চিত্ত_চিরে_চৈত্রমাস,পর্বঃ নয়

0
106

#চিত্ত_চিরে_চৈত্রমাস,পর্বঃ নয়
#মম_সাহা

(২০)

সন্ধ্যার প্রকৃতি তখন বিষণ্ণ, সাথে বিষণ্ণ অষ্টাদশীর হৃদয়। দুপুর হতে এ অব্দি সে কেঁদেছে, কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ প্রায় ফুলে যাওয়ার উপক্রম। তার জীবনের সবচেয়ে কোমল একটা অংশ হলো তার শখের বাগান। অথচ কেবল আজ না, প্রায় এ নিয়ে দুই বার তার সাথে এই ঘটনা ঘটেছে। কে বা কারা এ কাজটা করে এটা বোধগম্য না কারোরই। কেবল চোখ মেলে দেখতে হয় শখ বাগানের বিধ্বস্ততা। প্রথম যখন এই রকম ঘটনা ঘটলো তখন প্রকৃতিতে কেবল আষাঢ় মাস এসেছে। দিন রাত কেবল বর্ষণ ধারা আপন গতিতে ঝরে যায়। এমনই টানা দুই দিন বৃষ্টির পর ক্ষান্ত হলো প্রকৃতি। বাহার তখন ট্যুরে গিয়েছে। চিত্রারও শরীরে জ্বর। তাই আর বাগানের যত্ন নেওয়া হয় নি, অথচ দু’দিন পর প্রকৃতির ঝড়ের সাথে চিত্রার শরীরের জ্বর কমতেই চিত্রা ছাঁদে গেলো, নিজের প্রিয় গাছ গুলোকে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছাঁদে উঠে সে হতভম্ব। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর ফুল গাছ গুলোর টব ভেঙে একাকার। বৃষ্টির পানিতে টবের পানি ধুয়েমুছে কাঁদায় মাখামাখি ছাঁদ। সেদিন চিত্রা পাগলের মতন কেঁদেছিল। সবাই বলেছে ঝড়ের কারণে হয়তো টব গুলো পড়ে ভেঙে গিয়েছে, অথচ চিত্রা বিশ্বাস করে নি। মানে নি সে কথা। কারণ যে ফুলের টব গুলো ভেঙেছে সে গুলো নিচেই রাখা ছিলো। ওগুলো ঝড়ের বাতাসে পড়লে খুব বেশি হলে টব ফেঁটে যেতো, কিন্তু এমন বিশৃঙ্খল ভাবে ভাঙতো না। চিত্রার কান্না দেখে সেদিন বিকেলেই তুহিন অনেক গুলো ফুলের চারা এনে দিয়েছিল। অতঃপর একটানা দু’দিন কান্নাকাটির পর চিত্রা সে ব্যাথা ভুলেছে। আজ আবার এত গুলো মাস পর একই ঘটনা ঘটলো। বাড়িতে এত গুলো মানুষ থাকা শর্তেও ফুলের টবের কি নির্মম অবস্থা!

ঘরের দরজায় তুমুল শব্দ হতেই ধ্যান ভাঙলো চিত্রার। চোখের অশ্রু ততক্ষণে বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। চিত্রা কাঠের দরজাটার দিকে দৃষ্টি দিলো। গভীর ভাবে বোঝার চেষ্টা করলো কে এসেছে। তন্মধ্যেই অহির ডাক ভেসে এলো,
“চিত্রা, দরজা খোল তো। দেখি, দরজা খোল।”

অহি আপা হসপিটালেই ছিলেন সারাদিন, হয়তো এখন এসেছে। বাড়ির পরিস্থিতিও তো তত ভালো না, ঘরের দোর দিয়ে বসে থাকাটা আদৌও মানানসই? চিত্রা জানে এ কাজটা বেমানান, তবুও সে কাজটা করেছে। প্রিয় কিছুর কিঞ্চিৎ ক্ষতিও যে ভেতরটা ভেঙে দেয়। হোক সেটা মানুষ কিংবা বস্তু।

চিত্রার ভাবনার মাঝেই বাহির থেকে অহির আবার ডাক ভেসে এলো,
“চিত্রা, খোল না দরজাটা।”

চিত্রা সারাদিনের অনশন ভাঙলো। ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখার প্রতিজ্ঞা টাও ঝিমিয়ে এলো। অলস শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ধীর গতিতে দরজা টা খুলে দিতেই মুখমন্ডলের সামনে দৃশ্যমান হলো অহি আপার নিষ্পাপ, সাধাসিধে চেহারাটা।

চিত্রাকে দরজা খুলতে দেখেই বাড়ির সদস্যদের প্রাণে পানি এলো। একে একে চিত্রার মা, বড়মা ছুটে এলো। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো চিত্রার ঘরে। চিত্রা তখনও নিরুত্তর।

চিত্রার শ্যামলা রঙের কারণে অধিক কান্নার পরেও গালে লাল আভা দেখা দেয় নি। কিন্তু চোখ মুখে তখনও অশ্রুকনাদের আধিপত্য। চিত্রার মা মুনিয়া বেগম মেয়ের গালে হাত রাখলেন, খুব ধীর থেকে ধীর কণ্ঠে বললেন,
“কেঁদেছিস কেনো বোকা মেয়ে? তোর জন্য তোর তুহিন ভাইজান নাহয় আবারও চারাগাছ এনে দিবে। এমন কারণে কাঁদতে হয় নাকি?”

