরও আনন্দ হচ্ছে। আর সেই কারণেই এইসব খাওয়া।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আয়ান বললো,

-হ্যাঁ, সেদিন আমি যখন জিয়ার সাথে ফোনে কথা বলছিলাম, তখন ও ড্রাংক অবস্থাতেই ছিলো। কিন্তু তারপর কী হলো শিয়া?!
-তারপর আমি ওকে তুলে ধরে ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তখনও জিয়ার একটু একটু হুশ ছিলো। ও মনে মনে কী সব বিড়বিড় করছিলো। তবে কী বলছিলো, সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম না। ওর যেহেতু তখনও একটু হুশ ছিলো, তাই আমি ওকে বললাম আমার আশীর্বাদের ছবি গুলো একটু দেখাতে। কিন্তু ও এতোটাই ড্রাংক ছিলো যে, ওর পক্ষে উঠে গিয়ে ক্যামেরাটা আনা সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই আমি নিজেই উঠে গিয়ে ওর ক্যামেরাটা নিয়ে এলাম। ততক্ষণে জিয়া প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে। তাই আমি নিজেই ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ছবি গুলো দেখতে শুরু করলাম। কিন্তু কনস্ট্যান্ট জিয়ার ফোনে একের পর এক কল আর মেসেজ এসেই চলেছিলো। তাই জিয়াকে আমি বলছিলাম,

-জিয়া তোর ফোনটা অনেক্ষণ থেকে বাজছে তো! একবার একটু কষ্ট করে রিসিভ করে নে না? কেউ হয়তো কোনো দরকারেই কলটা করছে! জিয়া….

মেসেজ গুলো না খুললেও আমি জিয়ার ফোনটা হাতে নিয়ে একবার দেখতেই নাম্বারটা কেমন যেনো আমার চেনা চেনা লাগছিলো। কিন্তু আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না যে ওটা কার নাম্বার! তখন আর বেশি কিছু না ভেবে আমি আবারও ছবি গুলো দেখতে শুরু করলাম। একের পর এক ছবি দেখতে দেখতে বেশ অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছিলো। আমার আশীর্বাদের ছবি গুলো দেখা হয়ে যাওয়ার পরেও আমি জিয়ার তোলা আগেকার অন্যান্য ছবি গুলোও দেখছিলাম। আমার বেশ ভালো লাগছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই জিয়ার ক্যামেরায় আমি একটা ছবি দেখতে পেলাম, যেটাতে কোনো একজন পুরুষ পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই পুরুষটিকে পিছন থেকে ভীষণ চেনা লাগলো আমার। আমি কৌতুহল বশত পরের ছবি গুলোও দেখতে শুরু করলাম। তারপরই জিয়ার আর আপনার অসংখ্য ছবি দেখতে পেলাম একাধিক স্থানে একাধিক পোজে। ছবি গুলো দেখার পরে যেনো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে আমি জিয়ার ফোনটা হাতে নিয়ে ওর ফোনে আসা মেসেজ গুলো চেক করতে লাগলাম। জিয়ার ফোনের মেসেজ বক্সটা খুলে আমি একরকম বাধ্য হয়েই মেসেজ গুলো পড়তে শুরু করলাম,

“প্লিজ জিয়া, তুমি আমাকে এতো বড়ো শাস্তিটা দিয়ো না! আমি আর পারছি না! এখনও সময় আছে জিয়া, এখনও সময় আছে! তুমি তিনটে জীবন নষ্ট করে দিয়ো না!

আজ আমি শিয়াকে আংটিটা পরিয়ে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তুমি কি জানো? আমি যে আংটিটা আমার হবু স্ত্রীকে পরাবো বলে কিনেছিলাম, সেটা আমি শিয়াকে পরাইনি! আমি যে আংটিটা কিনেছিলাম, সেটা সেদিন তোমাদের বাড়িতে প্রথম তোমাকে দেখতে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম সেদিনই তোমাকে পরিয়ে দেবো। আর আমার মনের কথাটাও তোমাকে বলবো ভেবেছিলাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমি তোমাকে নয়, শিয়াকে দেখেছিলাম জিয়া। আর আমার ভুল ধারণাটা তখনই একদম ভেঙে গিয়েছিলো। তাই আমি ওই আংটিটা আমার কাছেই যত্ন করে রেখে দিয়েছি! আমি ওই আংটিটা কিছুতেই শিয়াকে পরাতে পারবো না।

