#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ২৯

0
203

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ২৯
#ফারহানা ইয়াসমিন

ফিরিয়ে এনেছে সৌরভ। নিজেকে পাল্টে ফেলবে এই শর্তে ফিরিয়ে এনেছে ঝিলিককে। তাদের পরিবারে ডিভোর্স এর রেকর্ড নেই। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক যেমনই হোক বিয়ে টিকে থাকতে হবে। তাছাড়া সমাজে তাদের মানসম্মান প্রভাব পতি পত্তি আছে। ঝিলিক ডিভোর্স দিচ্ছে শুনলে সেসব কোথায় যাবে ভেবেই নিজেকে নতজানু করেছে সৌরভ। কথাগুলো বাবা মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাক তা সে চায় না। তাই ঝিলিকের শর্ত মেনেই ঝিলিককে ফিরিয়ে এনেছে। ফিরে আসলেও ঝিলিক ভীষণ চুপচাপ থাকে। প্রয়োজন ছাড়া একটাও কথা বলে না, নিজের কাজে বেশ সিরিয়াস হয়েছে। কিছু জানতে চাইলে ভীষণ চমকে উঠে এমনভাবে তাকায় যেন কোন কথা ওর কানে ঢোকেনি। সৌরভ ঝিলিকের ব্যবহারে অবাক হলেও ওকে ঘাটে না। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, ইচ্ছে করেই বাড়িতে দেরি করে ফিরে। এরমধ্যে রুহির প্রেগ্নেন্সির খবর যেন ঝিলিকের মুখে কালিমা লেপন করে দিয়েছে। ওদের বিয়ের বয়স পাঁচ পার হয়েছে অথচ এখনও বাচ্চার খবর নেই। সেদিন শিখা এসেছিলো ওদের কামড়ায়- “তোমরা আর কতোদিন এমন নতুন কাপল হয়ে ঘুরবে বলোতো? আমরা কি নাতিপুতির মুখ দেখতে পাবো না?” ঝিলিক মুখ নিচু করে বসে ছিলো নিশ্চুপ। সৌরভ আড়চোখে ঝিলিককে দেখছিলো। শিখা দু’জনকে দেখেই গভীর শ্বাস ফেলে- “সমস্যা মনে হলে ডাক্তার দেখাও। আমরা শিগগিরই সুখবর শুনতে চাই। ঝিলিক বুঝতে পারছো তো আমার কথা?” ঝিলিক মাথা নিচু করেই মাথা নাড়ে। সৌরভ সন্দিগ্ধ চোখে ঝিলিককে দেখে। মেয়েটা কি কিছু লুকাচ্ছে তার কাছে? ফিরে আসার মাস তিন চার পার হলেও সৌরভ ঝিলিকের সাথে ইন্টিমেট হয়নি। কাছে গেলেই ঝিলিক কেমন যেন কুঁকড়ে যায়। সৌরভের এবার জোর করতে একদম ইচ্ছে করেছি। থাক মেয়েটা তার মতো। একজনার ইচ্ছেয় কি সম্পর্ক হয়? ঝিলিকের যদি তাকে না লাগে তাহলে সে কেন বার বার নিজ থেকে এগুবে? মা চলে যেতেই সৌরভ ঝিলিককে প্রশ্ন করে- “তুমি কি কিছু লুকচ্ছ আমার কাছে?” ঝিলিক কেঁপে উঠে ভিতু কন্ঠে বলে- “নাহ নাতো, কি লুকবো?” “কিছু না লুকালেই ভালো।” সৌরভ উঠে চলে গেলো। ঝিলিক ঠায় বসে রইলো সেভাবেই। সেই রাতে হঠাৎ সৌরভের ঘুম ভেঙে গেলো। ঝিলিক তখন বিছানার অপর প্রান্তে ঠকঠক করে কাঁপছে। ডিম লাইটের আলোয় প্রথমে না বুঝলেও পরে টের পেয়ে সৌরভ এগিয়ে গেলো ঝিলিকের দিকে। মেয়েটা বিরবির করে কিছু বলছিলো। কপালে হাত রাখতেই টের পেলো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ঝিলিকের। সৌরভ কান পেতে শুনে বোঝার চেষ্টা করে কি বলছে ঝিলিক। কিছুক্ষণ পরেই সৌরভের চোখে অবিশ্বাস খেলা করে। প্রচন্ড আক্রোশে ঝিলিককে মারতে চাইলেও শেষ মুহূর্তে কি ভেবে নিজেকে নিবৃত্ত করে। সারারাত আর ঘুমালো না সৌরভ। রুমের রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে ঝিলিকের দিকে চেয়ে রইলো অপলক। জ্বরের তেজ কমলে সকালে চোখ মেলে তাকাতেই সৌরভকে তার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখে চমকে উঠে বসলো ঝিলিক- “তুমি! এতো সকালে উঠেছো যে?” সৌরভ স্থির চোখে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। সৌরভের অচেনা দৃষ্টি দেখে ঝিলিকের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো, সৌরভ কি সব জেনে গেলো? ঝিলিককে ইশারায় তার সামনে বসার নির্দেশ দিলো সৌরভ। ঝিলিক বিস্মিত কন্ঠে বলে- “কি হয়েছে?” “বলছি বসো।” ঝিলিক ভয়ে ভয়ে বসে সৌরভকে দেখে। সৌরভ বরফ শীতল গলায় জানতে চাইলো- “তুমি বাচ্চা নষ্ট করেছো?” ঝিলিকের পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। সে কি বলবে ভেবে পেলোনা। সৌরভের এই ঠান্ডা রুপ একদমই অচেনা তার কাছে। রাগ হলে সৌরভ তাকে মারে তার উপর অত্যাচার করে। কিন্তু এতো শীতল আচরণ এই প্রথম। ঝিলিক মাথা নেড়ে হ্যা বলে। “কেন? কেন করলে এমন কাজ? মা হয়ে এতো নিষ্ঠুর আচরণ কিভাবে করলে?” ঝিলিক চুপ। সৌরভ চেচিয়ে উঠলো- “আনসার মি ঝিলিক। কেন করেছো এ কাজ?” ঝিলিক কেঁপে উঠে সৌরভের চোখে চোখ রাখে, শান্ত গলায় বললো- “বিকজ ইউ রেপড মি। আমি এরকম ভাবে সন্তান চাই না। ওকে দেখলেই তোমার নোংরা আচরণ মনে হবে আমার। তাই সারাজীবন সহ্য করার চাইতে ওকে মেরে ফেলা উত্তম মনে হয়েছে আমার কাছে। গট ইট?” সৌরভের শরীরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। মন চাইছে ঝিলিকের গলা টিপে মেরে ফেলতে। সৌরভ টকটকে লাল চোখে ঝিলিকের দিকে এগিয়ে এলো দু’হাত বাড়িয়ে। ঝিলিক পিছিয়ে গেলো না, সে স্ট্যাচু হয়ে তাকিয়ে রইলো সৌরভের দিকে। দেখতে চায় আজ সৌরভ কি করে তার সাথে। দু’জনেই দু’জনকে দেখছে অপলক। সৌরভ খপ করে ঝিলিকের গলা চেপে ধরলো। ★★★ “যে উদ্দেশ্য নিয়ে এতো নাটক করছো সে উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার পথে। এবার কি করবে তুমি? আর কতোদিন এমন থাকবে?” পুরুষটি উঠে বসলো, হাত দিয়ে মাথার অল্প কাঁচাপাকা চুলগুলো হাতড়ালো- “যতদিন প্রয়োজন হয় থাকবো। সন্তানের জন্য যা করা তা অন্যায় কিছু না এটা তো মানো?” মহিলার চেহারায় মালিন্যতা, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ক্ষীন আওয়াজে বলে- “যদি ও একবারও ঘুনাক্ষরেও জানতে পারে এসব তাহলে কি করবে জানো? আমি তো ভাবতেই পারিনা কি হবে। যে রাগ ওর ভুলে গেছো তুমি?” “কিছু নাও করতে পারে। এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। আমার আশা এবার অন্তত ও আমাকে বুঝবে।” লোকটার চাপা আওয়াজ পাওয়া গেলো। মহিলা কিছুসময় তাকিয়ে দেখলো সামনের মানুষটাকে। তারপর শ্বাস ফেলে গম্ভীর হলো- “বুঝলে তো আর চিন্তা নেই। কিন্তু ও যাতে না বোঝে এমন বুঝ দেওয়ার লোকেরও অভাব নেই এটা জেনে রেখো। এতো টেনশন আর নিতে পারি না বাপু। শরীরে সইছে না।” “তোমাকে এতো টেনশন নিতে বলেছে কে? টেনশনের ভার আমার তুমি আরামে থাকো।” ঠিক সেই সময় একটা আর্তচিৎকারে দু’জনেই চমকে উঠলো। মহিলা তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে এলো কি হয়েছে দেখার জন্য। “রাযীনকে বলার সময় হয়ে গেছে মনেহচ্ছে।” “যা করবে ভেবে করবে মা। বড় আব্বু যদি জানে এসব তুমি কিছু বলেছো তাহলে কি করবে জানো