ভূতূড়ে_জমি #১ম_পর্ব

0
72

ভূতূড়ে_জমি
#১ম_পর্ব
Misk_Al_Maruf

মা ফোন দিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“শিয়াল পাড়ার ক্ষেতে তোর আব্বারে কাল রাইতে জ্বীনেরা মাটির মধ্যে কোমর পর্যন্ত গাইড়া রাখছিল। এখনও ওনার হুঁশ ফিরে নাই।”
আমি স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“হসপিটালে নিয়েছিলা আব্বা’কে? ওনার অবস্থা এখন কেমন?”
“অবস্থা বেশি ভালো না। কালু কবিরাজরে তোর চাচা খবর দিয়া আনাইছে। উনি ঝাড়ফুঁক করতেছে কিন্তু এখনো তার জ্ঞান ফেরার নাম নাই।”
আমি উত্তেজিত কন্ঠে বললাম,
“আরে তোমাদের মাথা কি পুরোপুরি গেলো নাকি? হসপিটালে না নিয়ে কিসব কবিরাজ টবিরাজ নিয়ে পরে আছো? এদের দুই নাম্বারিতো গতবারই গ্রামবাসীর সামনে উন্মুক্ত করলাম। যত দ্রুত সম্ভব আব্বাকে হসপিটালে নিয়ে যাও। আমি বাসে উঠে রওনা দিচ্ছি।”
আমার মা কিছুক্ষণ কেঁদেকেটে বললো,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়”
মায়ের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে তৎক্ষনাৎ আমি ফোনটি রেখেই সামান্য কিছু কাপড়চোপড় ব্যাগে ঢুকিয়েই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার মেসের বড়ভাই আকিব আমার এমন তাড়াহুড়ো দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি ব্যপার মারুফ? ব্যাগপত্র গুছিয়ে কই যাচ্ছো?”
“জ্বী ভাই! ঐ আব্বু একটু অ্যাক্সিডেন্টে করেছেতো তাই বাড়িতে যাচ্ছি। আপনাকে পরে সব জানাবো, এখন আসি তাহলে।”
এই বলে তার কোনো প্রতি উত্তর না শুনেই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।
আকিব ভাই এমনিতেই এসব জ্বীন-ভূত সম্পর্কে খুবই স্পর্শকাতর, মাঝেমধ্যে ফ্রি সময় পেলেই আমাদের মেস মেম্বারদের নিয়ে জ্বীন-ভূত এর গল্প নিয়ে মেতে উঠেন। অন্য মেস মেম্বাররা এসব বিশ্বাস করলেও আমি ঠিকই বুঝতে পারি উনি এসব বিনোদনের জন্যই অর্ধেকটাই মিথ্যা বলেন।

বাবার সাথে আমার সৎ চাচাদের জায়গা জমি নিয়ে বহুবছরের একটি কোন্দল ছিল। আর মায়ের ভাষ্যমতে যেখানে বাবাকে অজ্ঞান অবস্থায় মাটির মধ্যে পাওয়া গেছে সেখানের জমি নিয়েই মূলত আসল সমস্যা। আমার যতটুকু ধারণা আমার সৎ চাচারাই বাবাকে কোনোরকম আহত করে ঐ মাটির মধ্যে গেড়ে এটাকে জ্বীন-ভূত হিসেবে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। তারা হয়তো ভেবেছে এসব করলে আমরা ভয়ে ভুলেও ঐ জমিতে পা বাড়াবো না। কিন্তু আমার বাবার এমন তরতাজা এক যুবক ছেলে থাকতে তাদের এসব কুবুদ্ধি যে কখনোই সফল হবে না সেটা হয়তো তারা ভাবতে পারেনি।

