#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩১

0
212

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩১
#ফারহানা ইয়াসমিন

ছোট ভাইয়ের বউকে নিজের কামরায় দেখে ভীষণ অবাক হলো আশরাফ। বাম পাটা তুলে দিয়েছে ডানপায়ের উপর, মুখের সামনে পেপার ধরে আছেন। চেয়ার টানার শব্দ পেয়ে তাকাতেই বিষম খেলেন আশরাফ। আমতা আমতা করতেই রোজী তাকালো। রোজী খাবার রেডি করছিলো খাওয়ানোর জন্য। শিখাকে দেখে সেও কম অবাক হলোনা। শিখা সালাম দিলো না আজকে। একটা চেয়ার টেনে আশরাফের সামনে বসে আছে। শিখাকে বিচলিত দেখাচ্ছে ভীষণ, চোখদুটো লাল হয়ে আছে। মনেহচ্ছে এইমাত্র কেঁদেছে ভীষণ। রোজী ব্যস্ত হয়ে শিখার কাছে এসে বসলো-
“কি হয়েছে শিখা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? সব ঠিক আছে?”
শিখা উষ্কখুষ্ক চাহুনি দিয়ে রোজীকে দেখলো একবার তারপর আশরাফের পানে চেয়ে বললো-
“হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিলো, আমার নুরী তার কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে ভাইজান। এবার আপনি খুশি হয়েছেন তো? এ বাড়ির দুটো তাজা প্রানকে কেড়ে নিয়ে আপনি খুশি তো ভাইজান?”
“কি বলছো শিখা? সত্যি সত্যি নুরী নেই?”
রোজী শিখার হাত ধরলে শিখা ঝাটকা মেরে সে হাত সরিয়ে দিলো-
“মিথ্যে কেন বলবো বড়ভাবি? আপনাদের জন্য খুশির খবর নিশ্চয়ই তাই ভাবলাম নিজেই দিয়ে আসি। আমার মেয়েটা আজ মুক্তি পেলো ভাবি। ওর এতোদিনের কষ্ট থেকে মুক্তি পেলো। আমি খুব খুশি আমার মেয়ের জন্য।”
রোজী শিখাকে জরিয়ে ধরলো, তার চোখেও পানি। টপটপ করে ঝরে যাচ্ছে চোখের জল-
“এমন বলে না শিখা বলে না। নিজেকে সামলাও প্লিজ। তোমার মেয়ের তবু আশা আছে এক না এক সময় বেহেশতে যাবে। আমার ছেলেটা কি করলো বলো তো? ও তো পাপ করেছে যে কাজের কোন ক্ষমা হয় না। সে যে কাজ করেছে আল্লাহ কি ওকে মাফ করবে? তবুও আমি চুপ শিখা। আমাদের সবার ভুল ছিলো তখন। আমরা আরেকটু সহনশীল হলে হয়তো এমন হতোনা ব্যাপারটা।”
শিখা ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো, রোজীর বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আশরাফের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলে-
“আপনাকে কখনো মাফ করবো না ভাইজান কখনো না। আমার মেয়ে যতোটা কষ্ট করেছে, আলিফ যতটা মনকষ্টে মরেছে তার চাইতে দ্বিগুন যেন আপনি সহ্য করেন। আর সে ব্যবস্থা আমি করবো।”
রোজী আঁতকে উঠলো-
“শিখা, বোন আমার এমন কথা বলোনা প্লিজ। আমরা সবাই একটা পরিবার, কি হবে একজন আরেকজনের সঙ্গে এমন করে? নুরী এ বাড়ির মেয়ে, ওর জন্য আমরা সবাই দুঃখী। প্লিজ এমন কিছু করো না বা বলো না।”
শিখা কিছু না বলে হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। রোজী থম ধরে বসে রইলো, মাঝে মাঝেই শরীর কেঁপে উঠছে তার। এ কি হয়ে গেলো তাদের সাথে? এমন কিছু তো কখনো চায়নি তারা? আশরাফ রোজীর মাথায় হাত রাখতেই রোজী খুব আস্তে করে সে হাত সরিয়ে দিলো।

