চিত্ত_চিরে_চৈত্রমাস,পর্বঃ দশ

0
100

#চিত্ত_চিরে_চৈত্রমাস,পর্বঃ দশ
#মম_সাহা

(২২)

রাত দশটা। অনেক গুলো দিন পর সওদাগর বাড়িতে রাতের খাবারের সময় নক্ষত্রদের মেলা বসলো। বড় চাচী, বড় চাচা, মুনিয়া বেগম, নুরুল সওদাগর, তুহিন, চাঁদনী, মাহতাব,লতা বেগম, চিত্রার ফুপি, অহি, চিত্রা, দিশান, তৃষান সব খাবার টেবিলে অবস্থিত। মুনিয়া বেগম তার বড় জা এবং চিত্রার ফুপি অবশ্য খাবার বেড়ে দিচ্ছে আর বাকিরা খাবার খাওয়ায় মগ্ন।

এর মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে বাহারকে নিচে আসতে দেখে ডাক দিলো নুরুল সওদাগর,
“এই ছেলে, দাঁড়াও। কথা আছে।”

যেহেতু তাদের মেইন দরজার বাহিরে ছাঁদের সিঁড়ি, সেহেতু সবাই বাহারকে তেমন খেয়াল করে নি, নুরুল সওদাগরের ডাকেই সবার দৃষ্টি বাহারের দিকে গেলো। বাহারও হয়তো প্রস্তুত ছিলো না হুট করে ডাকের। তাও আবার নুরুল সওদাগর এমন অনাকাঙ্খিত সময় ডাকবে সেটা যেন ভাবনার বাহিরেই।

থমথমে পরিবেশে সকলের অবাক দৃষ্টির দিকে চোখ বোলালো নুরুল সওদাগর অতঃপর ভাত নাড়তে নাড়তে, বেশ ধীর কণ্ঠে বললো,
“ভেতরে এসো, অতদূর থাকলে কথা বলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবো না।”

“দূরের মানুষ দূরে থাকাই ভালো। আপনি বলুন, আমি শুনছি।”

বরাবরের মতনই বাহারের কাঠখোট্টা জবাবে বিরক্ত হলেন নুরুল সওদাগর। হাতে নেওয়া ভাতের লোকমা টা আবার থালায় রেখে দিলো সে। কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“আমাদের সন্দেহের তালিকায় কিন্তু তুমিও আছো। তাই এমন কিছু করো না যেন সন্দেহ প্রখর হয়।”

“এটা তো স্বাভাবিক কথাই। যে লোক নিজের মেয়েকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারে, সে যে আমাকেও রাখবে এটা আমি জানি। নতুন কোনো খবর থাকলে বলেন।”

এমন একটা খবর পাওয়ার পর, অন্য কেউ হলে ঘাম ছুটে যেতো হয়তো অথচ এ ছেলের কেমন গা ছাড়া ভাব। বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে উঠলো নুরুল সওদাগরের অনুভূতি। সে আর কথা না দমিয়ে রেখে বেশ ধমকে বললো,
“কাল তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তুমি কী জানো আজ অহিদের উপর এসিড নিক্ষেপ করা বাইকের ছেলে দুটোরই লা*শ পাওয়া গেছে? কাল তুমি শহরে ছিলে না। আজ শহরের বাহিরে খুব পুরোনো একটা বাড়ি থেকে ছেলে দু’টোকে পাওয়া গিয়েছে। মহিন যেদিন খু*ন হলো সেদিনও তোমার খোঁজখবর ছিলো না। হিসেব গুলো কেমন একে একে মিলে যাচ্ছে খেয়াল করেছো?”

অহির সবে মাত্র মুখে দেওয়া ভাতের লোকমাটা গলায় আটকে গেলো নুরুল সওদাগরের কথা শুনে। নাকে-মুখে খাবার উঠে বাজে অবস্থা। নুরুল সওদাগরের বলা কথাটা সবাইকেই যেন অবাক করে তুললো। শেষমেশ কিনা লোকটা বাহারের দিকেও আঙুল তুললো?