অন্য কারোর সিঁথিতে সিঁদুর তুলে দেওয়ার আগে পর্যন্ত আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো জিয়া। আমি জানি তুমি ঠিক আমার কাছে ফিরবে। তুমি ঠিক আমার মনের অবস্থাটা বুঝবে। আমি জানি। আমি জানি তুমি কিছুতেই আমাকে এতোটা কষ্ট পেতে দেবে না। আমি চাইলেই নিজেকে শেষ করে দিতে পারতাম জিয়া। কিন্তু না! আমি সেটা করবো না। আমি কিছুতেই নিজেকে এভাবে শেষ করে দেবো না। কারণ আমি তোমার সামনে কষ্ট পেয়ে পেয়ে মরতে চাই। আমি এটাই দেখতে চাই যে, তুমি কি করে আমাকে এতোটা কষ্ট পেতে দেখতে পারো! আমি কষ্ট পেয়ে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, সেটা তুমি কি করে সহ্য করতে পারো! আমি জানি জিয়া, তুমিও আমার মতোই আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো। আর সেই ভালোবাসার টানেই তুমি সেটা কিছুতেই নিজের চোখে দেখতে পারবে না।

তবে আমি তোমাকে স্যালুট জানাচ্ছি জিয়া। কারণ তোমার মতো সার্থত্যাগ আর কেউ করতে পারবে না। তুমি তোমার দিদিয়াকে যতোটা সম্মান আর শ্রদ্ধা করো, ততোটা শ্রদ্ধা খুব কম মানুষই করতে পারে। তোমার মতো এতোটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে খুব কম লোকই পারে। আমি তোমার প্রতিটা ইচ্ছেকে সম্মান করি জিয়া। আর সেই জন্যই তোমার এই ইচ্ছেটাকেও অসম্মান করতে পারবো না। তবে আমি শিয়াকে নিজের স্ত্রীর জায়গা দিলেও আমার মনের জায়গাটা সারাজীবন শুধুই তোমার জন্য থাকবে।

আমি জানি জিয়া, তুমিও আমাকে খুব ভালোবাসো। আর সেইজন্যই আজ শিয়া আর আমার এনগেজমেন্টটা নিজের চোখে দেখতে পারছিলে না। আজ আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেই বুঝেছি, তুমি কাঁপছিলে। আর আমার ঠোঁটের বন্ধন থেকে তুমি নিজে থেকে মুক্ত হতে পারনি, যতোক্ষণ না আমি তোমাকে মুক্ত করেছি।”