সৌরভের সাথে সম্পর্কটা ভীষণ ঠান্ডা পড়ে গেছে ঝিলিকের। সেই রাতের পর থেকে সৌরভের সাথে শারীরিক মানসিক দূরত্ব যেন যোজন যোজন মাইল। দু’জনের কেউ পারতপক্ষে একে অপরের সাথে কথা বলে না। যে সৌরভ আগে রাগ হলেই ওর উপর হামলে পড়তো সেই সৌরভ ওকে চেয়েও দেখে না। ভেবেছিলো রাজ দেশে ফিরলে ওকে কষ্ট দিয়ে নিজের কষ্ট কমাবে। কিন্তু ও বেচারার দোষ কি? ঝিলিক যে ফাঁদে পরে সৌরভকে বিয়ে করেছিলো সেটা আর ওকে বলে কি লাভ? ফিরে তো আর পাওয়া যাবে না? সে কেবল ভাবে তার জীবনটা কি হওয়ার ছিলো আর কি হলো। রুহিকে দেখলে মাঝে মাঝে হিংসা হয় তার। ওর জায়গায় একসময় তার থাকার কথা ছিলো। রাযীনের এতো কেয়ার ভালোবাসা সব তার ভাগ্যে থাকার কথা ছিলো অথচ কিছুই পেলোনা। তাকে ভালোবাসে দাবী করা মানুষটা সারাজীবন তাকে অত্যাচার করে গেলো। তার এমন জীবনের জন্য আসলে দায়ী কে? কেন সৌরভ তার আর রাজের ব্যাপারে জানার পরও তাকে পাওয়ার জন্য এতো নাটক করলো? ঝিলিকের মনেহয় অনেক হয়েছে, এবার উত্তরটা সৌরভকে দিতেই হবে। আজ এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে। ঝিলিক সৌরভের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

★★★

মা হওয়ার অনুভূতি কেমন? আসলে এ অনুভূতি মা না হওয়ার আগ পর্যন্ত বোঝা যায় না। শুরুতে রুহি পরিবর্তন টের না পেলেও যত দিন গেছে এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে আটকা পড়েছে, বাচ্চার জন্য মনটা দ্রবিভুত হয়েছে। পতন থেকে বাঁচার পর আরো বেশি করে বাচ্চার জন্য টান অনুভুব করে। এরপর প্রথম যেদিন বাচ্চার নড়াচড়া টের পেয়েছে সেদিন এতো অবাক আর অভিভূত হয়েছে যে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করেছে বাচ্চাটা আবার কখন নড়ে উঠে। বিস্মিত হয়ে ভেবেছে, উপরওয়ালার অদ্ভুত ক্ষমতা। তারই পেটে আরেকটা জীবন খাচ্ছে ঘুমাচ্ছে খেলছে। রুহি অবাক হয়ে ভাবে আর আনমনে পেটের উপর হাত বুলিয়ে দেয়। ভীষণ ভালো লাগায় মনটা তৃপ্ত হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে বাবুটাকে কোলে নিয়ে চুমোয় চুৃমোয় ভরিয়ে দিতে। তার সন্তান তার নিজের অংশকে সে ধারণ করছে তার শরীরে যে এই পৃথিবীতে তার অবর্তমানে তাকে রিপ্রেজেন্ট করবেএই বোধটা এতো আনন্দ দেয় যে বাকিসব কিছু তুচ্ছ মনে হয় রুহির কাছে। যে মানুষটাকে মেনে নেবে না ভেবেছিলো আজ তারই সন্তানকে নিজের জঠরে ধারণ করেছে। রুহি প্রায়ই রাযীনকে দেখে আর আনমনে ভাবে, ও কি রাযীনকে ভালোবাসতে পেরেছে? প্রশ্নের উত্তরটা ধাঁধার মতো লাগে। এতোদিন যাই হোক সন্তানের বাবা হিসেবে রাযীনকে অসম্মান করা যায় না। সন্তানের বাবা হিসেবে রাযীনের প্রতি টানটাও অস্বীকার করতে পারে না। মানুষটা সেদিনের পর থেকে তার জন্য যথেষ্ট করছে। ঘরে বসেই অফিসের কাজ সারছে। খুব প্রয়োজন না পড়লে বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে না। হরমোনের হেরফের এর কারনে তার মেজাজের উত্থানপতন ভালোভাবেই সয়ে নিচ্ছে। তার বায়না মেটানোর চেষ্টা করছে। স্বামীর কাছ থেকে এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই একটা মেয়ের। কিন্তু রুহির মনে কেবল একটা প্রশ্ন ঘুরে, রাযীন কি ওকে মন থেকে মেনে নিয়েছে? নাকি এখনো শুধু বাবার খাতিরে ওর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে? সন্তান হওয়ার দিন যত ঘনিয়ে আসছে প্রশ্নটা ততই রুহিকে অশান্ত করছে।