সবাই যখন ব্যাতিব্যস্ত হয়ে অহির দিকে পানি তুলে দিলো বাহার তখন হো হো করে হেসে উঠলো। একটা ছন্নছাড়া ভাব নিয়ে বললো,
“পুলিশদের কি কাজই এটা? অপরাধী না পেলে এরে ওরে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া? এ কেমন বিচার! যাই হোক, আপনার দরকারী কথা কি শেষ? আমি এবার যাই।”

নুরুল সওদাগর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। এ ছেলের মনে প্রাণে কী একটুও ভয় নেই? এমন একটা কথা শোনার পরও একটা মানুষ এত স্বাভাবিক কী করে থাকে? ভাবতেই হতাশার একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো।

নুরুল সওদাগরের চুপ থাকা দেখে আফজাল সওদাগর বেশ শীতল কণ্ঠে বাহারকে বললো,
“যেহেতু আইনের চোখ তোমার দিকে পড়েছে একটু সাবধানে থেকো।”

“আচ্ছা! সাবধানে না থাকলে কী হবে? কেঁচো খুঁজতে গিয়ে কেউটে বেরিয়ে আসবে নাকি?”

বাহারের কথার ধরণে সবাই হতভম্ব চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। বাহার অবশ্য তার ধার ধারলো না বরং খুব স্বাভাবিক ভাবেই হাঁটতে হাঁটতে মেইন গেইট পেরিয়ে রাস্তায় চলে গেলো। রাতের রাস্তা আবার তার খুব প্রিয়।

নিশ্চুপ হয়ে সবাই কেবল বাহারের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। নিরবতাকে ভেঙে আফজাল সওদাগর কথাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললেন,
“আচ্ছা, তোমার কী মনে হয় নুরু, ঐ ছেলে দুটিকে কে মে*রেছে?”

“কোনো ক্লু পাচ্ছি না ভাইজান। যদি মহিন ওদের দিয়ে কাজটা করায় তাহলে মহিন তো মা*রাই গেছে, ওদের খোঁজ জানলো কে? আর খুব সম্ভবত মহিনকে যে মেরেছে সেই একাজ করেছে।”

“তোমরা কী সত্যি সত্যি বাহারকে সন্দেহ করছো?”

“হ্যাঁ ভাইজান, সন্দেহের খাতায় তো সবার নামই রাখতে হয়। আর কেসটা এত জটিল হচ্ছে যে না রেখে উপায় নেই।”

আফজাল সওদাগর হতাশার একটা শ্বাস ফেললেন। কি যেন বলতে না পারায় ছটফট ভাব ফুটে উঠলো মুখে। কেউ খেয়াল করলো কি না কে জানে!

(২২)

মাঝে অতিবাহিত হলো আরও দিন দুই। আজ চেরিরা চলে যাবে দেশ ছেড়ে। রাত সাড়ে নয়টার ফ্লাইট। সওদাগর বাড়িতে ঘোর শোকের ছায়া। বাচ্চাটার জ্ঞান ফিরলে কেমন তাকিয়ে থাকে আবার ঘুমের ঔষুধের জোরে ঘুমিয়ে যায়। কোনো কথা বলে না, কেমন জড় পদার্থ। অথচ এই মেয়ের হাসিতেই বাড়িতে মুক্তা ঝরতো।

বাড়ির ড্রয়িং রুমে সকলের নিস্তব্ধতা যেন হাহাকার করে উঠছে। অবনী বেগম কেবল ধীর স্বরে কেঁদে যাচ্ছেন। অবশেষে অনবরত কান্না থামানোর জন্য ধমক দিলেন মুনিয়া বেগম। শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“এত কান্নাকাটি করছো যে, সেই ভিনদেশে গিয়ে শক্ত থাকবে কীভাবে? তোমার সাথে কিন্তু কেউ থাকবে না। এখন থেকেই তো শক্ত হতে হবে।”

“আপনি আর সন্তানের মর্ম কী বুঝবেন! পরগাছা লাগিয়েছেন।”

বজ্রপাত হলেও যেন এমন ভয়ঙ্কর নিশ্চুপতা হতো না যতটা এই কথার প্রভাবে হয়েছে। অপ্রত্যাশিত কথাটা যেন বাড়ির গহীনে রোপন করে রাখা অনেক বছরের ভিত্তিটাকে ক্ষাণিক নাড়িয়ে দিলো। উপস্থিত সবাই বিস্ফো*রিত নয়নে অবনীর দিকে তাকিয়ে রইলো। কথাদের তীক্ষ্ণ আন্দোলনেই যেন চুপ করে গেলো সবাই। অনেকের কাছে বোধগম্য হলো না অবনী কি বলেছে, আবার অনেকে মানতে পারছে না অবনী এমন কিছু বলেছে।

