#হৃদমাঝারে পর্ব-৯

0
42

#হৃদমাঝারে পর্ব-৯
#দেবারতি_ধাড়া

সামনের ছোটো টী-টেবিলটায় তখনও একইভাবে সব মিষ্টি আর জলখাবার গুলো সাজানো রয়েছে। আয়ান বা বাসন্তীদেবী কেউই খেতে শুরু করেননি। গায়েত্রীদেবী চায়ের ট্রে হাতে পাত্রীকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখলেন প্লেটে সব খাবার গুলো একইরকমভাবে সাজানো রয়েছে। তাই দেখে উনি বললেন,

-একী? আপনারা তো দেখছি এখনও কিছুই খেতে শুরু করেননি! দয়া করে খেতে শুরু করুন.. সব খাবার গুলো তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেলো!
-খাবো খাবো, আগে আমি আমার হবু বৌমাকে একটু ভালো করে দেখি.. তারপর নাহয় এসব খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শুরু করা যাবে। আসলে আমি কোনোদিনই এভাবে মেয়ে দেখতে আসাতে সহমত পোষণ করি না জানেন.. কিন্তু এইযে আমার লাজুক ছেলেটা! ওকে কতোবার বলেছিলাম যে নিজের থেকে মেয়ে দেখে আমার কাছে নিয়ে আসবি, আমি সাথে সাথে তাকে বরণ করে ঘরে তুলে নেবো। কিন্তু ও এমনই একটা ছেলে, যে নিজের থেকে একটা মেয়েও পছন্দ করতে পারলো না এতোদিনে। প্রেম করা তো অনেক দূরের কথা!

বাসন্তীদেবীর কথা শুনে একটু হেসেই ফেললেন গায়েত্রীদেবী। তারপর উনি বললেন,

-আমার মেয়েটিও তাই.. ভীষণ লাজুক.. আর ভীষণ মুখচোড়া। কথাও খুব কম বলে। আর তাছাড়া আমার মেয়ে এবার আপনাদের বাড়ির বউ হয়ে আপনাদের বাড়ি যাবে, আপনারাই ভালো করে দেখে শুনে নিন.. চায়ের ট্রে-টা টেবিলে রেখে ওনাদের চা গুলো একটু হাতে হাতে দিয়ে দে মা..
-আমি আর কী দেখবো? ছবিতে তো দেখেইছি। আমার তো ছবি দেখেই আপনাদের মেয়েকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে। আর সামনে থেকে আপনার মেয়ে আরও বেশি সুন্দর।এবার শুধু যারা সংসার করবে, একসাথে সারাটা জীবন কাটাবে, তাদের মধ্যে সব ঠিকঠাক থাকলেই ব্যাস! কী বলুন গায়েত্রীদেবী?
-হ্যাঁ তা আপনি যা বলেছেন দিদি। ওরা একে অপরকে ঠিকমতো জেনে শুনে নিলেই হবে। তবুও যদি আপনার কিছু জানার থাকে, আপনিও জিজ্ঞেস করতে পারেন..
-আপনাদের মেয়ের সম্বন্ধে তো সবই শুনেছি ঘটকমশাইয়ের কাছে। শুধু তোমার নামটাই জানা হয়নি মা। কী নাম তোমার?
-আরুশি, আরুশি সেন!
-বাহ্ ভারী সুন্দর নাম তো তোমার। আমার তো আর তোমার কাছ থেকে তেমন কিছু জানার নেই। তোমার ব্যাপারে সবই তো আমি ঘটকমশাইয়ের কাছে আগেই শুনেছি। তবে তোমার যদি কিছু জানার থাকে, তুমি আমাদের নির্দ্ধিধায় জিজ্ঞেস করতে পারো আরুশি। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু তোমার দজ্জাল শাশুড়ি হতে চাই না! আমি তোমার মা হতে চাই। আমার ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমার আর এক মেয়ে হয়ে আমার বাড়ি যাবে তুমি। তাই নিজের মতো ভেবে নিয়ে তুমি যা খুশি জিজ্ঞেস করতে পারো আমাকে।

বাসন্তীদেবীর কথা শুনে লাজুক মুখে মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে একটু হাসলো আরুশি। ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাসন্তীদেবী বললেন,

-একী আরুশি, তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো এখানে..

