মেঘবতীকন্যা পর্ব ৪

0
111

#মেঘবতীকন্যা পর্ব ৪
# সুমাইয়া আক্তার মিম

“চারিদিকে মানুষের গিজগিজ আওয়াজে বাড়িটাকে পাখির বাসা মনে হচ্ছে।এতো এতো মানুষের ভিড়ে জেনো বাড়ির ছোট সদস্যদের জন্য আজকে ঈদের দিন।এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে আর সাথে চিৎকার চেঁচামেচি তো আছেই।। তাদের মতে, বিয়ে বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচি হবে না তা কী হতে পারে? কিছুক্ষণ আগে বারিশের সাথে সকল নিয়ম-কানুন মেনে আইনি মোতাবেক রূপসার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে।।
একরাশ ভয় আর বিরক্তি নিয়ে বিয়ে টা শেষ মেষ করতে হয়েছে রূপসাকে। হাজার অনিচ্ছার সর্তেও তাকে বিয়েটা করতে হয়েছে।যেখানে ছোট বেলায় তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে সেখানে কিছু করার মানেই বোকামি।আর বারিশের কথার বাহিরে কোনো কান্ড ঘটানোর মতো দুঃসাহস বরাবরই রূপসার কিংবা অন্য কারোর নেই।লাল টুকটুকে বউ সাজিয়ে যখন ড্রয়িং রুমে বারিশের ঠিক সামনাসামনি বসনো হয়েছিল রূপকে (রূপসার সর্ট নেইম রূপ) তখন রূপ ভয়ে জড়সড় হয়ে বসেছিল।দিন দুনিয়া কি হচ্ছে সেখানে তাঁর মোটেও খেয়াল নেই। নিজের মতো করে মনে মনে যতো মুখস্থ দোয়া দুরুদ আছে সব পাঠ করে চলছে।। নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষের এতোটা কাছাকাছি ভাবতেই তরতর করে ঘাম ঝরছে তাঁর কপাল থেকে। লেখিকা সুমাইয়া আক্তার মিম।আসার পর মাথা নুইয়েছে আর উপরে করেনি।রিনি আসার পর থেকে এটা সেটা বলে রূপকে হাসানোর চেষ্টা করছে।।। অন্যদিকে বারিশ এক দৃষ্টিতে তাঁর লাল টুকটুকে পিচ্চি বউটাকে দেখছে। তাঁর নেশা, তাঁর ভালোবাসা তাঁর বাবুই পাখিকে দেখছে। আজকে জেনো হাজার বছরের চোখের এবং মনের তৃষ্ণা কিছুটা লাঘব হয়েছে।এই তৃষ্ণা জেনো মেটানো সম্ভব নয়।যতো দেখবে ততোটা আরো ভয়াবহ হয়ে নেশা বারিয়ে যাবে।বারিশের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। বাঁকা হেসে মনে মনে বলতে লাগলো,

–আর কিছু মুহূর্ত জান পাখি তারপর আর কোনো দূরত্ব নয়।আজ সকল দূরত্ব শেষ হবে। তোমাকে নিজের কাছে রাখার জন্যই তো এতো এতো আয়োজন।যাতে তোমার আমার মাঝে বিন্দুমাত্র দূরত্ব না থাকে। তোমার কাছ থেকে বিন্দুমাত্র দূরত্ব হৃদয়ে হাজারো রক্তক্ষরন হয়।। তুমি শুধু আমার মেরি জান শুধু আমার। শুধু মাত্র বারিশের #মেঘবতী_কন্যা। দীর্ঘ দিনের অপেক্ষা প্রেয়সী আজ শেষ হবে।আর কোনো দূরত্ব নয়। শুধু মাত্র তোমার জন্য এতো এতো দূরত্ব আমাকে মানতে হয়েছে এর জন্য তো তোমাকে শাস্তি পেতে হবে মেরি জান। খুব কঠিন শাস্তি। আজকে থেকে আমিতে তোমার শুরু আর আমিতে শেষ। তোমার সব আজাদি আমার কাছে বন্দি হলো মেরি জান।
রূপসার দিকে নেশা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে মনে মনে কথা গুলো আওরাতে লাগলো।