আফজাল সওদাগরের স্ত্রী রোজা সওদাগর ভয়ঙ্কর এক ধমক দিয়ে উঠলেন ছোট জা’কে। চোখ রাঙিয়ে বললেন,
“আক্কেল জ্ঞান কী শোকে খেয়ে ফেলেছিস? কোথায় কাকে কী বলতে হবে তা কী ভুলেই গেলি? পুরোনো কাসুন্দি ঘাটলে কেবল গন্ধ ছাড়া কিছুই বের হবে না। অহির মা, তুই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারিস না। তবে অতীতের অনেক কিছু বের হবে।”

অবনী হয়তো নিজেও প্রস্তুত ছিলো না এমন একটা কথা বলার জন্য। অতিরিক্ত শোকে আর রাগে মানুষের বিবেকবুদ্ধি লোপ পায়। তখন তারা কী বলে করে তা নিজেরাও জানে না। তাই অতিরিক্ত রাগে বা শোকের বলা কথার আঘাতে মানুষ অনেক মানুষ হারায়।

অবনী নিজের ভুল বুঝতে পেরে থতমত খেয়ে গেলো। আমতা-আমতা কণ্ঠে মুনিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে বললো,
“ছোটো আপা, আপনাকে আসলে ওভাবে কথাটা বলতে চাই নি। আসলে সন্তানের চিন্তায় মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। বুঝেনই তো।”

“না অবনী, আমি আসলে বুঝি না সেসব। পরগাছা লাগিয়েছি কিনা।”

মুনিয়া বেগমের খোঁচা মারা কথাটা ঠিক গায়ে লেগে গেলো অবনীর। মুখ ছোটো হয়ে এলো তার। বাড়ির ছোটো সদস্য, তুহিন, তৃষান,দিশান,চিত্রা, অহি কেবল দেখে গেলো এ নীরব যুদ্ধ। তারা হয়তো যুদ্ধের ভাষা কিছুই বুঝলো না, কিন্তু এতটুকু তারা ঠিকই জানে যে মুনিয়া আর অবনী নামের নারী দু’জন সবসময় একে অপরের বিপরীতে শীতল একটা যুদ্ধ চালিয়ে যায়৷ অন্যান্য সময় হলে এ যুদ্ধের কোনো কিছুতেই তারা আগ্রহ প্রকাশ করতো না কিন্তু আজকের ব্যাপারটা একদমই ভিন্ন। আজকে কথার ভাষা গুলো কেমন যেন বিষাক্ত, তিক্ত কিছু দ্বারা মোড়ানো।

এই শীতল যুদ্ধকে স্থগিত করতে রোজা সওদাগর গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,
“বাচ্চাদের সামনে তোদের কথা গুলো বেমানান, এতটুকু বোঝার ক্ষমতা তোদের থাকা উচিৎ।”

“বড়ো চাচী, ছোটো চাচী অমন কথা বললো কেনো? আম্মু কেনো বুঝবে না সন্তানের কষ্ট? আম্মুর আমরা আছি না? এসব কেনো বললো ছোটো চাচী?”

ঠিক এ ভয়টাই পেয়েছিলো ঘরের বড় সদস্য রা। চিত্রার প্রশ্নে তাদের ভেতর ভয়ের দানা গুলো কেমন শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে গেলো। নুরুল সওদাগর ধমকে উঠলেন মেয়েকে,
“এই তুমি বড়োদের মাঝে কথা বলছো কেন? তুমি কখনো ঠিক হবে না, তাই না?”

“বড়রা ছোটোদের মাঝে এমন অহেতুক কথা বলতে পারলে, ছোটোদেরও সে কথার বিশ্লেষণ চাওয়ার অধিকার আছে, আব্বু। আপনি ধমকটা সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে পারেন নি বলে আজ মানুষ এসব কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।”

তুহিন সবসময়ই গম্ভীর ছেলে। কিন্তু সঠিক জায়গায় সঠিক কথা বলতে সে ভুলে না। বোনকে প্রচুর ভালোবসে কিনা।

নুরুল সওদাগরের ধমকে চিত্রার চোখে জলেরা অবাধ্য হলো। টইটুম্বুর হয়ে ঘর বসালো চোখের ভেতরের আস্তরণে। ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না এলো। বাবা সবাইকে কত ভালোবাসে, অথচ তার বেলাতেই এসে এতটা নিষ্ঠুর হয়ে যায় কেনো!