তো?” “কি করবে? কিছু করার ক্ষমতা আছে নাকি তার? শুয়ে শুয়ে কোথায় কি করবে?” “করবে অনেক কিছু যেটা তুমি আমি ভাবতেও পারি না। দেখছো না সব সম্পদের বিষয়ে কেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? কোথায় কি করবে সব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। কেউ যাতে তার কষ্টের সম্পদ নষ্ট না করতে পারে সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন সে।” বেনুর কথায় শিখা ভাবনায় ডুবে গেলো। বেনু আজ যে খবর নিয়ে এসেছে সেটা শুনে শিখার চক্ষু কপালে উঠে গেছে। বেনুর বর জামসেদ গোপন সুত্রে খবর বের করেছে শশুরের হাতে গড়ে ওঠা শিপিং বিজনেসের একান্ন শতাংশের মালিক নাকি রাযীন হবে। খবরটা শুনেই শিখা সর্বাঙ্গ কেমন যেন জ্বালা করে উঠেছে। একটা সময় ছিলো যখন শিখা রাযীন কিংবা শুভ সৌরভকে আলাদা করে দেখতো না। কিন্তু এখন রাযীন বা রেনু ওদের কাউকেই সহ্য হয় না। তাও ভালো রাযীন এতোদিন দেশে ছিলো। সৌরভ তখন এদের সবার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। শুভটাকেও ভাইজান ভীষণ ভালো বাসতেন। সেসময় তোমার আমার এমন ভেদাভেদ কখনো কারো মনে আসেনি। কিন্তু এখন যেন সবই হিজ হিজ হুজ হুজ। সবাই নিজের হিসাব নিকাসে ব্যস্ত। শিখা ভাবছে ভাইজান এমন কাজ করলো কি করে? তিনছেলেকে সমান অংশ দেবে আর দুইমেয়েকে সমান অংশ। এতো বিভেদ মেনে নেওয়া সম্ভব না। নিজের ছেলে আর ভাইয়ের ছেলের মধ্যে তফাত ভাইজান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যেন। শিখা কপালে ভাজ তুলে আঙুল কচলাচ্ছে। “মা কি ভাবছো এতো?” বেনু অস্থির কন্ঠে জানতে চাইলে শিখা ঘোলাটে চোখে তাকায়- “একটা বিহিত তো করতেই হবে। ভাইজানের এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু একটা তো করতেই হবে। যদিও আমি আগেই ভেবে রেখেছি কি করবো।” শিখার চেহারার ভিলেন মার্কা হাসি ফুটে উঠতেই বেনুর চোখ চিকচিক করে- “সত্যি কি এমন কিছু করবে? বেচারিকে কেন খামাখা কষ্ট দেবে?” “ওই তো এখন তুরুপের তাস। ও কষ্ট পেলে রাজ আর ভাইজান দু’জনকে নাচানো যাবে।” বেনু হাসলো, চোখ দুটোতে প্রতিশোধ স্পৃহা। এই মেয়েটা আসার পর থেকে রেনুটা কেমন যেন পাল্টে গেছে। আগে যে রেনু ওকে ছাড়া একপা চলতো সেই এখন ওকে মাসে দু’মাসেও খোঁজে না। কতোবড় স্বার্থপর ভাবা যায়? হঠাৎ করে কোন আওয়াজ পেতেই রুহি বন্ধ দরজার পাশ থেকে সরে এলো। ভয়ে ওর গা কাঁপছে। এসব কি শুনলো ও? ওরা কি ওর কথাই আলোচনা করছিলো? কি করবে ওর সাথে? আনমনা হয়ে দোতলায় সিড়ি থেকে নামতে যায়। ঠিক তখনই পা পিছলে যায় রুহির। ভয়ে নিজের সর্ব্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। পেটে তার অনাগত সন্তান বাঁচাতে হবে ওকে। চলবে— ©Farhana_Yesmin (প্রিয় পাঠক, বইমেলা শেষ হয়ে গেলেও বই কেনা যেন না থামে। আমার দুটো বই রকমারিতে পাবেন। চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। রকমারি অর্ডার লিংকঃ তিয়াসঃ https://www.rokomari.com/book/211757/tiyas অনসূয়াঃ https://www.rokomari.com/book/226534/anosoya)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here