#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩৪

0
209

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব৩৪
#ফারহানা ইয়াসমিন

“রাহি কোথায়?”
অফিস থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়েই দৌড়ে এলো রাযীন ছেলে কোলে নিতে। রুহিকে একা শুয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে রাযীন।
“মা নিয়ে গেছে। বাবা দেখতে চাইছিলেন খুব।”
“ওহহহ। ঠিক আছে ওকে নিয়ে আসি তাহলে।”
রাযীন রুম ছেড়ে বেরুতে গেলে রুহি বাঁধা দিলো-
“আরে কিছুক্ষণ পরে যান না। আপনি বরং নাস্তা করুন, চা খান তারপর না হয় ওকে আনবেন? আসলে ওকে মা নিয়ে গেছে বেশিক্ষন হয়নিতো।”
রাযীন থমকে দাঁড়ালো। রুহির দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর চোখে দুষ্ট হাসির আভাস। রাযীন অসহিষ্ণু হয়ে বসলো-
“ঠিক আছে কি খাওয়াবে খাওয়াও।”
রুহি মাথা নেড়ে বেড়িয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরই নাস্তার ট্রে হাতে নিয়ে এলো। নিজের জন্য দুধ আর রাযীনের জন্য কফি সাথে চিকেন কাটলেট, চিকেন ফ্রাই আর কিছু বাদাম সামনে রাখলো। খাবারে কামড় বসিয়ে রুহিকে প্রশ্ন করলো-
“তুমি তখন হাসলে কেন?”
রুহি মুখ তুলে রাযীনকে দেখলো, চেহারায় বেশ সিরিয়াস ভাব। রুহি আবারও মুচকি হাসলো-
“আপনার অস্থিরতা দেখে হাসছিলাম। যে মানুষটা বাচ্চা নিয়ে কোন ধরনের এক্সাইমেন্ট দেখায়নি সে আজ বাচ্চার জন্য এতো পাগল এটা দেখে ভালো লাগছে আমার। একজন মায়ের জন্য এর চাইতে বড় আনন্দের কিছু নেই।”
রাযীন খাওয়া থামিয়ে কিছুক্ষণ রুহিকে দেখলো। কিছু না বলে পানির গ্লাসে চুমুক দিলো-
“তুমি কি জানো এখন তোমাকে অন্যরকম লাগে। একটা মা মা ভাব স্পষ্ট। ভীষণ আদর আদর চেহারা, ধরে টুপুক করে গিলে নিতে মন চায়। কতোদিন আমাদের মধ্যে কিছু হচ্ছে না বলোতো? তুমি কবে সুস্থ হবে?”
রুহির গলায় খাবার আঁটকে গেলো। খকখক কাশিতে দম বন্ধ হওয়ার যোগাড়। টের পেলো গাল দুটোর তাপমাত্রা বেড়ে রং পাল্টাচ্ছে। তার আনরোমান্টিক জামাই এর হঠাৎ কি হলো? এতো সুন্দর রোমান্টিক কথাবার্তা সেই কি বলছে? চোখে অবিশ্বাস নিয়ে রুহি রাযীনকে দেখছে। রাযীন ঠোঁট টিপে হাসছে ক্রমাগত। রুহি গোল চোখে তাকিয়ে থাকাটা সে এনজয় করছে। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। মেয়েটার অবস্থা দেখে হাসির দমক উঠছে পেটের মধ্যে। লজ্জায় চেহারা পাকা চেরীর রং নিয়েছে আর চোখ দুটো? দেখোতো কেমন করে তাকিয়ে আছে? রাযীন রুহির দিকে এগিয়ে এলো। হাতে ধরে থাকা গ্লাসটা নিয়ে নামিয়ে রাখলো। রুহির দু’হাতে আলতো করে চুমো একে দিলো। ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা খাবারটা হাত দিয়ে মুছে দিয়ে নিবিড় গলায় মাদকতা মিশিয়ে জানতে চাইলো-
“বাচ্চা হওয়ার পর বউ এতো সুন্দর হয় আগে জানা ছিলোনা। জানলে আরো আগেই বাচ্চা নিয়ে নিতাম আর তোমাকে আরো বেশি যত্নে রাখতাম।”
রাযীন নিজের মুখটা এগিয়ে আনতেই রুহি ঝট করে উঠে দাঁড়ালো, বুকের ভেতর কাঁপন উঠেছে। চোখের পাতা তিরতির করে কাঁপছে। সে ভাঙা গলায় বললো-
“কিসব বলছেন তখন থেকে? মা বাবুকে নিয়ে এলো বলে।”
রাযীন সে কথা বিন্দু মাত্র পাত্তা দিলো না। সে হ্যাচকা টানে রুহিকে কোলের মধ্যে নিয়ে এলো, জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করলো-
“কি বলছি? যেটা সত্যি সেটাই বলছি। তোমার চেহারা কেমন গ্লো করে জানো? তোমার অসুস্থতার কারনে আমি বাবুকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার ভান করি। নয়তো নিজেকে সামলানো মুস্কিল হতো।”
রুহি লাজে আধমরা অবস্থা। এ বাড়িতে আসার পর এই প্রথম রাযীন ভালোবাসার কথা এভাবে বলছে। সন্তান হওয়ার পর কি সত্যিই ওর প্রতি টান হলো রাযীনের? রুহি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চায়-
“ধ্যাৎ কিসব বলছেন না, মাথা গেছে একেবারে। যান যান বাবুকে নিয়ে আসুন। অনেকক্ষন হয়েছে খায় না।”
রাযীন সাথে সাথে রুহিকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো-
“যো হুকুম মেরে রানী।”
রাযীন বেড়িয়ে যেতেই রুহি হাসলো-
“পাগল একটা।”

