মালা_করনু_তারে_দান,পর্ব-১৪,১৫

0
79

#মালা_করনু_তারে_দান,পর্ব-১৪,১৫
অরিত্রিকা আহানা
পর্ব-১৪

দুপুরের খাবার শেষে আয়েশি ভঙ্গিতে বারান্দায় বসে সিগারেটে টান মারছে ইফরান। এখনই একটু বিশ্রাম নেবার সময়। বিকেলবেলা আবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরোবে।

বিনি গোসল সেরে বারান্দায় কাপড় মেলে দিতে এসেচগে। ইফরানকে বসে থাকতে দেখে একপাশে সরে গেলো। ইফরান নজর হটালো না। কাপড় মেলে দেওয়ায় সময় হাত উঁচু করতে হচ্ছে বিনিকে। যার ফলে তখনকার মতো পেটের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। ইফরান বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে মুচকি হেসে বললো,
—‘বারবার আমি ছাড় দেবো কেন? দেখা যখন যাচ্ছে আমি দেখবো। কেউ সচেতন না হলে সেটা তাঁর দোষ।
বিনি ভ্রু কুঁচকালো। ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,
—‘কি?’
—‘পেট দেখা যাচ্ছে।’

বিনি নিজের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে শান্তভাবে শাড়ি ঠিক করে নিলো। লজ্জা অস্বস্তি ঢাকতে গম্ভীর মুখ করে বললো,
—‘অসভ্য!’

ব্যস! এটুকুই। ফের কাপড় মেলে দেওয়ায় মনোযোগ দিলো। ইফরান একথা সেকথা বলে আলাপ জমাতে চাইলো কিন্তু বিনি বিশেষ প্রতিউত্তর করলো না। অন্যদিনের চাইতে আজকে একটু বেশিই চুপচাপ লাগছে তাঁকে। ইফরান পুনরায় নিজে থেকে কথা বলার চেষ্টা করলো। ঠাট্টা করে বললো,
—‘অসভ্য কাকে বললে ম্যাডাম? মানছি তুমি সুন্দরী, আবেদনময়ী। কিন্তু আমি মহাপুরুষ। আর মহাপুরুষদের কাছে কখনো নিজের বউ আকর্ষণীয় হয় না। তাই আমার সম্পর্কে এমন ধারণা না রাখাই ভালো।

ইফরানের ঠাট্টায় যোগ দিলো না বিনি। বারান্দা থেকে শুকনো কাপড়গুলো নিয়ে চুপচাপ রুমে ঢুকে গেলো। ইফরান অবাক হলো। সিগারেট ফেলে ঘরে ঢুকলো সে-ও। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলো,
—‘রেগে আছে নাকি আমার ওপর?’
—‘আমার রাগ তুমি বোঝো?’
বিনির কন্ঠে ক্ষোভ। ইফরান মাথা নাড়িয়ে বললো,
—‘তারমানে রেগে আছো।’
—‘হ্যাঁ আছি।’

ইফরান হাসলো। বিনি কাপড় ভাঁজ করায় মনোযোগ দিলো। তাঁর হাত ধরে টেনে থামিয়ে দিয়ে বললো,
—‘কি নিয়ে রেগে আছো শুনি?’

বিনি গম্ভীরমুখে হাত ছাড়িয়ে নিলো। কিন্তু জবাব দিলো না। ফের কাপড় ভাঁজ করায় মনোযোগ দিলো। অসম্ভব রাগ লাগছে তাঁর। গতকাল রাতেও ইফরানের সঙ্গে মদ খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বিনি খুব ঝেড়েছে।
সেই কারণেই সকাল থেকে তিরিক্ষি মেজাজে ছিলো ইফরান। তাঁর ঝাল লতিফের ঝেড়ে ক্ষ্যান্ত হয়েছে। বেচারা গরিব মানুষ। বিনাদোষে ইফরানের হাতে মার খেয়েছে।
এতকিছুর পরেও বিনি মুখ বুঝেও চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছে কেবল এই আশায় যে আস্তে আস্তে হয়ত ইফরান ঠিক হবে। কিন্তু এখন আবার সে সিগারেট নিয়ে বসেছে। তারওপর এমন ভাব করছে যেন কিচ্ছু জানে না।

ইফরান তাঁর মুখ গোমড়া দেখে বললো,
—‘মৌনব্রত পালন করছো নাকি? কথা বলছো না কেন?’

এবারে মুখ খুললো বিনি। গম্ভীর, থমথমে গলায় বললো,
—‘তুমি সত্যিই কিছু বোঝো না নাকি বুঝতে চাও না?’