তারপর আর কোনো মেসেজ পড়তে পারিনি আমি। তবে যে কটা মেসেজ পড়েছিলাম, তাতে শুধু এটুকু বুঝেছিলাম, আমার বোনটা আমার জন্য নিজের ভালোবাসাকেও অনায়াসে স্যাক্রিফাইস করে দিতে পারছে। আমার সেই ইমম্যাচিউর, খামখেয়ালী ছোট্ট বোনটা কবে এতো বড়ো হয়ে গেলো হঠাৎ করে! যে কিনা সামান্য একটা মাছের কিংবা মাংসের বড়ো পিস খাওয়ার জন্য ঝগড়া, মারামারি করতো, সেই মেয়েটা এতো সহজে নিজের ভালোবাসার মানষটাকে আমার জন্য নিজের থেকে এতো দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে?! কিন্তু সেটা তো আমি কখনোই হতে দিতে পারতাম না! আর সেই জন্যই সেদিন সবটা জেনে যাওয়ার পরেও আমি চুপ করেই ছিলাম। কাউকে কিচ্ছুটি বুঝতে দিইনি আমি। এমনকি জিয়াকেও না। আমি এই বিয়েটা নিয়ে যে খুব আনন্দিত আর এক্সসাইটেড ছিলাম, সবার সামনে সেটারই অভিনয় করতে শুরু করলাম সেদিন থেকে। যাতে জিয়া আমাকে বিয়ে নিয়ে এতো উত্তেজিত হতে দেখে নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ভালোবাসাটার কথা বুঝতে পারে। ও যাতে আরো বেশি জেলাস হয়, সেটারই চেষ্টা করছিলাম আমি। আর আমার ভাবনাটাই সত্যি হলো। আমি যতো হাসিখুশী থাকতে শুরু করলাম, জিয়া ততোই কষ্ট পেতে লাগলো। ওর মনের ভালোবাসাটা ততো বেশি জমাট বাঁধতে আর গভীর হতে শুরু করলো। আর একদম বিয়ের দিন সন্ধ্যায়, মানে আজই মেকআপের সময় আমি ওকে সবটা বলবো বলে মনে করি। সেই মতো বলিও সবটা। আর জিয়াকে বিয়ের জন্য রাজিও করাই। কারণ আমি জানতাম, আগে থেকে জিয়াকে সবটা বললে ও সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে চাইবে। আর সেটা তো আমি কিছুতেই হতে দিতে পারতাম না। তাই জিয়াকে আমার মাথার দিব্যি দিয়ে জিয়ার মুখ থেকেই আমি সবটা শুনতে চাই। তবে হ্যাঁ এইসব কিছু আমি আজ সকালে আর একজনকে বলেছিলাম, সে হচ্ছে রিমলি। কারণ সকালে রিমলির সাথে কথা বলে আমি এটাই বুঝেছিলাম যে, রিমলিও কিছুটা জানে। ও যে কিছুটা হলেও জানে, সেটা ওর ব্যবহারেই প্রকাশ পাচ্ছিলো। তাই আমি মনে করেছিলাম ওকে সবটা খুলে বলা উচিত। আর সেইজন্যই আমি ওকে বলেছিলাম গায়ে হলুদ পর্ব মিটে যাওয়ার পরে যেনো ও আমার সাথে দেখা করে যায়। আর ও আমার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময়ই আমি ওকে সবটা বলি। আর কাউকে জানতেও বারণ করি। সেই মতো রিমলি কাউকে কিছু জানায়ওনি।

আজ জিয়া যখন আমাকে সবটা খুলে বললো তখন আমি এটাই উপলব্ধি করি যে জিয়া আমাকে কতোটা ভালোবাসে। আমি নিজেকে সত্যিই খুব ভাগ্যবতী বলে মনে করি এরকম একজন সোনার টুকরো বোন পেয়ে। আর সেই বোনের ভালোর জন্য আমি এটুকু করতে পারবো না? আমি নিজের চোখে আমার নিজের বোনের এতো বড়ো একটা কষ্ট কি করে দেখবো বলুন তো আয়ান? সেই জন্যই তো আজ মেকআপ আর্টিস্টের কাছে সাজার সময় আমি জিয়াকে এই শর্তটাই দিয়েছিলাম যে, আমার বদলে ও যদি এই বিয়েটা না করে, তাহলে আমিও সবাইকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো! আর ও যদি এই বিয়েটা করে তবেই আমি এখানে থাকবো আর মা-বাবার সাথে সম্পূর্নভাবে স্বাভাবিক হতে পারবো। আমি এতোদিন মা আর বাবাকে ভুল বুঝে ওদের থেকে দূরে সরে ছিলাম। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে, ছোটবেলায় আমাকে মণি আর পাপানের কাছে রেখে যাওয়াতে ওদের সত্যিই কোনো দোষ ছিলো না। আর যদি জিয়া এই বিয়েটা করে, তাহলেই আমি মা-বাবার কাছে মুখ দেখাতে পারবো। তা নাহলে যে মা-বাবার কাছে আমি মুখ তুলে তাকাতেই পারবো না! কারণ এতোদিন আমি বিনা দোষে মা, বাবার সাথে এতো খারাপ ব্যবহার করেছি, ওদের থেকে দূরে দূরে থেকেছি। হয়তো মনে মনে জিয়াকে হিংসেও করেছি। তার প্রায়শ্চিত্ত তো আমাকে করতেই হতো।