মায়ের আদুরে আলাপে চিত্রা ঠোঁট ফুলালো, চোখ-মুখ আঁধার হয়ে এলো তার। এইতো, মনে হচ্ছে হয়তো এখনই কেঁদে দিবে। অহি হয়তো বুঝতে পারলো চিত্রার অনুভূতির মতিগতি। তাই ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বললো,
“কাঁদিস না, কাঁদিস না, দাঁড়া। আমি তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি।”

চিত্রার কাঁদো কাঁদো চোখে-মুখে ভর করলো বিষ্ময়। অহি আপা তার জন্য কিছু এনেছে! অথচ অহি আপার আগে এসব ব্যাপারে কখনো হেলদোল দেখা যায় নি।

চিত্রা যখন অধির আগ্রহে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো অহি আপা মিনিট দুইয়ের মাঝেই চারটা ফুলের টব নিয়ে হাজির হলো। দু’টো টব দোয়েলের হাতে আর দু’টো তার নিজের হাতে। চিত্রা ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে আছে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না তার সাথে হচ্ছে টা কি। এতটুকু বয়সে কী তারও মতিভ্রম হচ্ছে! নাহলে অহি আপার মতন মানুষ কিনা ফুলের টব এনেছে নিজে যেচে, তাও আবার চিত্রার জন্য!

কেবল চিত্রা না, অবাক হলো উপস্থিত সবাই। অহি কখনোই বাড়িতে ঘটে চলা ঘটনার স্রোতে গা ভাসায় না। তাকে বরাবরই দেখা যাবে পড়ার টেবিলে কিংবা তার ঘরের বারান্দায়। অথচ আজ সে মেয়ে বোনের অশ্রু মুছাতে ফুলের টব এনেছে ভাবতেই সকলের শরীরে কিঞ্চিৎ আনন্দের ধারা বয়ে গেলো।

অহি সবার হতভম্ব মুখ খানার দিকে একবার চাইলো। মেঝো চাচী, বড়ো চাচী সকলের দৃষ্টিই তার দিকে নিবদ্ধ। এর কারণে সামান্য অস্বস্তিতে গা কাঁপলো অহির। সবার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বললো,
“আসলে বড় আপা দুপুরে কল দিয়ে বলেছিলো চিত্রার গাছ গুলো নাকি ভেঙে গেছে। তাই ও নাকি দরজা আটকে বসে আছে, কান্নাকাটি করছে। তাই কয়েকটা চারাগাছ নার্সারি থেকে কিনে আনলাম। বাড়ির পরিস্থিতি এমনকি চিত্রার পরিস্থিতিও তত একটা ভালো নেই যে এসব নিতে পারবে। তাই নিয়ে এলাম।”

সারাদিনের মন খারাপ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। চিত্রা বরাবরই অহি আপাকে পছন্দ করে বেশি। অহি আপার দৃঢ়তা সম্পন্ন চালচলনটাই চিত্রার পছন্দের কারণ। কিন্তু অহি আপা গম্ভীর মুখো বলে তাদের ভাব এতটা জমে নি কখনোই। অথচ সেই অহি আপা ই আজ চিত্রার খুশির কথা ভাবছে। এটাই যেন চিত্রাকে রাজ্যের সুখ এনে দিলো।

চিত্রা ছুটে এলো অহির দিকে, খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অহি আপার ছোটোখাটো শরীরটা। বা’হাতটায় টান পড়তেই কেমন চিন চিনে ব্যাথা করে উঠলো। কিন্তু সে ব্যাথায় তোয়াক্কা করলো না চিত্রা। সব ব্যাথা ছাপিয়েই যেন আজ অহি আপার আগমন ঘটেছে।

চিত্রার পাগলামো দেখে উপস্থিত সবাই হাসলো। যাক, বাড়িটাতে এতদিনে প্রাণ ফিরলো। কেমন সতেজতায় ভরে গেলো চারপাশ।

(২১)

আশ্বিন মাসে সচারাচর বৃষ্টির দেখা মেলে না। আকাশে কেবল তুলোর মতন মেঘেদের ছড়াছড়ি দেখা যায়। শরৎ এর নরম তুলতুলে আকাশ, আদুরে প্রকৃতি, সজীব গাছপালা দেখতেও ভালো লাগে। অথচ আজ আবহাওয়া শরৎ এর রূপে নেই। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে প্রকৃতি কিঞ্চিৎ সিক্ত। যে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছে চিত্রার শরীরের ঢিলেঢালা জামাটাও। জামার জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির ফোঁটার চিহ্ন পরিলক্ষিত। অথচ চিত্রার সেখানে ধ্যানই নেই। সে ফুলের টবে নতুন মাটি চেপে চেপে দিতে ব্যস্ত।

“এই মেয়ে, শুনলাম আজ নাকি প্রচুর কেঁদেছো?”