বাসন্তীদেবীদ কথায় আরুশি আয়ানদের উল্টোদিকের সোফাটায় গিয়ে বসলো খুব ধীর ভাবে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ও খুব ধীরস্থির শান্ত। আর সত্যি সত্যিই ভীষণ লাজুক। কিন্তু ওকে দেখে আয়ান ভীষণ অবাক হয়ে যাচ্ছিলো। ওর চেনা জিয়া যে এতো চুপচাপ আর ধীরস্থির থাকতে পারে, সেটা ওর কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। অনেকক্ষণ থেকেই আরুশির দিকে তাকিয়ে ছিলো আয়ান। কিন্তু আরুশি ওর দিকে তাকানো তো দূরের কথা, লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতেই পারছিলো না ওদের দিকে। বাসন্তী দেবী আবারও জিজ্ঞেস করলেন,

-আরুশি? তোমার সত্যিই আমার থেকে কিছু জানার নেই?

আরুশি মাথা নেড়ে “না” বলাতে বাসন্তীদেবী বললেন,

-আচ্ছা আচ্ছা, আমি বুঝতে পেরেছি তুমি খুব লজ্জা পাচ্ছো। তবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, আমাদের কাছে লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু নেই মা.. আর কিছু দিন পরেই তো তোমাকে আমাদের সাথেই থাকতে হবে। যদিও তোমাকে হয়তো আমার ছেলের সাথে শিলিগুড়িতেই চলে যেতে হবে। তবুও বিয়ের পর কিছু দিন তো আমার সাথেও থাকবে। তখন কী আর এতো লজ্জা পেলে চলবে নাকি?

কথা গুলো বলেই আরুশির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফেললেন বাসন্তীদেবী। তারপর উনি বললেন,

-গায়েত্রীদেবী?
-হ্যাঁ দিদি বলুন?
-আমি বলছিলাম যে, এবার যদি আমার ছেলে আর আপনার মেয়ে দুজনে একটু আলাদাভাবে কথা বলে নেয়, মানে ওদের যদি ব্যক্তিগত কোনো প্রশ্ন থেকে থাকে, যদি একে অপরের থেকে সেগুলো জেনে নেয়, তাহলে খুব ভালো হবে। আসলে বুঝতেই তো পারছেন, আজকালকার সব ছেলেমেয়ে তো! নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নেওয়াটাও খুবই জরুরী।
-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমি এক্ষুণি ওদের দুজনকে পাশের ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসছি আলাদাভাবে কথা বলার জন্য। তুমি এসো বাবা! তুইও আয় মা…
-না না গায়েত্রীদেবী, ওরা বরং এখানেই থাকুক। আমিই বরং আপনার সাথে পাশের ঘরে গিয়ে একটু গল্পগুজব করি। ওদিকে ঘটকমশাইও তো মনে হয় অমলেন্দুবাবুর সাথে গল্পে মেতে উঠেছেন। চলুন আমরাও নাহয় ওনাদের সাথেই গল্পে যোগ দিই। কিছুক্ষণ পর ওদের কথা হয়ে গেলে নাহয় আমরা আবার এখানে আসবো!
-আচ্ছা আচ্ছা, তাহলে তাই চলুন… আমি বরং আপনার চা আর মিষ্টি গুলো সঙ্গে নিয়ে নিচ্ছি! গল্প করতে করতে নাহয় ওখানেই খেতে শুরু করবেন.. তুমিও কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে বলতে খেতে শুরু করো বাবা.. আপনি আমার সাথে আসুন দিদি…
-হ্যাঁ চলুন…

