#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩৫

0
75

#না_চাহিলে_যারে_পাওয়া_যায় পর্ব ৩৫
#ফারহানা ইয়াসমিন

ঝিনুক ম্যাসেন্জারে আসা ছবিটার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সৌরভের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় একটা মেয়ের ছবি। সৌরভ যেমনই হোক এতোটা নিচ তাকে কখনো ভাবেনি। মিসক্যারেজের ঘটনার পর থেকে সৌরভের সাথে তার একরকম দেখানো সম্পর্ক। চারদেয়ালের মধ্যে একে অপরের সাথে কথা বলে না। মাঝে একবার ঝিলিক কথা বলতে চেয়েছিলো কিন্তু সৌরভের অনাগ্রহে সেকথা বলা আর আগায়নি। এরপর ঝিলিক আর চেষ্টা করেনি। ইদানীং সৌরভ মাতাল হয়ে ফিরে বলে কথা বলার চেষ্টা করে লাভ হয়নি। কিন্তু আজ মনেহচ্ছে যেভাবেই হোক কথা বলা দরকার ছিলো। কথা বললে হয়তো এই দিন দেখতে হতোনা এতো অসম্মান হতে হতোনা। ঝিলিক মোবাইল হাতে নিয়ে ভুতগ্রস্থের মতো বসে রইলো।

“কি ব্যাপার এভাবে বসে আছো কেন?”
সৌরভের জড়ানো কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। হঠাৎ করে যেন ঝিলিকের মাথায় আগুন ধরে, সে মোবাইলের ছবিটা মেলে ধরে সৌরভের সামনে-
“এটা কি? এটাই বুঝি দেখা বাকি ছিলো?”
“কি এমন ব্যাপার যে এতো আপসেট হতে হবে? বিজনেস করলে এরকম একটু আধটু থাকেই।”
ঝিলিক সজোরে চেচিয়ে উঠলো-
“এটা ছোট ব্যাপার? তুমি আরেক মেয়েকে নিয়ে বেডে যাচ্ছ আর আমি এসব নিয়ে কিছু বলবো না? আমি হলে সহ্য হতো?”
সৌরভ কানে দু’হাত চাপে-
“ওহহ প্লিজ চেচিয়না তো। নেশার ঘোর কেটে যাচ্ছে তোমার চিৎকারে।”
ঝিলিকের হঠাৎ কি হলো কে জানে। সে দৌড়ে এসে সর্বশক্তি দিয়ে সৌরভের চুল টেনে ধরলো-
“তুমি বলে আমাকে ভালোবাসো? এই তোমার ভালোবাসার নমুনা? আমাকে কেন বিয়ে করলে তুমি? কেন আমার জীবনটা নষ্ট করলে? বলো জবাব দাও আমাকে। আজ জবাব না দিলে তোমাকে খুন করবো আমি।”
সৌরভ তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় গড়িয়ে পড়লো সাথে ঝিলিকও। ঝিলিকের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু ঝিলিক আজ মরিয়া হয়ে সৌরভের গায়ে সমানে কিল ঘুষি মেরে চলেছে। গায়ের কাপড় টেনেহিঁচড়ে ছিড়ছে-
“বলো শিগগিরই বলো। কেন আমাকে জোর করে বিয়ে করলে? কেন? তুমি জানতে না আমি রাজকে ভালোবাসতাম?”
রাযীনের নাম শুনেই হয়তো টনক নড়ে সৌরভের-
“বেশ করেছি জোর করে বিয়ে করে। কেন করেছি শুনবে? শোনো তবে… ”
সৌরভের কথা শুনে ঝিলিক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।