★★★

“আমি এখন বিয়ে করবো না মা। প্লিজ আমাকে জোর করোনা।”
“কেন করবি না। তুই কি এখনো রুহিকে ভুলতে পারিস নি? অথচ ও তোকে ভুলে বাচ্চার মা হয়ে গেছে।”
“মা প্লিজ, এসব বোলোনা। আমার বিয়ের সাথে ভাবির সম্পর্ক কি? আমার বিয়ের ইচ্ছে নেই এখন হলে করবো।”
“অবশ্যই সম্পর্ক আছে না হলে অযথাই বিয়ে করবি না কেন? আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, তোর বিয়ে দেখতে চাই। বিয়ে তোকে করতেই হবে।”
“মা প্লিজ জোর করোনা, জোর করলে আবার বাড়ি ছেড়ে পালাবো। এবার কিন্তু ফিরে আসবো না।”
“গতবার বড় আব্বুর কথায় রুহির পেছনে গেছিলি এবার নিজের মনমতো চলবি। আমি তো তোর কেউ না, আমার জন্য কিছু কেন করবি। আমার দেখছি মরা ছাড়া গতি নেই। মরলে যদি তোরা বুঝিস।”
সেই সময় রুমের দরজাটা খুলে গেলো আচমকা। মা ছেলে দু’জনেই চমকে উঠে দেখলো দরজায় রাজ দাঁড়িয়ে। রাজের চোখে অবিশ্বাস, শীতল চোখে শুভকে দেখলো। সে দৃষ্টির সামনে শুভ কুঁকড়ে গেলো যেন। শিখা হাসার চেষ্টা করলো-
“আরে রাজ বাবা, তুই হঠাৎ?”
রাজ শিখার কথা জবাব না দিয়ে সজোরে দরজা আঁটকে দিয়ে চলে গেলো। শিখার মুখে ক্রুর হাসি ফুটে মিলিয়ে গেলো। সে উদ্বিগ্ন হওয়ার ভান করে উঠে দাঁড়ালো-
“আল্লাহ, রাজ কি সব শুনে ফেললো? এখন কি হবে?”
শুভ অসহায় চেহারা নিয়ে বসে রইলো আর শিখা দৌড়ে রাজের পিছু নিলো-
“রাজ, কি হয়েছে বাবা? কোথায় যাচ্ছিস?”
রাযীন হাঁটতে হাঁটতে নিজের টাই খুলছিলো টেনেহিচড়ে। আজ হঠাৎ ভরদুপুরে বাড়ি ফিরেছে ছেলের টানে। এসে এসব কি শুনলো? মাথাটায় হঠাৎ যেন আগুন ধরে গেল। শিখার ডাক কানে গেলোনা তার। শিখা দৌড়ে এসে রাযীনকে ধরলো-
“কি হয়েছে বাবা, এমন করে ছুটে কোথায় যাচ্ছিস?”
রাযীন শিখার দিকে তাকালো না।
“অফিসে যাচ্ছি জরুরি কাজ আছে।”
“আচ্ছা বেশ এসেই যখন পড়েছিস একটা জিনিস দেখাতাম তোকে।”
রাযীন এড়াতে চাইলো শিখাকে। তার বুকের ভেতর ভাঙচুর হচ্ছে। প্রতিবার কেন এমন হচ্ছে তার সাথে? কি দোষ তার? প্রথমে ঝিলিক তারপর রুহি? সে বাস্পরুদ্ধ কন্ঠে বল-