~~
‘সব নিয়ম কানুন শেষ করে সকলের খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ করার মাঝে বিয়ের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।সব মেহমান আস্তে আস্তে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। এখন সারা বাড়িতে শুধু বারিশের পরিবারের সদস্য আর রূপসার বাড়ির লোকেরা আছেন। সকলে এক সাথে বসে কথা বলছেন।এরি মাঝে একবারও বারিশের মুখ দেখনি রূপসা।রিনি অনেকবার খুঁচিয়ে রূপসার মাথা তোলার চেষ্টা করেও বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে। বেশ অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে রাখতে রাখতে আর একই জায়গায় বসে থাকতে রূপসার এখন নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে মাথাটা পর্যন্ত তুলতে পারছে না সে।আর না থাকতে পেরে এই বার অনেক সাহস জুগিয়ে আস্তে আস্তে মাথা উঠিয়ে টিপটিপ চোখে হাজারো ভয়ের সাথে যুদ্ধ করে সামনে তাকিয়ে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। আশেপাশে ভালো করে ঘার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। ‌না আশেপাশে কোথাও বারিশ নেই।বিশাল ড্রয়িং রুমের কোথাও বারিশ নেই।রূপসাকে আশেপাশে তাকাতে দেখে রিনি পাশ থেকে মৃদু হেসে বলল,,

–ভাইয়া বাহিরে গিয়েছে কল এটেন্ট করতে।।।
রিনির কথা শুনে রূপসা চওড়া করে হেসে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে আয়েশ করে মাথা এলিয়ে দিল। এতোক্ষণ পর একটু শান্তিতে শ্বাস নিতে পারছে। এতোক্ষণ জেনো শ্বাসটুকু বুকের মাঝে চাপা পড়ে ছিল।আরেকটুর জন্য শ্বাস কষ্টের জন্য তাকে মারা যেতে হয়নি।রূপসার অবস্থা দেখে রিনি মুখ চেপে হাসছে।সে বেশ বুঝতে পারছে রূপসার অবস্থা।বেচারি কী করে থাকবে তাঁর ভিলেন ভাইটার সাথে।আস্ত এক রহস্যময় মানব সে।।কথা গুলো ভেবে মনে মনে আফসোস করতে লাগলো রিনি।।
রূপসা একবার ইশারা করে রোজা হায়দারকে বলেন সে একটু রুমে যেতে চাইছে কিন্তু রূপসার দিকে কী ভয়ানক লুক দিয়েছেন এতে করে রূপসা মুখটা ছোট করে চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ আগে যখন বিয়ে পড়ানোর সময় বারবার কাজি সাহেব তাকে কবুল বলতে বলছিলেন ভয়ের ছুটে রূপসার মুখে ‘ক’ পর্যন্ত উচ্চারণ হচ্ছিল না।তা দেখে রূপসার আব্বি অমিত হায়দার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,

–আম্মিজান কবুল বলে ফেলুন। দেখুন আমরা সবাই অপেক্ষা করছি আপনার মুখে কবুল শুনার জন্য।আর অপেক্ষা করবেন না কেমন।কবুল বলে ফেলুন।আব্বি জান আপনার ভালোর জন্য সব করছি সেটা আপনি জানেন তো।। লেখিকা সুমাইয়া আক্তার মিম।
রূপসা মাথা দুলিয়ে হ্যা বললো।অমিত হায়দার মেয়ের চোখের পানি গুলো স্নেহের সাথে মুছে দিয়ে পুনরায় বলেন, তাহলে কবুল বলুন।।‌