ইফরান এবারেও ঠাট্টা করলো। বললো,
—‘বুঝবো না কেন? এই বাড়িতে এখন নারীরাজ্যত্ব চলে। পুরুষ এখানে অবহেলিত, নির্যাতিত। সেজন্যই কালরাতে তুমি আমার সিগারেটের প্যাকেট ফেলে দিয়েছো।’
তাঁর ঠাট্টা বিনি বুঝলো না। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
—‘তবে রাজত্বের ভার নিজের কাধে তুলে নিলেই তো পারো। মিছেমিছি নারী রাজত্বের নিন্দা কেন?’

ইফরান তৎক্ষণাৎ হো হো করে হেসে উঠে বললো,
—‘থাক বাবা। তোমার রাজত্ব তুমিই সামলাও। আমার ওসবে মাথাব্যথা নেই।’
—‘মাথাব্যথা নেই কেন?’
—‘যার মাথাব্যথা তাঁকে নারাজ করতে চাই না। আমি ভার নিলে তাঁর কি হবে?’
—‘আমার মাথাব্যথা বলছো?’

বিনি মলিন হাসলো। বললো,
—‘নারীর সত্যিকার রাজত্ব যে কিসে তা যদি তুমি বুঝতে তবে মিথ্যে অপবাদ আমার মাথায় চাপিয়ে দিতে পারতে না।’
—‘কিসে শুনি?’
—‘বাদ দাও। নারীর মন তুমি বুঝবে না।’

ইফরান জানার কৌতূহল বোধ করলো না।একটু বাদে বন্ধুদের সঙ্গে বেরোতে হবে। রেডি হতে হবে। আলমারি থেকে কালো জ্যাকেট বের করলো। গেঞ্জির ওপর দিয়ে সেটা জড়িয়ে নিলো। হাত ঘড়ি লাগিয়ে চুল ব্রাশ করে বললো,
—‘আমি বেরোচ্ছি। ফিরতে রাত হবে।’
—‘কত রাত?’

ইফরান জবাব দিলো না। বিনির চোখে পানি টলমল! এই হৃদয়হীন পাষাণ ক্রমাগত তাঁর জীবনটা অসহ্য বানিয়ে দিচ্ছে। হাতের শুকনো কাপড় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। রাগে অভিমানে কাঁদতে মন চাইছে। ইফরান তাঁর রাগের তোয়াক্কা না করে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

বিনি উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। অসহ্য বেদনায়, অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। নিজের স্বামীর কাছে বিন্দুমাত্র মূল্য নেই, সংসারে সুখ নেই। তাঁর নাকি আবার রাজত্ব! দুপুরের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো।

দুপুরেও কিছু খায় নি বিনি। সন্ধ্যার সময়ও না খেয়ে শুয়ে রইলো। রাহেলা মির্জা ডাকতে এলেন। বিনি তাঁকে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসলো। বিকেলে থেকেই প্রচুর মাথাব্যথা হচ্ছে। খালিপেটে ওষুধ খেয়ে শুয়ে ছিলো। উঠে বসতেই আবার শুরু হয়েছে। রাহেলা মির্জা তাঁর মলিন চেহারা চিন্তিত মুখে বললেন,
—‘কার ওপর রাগ করে না খেয়ে আছিস মা? সে তোর রাগ বোঝে? বদমাইশ, জালিম জাহিল পেটে ধরেছি আমি। নিজের ওপর রাগ লাগে। কেন ওর বাবা মারা যাওয়ার পর ওকে শাসন করলাম না। তাহলে আর এসব দেখা লাগতো না।’

বিনি জবাব দিলো না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তাঁর। এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে মন চাইছে। এত অবহেলা, মানসিক যন্ত্রণা আর নিতে পারছে না। রাহেলা মির্জার সহানুভূতিশীল কথাবার্তা গুলোও বিতৃষ্ণাময় ঠেকছে। মুখে যত যা-ই বলুক না কেন পুত্রস্নেহে অন্ধ তিনি। বিনির দুঃখ বুঝবেন না।

এদিকে বিনির নিরুত্তাপ মনোভাব মনে মনে আহত করলো রাহেলা মির্জাকে। ভেতরে ভেতরে তিনিও ইফরানের প্রতি বিতৃষ্ণা বোধ করলেন। কিন্তু মুখে প্রকাশ করলেন না। তাতে বিনির দুঃখ বাড়বেই বইকি কমবে না। স্ত্রীর কাছে স্বামীর দুর্নাম কখনো সুখকর হতে পারে না। বুকের ভেতর অসংখ্য হাহাকারের জন্ম দেয়।