শিয়া একভাবে কথা গুলো বলে চলছিলো। বাসর ঘরে উপস্থিত সকলে খুব মনযোগ সহকারে ওর কথা গুলো শুনছিলো। সবার চোখ শিয়ার দিকেই নিবদ্ধ ছিলো তখন। তাই কেউ খেয়ালই করেনি যে, কখন দরজার সামনে অনসূয়া দেবী, সুখময় বাবু এবং গায়েত্রী দেবী আর অমলেন্দু বাবু এসে উপস্থিত হয়েছেন। ওনারা বেশ কিছুক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শিয়ার সমস্ত কথা শুনছিলেন। ওনাদের কাছে এখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বিয়ের আসরে কনের সাজে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যে আয়ানকে বিয়ে করেছে সেটা হলো জিয়া। আর জিয়ার মতো সেজে সেই সন্ধ্যে থেকে যেই মেয়েটা সারা বিয়ে বাড়ি মাতিয়ে রেখেছিলো, আর সবার একের পর এক ছবি তুলছিলো, সেই মেয়েটা হলো শিয়া। ওনারা ঘরের ভিতরে আসতেই শিয়া ওনাদেরকে দেখে মাথা নামিয়ে নিলো। তখনই অনসূয়া দেবী এগিয়ে এসে শিয়ার গালে হাত রেখে ওকে বললেন,

-নারে মা, এতে তোর কোনো দোষ নেই। আসলে আমাদেরই উচিত হয়নি তোকে আমদের থেকে, তোর নিজের ছোটো বোনের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়াটা। তাই আমাদেরই তো তোর থেকে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তুই আমাদের ক্ষমা করে দে মা..

অনসূয়াদেবীর কথার উত্তরে পাশ থেকে গায়েত্রী দেবী বললেন,

-নাগো বৌদি, এতে তোমার আর দাদার কোনো দোষ নেই। সব দোষ তো আমার! আমার জন্যই তো তোমরা ছোটবেলায় শিয়াকে এখানে রেখে গিয়েছিলে। আমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য, আমার মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্যই তো তোমরা আমার হাতে তোমাদের একটি মেয়েকে তুলে দিয়েছিলে। যাতে আমি তোমাদের সন্তানকে কাছে পেয়ে আমার নিজের সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারি।

শিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে উনি বললেন,

-তুই তোর বাবা-মায়ের ওপর আর রাগ করে থাকিস না রে মা। তোর মা-বাবা আমাকে ভালো রাখার জন্যই তোকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলো। তোকে আমি নিজের সন্তান স্নেহে মানুষ করেছি ঠিকই, কিন্তু যতোই হোক, আমি তো আর তোর নিজের মা নয়। আর তোর পাপানও তোর নিজের বাবা নয়। তাই এতোদিন আমরা তোর মনের কষ্টটা বুঝতে পারিনি রে মা। তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস! আমি আর তোকে আটকাবো না, তুই এখন থেকে তোর নিজের মা বাবার কাছে গিয়ে থাকতে পারিস।

গায়েত্রী দেবীর চোখও সিক্ত হয়ে উঠেছে নোনতা জলে। শিয়া এগিয়ে এসে গায়েত্রী দেবীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। তারপর ওনার বুকে মাথা রেখে ও বললো,

-চুপ করো মণি। প্লিজ তুমি চুপ করো… তুমি কাঁদলে আমার একদম ভালোলাগে না। আমার মনে আর কোনো কষ্ট নেই মণি। আমি এখন আমার সব ভুল গুলো বুঝতে পেরেছি গো। মা, বাবার ওপরেও আমার আর একটুও রাগ নেই। জিয়া আমাকে সবটা বলেছে… জিয়া-ই আমার সব ভুল গুলো ভাঙিয়ে দিয়েছে। আমার সেই অপরিণত বোনটা আমার অজান্তেই যে, কিভাবে এতোটা পরিণত হয়ে উঠেছে, সেটা আমি এতোদিন বুঝতেই পারিনি! আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দাও মণি.. আমি তোমাদের ঠিক করা ছেলেকে বিয়েটা করিনি বলে। আমার কাছে যে আমার বোনের ভালো থাকাটাই সবার আগে। তাই তোমাদের না জানিয়েই আমি জিয়াকে বিয়েটা করতে বাধ্য করিয়েছি। তুমি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও…
-আমি রাগ করিনি রে মা। তুই যা করেছিস একদম ঠিক করেছিস। তোর এই সিদ্ধান্তকে আমি আর তোর পাপান মন থেকে সমর্থন জানিয়েছি। তোকে এই সিদ্ধান্ত নিতে দেখে আমার খুব গর্ব হচ্ছে রে মা। আমার মনে হচ্ছে আমি তোর নিজের মা না হলেও তোকে সঠিকভাবে মানুষ করে তুলতে পেরেছি। এতোদিন হয়তো আমি আমার সিদ্ধান্ত গুলোকে তোর ওপর চাপিয়ে দিতাম, তোর ইচ্ছে গুলোকে সেভাবে গুরুত্ব দিতাম না। কিন্ত তুই যে বড়ো হয়ে গেছিস, এখন তুই নিজেই নিজের জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবি, সেটা বুঝতেই পারিনি! আমাকে তুই ক্ষমা করে দে মা। আমি তোকে বলেছিলাম বেশি দূর পড়াশোনা করে কি হবে, সেই তো রান্নাঘরে খুন্তি নাড়তে হবে। কিন্তু আজ আমি তোকে বলছি মা, তুই আবার পড়াশোনাটা শুরু কর। তোর ইচ্ছে মতো বিষয় নিয়ে খুব যত্ন সহকারে পড়া শুরু কর মা। হ্যাঁ, আর একটা কথা, আমি আর তোকে আমার কাছে আটকে রাখবো না মা। তুই চাইলে এখন থেকে তোর মা বাবার কাছে গিয়েও থাকতে পারিস। ওদের আর কষ্ট পেতে দিস না শিয়া। যা মা, তোর বাবা মায়ের কাছে যা। ওরা তোকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য সেই কবে থেকে অপেক্ষা করে আছে!