“পরে দেখবো ছোটআম্মু। আগে অফিসে যাই জরুরি একটা মিটিং আছে।”
শিখা গলায় মধু ঢালে-
“আরে, তখন থাকবে নাকি যে দেখাবো? চল চল মজার জিনিস দেখাবো তোকে।”
রাযীন হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে আশরাফের রুমের কাছে নিয়ে এলো। রাযীন অবাক হয়ে শিখার চোখে চাইলো-
“বাবার রুমে কি দেখাবে ছোট মা?”
শিখা ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলে দরজাটা নিঃশব্দে ফাঁক করলো। আশরাফ দিব্যি সুস্থ মানুষের মতো নাতি কোলে নিয়ে খেলছেন। হাতের ইশারা করলো রাযীনকে-
“তোর বাপ যে অসুস্থ হওয়ার নাটক করছে সেটা দেখ।”
রাযীন খুব একটা অবাক হলোনা, সে বিরক্ত গলায় বললো-
“আমি জানি ছোটমা। মাসকয়েক হলো জেনেছি।”
শিখা অবাক গলায় বললো-
“তবুও চুপ করে আছিস?”
রাযীন কিছু বললো না। শিখা ফোঁস করে উঠলো-
“ভাইজান সব সময় নিজের মনমর্জি সবার উপর চাপিয়ে দেয় কেউ মেনে নিক না নিক। আলিফ আর নুরীর বিষয়টা যদি মেনে নিতো তাহলে বাচ্চা দুটো বেঁচে থাকতো আজ। নিজের ক্ষমতার দাপট ভাইজান আলিফকে দেখাতেও ভোলেনি। যেজন্য ছেলেটা শেষমেষ বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করলো। তবুও ভাইজান থামলো না। তোর সাথে ঝিলিকের বিয়ে না দিয়ে সৌরভের সাথে দিলো কারন তোকে নিজের বন্ধুর মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে বলে কথা দিয়েছে। তখন মেনে না নিলেও আজ দেখ তুই ওই রুহির সাথেই সংসার করছিস। আসলে ভাইজান যা চায় তা করিয়েই ছাড়ে বুঝলি এবার?”
রাযীন কোন জবাব না দিয়ে হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো। শিখা চুপচাপ রাযীনকে দেখলো একবার তারপর দরজার ফাঁক দিয়ে আশরাফকে আরেকবার। মনে মনে হাসলো, লোহা গরম থাকতেই কাজ সেরে ফেললো। পর পর দুটো বাড়ি দিলো। এবার ভাইজান যাবে কোথায়? শিখা মনে প্রানে চায় আশরাফ কাঁদুক, অসহায় হয়ে কেঁদে বুকভাসাক। রাযীনের ঝড় তুলতে যতটুকু দেরি হবে। এরপর নিশ্চয়ই আশরাফ কাঁদবে তাকে কাঁদতেই হবে। শিখার চেহারা কঠিন হয়ে উঠলো।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here