বাস থেকে নেমে বাড়িতে না গিয়ে সরাসরি হসপিটালে চলে আসলাম। হাসপাতালটি সরকারী এবং বেশ পুরোনো, আমাদের পরিবারে কারো কোনো শারীরিক সমস্যা কিংবা রোগ হলেই এই হাসপাতালে চলে আসি।
বাবা শুয়ে আছে আর আমার মা রক্তিম চোখে বাবার সাথে বসে আছে। এখন আপাতত আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কেউ উপস্থিত নেই, হয়তো তারা বাবাকে দুএক নজর দেখে যার যার কাজে চলে গেছেন। আমি হন্তদন্ত হয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করলাম,
“আব্বার কি অবস্থা?”
মা নির্লিপ্ত স্বরে বললেন,
“জ্ঞান ফিরছিলো! একজন নার্স আইসা ঘুমের ঔষধ খাওয়াইয়া দিছে আবার, তাই এখন ঘুমাইতেছে। ওনারা বললো, এই মুহূর্তে নাকি তোর আব্বার জেগে থাকা ঠিক হইবো না।”
আমি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলি,
“হুম তাহলে ঠিক আছে। আর তোমরা কিনা ঐসব ভন্ড কবিরাজ নিয়া উঠেপড়ে লাগছিলা। ওরা হলো কোনোরকম দুইএকটা হাবিজাবি মন্ত্র পড়ে টাকা কামানোর ধান্দা। যাইহোক এখন কিভাবে কি হলো সেটা বলো।”
“তোর বাপে কালকে রাতে গেছিলো শিয়ালপাড়ার জমিটা একটু দেখতে। এর আগেও বহুবার রাতে গেছিলো কিন্তু তেমন কিছুই হয়নাই। কালকে রাত বারোটার পরও যখন তোর আব্বায় বাড়ি ফিরছিল না তখনই আমার চিন্তা শুরু হয়। কারণ এতো রাইত কইরা সে কোনোদিন বাড়ি ফিরে নায়। উল্টা বেশি কাজ কাম থাকলে দশটার আগেই বাসায় চলে আসে। তখন আমি চিন্তামন নিয়া তোর ছোট চাচার ঘরে যাই। কিন্তু তোর ছোট চাচায়ও গঞ্জে গেছিলো কি জানি এক কামে। এরপর পাশের বাড়ির সবুজ আর সাদেকরে অনেক বুঝাইয়া শুনাইয়া সেই ক্ষেতে পাঠাই। ওরাওতো পোলাপান মানুষ তাই এতো রাইতে যাইতে চায় নায় প্রথমে। ওরা নাকি যাইয়া দেখে তোর বাপের জমির পাশে যেই পুকুরটা আছে সেটার কিনারায় কাদামাটির মধ্যে তোর বাপেরে জ্বীনেরা কোমর পর্যন্ত গাইড়া রাখছে অজ্ঞান অবস্থায়। এরপর ওরা যখন আমারে কল দেয় তখন আমি কোনোরকম তোর চাচীরে নিয়া সেইখানে যাই এরপর তোর বাপেরে নিয়া আসি।”

মায়ের কথা শুনে আমার একটুও বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা নিশ্চই আমার সৎ চাচাদের কাজ। তবুও কোনো প্রমাণ ছাড়া তাদেরকে দোষারোপ করাটাও আমার যে বোকামি হবে সেটাও ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি।

বিকালেই বাবাকে বাড়িতে নিয়ে আসলাম। বাড়িতে আসার পর আমি আর একমুহূর্ত দেরি না করে সবুজদের বাড়িতে চলে গেলাম। সবুজদের পরিবার আমাদের আপন কোনো আত্মীয় না হলেও ওদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা অনেক আপনজনের চেয়েও বেশি। আমার বাড়িতে আসার খবর শুনলে ওরা দুই ভাই আমাকে ছাড়া যেন কিছুই বুঝে-না। সবসময়ই আমার পিছু পরে থাকে। এর কারণটাও স্বাভাবিক, একজন বড় ভাই হিসেবে যতসব দায়িত্ব আর কর্তব্য আছে সবকিছুই আমি পালন করার চেষ্টা করি।
সবুজ আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে বললো,
“ভাই! আপনে কখন আইলেন? আর চাচার অবস্থা কেমন?”
“হুম এখন মোটামুটি ভালো। আচ্ছা কালকে রাতে তোরা ক্ষেতের মধ্যে যাওয়ার পর কি দেখছিলি বলতো!”
“যা দেখছি তা আর বলার মতো না। ক্ষেতের পাশের পুকুরে চাচারে ভূতেরা গাইড়া রাখছিল। আমিতো এই দৃশ্য দেইখা ভয়ে সামনেই আগাই নাই। পরে সাদিককা কইলো চাচীরে কল দিয়া আনতে। এর আগেও নাকি অনেকেই ঐখানে সাদা কাপড় পরা ভূত দেখছে। কোনোরকম নাকি তারা সেই ভূতের হাত থিকা বাঁইচা আইছে। সন্ধ্যার পর ঐখানে কোনো মানুষ ভুলেও যায় না এইসব ভূতের কারণে। আর চাচায় কি বুইঝা যে গেলো সেইটাই আমার মাথায় খেলতেছে না।”
“এইসব কল্পকাহিনী তোরে বললো কে?সত্যি করে বলতো!”
“কি যে বলেন আপনে? পুরা গ্রামবাসীর মানুষ জানে ঐখানে ভূত আছে। ক্ষেতের পাশেইতো বাঁশঝাড়, আমার মনে হয়ে ওখানেই ভূত থাকে।”
“হুম আচ্ছা এখন চল, আজকে যেয়ে দেখমু ওখানে আসলেই কোনো ভূত আছে কিনা?”
“না ভাই আমি আর ঐখানে যামুনা। কালকে চাচারে যেই অবস্থায় দেখছি সেইটা দেখার পরতো আরো আগে যামুনা।”
আমি ধমক দিয়ে বললাম,
“চুপ থাক! এখন বিকাল, এখন কোনো ভূত নাই। আর সাথে আমিতো আছি। সাদিকরেও ডাক দে।”