শিয়া গায়েত্রীদেবীর বুক থেকে মুখ তুলে অনসূয়া দেবী আর সুখময় বাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওনাদের জড়িয়ে ধরলো। ওনারাও শিয়াকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিলেন প্রাণ ভরে। এতোদিন পর নিজের মেয়েকে এতো কাছে পেয়ে ওনারা যেমন খুশি হয়েছেন, শিয়াও নিজের বাবা-মাকে কাছে পেয়ে ঠিক ততোটাই খুশি হয়েছে। জিয়া কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ওর দিদি আর মা-বাবাকে একসাথে হতে দেখে, আনন্দে ওর চোখেও জল এসে গেলো। এতোদিনে ওর মনের চাওয়াটা আর ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে বলে। আজ জিয়া বা শিয়ার মনে আর কোনো দুঃখ নেই। যদিও শিয়া প্রথম দিকে মনে মনে আয়ানকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলো, কিন্ত যখন থেকে ও জিয়া আর আয়ানের সম্পর্কের কথাটা জানতে পেরেছে, তখন থেকে ও নিজের মনকে এটাই বুঝিয়ে নিয়েছে যে, সব কিছু সবার জন্য নয়। ও যে নিজের মা-বাবার সাথে আবার একত্রিত হতে পারবে, মা-বাবার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারবে, মিশতে পারবে, সেটা ভেবেই ওর মন আনন্দে ভরে উঠেছিলো। তাই মা-বাবার এই ভালোবাসার কাছে আয়ানকে সামান্য ভালোবাসতে শুরু করাটা প্রায় হেরেই গেছে।

জিয়া এগিয়ে এসে শিয়াকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো। শিয়ার দুচোখও তখন নোনা জলে সিক্ত হয়ে রয়েছে। জিয়াকে ওভাবে কাঁদতে দেখে শিয়া ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো,

