অন্তরালে #দ্বিতীয়_পর্ব

0
77

#অন্তরালে
#দ্বিতীয়_পর্ব
_আরশিয়া জান্নাত

ঋতু সেখান থেকে বের হয়েই এলোমেলোভাবে রাস্তায় হাঁটতে লাগলো।বিধাতা এ কোন পরীক্ষায় ফেললো তাঁকে।একদিকে তাঁর জীবনের চেয়েও প্রিয় ভালোবাসার মানুষ অপরদিকে তার সবচেয়ে আদরের বোনের জীবন।এই কঠিন পরীক্ষা সে কিভাবে পার করবে?
_____________________________
:ঋতু এই ঋতু আমার টাই কোথায়?
:এতো চেঁচাচ্ছ কেন?টাই কোথায় মানে যেখানে থাকে সেখানে।
:কোথায় থাকে আমার মনে নাই।খুঁজে দাও
:চোখের সামনেই তো সব রেখে গেছি তাও পাওনা।
এই নাও টাই।
আসিফ ঋতুর কোমড় ধরে নিজের কাছে টেনে বললো,
:টাই তোমার হাতে না রেখে অন্যখানে ফেলে রাখলে আমি দেখবো কিভাবে।অন্যদিকে আমার চোখ যায় নাকি?
:এখন কি তোমার সবকিছু হাতে নিয়ে ঘুরবো আমি?ব্রেকফাস্ট বানাবে কে তাহলে?
:তুমি চাইলে ব্রেকফাস্ট না খাইয়ে অন্য কিছু খাওয়াতে পারো (দুষ্টুমি ভরা হাসি)
:তুমি ও না।সবসময় শুধু উল্টাপাল্টা কথা।দেখি ছাড়ো চায়ের পানি বসিয়ে এসেছি।
:না ছাড়বোনা।।টাই না বেঁধে যাবে?
:ইশ রে ভুলেই গেছি।দাও বেঁধে দিচ্ছি।
ঋতু টাই বাঁধায় মনোযোগ দিলো ঐদিকে আসিফ একদৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে আছে।
:হুম হয়েছে এবার ছাড়ো।
:এই
:হুম বলো।আর কি?
:তুমি এতো সুন্দর কেন ঋতু?
:আমি সুন্দর না।আমার বরটার দৃষ্টি সুন্দর।
:তাই বুঝি?
:জ্বি ঠিক তাই।
:তা সুন্দর দৃষ্টির বরটাকে বুঝি একটুও আদর করতে মন চায় না?
:চায় তো।কিন্তু বরটা যে বেশি আদরে বাদর হয়ে যাচ্ছে।তাই একটু কমিয়ে আদর করি এখন।
:কি বললে তুমি!দাঁড়াও আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন,
বলতেই দুজনে ছুটতে লাগলো।তাঁদের হাসির শব্দে পুরো ঘর মুখোরিত হয়ে উঠলো।