বিনির মাথায় হাত রেখে বললেন,
—‘আমি মিনুকে খাবার পাঠাচ্ছি। খেয়ে নিস মা।’

তিনি চলে গেলে বিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। আকাশ বিষণ্ণ! একটু পরেই হয়ত বিরহের বৃষ্টি ঝরাবে। ঝরঝর করে ঝরিয়ে দিবে নিজের সকল দুঃখ, যন্ত্রণা, ক্লান্তি!
কিন্তু বিনি! বিনি কি চাইলেই কাঁদতে পারে? না! পারে না! লজ্জা হয়। ভীতু, মেরুদণ্ডহীন মনে হয় নিজেকে। কার জন্য কাঁদবে? কেন কাঁদবে? কিসের আশায় কাঁদবে?

একটা নিষ্ঠুর পাষাণ বিনির গলায় বেদনার মালা গলায় পরিয়ে দিয়ে দিব্যি সুখে আছে। সেই মালা প্রতিনিয়ত কাঁটা হয়ে বিঁধছে বিনির অন্তরে। জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছে না! তাঁর জন্য কাঁদতে বিবেকে বাঁধে!

বন্ধুরের সাথে মদ্যপান বিশেষ জমলো না ইফরানের। হাসিঠাট্টা,মস্তিমজার মাঝেও কোথাও যেন তাল হারিয়ে ফেলেছে সে। বিনির ক্রন্দনরত মুখ আর আকুতিভরা চাহনি সমস্তটা একেবারে বিষাক্ত করে দিচ্ছে।

ঘড়ির কাঁটায় নটা বেজে দশ মিনিট! আর থাকতে না পেরে বাসায় ফিরে এলো ইফরান। রাহেলা মির্জা তাঁকে দেখে বেশ একচোট বকাঝকা করলেন। তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে নিজের কপালকে দুষলেন। প্রতিউত্তর করলো না ইফরান। চুপচাপ ঘরে ঢুকে গেলো।

বিনি সোফায় কাত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ডান হাত গালের নিচে দিয়ে বাম হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে রেখেছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। ইফরান ভেতরে ঢুকে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে নিলো। বারান্দা থেকে টাওয়েল নিয়ে ফ্রেশ হতে ঢুকে পড়লো।

ফ্রেশ হতে না হতেই দরজায় নক। মিনু খাবার জন্য ডাকতে এসেছে। দরজা খুলে সে মুখ খোলার আগেই ইফরান নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে ‘শসসসস’ জাতীয় শব্দ করে উঠলো। মিনি থেমে গেলো। ইফরান সতর্ক করে দিয়ে বললো,
—‘আস্তে কথা বল। তোর ভাবি ঘুমাচ্ছে!’

মিনু যারপরনাই অবাক হলো! ইফরান কারো জন্য ভাবতে পারে এ যেন তাঁর কল্পনার বাইরে। যেই মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাড়ির সকলের ঘুম হারাম করে দেয় তাঁর কাছ থেকে এমন কথাবার্তা ঠিক হজম হওয়ার মতো নয়। যাইহোক, নিজের বিস্ময়ভাব গিলে নিয়ে ফিসফিস করে বললো ,
—‘আপনারে আর ভাবিরে আম্মা খাইতে ডাকে।’
—‘আসছি। তুই যা।’

মিনু চলে গেলে ইফরান ঘরের বাতি নিভিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বাইরে থেকে খুব সাবধানে দরজা টেনে দিলো যাতে আওয়াজ না হয়। বিনিকে আর সজাগ করলো না। কাঁচা ঘুম ভাঙলে যদি মাথাব্যথা উঠে যায়!

বিনির মাথা কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইফরান। রাতের খাবার শেষ করে একটু আগে ঘরে এসেছে সে। ঘরে ঢুকে বিনির মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সোফায় জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে ঠোঁটকাটা, তেজি,কঠিন প্রকৃতির, অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটা। ইফরানের ভয়ানক চাহনি, ঠাট্টা, তিরস্কার, বিদ্রুপ কোন কিছুই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি। নিজের চরিত্রে অটল সে।
তাঁকে এমন নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখে নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো ইফরানের। জেগে থাকলে এই সময়ে ইফরানকে বাসায় দেখে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতো সে। যদিও মুখে প্রকাশ করতো না। কারণ ইফরানকে সে নিজের দুর্বলতা দেখাতে চায় না। তবে মনে মনে ঠিকই খুশি হতো। ফের হাসলো ইফরান। বাতি নিভিয়ে নিরবে খাটে শুয়ে পড়লো।

