#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩০

0
200

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩০
#ফারহানা ইয়াসমিন

বলে যে রাখে আল্লাহ মারে কে। আপনি ভাবছেন এই দুনিয়ায় আপনার থাকার দিন মনেহয় ফুরিয়ে এসেছে অথচ উপর ওয়ালা নতুন করে আপনাকে বেঁচে থাকার রসদ দিচ্ছে। রুহি পরার সময় ভয়ে জ্ঞান হারানোর আগে ভেবেছিলো ও মনেহয় ওর সন্তানকে হারিয়ে ফেলবে। আর কোনোদিন মনেহয় রাযীনকে দেখতে পাবে না। কিন্তু ওই যে উপরওয়ালার ইচ্ছে? সেই ইচ্ছের ফলশ্রুতিতে সঠিক সময়ে কেউ রুহিকে পতন থেকে বাঁচায়। কেউ ওকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নেয়। জ্ঞান ফেরার পরে রুহির হাত আপনাতেই পেটে চলে যায়। সন্তান হারানোর ভয়ে চোখ থেকে অনর্গল পানি পড়ছে। এমনটা তো সে চায়নি। কোন দোষ না করেও কেন সে এতো সাজা পাবে? কেন এ বাড়ির মানুষের জিঘাংসার স্বীকার হবে সে? বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে আসছে রুহির। কান্না জড়ানো কন্ঠে সে জানতে চায়-
“আমার বাচ্চা! আমার বাচ্চা!”
ঘরের বাতি জ্বলে উঠলো। রাযীনের উদ্বিগ্ন মুখ দৃশ্যমান হলো রুহির সামনে। সে রুহির কপালে হাত রেখে নরম কন্ঠে বললো-
“বেবি ভালো আছে রুহি বেবির কিছু হয়নি। তুমি ঠিক আছো তো? কি হয়েছিলো বলো তো?”
বেবি ভালো আছে কথাটা শুনে আনন্দে রুহির চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করলো। সে উঠে বসার চেষ্টা করতেই রাযীন তাকে ধরে বসিয়ে দিলো। রুহি রাযীনের বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো-
“সত্যি বলছেন? বাবু ঠিক আছে?”
রাযীন রুহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো-
“হ্যারে বাবা। মিথ্যে বলবো কেন? তুমি নাকি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাচ্ছিলে শুভ ধরেছে তোমাকে। শুভর জন্যই আজ আমাদের বাচ্চা বেঁচে গেলে রুহি। থ্যাংকস টু শুভ।”
“শুভ!”
রুহি বিরবির করে রাযীনের দিকে তাকালো। তার চোখের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। রাযীন হাসলো-
“হ্যা। ও না থাকলে কি হতো আমি তো ভাবতেই পারছি না। মা খুব রাগ হয়েছে আমার উপর। আমার নাকি অফিস যাওয়া বন্ধ। বেবি না আসা পর্যন্ত তোমার সাথে সাথে থাকতে হবে।”
রাযীনের একটা কথাও রুহির কানে যাচ্ছিলো না। রুহির কানে কেবল শুভর কথা বেজে যাচ্ছিলো। শুভ ওকে বাঁচিয়েছে? কেন? শুভর মা ওকে মেরে ফেলতে চায় আর শুভ বাঁচাতে চায়। কি নাটক মা ছেলের? নিশ্চিত এর মধ্যেও কোন স্বার্থ আছে। শুভ যদি ভাবে এভাবে রুহিকে কাছে টানবে তাহলে ভুল ভাবছে। রুহি কোনদিন আর শুভর হবে না। কখনোই না।
“এই কি ভাবছো?”
রাযীন রুহির গালে টোকা দিলো। রুহি রাযীনের দিকে চাইলো-
“কিছু না। একটু পানি খাওয়াবেন?”
“অবশ্যই। মা তোমার জন্য শরবত বানিয়ে পাঠিয়েছে। ডাক্তার এসেছিলো, বলেছে তুমি ভীষণ উইক। বেশি বেশি খেতে হবে তোমাকে।”
রুহিকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে ওর হাতে শরবতের গ্লাস ধরিয়ে দিলো রাযীন।
“তুমি খাও আমি কাপড় পাল্টে আসি। এতোক্ষণ তোমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম।”
রুহি ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। আপাতত মাথার মধ্যে শুভ ঘুরছে। শুভ কি চায় নতুন করে? কোন স্বার্থে বাঁচালো তাকে?