রূপসা আব্বির কথা শুনে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ধিরে ধিরে তিনবার কবুল বলে দিলো। কিন্তু বাঁধ সাধলো যখন রেজিস্ট্রার পেপারে সাক্ষর করতে বলা হলো। ভয়ে আর আলাদা নাম না জানা অনুভূতি গুলো এমন করে সারা শরীর জুড়ে জেঁকে বসেছে কাঁপা কাঁপা হাতে কলম ধরা দায় হয়ে উঠেছে।। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন কিছু হচ্ছিল না তখন রোজা হায়দার মেয়ের কান্ঠ দেখে প্রচন্ড বিরক্তি হলেন। মনে মনে বলেন,এই মেয়ে শুধরানোর নয়। তিনি রুপসার কানের কাছে মুখ এনে ধিরে গলায় বলতে লাগলেন,বারিশ পাশের রুমে আছে। তুমি যদি সাক্ষর না করো রূপ তাহলে বারিশ এখানে হাজির হয়ে যাবে।সেটা নিশ্চয়ই তুমি এই মুহূর্তে চাইছো না।
রূপসা মায়ের কথা শুনে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে চট করে সাক্ষর করে দিলো। সাক্ষর করার সময় নিজের নামের পাশে বড় বড় অক্ষরে বারিশ খান নামটা চোখে পড়তে বাধ ভেঙ্গে চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে লাগল। মনে মনে নিজের মায়ের বিটলামির জন্য বারিশকে শ খানিক বকা দিতে লাগলো।।‌

❀❀
”সময় তাঁর আপন গতিতে ছুটে চলে।সময় কারোর জন্য অপেক্ষা করে না।। বিয়ে বাড়ীতে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত কনে বিদায়।কনে বিদায় কাজটা সকল মেয়েদের জন্য কষ্টকর। নিজের আপন মানুষদের ছেড়ে যাদের সেই জম্মের পর থেকে পাশে পাচ্ছে নিজের বাবা মা আপন মানুষদের ছেড়ে অচেনা অজানা জায়গায় পারি জমতে হয়।যেখানে সকলে তাঁর অপরিচিত তাদের নিজের আপন করে নিতে হয়। সত্যি জীবন খুবই হাস্যকর। কেমন কেমন নিয়মনীতি মানতে হয় সকলকে। বাস্তবতা সত্যি খুব কষ্টকর।যা প্রত্যেকটি মেয়েকে মানতে হয়।।রূপসার জন্য বেপরটা অনেক আলাদা হলেও সে পৃথিবীর কঠিন নিয়মটা মানতে নারাজ।সে জানে তাকে মানতে হবে কারণ এটাই যেই বাস্তবতা কিন্তু সে বারবার পরাজিত হচ্ছে। তাঁর ছোট্ট মন কিছুতেই মানতে রাজি নয় সে তাঁর আব্বি আম্মিকে ছেড়ে এতো দূরে পারি জমাবে। হয়তো কালকের পরেরদিন এই গ্ৰাম আর এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে ভিনদেশে অজানা গন্তব্যে।।কী করে থাকবে সে এতো দূরে তাঁর আব্বি-আম্মিকে ছেড়ে যেখানে একটা রাতও সে তাদের ছাড়া কোথাও থেকেনি।কী করে থাকবে সে?কী ভাবে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে সব মানিয়ে নিবে।যেখানে ছোট থেকে ছোট বিষয় গুলো তাঁর কাছে জটিল মনে হয় আব্বি আম্মি ছাড়া সমাধান করতে পারে না সেখানে এতো এতো জট কি করে ছুটাবে ‌। ভাবতেই বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে। আজকে মনে হচ্ছে তাঁর আব্বি আম্মি ভীষণ রকম অন্যায় করে ফেলেছেন তাঁর সাথে।খুব কী প্রয়োজন ছিল তাকে বিয়েটা দেওয়ার?অন্য কোনো উপায় কী ছিল না?রূপসা জানে কোনো উপায় ছিল না কিন্তু মনকে জেনো আজ কোনো মতে মানাতে পারছে না ‌।।। বাড়ির সবাই রূপসার কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজেদের কষ্ট গুলোকে মনের মাঝে রেখে রূপসাকে শান্ত করাতে ব্যস্ত । রোজা হায়দার মেয়ের চোখের পানি দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেন না।আড়ালে চোখের পানি মুছে নিজেকে শক্ত করে মেয়েকে এটা সেটা বুঝাতে লাগলেন। কিন্তু এই শক্ত মনটা সহজে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো।ব্যর্থ হয়ে এক সময় মেয়েকে জড়িয়ে নিরবে নিজেও অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল কিন্তু মেয়েকে বুঝতে দিলেন না।দেখা যাবে মেয়ে তাঁর আরো এলাহী কান্ড বাঁধিয়ে দিবে।অমিত হায়দার মেয়েকে নিজের বুকে চেপে মাথায় চুমু খেয়ে এটা সেটা বুঝাতে লাগলো। নিজের কলিজাকে নিজের থেকে এতো দূরে পাঠানোর কোনো কালে তাঁর ইচ্ছে ছিল না কিন্তু তিনি নিরুপায়।।।ভাগ্যিস বারিশ রূপসাকে কাঁদতে দেখেনি হয়তো এখন দুটো গাল লাল করে দিতো এইরকম নিজের হাল বানানোর জন্য রূপসাকে। তাঁর চোখের পানি একদম সহ্য করবে না বারিশ।সব লন্ডভন্ড করে দিবে।।। লেখিকা সুমাইয়া আক্তার মিম।