-কী হলো বোন? আজকের দিনে তুই কাঁদছিস কেনো? আর একদম কাঁদবি না! আজ তো আমাদের জীবনে খুব আনন্দের একটা দিন বল? আজ যেমন তুই তোর জীবনসঙ্গীকে নিজের করে পেলি, তেমনই আমিও আজ মা-বাবাকে আবার নিজের করে পেলাম। তুই তো এটাই চেয়েছিলি জিয়া। তুই তো চেয়েছিলি যাতে আমি কোনো কষ্ট না পাই, আমি যেনো সারাজীবন সুখে থাকি। সেটাই তো হয়েছে বোন। আজ আমি সত্যিই খুব খুব খুশী রে…
-কিন্তু দিদিয়া, আমার জন্য তুই এতো কিছু থেকে বঞ্চিত হলি… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে দিদিয়া..
-চুপ কর বোন! তোর কষ্ট কিসের শুনি? আমার জন্য কষ্ট হচ্ছে? কিন্তু কেনো বোন? আমার তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না! আমার কাছে এই বিয়ের থেকে মা বাবার ভালোবাসাটা বেশি বড়ো রে বোন.. যাদের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, যাদের কাছে থাকার জন্য আমি এতোদিন হন্যে হয়ে ছিলাম, আমি এখন তাদের ভালোবাসা পেয়েছি। তাদের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারছি। এর থেকে বড়ো পাওয়া আমার কাছে আর কি হতে পারে জিয়া? এটাই যে আমার কাছে সব থেকে বড়ো পাওয়া! জানিস জিয়া, আজ আমি তোর মতো করে সেজেছি, তাই আমাকে কেউ শিয়া বলে চিনতে পারেনি। সবাই ভেবেছে আমি হয়তো জিয়া-ই এমনকি মণি আর পাপানও আমাকে চিনতে পারেনি জানিস? কিন্তু মা আর বাবা প্রথমেই ঠিক আমাকে চিনে ফেলেছে! আমি যখন মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, “চলো মা, দিদিয়ার বিয়েটা তো হয়ে গেলো। এবার ওদের আশীর্বাদ করবে চলো?”
তখন মা আমাকে কি বললো জানিস? মা বললো, “তোকে সবাই জিয়া ভেবে ভুল করলেও, আমার কিন্তু তোকে চিনতে ভুল হয়নি মা.. তোরা যখন মেকআপ রুম থেকে বেরোলি, তখনই আমি আর তোদের বাবা তোদেরকে চিনতে পেরেছি শিয়া। কিন্তু আমরা কাউকে কিছু বলিনি, কারণ আমরা এটা বুঝেছি যে, আমাদের মেয়েরা কখনও কোনো ভুল করতেই পারে না! যে সিদ্ধান্তটা তোরা দুজন মিলে নিয়েছিস, সেটা নিশ্চয়ই সব কিছু ভাবনা চিন্তা করেই নিয়েছিস। তোরা যা ভালো বুঝেছিস, সেটাই করেছিস। তাই আমরা কিচ্ছু বলিনি শিয়া। এটাই ভেবেছিলাম যখন তোরা নিজেরা সবটা আমাদের খুলে বলবি, তখনই আমরা তোদের মুখ থেকে সবটা শুনবো।”

শিয়া যখন কথা গুলো বলছিলো, তখন ওর চোখ মুখ থেকে খুশী আর আনন্দ ঝরে পড়ছিলো। ওকে এতো হাসিখুশী আর আনন্দিত দেখে জিয়ারও ভীষণ আনন্দ হলো। ও আবারও শিয়াকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে দিলো। ওকে এরকম ছেলেমানুষী করতে দেখে শিয়া বললো,

-চল জিয়া, এবার মা-বাবাকে প্রণাম করবি চল… মা-বাবা সবটা শুনে তোদের দুজনকে আশীর্বাদ করার জন্য অপেক্ষা করছে তো! মা? বাবা? নাও তোমাদের মেয়ে আর জামাইকে এবার আশীর্বাদটা করো…