★★★

রুহির চিৎকার হয়তো ঝিলিককে বাঁচিয়ে দিলো। জিভ প্রায় বেড়িয়ে এসেছিলো সেই মুহূর্তে সৌরভের কানে রুহির চিৎকার গেছিলো। ঝিলিক চিৎকার শোনার অবস্থায় ছিলোনা। ও ধরেই নিয়েছিলো ও মারা যাচ্ছে। সেই অবস্থায় হঠাৎ সৌরভ ওকে ছেড়ে দেওয়ায় ও প্রথমে কিছুক্ষণ নেতিয়ে পড়ে রইলো। প্রচুর কাশি হচ্ছিল ঝিলিকের। অনেক কষ্টে চোখ মেলে পানির বোতল খুঁজলো। টেবিলে উপর বোতলটা অলস পড়ে ছিলো। ঝিলিক অনেক কষ্টে উঠে গিয়ে পানি পান করার চেষ্টা করলো। প্রথমবারে পুরো পানিটা মুখ থেকে গড়িয়ে গেলো। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে কিছু পানি খেতে পারলো। আরো কয়েকঢোক পানি পান করে ঝিলিক বিছানায় ঢলে পড়লো। শুন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। আজ হয়তো সে মারা যেত। বাবা মা এতোক্ষণে খবর পেয়ে হয়তো কাঁদতে বসতো। সৌরভ এতোটা হিংস্র হবে এটা ভাবনাতে ছিলোনা। ঝিলিক ভেবেছে সৌরভের জন্য এসব কোন ব্যাপার না। নিজে বরং মানসিক কষ্টে ছিলো বাচ্চাটা নষ্ট করে। কয়েকদিন অনেক ভেবেছে, বারবার মনে হয়েছে বাচ্চাটা দেখলেই সৌরভের অপমানের কথা মনে হবে। এই বোধ তাড়া করে ফিরছিলো ঝিলিককে। শেষ মেষ সব ভেবে বাচ্চাটা না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ভেবেছিলো বাচ্চাটা না রাখলে মনের কষ্ট কিছুটা কমবে কিন্তু বাচ্চা ফেলে আসার পর থেকে বাচ্চাটা যেন সর্বদা ওকে মা মা বলে ডাকছিলো। একটা অপরাধবোধ কুঁড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো ওকে। কিন্তু আজ যা হলো তাতে মনের মেষটুকুও কেটে গেলো। যা হয়েছে ভালো হয়েছে কোন আক্ষেপ নেই মনে।
“রুহির জন্য বেঁচে গেলে আজ। তোমার ভাগ্য বিশেষ ভালো বলতেই হবে।”
ঝিলিকের ভাবনায় ছেদ পড়লো। তাকিয়ে দেখলো সৌরভ রুমে ফিরে হিংস্র দৃষ্টি হেনে ওকে দেখছে। ঝিলিক চোখ ফিরেয়ে নিলো। ওর জানার ইচ্ছে হলোনা রুহি কিভাবে তাকে বাঁচালো। সৌরভ ওর দিকে এগিয়ে এলো-
“তুমি কি বুঝতে পারছো কি করেছো তুমি?”
ঝিলিক অনিচ্ছায় সৌরভকে দেখলো-
“তুমি কি বোঝো তুমি কি করো আমার সাথে? অকারণ আক্রোশে নিরপরাধ আমার উপর যে অত্যাচার করেছো এতোদিন তার জন্য তোমার চোখে কখনো অনুতাপ দেখিনি। সেই তুমি এমন প্রশ্ন করছো আমাকে?”
সৌরভ বিচলিত হলো কিছুটা-
“তাই বলে একটা নিস্পাপ প্রান কেঁড়ে নেবে?”
ঝিলিক জবাব দিলো না। উল্টো ঘুরে ঘুমালো। সৌরভের কষ্ট দেখে বুকটা একটু হালকা লাগছে যেন। বুঝুক লোকটা কষ্ট পেলে কেমন লাগে?