:হ্যালো মিস্টার আসিফ?
:হ্যাঁ বলুন।
:আমি মিসেস ঋতুর লয়ার রিদওয়ান বলছি।
আপনাদের ডিভোর্সের ফাইল কোর্টে জমা দেওয়া হয়েছে।যদি দুজনের সম্মতি থাকে তবে…
:দেখুন মিস্টার রিদওয়ান আমি ঋতুকে ডিভোর্স দিতে ইচ্ছুক না।এখানে কেবল ওর মত আছে আমার না।আমি আমার পক্ষের লয়ার ঠিক করেছি যা বলার উনিই বলবেন।
:দেখুন,পার্সোনালি একটা কথা বলি।বর্তমান আইনে নারীদের ক্ষমতা বেশি।মিউচুয়াল ডিভোর্সে ভেজাল কম হবে।বাট যদি আপনার স্ত্রী আপনার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করে ডিভোর্সটা নিতে চায় তখন কিন্তু আপনারই সমস্যা হবে।যাই হোক বাকিটা আপনার ইচ্ছে।
আসিফ মাথা চেপে বসে পড়লো।ঋতু ওর নামে অভিযোগ করতে পারবে?কি অভিযোগ করবে সে? তাঁকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসি এই অভিযোগ করবে?
ঋতু রে আমার বুকটা খালি খালি লাগছে ঋতু।আমি যে পারছিনা এসব মেনে নিতে।
রিদওয়ান সাহেবের কথা শুনে ঋতু মোটেও অবাক হলোনা।ও তো জানেই আসিফ কখনওই তাঁকে ছাড়তে চাইবেনা।কিন্তু ওদের ডিভোর্স হওয়াটা খুব জরুরী।এতে যেমন আসিফের ভালো হবে তেমনই ছোট বোন রায়ার ও ভালো হবে।ওরা কেবলে রায়াকে কিডন্যাপ করেনি বরং আসিফকে খুন করার হুমকি ও দিয়েছে।রায়া ঢাকায় হোস্টেলে থাকে তাই ওর মা বাবা কেউ জানেনা রায়া কিডন্যাপ হয়েছে।ওরা খুব সতর্কতার সাথে সবকিছু হ্যান্ডেল করেছে,সর্বক্ষণ ঋতুর সবকিছু নজরদারিতে রাখছে।
ঋতুর বুঝে আসেনা তাঁদের ডিভোর্স হলে ঐ লোকের কি লাভ হতে পারে।তবে এর পেছনে বড় কারো হাত আছে বুঝতে বাকি নেই ওর।


আসিফকে দেখে ঋতুর ভেতরটা একদম নিঃশেষ হয়ে গেল।নিজের কি হাল করেছে আসিফ!চোখগুলি কেমন মিইয়ে এসেছে যেন ক’রাত ঘুমায় না।চুলগুলো উস্কোখুশকো।পড়নের শার্টের বোতাম ও ঠিকঠাক করে লাগানো নেই।
এই লোকটা কেন এভাবে ভেঙে পড়েছে।সে কি জানেনা তাঁর এমন চেহারা দেখে আমি ঠিক থাকতে পারবোনা?
নিরবতা ভেঙে আসিফ বললো,
:কেমন আছ ঋতু?
:ভালো আছি।তুমি?
:দেখতেই তো পাচ্ছ।যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়া সৈনিক আর কেমন থাকবে?
:দেখো আসিফ যুদ্ধে হারজিত আছেই।সবসময় জিততে হবে এমন তো না।পরিস্থিতি মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই সাহসিকতার কাজ।
:কি জন্য ডেকেছো?
:তুমি ভালো করেই জানো।
:আমি কিছু জানি না।
:ডিভোর্সে এগ্রি হচ্ছোনা কেন?
:এগ্রি হবার মতো আমার কি কোনো রিজন আছে?
:আমি তো বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসিনা, তোমার সাথে সংসার করা আমার জন্য অসম্ভব।
:সেটা তোমার সমস্যা আমার না।আর এই বিষয়ে আমি খুব স্বার্থপর।
:আমি নাদিম কে ভালোবাসি।ওকে বিয়ে করতে চাই।তুমি ডিভোর্স দিলে আমি ওকে বিয়ে করতে পারবো।
আসিফের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে ফেললো।নাদিম ঋতুর বেস্টফ্রেন্ড।শুরু থেকেই নাদিমকে খুব জেলাস করতো আসিফ।ঋতুর মুখে এই কথা শুনে কেমন এক দোটানায় পড়ে গেল সে।কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো,
:আমি বিশ্বাস করিনা।নাদিমের তো গার্লফ্রেন্ড আছে।ও তোমাকে কবে বিয়ের কথা বলেছে!
:সেসব তোমার জানতে হবেনা তুমি জাস্ট আমাকে মুক্তি দাও।
আসিফ উঠে এসে ঋতুর চেয়ারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।ঋতুর কোলে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
:তুমি মুক্তি চাচ্ছো ঋতু?আমার ভালোবাসা তোমার কাছে জেলখানা মনে হচ্ছে?ঠিক আছে ঋতু আমি তোমাকে মুক্তি দিবো।তোমার সব শখ আমি পূরণ করবো ঋতু।শুধু শেষবারের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরো।আর কিছু চাইবোনা।
ঋতু বহুকষ্টে কান্না আটকে রেখেছে।না কেঁদে ফেলা যাবেনা।নিজেকে সামলাতে হবে।
:তুমি কথা দিচ্ছ সাইন করবে?
:হ্যাঁ।
তারপর ঋতু দাঁড়াতেই খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আসিফ,যেন একদম বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলবে।আর মনে মনে বললো,”তুমি আমায় মিথ্যে বলছো ঋতু।আমাকে যদি ভালো না বাসতে এরকম শুকিয়ে যেতে না এ ক’দিনে।তোমার মুখ যাই বলুক না কেন তোমার চোখ সব বলে দিচ্ছে।কেন এভাবে কষ্ট পাচ্ছ ময়না।কেন আমাকে বলতে পারছোনা!”
ঋতুর ভেতর ভেঙে কান্না পাচ্ছে।এই সময়টা যদি থেমে যেত অনন্তকালের জন্য!
এই মানুষটাকে ছাড়া কিভাবে বাঁচবে ও!
___