সারারাত সবাই মিলে হইহুল্লোড় করে বাসর ঘরের আসর জমিয়ে তুলেছিলো। ভোরের দিকে সবারই একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো। আয়ান লাল রঙের পাশ বালিশটার ওপরে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। আর জিয়াও আয়ানের পেটের ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আর বাকিরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো, তখন শিয়া বাসর থেকে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে ছিলো। সারাদিনের ভীষণ পরিশ্রমে খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো ও। তাই নিজের ঘরে গিয়ে গা এলিয়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলো শিয়া। সূর্যের সোনালী আলোয় যখন ঘরটা হালকা আলোকিত হতে শুরু করলো, জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সোনালী রোদের আভা এসে আয়ানের চোখে মুখে পড়ে ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিলো, তখন ও জিয়ার ঘুমন্ত, স্নিগ্ধ, কোমল মুখটার দিকেই তাকিয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর আলতো করে ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিয়ার সাথে সেই প্রথম দেখা হওয়ার দিনের কথা ভাবতে লাগলো। প্রথম দিন থেকেই যে মেয়েটা আয়ানকে এতো মুখ ঝামটা দিতো, আজ সেই মেয়েটাই আয়ানের একেবারে নিজের। সেই ছটফটে, চঞ্চল, সারাক্ষণ দৌরাত্ম্য করে বেড়ানো মেয়েটা যে বউ সাজে, মাথা ভর্তি সিঁদুর নিয়ে এতো সুন্দর দেখাতে পারে, সেটা আয়ানের ধারণারও বাইরে ছিলো। জিয়াকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে এই কদিন ও এতোটাই কষ্টের মধ্যে ছিলো, যে রাতে একটুও ঘুমাতে পারতো না। কিন্তু জিয়াকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার পর এতগুলো রাত জাগার কষ্ট যেনো নিমেষের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে। ওর চোখ থেকে দুয়েক ফোঁটা আনন্দাশ্রুও গড়িয়ে পড়লো। এরমধ্যেই আয়ানের হাতের স্পর্শে জিয়ার ঘুম ভেঙে যাওয়ায় এবং আয়ানকে একভাবে ওর দিকে তাকিয়ে কিসব ভাবনা চিন্তা করতে দেখে ও আয়ানের পেটের মধ্যে সজোরে একটা চিমটি কেটে দিলো। আচমকা জিয়ার বড়ো বড়ো নখের চিমটিতে “আঃ” বলে চিৎকার করে উঠলো আয়ান। ওর চিৎকার শুনে সবাই উঠে পড়ার ভয়ে জিয়া ওর একটা হাত চেপে ধরলো আয়ানের মুখে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। আয়ানের চিৎকার শুনে ওখানে উপস্থিত প্রায় সকলেরই ঘুম ভেঙে গেছে। সবাই জিয়া আর আয়ানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে লজ্জায় জিয়ার গাল দুটো লাল হয়ে গেলো। ঠিক তখনই শিয়া চায়ের প্লেট হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। শিয়াকে দেখেই জিয়া তাড়াতাড়ি করে আয়ানের মুখ থেকে ওর হাতটা সরিয়ে নিলো। কিন্তু তা দেখে সবাই জোরে জোরে হেসে ফেললো। সবাইকে এভাবে হাসাহাসি করতে দেখে শিয়া সবাইকে উদ্দেশ্যে করেই জিজ্ঞেস করলো,

-কী হয়েছে রে? তোরা সবাই এরকম হাসাহাসি করছিস কেনো?

কিন্তু কারোর কাছ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে শিয়া রিমলিকে জিজ্ঞেস করলো,

-কেউ তো কোনো উত্তরই দিচ্ছে না দেখছি! এই রিমলি তুমি বলতো কী হয়েছে?
-আসলে আরুশি দি, তেমন কিছুই না। তবে আবার অনেক কিছুই হয়েছেও বলতে পারো!
-মানে? তোমার কথা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না রিমলি!

জিয়া সঙ্গে সঙ্গে আয়ানের পেটের ওপর থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে বললো,

-কিচ্ছু হয়নি রে দিদিয়া! তুই এখানে বস তো.. ওহ তুই আবার চা-ও নিয়ে এসেছিস? দে প্লিজ, আমার চা-টা তাড়াতাড়ি দে!

জিয়াকে চা দেওয়ার জন্য শিয়া প্লেট থেকে কাপটা নিতে গেলো, কিন্তু তার আগেই জিয়া এগিয়ে এসে চায়ের প্লেট থেকে ছোঁ মেরে একটা কাপ তুলে নিলো। জিয়া কাপটা তুলে নেওয়ার পর শিয়া একে একে সবার হাতে চায়ের কাপ গুলো তুলে দিলো। তারপর জলখাবার খেয়ে আয়ানদের বাড়ি ফেরার জন্য যখন সমস্ত গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তাদের থেকে আশীর্বাদ নিয়ে কান্নাকাটি করতে করতে জিয়া আর আয়ান শিয়ার কাছে এলো তখন শিয়ার চোখেও জল টলটল করছে। কাঁদতে কাঁদতেই জিয়া জড়িয়ে ধরলো শিয়াকে। তারপর ও আয়ানের হাত থেকে একটা বাক্স নিয়ে সেটা উপহার দিলো শিয়াকে। বাক্সটা দেখে শিয়া বললো,

-এটার মধ্যে কি আছে জিয়া? আমাকে কেন শুধু শুধু গিফট দিচ্ছিস? সামনে মা-বাবা থাকতে ওদের উপহার না দিয়ে আমাকে কেন দিচ্ছিস?

ক্রমশ…

গল্পের বাকি অংশটুকু বেলার দিকে পেয়ে যাবেন…

অন্তিম পর্ব-
https://www.facebook.com/101048758811830/posts/293585896224781/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here