#মালা_করনু_তারে_দান
অরিত্রিকা আহানা
পর্ব-১৫

বিনির ঘুম ভাঙলো একেবারে সকালে। ঘুম ভাঙতেই আড়মোড়া ভেঙ্গে চারপাশে চাইলো। সোফায় বেহাল অবস্থায় ঘুমাচ্ছে সে। ইফরান খাটের ওপর আরাম করে ঘুমাচ্ছে।

নারীহৃদয়! ভালোবাসা আকাঙ্ক্ষা করে! যতই সে কঠিন হৃদয়েরই হোক না কেন! অনুভূতি তাঁকেও পীড়া দেয়! ইফরান তাঁকে খাটে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা একটা কাথা মেলে দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করে নি।
অথচ তাঁরই জন্য কালরাতে সর্প দংশনের ন্যায় বিষাক্ত মাথাব্যথা নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো বিনি। ব্যাকুল হৃদয়ে বারবার প্রার্থনা করেছিলো ফিরে আসুক সে,ফিরে আসুক!

অরুণরাঙ্গা প্রভাতের নতুন আলোয় কতখানি অবহেলা, কতখানি অভিমান বিনির বুকে সঞ্চার হলো তাঁর তিলপরিমানও যদি ইফরান টের পেতো তাহলে বুঝতো রাত্রিকালে তাঁর বিনিকে নিয়ে চিন্তা, উদ্বেগ ঠিক কতখানি বৃথা গেছে!

তথাপি, অনুভূতি গোপন করার বেলায় বিনি বরারবই পারদর্শী। আজও তাই হলো। চুপচাপ উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। ফ্রেশ হয়ে সকলের জন্য নাশতা তৈরী করলো। তারপর মিনুকে পাঠালো সবাইকে ডেকে আনার জন্য। ঘুণাক্ষরেও কেউ কিছু টের পেলো না।

ইফরানের ঘরে গিয়ে মিনু ফিরে এলো। বললো,
—‘ভাইজান ঘরে নাই ভাবি। বাইরে টেনিস খেলে। সেখানে নাশতা পাঠায় দিতে বলছে।

বিনি তাওয়ায় গরম গরম পরোটা সেঁকছিলো। সেটা থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে মিনুর দিকে চাইলো। সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
—‘একা একা কার সঙ্গে টেনিস খেলে?’

প্রতিউত্তরে মিনুর জবাব সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিলো । ম্যানেজারের ভাগ্নি রাকা এসেছে। তাঁর সঙ্গেই টেনিস খেলছে ইফরান। বিনি শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—‘আমি রেডি করে দিচ্ছি। তুমি নিয়ে যাও।’

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমনে টেনিস কোর্টের দিকে চেয়ে আছে বিনি। তাঁর মনের ভেতর কি চলছে বোঝা যাচ্ছে না। ভাবলেশহীন ভাবে সম্মুখপানে তাকিয়ে আছে। যেন রক্তেমাংসে গড়া মূর্তি দাড়িয়ে আছে।

রাহেলা মির্জাদ শরীর খারাপ থাকায় তিনি আজকে নিচে নামেন নি। তার ঘরে নাশতা দিতে গিয়েছিলো বিনি। সেখান থেকে বেরোনোর সময় নিচে চোখ পড়তেই বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো।

এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে টেনিস কোর্ট। খেলা শেষ। কোর্টের পাশে বসার জন্য গোল টেবিল পাতানো আছে। সেখানেই বসে গল্প করছে ইফরান এবং রাকা। ইফরানের পরণে সাদা জ্যাকেট আর ব্ল্যাক জিন্স। ঝাঁকড়া চুলগুলো ব্যান্ডানা দিয়ে পেছনে ফেরানো। হাতে সাদা রিচব্যান্ড। সুদর্শন, সুপুরুষ।

বিনি চোখ নামিয়ে নিলো। তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ঢুকে পড়লো। মাথাব্যথাটা আবার এসে ভর করেছে! শরীর অসাড়, অবসাদগ্রস্ত লাগছে। কপালের শিরা দপদপ করছে। মিনুকে রান্নার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো।


কপালের ওপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো বিনি। একটু আগে ৫০০ মিলিগ্রামের একটা প্যারাসিটেমল ট্যাবলেট খেয়েছে। ব্যথাটা যদিও কমে নি তবে এখন একটু শান্তি লাগছে।

ইফরানের ডাক শুনে চোখ মেলে চাইলো। রাকাকে নিয়ে ঘরে এসেছে ইফরান। মেয়েটা আহামরি সুন্দরী না হলে আধুনিক। পোশাকআশাকে অন্তত তাই মনে হয়।