হুট করে এমন ডাকে ভীত হলো চিত্রা। ডান হাতের মুঠোয় থাকা মাটি গুলোকে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে কেঁপে উঠলো। কিন্তু কণ্ঠের মালিককে চিনতে তার সামান্য অসুবিধা হলো না। সে অবাক উত্তর দিলো,
“বাহার ভাই, কোথায় ছিলেন কাল থেকে এ অব্দি?”

কালো টি-শার্ট টার গলার দিকটা টানতে টানতে বাহার উত্তর দিলো,
“পার্সোনাল কাজ।”

“কি কাজ, বাহার ভাই?”

চিত্রার প্রশ্নে বাহার ভ্রু কুঁচকালো, বেশ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো,
“পার্সোনাল কাজ মানে বুঝো না? যেখানে ব্যাক্তিগত শব্দটা উল্লেখ্য আছে সেখানে সেটার বিশ্লেষণ চাওয়া টা বেশ বোকামি। অথচ তোমায় আমি বুদ্ধিমতী ভাবি।”

বাহারের কথার ধরণে আবারও মনের কোণে মেঘ জমলো চিত্রার। মুখটা অপমানে ছোটো হয়ে গেলো। সে বেশ শুকনো কণ্ঠে উত্তর দিলো,
“দুঃখীত।”

“তা আজ নাকি অনেক চারাগাছ পেয়েছো?”

বাহার যে পরিস্থিতি ঘুরানোর চেষ্টা করলো তা বুঝতে বাকি রইলো না চিত্রার। সেও মাথা নাড়িয়ে বললো,
“হ্যাঁ বাহার ভাই, জানেন আমার সব সুন্দর ফুলের টব গুলো কে যেন ভেঙে ফেলেছে।”

“কে ভেঙেছে বলো তো? তোমার কাছের কেউ না তো?”

বাহারের প্রশ্নাত্মক বাক্যে অবাক হলো চিত্রা। তার কাছের কেউ ভেঙেছে মানে? বাহার ভাই কী বলতে চাইলো? তবে কী বাহার ভাই জানে, কে একাজ খানা করেছে?

ভাবুক চিত্রার মাথায় চিন্তারা দলা পাকিয়ে গেলো। হাঁসফাঁস করে উঠলো হৃদয় কোণ। অধৈর্য্য কণ্ঠে তাই সে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার কাছের কেউ? কিন্তু কেনো বাহার ভাই? আর কেই বা করেছে?”

চিত্রার প্রশ্নে বাহার ঠোঁট উল্টিয়ে বুঝালো যে এর উত্তর তার জানা নেই। হতাশার দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো চিত্রার বুক চিরে। মন খারাপ করে বললো,
“বাহার ভাই, রঙ্গন ফুলের গাছটাও ভেঙে গেছে।”

“অলকানন্দা তো আছে, তোমায় নাহয় অলকানন্দা বলবো। এবার বলো তো, নতুন চারাগাছ গুলো কোন কোন ফুলের?”

“অলকানন্দা, হাসনাহেনা,সন্ধ্যা মালতী আর শ্বেত চন্দন।”

“বাহ্,অনেক তো। আর কিছু চাই?”

বাহারের প্রশ্নে চিত্রার দুষ্টবুদ্ধি গুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। টগবগ করে উঠলো ডানা ঝাপটিয়ে। চিত্রা বাহারের দিকে ঘুরে, বাহারকে পুরো পা থেকে মাথা অব্দি দেখে কুটিল হেসে বললো,
“হ্যাঁ চাই তো, আপনাকে চাই।”

বাহার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। খুব গভীর ভাবে কি যেন ভাবলো অতঃপর আনমনে বললো,
“আমায় চেও না অলকানন্দা, আমায় চাইলে বড়জোর প্রাপ্তির খাতায় বিরাট এক শূণ্যতার হাহাকার মিলবে, আমায় মিলবে না।”

বাহার দাঁড়ালো না আর। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে নিজের ঘরে চলে গেলো। চিত্রা কেবল সে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। মানুষটাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মাঝে মাঝে মানুষটা কোথায় উধাও হয়ে যায়!

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here