অতিরিক্ত কান্না করার ফলে আর সারাদিন হাজারো চিৎকার চেঁচামেচি সাথে এক গাদা চিন্তার ফলে মাথাটা ভীষণ ভারি অনুভব করে রূপ সাথে ভীষণ অস্থিরতা। অমিত হায়দার মেয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে সোজা করে দাড় করিয়ে গালে হাত রেখে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই রূপসা পড়ে যেতে নিলে দুটো শক্ত হাত তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে যায়। একটা শক্ত দেহের অধিকারী পুরুষ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে খুব শক্ত করে। অপরিচিত বুকে মাথা এলিয়ে দিতে চোখ দুটো বুঝে আসে রূপসার। শুধুমাত্র জ্ঞান থাকাকালীন এতো টুকু শুনতে পায় কারোর গভীর নিঃশ্বাস আর খুব জোরে বিট করা সেই অতি মধুর হার্ট বিট।আর সাথে একটি থমথমে পুরুষালি কন্ঠ,,

–মেরি জান কী হয়েছে তোমার? আমার দিকে তাকাও!
ব্যাস এতো টুকু শুনতেই জ্ঞান হাড়ালো সেই অচেনা যুবকের বুকে।

চলবে,,,,❣️

[লেখিকা সুমাইয়া আক্তার মিম✵]

(আসসালামুয়ালাইকুম সবাই কেমন আছেন। আবারো ফিরে এসেছি আপনাদের মাঝে দীর্ঘ দিন পর আপনাদের প্রিয় মেঘবতী কন্যা গল্পটা নিয়ে। আমার আব্বু মারা গিয়েছেন তাই গল্পটা এতো দিন দিতে পারিনি। ইচ্ছে ছিল না আর গল্পটা দেওয়ার কিন্তু সবার জোরোজুরিতে আবারো গল্পটা লিখা শুরু করেছি।কি লিখেছি নিজেও জানি না। শুধু মাত্র সকলের মন রাখতে লিখা। দীর্ঘ দিন পরে লিখছি তাই বেশ কিছু বানান ভুল থাকতে পারে তাই সকলে একটু মানিয়ে নিবেন।। এখন গল্পটা কনটিনিউ করবো কিন্তু হঠাৎ কখন আবার আপনাদের মাঝখান থেকে চলে যেতে হয় বলতে পারছি না। গল্পটা প্রতিদিন দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। সকলে আমার আব্বুর জন্য দোয়া করবেন।।ভুল ক্রুটির জন্য দুঃখিত। কেমন হয়েছে সকলে গঠন মূলক মন্তব্য করবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে 💞)
#Happy_reading

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here