ইফরান রাকার দিকে ইশারা করে বিনিকে উদ্দেশ্য করে হেসে উঠে বললো,
—‘সেদিন আমার গালে লিপস্টিকের দাগ দেখে তো খুব চড়াও হয়েছিলে। তাই এবার আসল অপরাধিকে ধরে এনেছি। যা শাস্তি দেওয়ার ওকেই দাও।’

বিনি ইফরানের ঠাট্টায় যোগ না দিলো না। অশোভনীয় একটা বিষয়! হাসিঠাট্টা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। তথাপি রাকাকে উদ্দেশ্য করে স্মিত হেসে বললো,
—‘বসুন।’
রাকা বিনি পাশে খাটের ওপর বসলো। বিনির হাত চেপে ধরে লাজুক গলায় বললো,
—‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছি ভাবি। সেদিনের ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত।’

লোক দেখানো আন্তরিকতা বিনির ধাতে নেই। তাই সে আর দশজন আধুনিকা নারীর মতন হেসে উঠে বলতে পারলো না,’দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই মিস রাকা। বন্ধু হিসেবে একটু আধটু ঘনিষ্টতা মানা-ই যায়।’
তার বদলে উল্টে বিনির মনে হলো , নিদ্রাবস্থায় অন্যের স্বামীর গালে চুমু খাওয়ার অভিপ্রায়ে এই মেয়েটির আরো বেশি অনুতপ্ত হওয়া উচিৎ। অথচ লাজুক লাজুক মুখ করে বিনির কাছে আবার নির্লজ্জতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে সে!

বাড়ি বয়ে আসা মেহমানকে অস্বস্তিতে ফেলা সমীচীন নয়। অগত্যা চুপ করে রইলো বিনি।

রাকার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পরে জানতে পারলো আজকে তাঁর জন্মদিন। বন্ধুরা সবাই মিলে পার্টি করবে। জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিনিকেও আমন্ত্রণ জানালো সে।

বিনি চট করে একবার ইফরানের দিকে চাইলো। ইফরান নিশ্চয়ই যাবে। রাকার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের দীর্ঘসূত্রিতা ইতোমধ্যে আন্দাজ করে ফেলেছে বিনি। অনেকদিনের পরিচয় নিশ্চয়ই। সেজন্যই রাকাকে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে ইফরান।

ইফরান অবশ্য তাদের কথোপকথন শুনছে না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে চুল ব্রাশ করতে ব্যস্ত। বিনি সৌজন্যমূলক হেসে বললো,
—‘সম্ভব হলে অবশ্যই যাবো।’

বিদায় জানিয়ে চলে গেলো রাকা। তার কিছুক্ষণ বাদে ইফরানও বেরিয়ে পড়লো। বিনির ক্লান্তদেহ নিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আর যেন পেরে উঠছে না সে। হতাশ লাগছে! এলোমেলো লাগছে সবকিছু। ইফরান বলেছিলো একতরফা অবসেশন! সত্যিই কি তাই!


সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলো ইফরান। ফিরে এসে আগে গোসল সেরে নিলো। তারপর ফোন নিয়ে বসলো।
বিনি রাতের খাবার তৈরী মাত্র শেষ হয়েছে। পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে ফ্যানের নিচে বসলো সে।
ইফরানকে দেখে কৌতূহল বশতই জিজ্ঞেস করলো,
—‘তুমি যাবে না?’

ইফরান খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে গেইমস খেলছিলো। ফোনের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
—‘কোথায়?’
—‘পার্টিতে?’
—‘না।’
কপালে ভাঁজ পড়লো বিনির। ইফরান ঘরে বসে আছে। সুতরাং পার্টিতে না যাওয়ার কোন কারণ নেই। তাছাড়া এসব পার্টি ইফরানের কখনো মিস হয় না। খানিকটা দায়সারাভাবেই জিজ্ঞেস করলো সে,
—‘কেন যাবে না। বিকেলে ও ফোন করেছিলো। তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে। আমি বলেছি যাবে।’
—‘ভালো করেছো।’

বিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ইফরান যায় নি। হয়তবা কোন ব্যক্তিগত সমস্যা হয়েছে। অন্যকারণ থাকলেও এইমুহূর্তে বিনির জানার আগ্রহ নেই। বিষাদগ্রস্ত লাগছে। বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। ইফরানও বলার জন্য বিশেষ আগ্রহবোধ করলো না। আড়চোখে একবার বিনির দিকে তাঁকিয়ে পুনরায় গেইমস খেলায় মনোযোগ দিলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here