★★★

“তোমার কি কখনো মনে হয়েছে আমাকে কিছু বলা দরকার?”
রাযীনের কথায় রুহি বেশ অবাক হলো। ঘুমন্ত ছেলেকে আলতো করে কটে শুইয়ে দিয়ে রাযীনের দিকে ফিরলো-
“হঠাৎ এমন কথা বলার কারন?”
রাযীন একটু শুকনো হাসলো-
“স্পেশাল কোন কারন নেই। অনেকদিন যেহেতু তোমার জীবনে ছিলাম না তাই বললাম আরকি।”
রুহি বিস্মিত হয়ে রাযীনকে দেখলো কিছুক্ষণ তারপর শান্ত গলায় বললো-
“আমার জীবনে আপনি ফিরে এসেছেন তাও তো দু’বছর হতে চললো। এতোদিন পরে আবার পেছনে ফিরে যেতে চাওয়ার কোন কারন খুঁজে পাচ্ছি না। তাছাড়া আমার যা বলা দরকার মনে হয়েছে তা কখনোই লুকিয়ে রাখিনি আপনার থেকে। তাই না?”
রাযীন কিছু বলতে যেয়ে থেমে গেলো৷ ম্লানমুখে বিছানার উল্টো দিকে যেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। রুহি বেশ অবাকই হলো। আজ রাযীন এমন করছে কেন সে ভেবে পাচ্ছে না। কিছু হয়েছে কি? রুহি এগিয়ে এসে রাযীনের গায়ে হাত দিয়ে কোমল গলায় ডাকলো-
“কি হয়েছে আপনার? মন খারাপ নাকি কোন কারনে? হঠাৎ শুয়ে পড়লেন যে?”
রাযীন রুহির দিকে না ফিরেই উত্তর দিলো-
“তেমন কিছু না। আজ একটু বেশি ক্লান্ত তাই ঘুম পাচ্ছে।”
রুহি আর কিছু না বলে নিজেও শুয়ে পড়লো। তার মনটা খচখচ করছে কেন জানি। রাযীন আজ ফিরেছে বেশ দেরী করে। আসার পর থেকে গম্ভীর হয়ে ছিলো সারাটা সময়। আজ ছেলের সাথে খুব একটা খেলেওনি। রাতে কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করতেই বললো খেয়ে এসেছে। রুহি বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে রাযীনের। কিন্তু কি হতে পারে? বিজনেসে কোন ঝামেলা কি? রুহি বেশিক্ষণ ভাববার সুযোগ পায় না। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে আপনাতেই।

সকালে রুহির ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। রাতে বার তিনেক উঠে রাহিকে খাওয়াতে হয়েছে। এই সকালের সময়টুকুতে তাই খুব গাড়ো ঘুমে থাকে রুহি। চোখ কচলে উঠে দেখলো রাহি কটে নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল দশটা। তারমানে রাযীন অফিসে চলে গেছে। ছেলেকে নিশ্চয়ই শশুরের ঘরে দিয়ে গেছে? রুহি হাসলো, রাগী লোকটা যে তার এমন কেয়ার করবে সেটা ভাবেনি কখনো। সকালে যাতে সে আরামে ঘুমাতে পারে সেজন্য নিজে ছেলেকে রাখে তারপর অফিস যাওয়ার সময় শাশুড়ীর কাছে দেয়। এই সময়ে একটু ফিডার খাওয়ায় রাহিকে। রুহি আরমোড়া ভেঙে ওয়াশরুমে ঢুকলো। হাতমুখ ধুয়ে ঝটপট বেরিয়ে এসে কাপড় পাল্টে চুল আঁচড়ে নিয়ে শাশুরীর রুমের দিকে পা বাড়ালো।
“মা আসবো?”
“কে রুহি? হ্যা এসোনা।”
রোজীর গলা শুনে রুহি দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো-
“মা রাহিকে নিতে এলাম।”
রোজী আলমারি খুলে কিছু একটা করছিলো। এমন কথা শুনে অবাক হয়ে রুহির দিকে ফিরে বললো-
“রাহিকে তো আজ আনিনি। আনতে গেছিলাম, তোমাদের ঘরের দরজা বন্ধ পেয়ে ফিরে এসেছি।”
রুহির বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠলো-
“কি বলছেন মা? রাজ আর রাহি কেউ রুমে নেই দেখে ভাবলাম রাজ মনেহয় অফিস যাওয়ার আগে রাহিকে আপনার কাছে দিয়ে গেছে।”
রাযীন নেই শুনে একটু স্বস্তিবোধ করলো রোজী-
“হতে পারে রাজ নিয়ে গেছে কোথাও। ও যেহেতু নেই বললে। ছাদে টাদে আছে কিনা দেখো।”
রুহি প্রায় ছুটে বেড়িয়ে গেলো। পুরো বাড়ি খুঁজেও রাযীন আর ছেলেকে পেলো না। বাড়ির দুই দারোয়ান কে প্রশ্ন করেও কোন সদুত্তর পাওয়া গেলোনা। হন্যে হয়ে ফোন করতে শুরু করলো কিন্তু রাযীনের ফোনও বন্ধ। রুহির হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। এসব কি হচ্ছে ওর সাথে? কোথায় গেলো ওরা দু’জন? মাত্র দু’মাসের বাচ্চা তার। রাযীন কি কোন কারণে রেগে আছে তার উপর? গতরাতে ঠিক মতো কথা বলেনি। আচ্ছা শুভ কিছু বলেনিতো? অজানা আশঙ্কায় আর ছেলের চিন্তায় রুহির বুকটা হুহু করে উঠলো। সে বাচ্চার জন্য চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো।