এতোক্ষণে যেন একটু নিশ্চিন্ত হলো আয়ান। মনে মনে ও ভীষণ ভয় পাচ্ছিলো এটাই ভেবে যে, এই বুঝি জিয়া সবার সামনেই ওকে মুখ ঝামটা দিয়ে বসে। আর সেই দেখে বাসন্তীদেবী বলে ওঠেন যে, উনি আর আয়ানের সাথে এই মেয়ের বিয়ে দেবেন না। গায়েত্রীদেবী ওদের দুজনকে ঘরের ভিতরে রেখে দরজাটা বাইরে থেকে হালকাভাবে ভিজিয়ে দিলেন। ওনারা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বেশ উত্তেজিত হয়ে আয়ান বললো,

-তোমার ভালো নাম যে আরুশি, কই আগে বলোনি তো আমাকে!

লাজুক মুখে নিচু গলায় আরুশি বললো,

-হ্যাঁ আমার নাম আরুশি। কিন্তু আপনাকে আগে বলিনি মানেটা তো আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না..

আরুশির কথা একটু হেসে ফেললো আয়ান। তারপর বললো,

-শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর দেখতে লাগছে… সত্যি তুমি পারোও বটে! তোমাকে দেখে একদম শান্ত আর লাজুক মেয়েই মনে হচ্ছে। আর তাছাড়া তুমি সবার সামনে কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে এতোক্ষণ ধরে চুপচাপ বসেছিলে কী করে?
-মানে? আপনার কথা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না..

ঠিক তখনই আয়ানের চোখ পড়ে গেলো ঘরের এক কোণে থাকা ছোট্ট টেবিলটার ওপরে রাখা একটা ছবির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আয়ান এগিয়ে গিয়ে ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে অবাক হয়ে ভালো করে দেখতে লাগলো। ছবিটাতে দুটো পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুজনকে একদম একইরকম দেখতে। একজন একটা নীল রঙের চুড়িদার পরে আছে, গায়ে সাদা রঙের ওড়না চাপানো। আর অন্য মেয়েটি থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর গোলাপী রঙের একটা টপ পরে রয়েছে। দুজনের চুলেই দুটো করে বিনুনি করা। চুড়িদার পরা মেয়েটির বিনুনি গুলো একটু ছোটো। আর টপ-প্যান্ট পরা মেয়েটির চুল গুলো অনেক বড়ো। ছবির দুটো মেয়ের সাথেই জিয়ার মুখের মিল স্পষ্ট। আয়ানকে ওভাবে অবাক হয়ে ছবিটা হাতে নিয়ে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখে আরুশি বললো,

-কী? আপনি খুব অবাক হলেন, তাইতো?

ওর কথা শুনে আয়ান আরও বেশি অবাক দৃষ্টিতে তাকালো আরুশির দিকে। তখন আরুশি বললো,

-ওটা আমার আর আমার বোনের ছোটোবেলাকার ছবি।
-বোন মানে?!
-আসলে আমরা আইডেন্টিক্যাল টুইন্স।
-হোয়াট! টুইন্স?!
-হ্যাঁ। আমরা জমজ.. আমার বোনের নাম জিয়া। হঠাৎ করেই ওর একদিন ইচ্ছে হয়েছিলো আমরা একে অপরের মতো সেজে একটা ছবি তুলবো। ব্যাস্ ও নাছোড়বান্দা! সাজগোজ করে ছবি তুলে তবেই রেহাই পেয়েছিলাম সেদিন।
-তুমি, মানে.. আপনি সত্যিই আরুশি? আপনি জিয়া নন?
-না না, আমি জিয়া নই। আমি শিয়া, আর আমার বোন জিয়া.. একটু আগেই তো ও এখানে ছিলো। হঠাৎই একটা বন্ধুর ফোন পেয়ে ও বেরিয়ে গেলো।
-ও মাই গড!