শিয়ালপাড়ার ক্ষেতে চলে আসলাম সবুজ আর সাদিক দুই ভাইকে নিয়ে। ক্ষেতের পূর্ব পাশ ঘেঁষেই এক বিশাল বাঁশঝাড় এবং আরো বেশ কিছু গাছপালা। কথিত আছে ঐ বাঁশঝাড়ের মধ্যে নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা বাঙ্গালীদের মেরে মেরে একসাথে গণকবর দিয়েছিল। যদিও এটার সত্যতা কতটুকু তা আমার জানা নেই। আমাদের ক্ষেতের দক্ষিণ দিকেই বিশাল এক কুয়ার মতো বড়সড় একটি পুকুর। বর্ষাকালে এই পুকুরটি পানিতে টইটম্বুর থাকলেও গ্রীষ্মের এই প্রচন্ড দাবদাহে পানি অর্ধেকটাই নেই। আশেপাশের ক্ষেতগুলোতে এই পুকুর থেকেই পানি নিয়ে সেচ করা হয়।
ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে পুকুরের যেই সাইটটি পরেছে সেখানেই দেখতে পেলাম নরম কাঁদার মধ্যে বেশ কিছুটা গর্ত করা। সবুজ সেখানের দৃশ্যটি আমাকে হাতের ইশারায় দেখিয়ে বললো,
“ভাই এইখানেই চাচারে ভূতেরা গাইড়া রাখছিল। অনেক কষ্টে চাচারে মাটির মধ্যে থেকে উঠাইছি।”
আমি কোনো কথা না বলে জুতাটি হাতে নিয়ে সেই কাঁদার মধ্যে নেমে পরলাম।
একটি বিষয় আমার চোখ এড়ালো না, খেয়াল করলাম গর্তের চারপাশটা বেশ সমান অথচ আমরা জানি কোথাও কোনো গর্ত করলে যদি মাটি অন্য কোথাও ফেলা না হয় তাহলে গর্তের চারপাশটা চাপের প্রভাবে কিছুটা উঁচু হয়ে যাবে অথচ এখানে তার কোনো লক্ষ্মণ নেই। গর্তের কিছুটা দূরে তাকাতেই রহস্যের জট কিছুটা খুললো। মানে এই গর্তের মাটি আসলেই আগে থেকে অল্প কিছু উঠিয়ে পাশেই ছুড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এসব ক্লু দিয়েতো আর আসল রহস্য উদঘাটন সম্ভব নয়।
যখন কোনো কিছু না ভেবে সবুজ আর সাদিককে নিয়ে পাশেই ক্ষেতের আইলে বসে পরি তখনি পাশে বেশ কিছু অর্ধখাওয়া সিগারেটের শলাকা দেখতে পেলাম তখনই আমার মাথাটি কিছুটা চক্কর দিয়ে উঠলো। একটু ভালোভাবে খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম সিগারেট গুলো খাওয়া হয়েছে তা খুব বেশি সময় হয়নি। অর্থাৎ গতকাল রাতেই সম্ভবত কয়েকজন মিলে এগুলো খেয়েছে।
আমাকে ভাবনার জগতে চলে যেতে দেখে পাশ থেকে সবুজ বললো,
“ভাই কি ভাবতেছেন? সন্ধ্যাতো হয়ে গেলো চলেন বাসায় যাই। নাহলে আমাদেরও ভূতে ধরবো।”
ওদের কথার প্রতিউত্তর না দিয়ে বাসার উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলাম।

সকালে বাড়িতে হট্টগোল শুনে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। অনেকটা ঘুমন্ত চোখে উঠোনে আসতেই সবুজ দৌড়ে এসে আমাকে বললো,
“ভাই শুনছেন! কামরুল চাচারেও কালকে রাতে ভূতেরা ঐ একই জায়গাতে মাটির মধ্যে গাইড়া রাখছিল। তার অবস্থা নাকি আরো মারাত্মক।”
সবুজের কথা শুনে মুহূর্তেই আমি হতভম্ব হয়ে যাই।
যেই সৎ চাচাদের আমি কালকে থেকে সন্দেহ করে আসছি আজ তারাই কিনা একই ফাঁদে আটকে গেলো? এ কিভাবে সম্ভব? এটা কি আসলেই কোনো জ্বীনের কাজ নাকি মানুষের কাজ?…

[To be continued]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here