তুহিনের কথা যে অবনী বেগমের তেমন ভালো লাগে নি তা অবনী বেগমের মুখ চোখের ভাব দেখেই বোঝা গেলো। সে মুখটাকে পাংশুটে বর্ণ করে তুহিনের উদ্দেশ্যে বললো,
“ভুল মানুষ মাত্রই হয়, তুহিন। তাই বলে বড়দের এভাবে বলা উচিৎ না। তোমার মতন ছেলের কাছে অন্তত এসব আশা করা যায় না।”

“বড়রা যদি নিজেদের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায় তবে এসব হবেই চাচী। আপনার জন্য এ বাড়ির ইতিহাস টা ভীষণ আঁধার। তাই আপনার এসব অসামঞ্জস্য কথা না বললেই খুশি হবো। সময়ে ভদ্র মানুষ কিন্তু আদব ভুলে বেয়াদব হয়ে যায়।”

অবনী বেগম হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন তুহিনের দিকে। তুহিনের মতন ঠান্ডা ছেলে কিনা তাকে এসব বলেছে? অপমানে, অপমানে শিউরে উঠলেন সে। নুরুল সওদাগরের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বললেন,
“আপনার সন্তান আমার সাথে এমন আচরণ করছে, কিছু বলবেন?”

নুরুল সওদাগর বরাবরই ছেলের সাথে তর্কাতর্কিতে কম যান কারণ সে তার ছেলেকে জানে। ছেলে তার অনেক ভদ্র কিন্তু মা-বোনের প্রতি বেশি পজিটিভ। সেখানে তার এই সত্তার উপর কেউ আঁচর কাটলে সে হিংস্র হয়ে যায়। তবুও নুরুল সওদাগর ডাক দিলেন ছেলেকে, রাশভারী কণ্ঠে বললেন,
“তুহিন, থামো। তোমার চাচী হন উনি। সম্মান দেও তাকে। বড়দের সাথে অভদ্রতা তোমায় শিখাই নি কিন্তু।”

তুহিন সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। সোফার সামনে সেন্টার টেবিলের উপর থাকা ফুলদানী টা আঁছাড় মেরে ভেঙে ফেললো। হুট করেই শান্ত তুহিন রাগী হয়ে উঠলো। মুখ চোখে যেন অগ্নি বর্ষন হচ্ছে৷ গলার রগ টানটান হয়ে ফুলে গেছে। সে সিংহের মতন গর্জন দিয়ে উঠে বললো,
“আপনি যা শিখিয়েছেন, তা সমাজে দেখালে আপনার মুখ থাকবে তো? আর কত? বলবেন, আর কত? আপনাদের জন্য আমরা হীনমন্যতায় ভুগী। লজ্জা হয় না আপনাদের? আবার আমার বোনকে নিয়ে আপনি কথা বলেন। আপনার মুখে ওর নামটাও বেমানান।”

কথা শেষ করেই ধপাধপ পা ফেলে তুহিন নিজের রুমে চলে গেলো। হুট করেই ড্রয়িংরুমের এমন বিধ্বস্ততায় অবাক সবাই।

রোজা সওদাগর মুখ বাঁকিয়ে উঠলেন। বিরক্ত স্বরে বললেন,
“অহির মা, কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না, তুই তার প্রমাণ। তুহিনের মতন ঠান্ডা ছেলেটাকেও রাগিয়ে দিয়েছিস। তোর জন্য আমার ছোটো দেবরটা দেশমুখী হয় না। সংসার থাকতেও বৈরাগী সে। তোর জন্য অহি মেয়েটা আজ এমন নিস্তব্ধ। অথচ তুই মানুষ হইলি না। সংসারটা খেলি। আমার সোনার সংসারে হাত দিয়েছিস।”

অবনী আঁচল মুখে চেপে কেঁদে দিলো। আজ অনেকের অনেক কথায় যেনো কেমন ভয়ঙ্কর অতীতের আভাস দিলো। হতভম্ব মানুষ জন কেবল দেখে গেলো এই কান্ড। তাদেরকে আরেকটু অবাক করে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো বিধ্বস্ত বাহার। যার মাথা ফেটে র*ক্ত বেরিয়েছে, টি-শার্টটাও ছিঁড়ে গিয়েছে। ডান হাতের কনুইয়ের দিকে ছিলে আছে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here