★★★

“শিখা, কেমন আছো?”
হঠাৎ করে রোজীকে দেখে মনের মধ্যে ঝড় বইলেও শিখা শান্ত থাকলো। বড় ভাবি তার কাছে কেন এসেছে শিখা জানে না। তবে চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলতে চান। ভাবি কি কিছু টের পেলো? আড়স্ঠ শিখা মুখে স্মিত হাসি এনে জবাব দিলো-
“ভাবি, কোন দরকার? আপনি এলেন কেন কষ্ট করে? আমাকে ডাকলেই হতো।”
রোজী শিখার সামনে বসলো-
“প্রয়োজনটা আমার বলেই আমি এলাম শিখা। এতে কোনো সমস্যা নেই।”
শিখা উন্মুখ নয়নে রোজীর পানে চাইলো-
“কি দরকার বড় ভাবি। সিরিয়াস কিছু?”
রোজী চুপচাপ কিছু একটা ভাবলো তারপর মুখ তুলে শিখার চোখে চোখ রাখলো-
“তোমাকে একটা অনুরোধ করতে চাই শিখা। রাখবে?”
শিখা চমকে উঠলো। রোজী কখনো এমন করে কথা বলেনি তার সাথে। আজ হঠাৎ কি হলো? শিখা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো-
“অনুরোধ কেন বড় ভাবি আপনি আদেশ করবেন।”
রোজী স্মান হাসি দিলো-
“আমি অনুরোধই করবো। তুমি রাখবে কিনা বলো?”
“না শুনে বলি কি করে? রাখার মতো হলে অবশ্যই রাখবো।”
মুখে বললেও মনে চিন্তার ঝড় বইছে শিখার। রোজী শিখার হাত ধরলো-
“রুহিকে ছেড়ে দাও শিখা। ওর কোন ক্ষতি করোনা প্লিজ। রাজ পাঁচ বছর দূরে ছিলো সয়েছি কিন্তু এবার এমন কিছু করোনা যা সইতে পারবোনা।”
শিখা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। ওর মুখে কথা ফুটলো না। রোজী আবার বলতে শুরু করে-
“তোমার দুঃখ আমি বুঝি। চোখের সামনে মেয়ের কষ্ট দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারো না। কিন্তু আমার কথাটাও ভাবো শিখা। আমিও ছেলে হারিয়েছি। আমার দুঃখ তোমার চাইতে কিছু কম নয়। তুমি রাজের কাছ থেকে ঝিলিককে কেড়ে নিয়েছো, ওকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছো সব তোমার কষ্ট থেকে করেছো ভেবে মেনে নিয়েছি। কিন্তু এবার অন্তত ছাড় দাও শিখা। এবার আমার ছেলেটার সাথে এমন কিছু করোনা। এমনিতেই ওদের বিবাহিত জীবন নিয়ে ওরা ভীষণ দ্বিধায় আছে। নতুন করে ওদের উস্কে দিয় না। এবার ক্ষমা করো শিখা। নিজে শান্তি পাবে বাকী আমরাও।”
শিখা রোজীর হাত ছাড়িয়ে মলিন হাসলো-
“আমার কষ্ট বুঝলেন কোথায় ভাবি? মেয়েটাও যদি মরে যেতো তাহলে ভালো হতো। প্রতিদিন মরতে হতোনা ওর। আর ওকে দেখে আমি কষ্ট পেতাম না। আপনাকে কথা দিতে পারছিনা ভাবি। আমরাও তো নির্দোষ ছিলাম কিন্তু প্রতিনিয়ত সাজা ভোগ করছি। সবই নিয়তি ভাবি। রুহির নিয়তিতে কষ্ট থাকলে তা থেকে কে বাঁচাতে পারবে তাকে?”
শিখা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলো। তার চেহারায় কাঠিন্য, চোখ দুটো যদিও ভিন্ন কথা বলছে। ছলছল চোখ দুটোতে স্পষ্ট বেদনা। রোজী কেবল খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারপর রুম ছেড়ে বেড়িয়ে এলো। রোজীর বিশ্বাস ছিলো শিখা অতোটা খারাপ হবে না। কিন্তু এখন কথা বলার পরে বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেছে। প্রতিহিংসা শিখাকে বদলে দিয়েছে। রুহি মেয়েটাকে এবার কিছুতেই দুঃখ পেতে দেওয়া যাবে না। তাহলে হয়তো মেয়েটা বাঁচবে না।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

(প্রিয় পাঠক, বইমেলা শেষ হয়ে গেলেও বই কেনা যেন না থামে। আমার দুটো বই রকমারিতে পাবেন। চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। রকমারি অর্ডার লিংকঃ
তিয়াসঃ
https://www.rokomari.com/book/211757/tiyas
অনসূয়াঃ
https://www.rokomari.com/book/226534/anosoya)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here