আরুশির কথা গুলো শুনেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো আয়ানের। ও কী বলবে, কী করবে ভেবে পেলো না। ছবিটার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আরুশির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে থাকলো আয়ান। ও এভাবে আরুশির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আরুশির গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আরুশি এদিক ওদিক তাকিয়ে আয়ানের দৃষ্টি থেকে মুক্তি পেতে চাইলো। কিন্তু আয়ানের দৃষ্টি থেকে মুক্ত হতে না পেরে লাজুক স্বরেই ও বললো,

-এই যা! আপনার চা-টা তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেলো মনে হয়। আপনি একটু বসুন, আমি আপনার জন্য আর এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসছি..

আরুশির কন্ঠস্বরে ঘোর কাটলো আয়ানের। ও বললো,

-না, তার কোনো দরকার নেই। আমি এখন আর চা খাবো না! আমাকে এক্ষুণি বেরোতে হবে। আপনি বরং পাশের ঘরে গিয়ে আমার মাকে একটু ডেকে দিন!
-কিন্তু আপনার কী কিছু জিজ্ঞেস করার নেই আমাকে?
-না! আমার আর কিচ্ছু জিজ্ঞেস করার নেই আপনাকে।

মুখের ওপর না বলে দেওয়াতে আরুশি নিজের মুখটা নামিয়ে নিলো। তারপর শান্ত স্বরে বললো,

-আচ্ছা, আপনি বসুন.. আমি আপনার মাকে আসতে বলছি।

আরুশি পাশের ঘরে যেতেই গায়েত্রীদেবী ওকে দেখে বললেন,

-কিরে? এর মধ্যেই তোদের কথা বলা হয়ে গেলো? এই তো এই ঘরে এলাম আমরা!
-মণি, আসলে উনি বললেন ওনার আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। আর উনি বললেন ওনাকে নাকি এক্ষুণি কোথাও একটা বেরোতে হবে। তাই আমাকে এসে ওনার মাকে ডেকে দিতে বললেন।

বাসন্তীদেবী কথাটা শুনতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন,

-সেকী? ও তোমার সাথে কথাটাও বললো না ঠিক করে? বাবানের আবার কী হলো? দাঁড়ান দিদি, আমি দেখছি।

তাড়াহুড়ো করে পাশের ঘরে এসে বাসন্তীদেবী আয়ানকে বললেন,

-কীরে বাবান? তোর আবার কী হলো? আরুশির সাথে কথা না বলে আমাকে এখানে ডেকে পাঠালি যে?
-মা, আমাকে এক্ষুণি বেরোতে হবে!
-সেকী রে! এক্ষুণি বেরোতে হবে মানে? এই কিছুক্ষণ আগেই তো আমরা এলাম!
-আমার একটা খুব ইম্পরটেন্ট কাজ আছে! প্লিজ তাড়াতাড়ি চলো…
-আমি তো গায়েত্রীদেবী, অমলেন্দুবাবু আর ঘটকমশাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম একটু। এক্ষুণি চলে যাবো কী করে?
-আমি কিছু জানি না মা। তুমি চলো প্লিজ! তা নাহলে আমি একাই চলে যাচ্ছি। তুমি পরে এসো।
-তুই চলে যাবি? কিন্তু কেন বাবান? তুই এভাবে চলে গেলে ওনারা কী ভাববেন বলতো বাবান?
-আমি জানি না মা। আমার আর এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগছে না। প্লিজ! আমার অনেক ভীষণ ইম্পরটেন্ট একটা কাজ আছে। সেটা না করতে পারলে খুব বড়ো একটা প্রবলেম হয়ে যাবে মা!
-আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। তুই যা তাহলে। আমি ওনাদের সাথে কথা বলে একটু পরে বাড়ি ফিরছি! তুই একবার ওনাদেরকে বলে যা, যে তোকে বেরিয়ে যেতে হবে। তা নাহলে হয়তো ওনাদের খারাপ লাগতে পারে।
-ঠিক আছে!

ক্রমশ…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here