রাযীনও খেয়াল করেছে রুহির খেয়ালি আচরণ। মেয়েটা প্রায়ই তার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়। জানতে চাইলে চমকে ওঠে কিছু না বলে কাটিয়ে দেয়। আজও কাজ করতে করতে হঠাৎ রুহির দিকে নজর গেলো। দেখলো রুহি ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। সাড়ে আঁট মাসের ভরা পেট নিয়ে কাঁত হয়ে তাকেই দেখছে। ইশারায় জানতে চাইলো, কি হয়েছে? রুহি মাথা নেড়ে না করলো। কি মনে হতে রাযীন উঠে এলো, রুহি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো যেন বুঝতে পারছে না রাযীন কি করতে চায়। রুহির পেছনে দুটো বালিশ দিয়ে ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজে ওর সামনে বসে হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিলো-
“আমাকে নিয়ে কিছু ভাবছো? প্রায়ই দেখি আমার দিকে তাকিয়ে থাকো?”
রুহির চেহারায় স্পষ্ট দ্বিধা, কথাগুলো বলবে কিনা ভেবে পাচ্ছে না।
“মনে যা আছে বলে ফেলো এতো ভাবছো কেন?”
রাযীনের কথায় একটু যেন সাহস পায় রুহি-
“আমি কি আপনার মনে জায়গা করতে পেরেছি? নাকি আগের মতোই অভ্যস্ত দাম্পত্য হবে আমাদের? আপনাকে ঠিক বুঝিনা, সব করেন কিন্তু মনেহয় দায়িত্ব মনে করে করছেন।”
রাযীন মন দিয়ে দেখলো রুহিকে। রাতে না ঘুমাতে ঘুমাতে চোখের নিচে কালি, চেহারার উজ্জ্বলতা কমে গেছে। বেঢপ পেট নিয়ে চলাফেরা করাই মুশকিল মেয়েটার। এমনভাবে পা ফুলে গেছে যে মাটিতে পা ফেলা মুশকিল। এতো কষ্ট মেয়েটা করছে কার জন্য? তার জন্য, সন্তানের জন্য নাকি নিজের জন্য?
রাযীন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে-
“তুমি মা হচ্ছ কেন? এই যে শারীরিক কষ্ট সইছো কাকে মনে করে? অনাগত কি বেশি অধিকার নিয়ে নিচ্ছে না? ত্যাদর বাদরের জ্বালায় যে রাতে ঘুমাতে পারছো না সেটা ওকে বলেছো? ব্যাটা আসার আগেই নিজেকে কেমন উচ্চ আসনে বসিয়ে নিয়েছে দেখেছো?”
রুহি হাসলো-
“ছেলে হবে বুঝলেন কি করে?”
“তোমার নাক দেখে। ওটা আরো বোঁচা হয়ে গেছে।”
রুহি গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরায়-
“সবসময় আমার নাকের পেছনে না লাগলে হয় না? বাবুর সামনে কিছু বললে কিন্তু আপনার খবর আছে বলে দিলাম?”
রাযীন ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে কান ধরে-
“কোনোদিন না। আমার এতো সাহস আছে নাকি?”
রুহি ফিক করে হাসলো-
“এখন মিছেমিছি কানে ধরলেও ছেলের সামনে সত্যি সত্যি কানে ধরতে হবে দেখেন। সন্তানের জন্য অনেক কিছু করে মানুষ।”
রাযীন জবাব না দিয়ে ফিরে এলো ল্যাপটপের সামনে। রুহির কথাটা তাকে ভাবাচ্ছে। যে আসছে সে কি তাকে পাল্টে ফেলবে? তাহলে যে তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না?
“আহহ!”
আচমকা চিৎকারে রাযীনের ধ্যান ভঙ্গ হয়। রুহি পেট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ বিস্ফোরিত, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এক হাত বাড়িয়ে দিয়েছে রাযীনের দিকে। রাযীন সসব্যস্ত হয়ে ফিরে এলো, রুহিকে ধরে জানতে চাইলো-
“কি হয়েছে হঠাৎ? এমন ঘামছো কেন?”
রুহির চেহারা নীল হয়ে যাচ্ছে, ব্যাথায় অস্ফুটে উচ্চারণ করলো-
“পেটে ব্যাথা হচ্ছে খুব। মাকে ডাকুন, আমার মনেহয় হাসপাতালে যেতে হবে।”

চলবে—
©Farhana_Yesmin

(শরীর ভীষণ ক্লান্ত ছিলো।আজ কিছুটা অনিচ্ছায় লিখেছি। লেখায় ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here