রোজীও বুঝতে পারছে না কি হলো? এই সাতসকলে রাজ কোথায় গেলো ছেলে নিয়ে? অফিসে ফোন দেওয়া হলো। নাহ, আজ নাকি অফিসে যায়নি রাযীন। একে একে পুরো বাড়ির মানুষ জেনে গেলো ঘটনা। সবাই চিন্তিত হয়ে ড্রইংরুমে বসে আছে। আফজাল, সৌরভ সবাই নানা জায়গায় ফোন দিয়ে খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারলোনা। রাযীন যেন গায়েব হয়ে গেছে একেবারে। রোজীর এবার সত্যি চিন্তা হচ্ছে। শিখার বলা কথাগুলো কি সত্যি হয়ে গেলো তবে? রাজ কি সব জেনে গেছে? ও কি ছেলে নিয়ে পালিয়ে গেলো? এমন কিছু হলে রোজী সইতে পারবেনা। এক ছেলে মারা গেছে আরেক ছেলে যদি এভাবে দূরে সরে যায় তবে বেঁচে থাকবেন কিভাবে? আর আশরাফই বা এ খবর শুনলে কি করবে? রুহি যদি সব সত্য জানে তাহলেই বা কি করবে? এসব ভেবে রোজীর অসুস্থ অনুভব হলো। হঠাৎ করে মাথা ঘুরতে লাগলো। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই সে চোখে অন্ধকার দেখে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

★★★

শুভ নিজের ঘরে বসেই সব টের পাচ্ছে। গতকাল থেকে তার হৃৎপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালন বেড়ে গেছিলো। নিজের মধ্যে স্হিরতা আনার বহু চেষ্টা করেও পারেনি, সারারাত পায়চারি করে কাটিয়েছে। সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাজ ভাই এসেছিলো তার কামরায়। শুভ কম্পমান কন্ঠে কিছু বলতে চাইলে রাজ হাত দেখিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়। চোখ ভরা জল নিয়ে শুধু একটা কথাই বলেছিলো-
“আমার সাথেই কেন বারবার এমন হয় বলতে পারবি শুভ?”
শুভ মাথা নিচু করে বসে ছিলো। এইপ্রথম নিজেকে অপরাধী মনেহচ্ছিলো তার। বড় ভুল করে ফেলেছে সে। সম্পর্কের লেহাজ ভুলে রুহির পেছনে পড়ে থাকা তার উচিত হয়নি। কেমন করে পারলো এমন করতে? রুহির জন্য কষ্ট হচ্ছিল। তার কারনে মেয়েটা কষ্ট না পায়। এমন হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না কিছুতেই। ঘুম ভাঙার পর যখন রাজের কথা জানলো তখন থেকেই বুকের ভেতরটা খালি লাগছে। সত্যি সত্যি কি ভাইয়া রাহিকে নিয়ে চলে গেছে? শুভর সাহস হলোনা রুম থেকে বেরুনোর, রুহির মুখোমুখি হওয়ার। রুহি যদি ভাবে তার কারনে রাযীন বাড়ি ছেড়েছে? যদি তাকে দোষারোপ করে সবার সামনে? এতোগুলো অভিযোগের দৃষ্টি সইতে পারবেনা শুভ কিছুতেই পারবে না, এতো সাহস তার নেই।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here