:এই নিন ডিভোর্স লেটার।এখন তো বিশ্বাস হয়েছে এবার রায়াকে ছেড়ে দিন।
:Oh my God! I can’t believe ঋতু।আসিফ তোমাকে ডিভোর্স দিয়েছে!! আমি অনেক খুশি আজকে।হাহাহা
:আপনার খুশিতে আমার কিছু যায় আসেনা।দয়া করে রায়াকে মুক্তি দিন।
:ডোন্ট ওরি।রায়া ঠিক সময়ে পৌছে যাবে বাসায়।ওকে নিয়ে অলরেডি রওয়ানা হয়ে গেছে।
তুমি এবার নিশ্চিন্তে বাসায় যাও।
:আপনি আসিফের কোনো ক্ষতি করবেন না তো?
:নাহ।
:আপনার কথামতো সব হয়েছে এখন কি আমি জানতে পারি কেন এসব করেছেন?কারো সাজানো গোছানো সংসার ভেঙে এতো খুশিই বা হচ্ছেন কি করে!
:সেইসব তোমার জানতে হবেনা।তুমি এখন চলে যাও।গেট লস্ট_


আসিফের প্রিয় সরষে ইলিশ।সরিষার ফ্লেভার ঋতুর একদম পছন্দ না।তবুও ছুটির দিনে খুব যত্ন করে সরিষা বেঁটে রান্না চাপিয়েছে।গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা।আসিফ ইলিশের ঘ্রাণ পেয়ে কিচেনে এসে দেখে ঋতু কোমড়ে শাড়ি গুজে রান্না করছে।ফর্সা গালগুলি লাল হয়ে আছে ,নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম চকচক করছে।
আসিফ পেছন থেকে কোমড় জড়িয়ে বললো,
:সরিষা ব্লেন্ড করলেই তো হয়।পাটায় বাটতে হয় কেন সবসময়?
:ব্লেন্ডার এ করা আর পাটায় বাটার মধ্যে অনেক তফাত গো।সেটা আপনি বুঝবেন না।
:আমি বুঝতেও চাইনা।আমার বৌ টা এতো কষ্ট করবে তা আমি মেনে নিবো না।
:তাই বুঝি?
:ঠিক তাই।কোথায় ছুটির দিনে একসঙ্গে সময় কাটাবে তা না কিচেনে বিজি তুমি।আমার তো আজকাল কিচেনকেও জেলাস লাগে।আমার চেয়ে বেশি তুমি একে সময় দাও।
:হাহাহা।তুমিও না পারো বটে।এতো হিংসুটে!কিচেনকেও ছাড় দিলেনা।
আসিফ ঋতুর ঘাড়ে গাঢ় করে চুমু দিয়ে বললো,
:আমি তোমায় নিয়ে খুব প্রজেজিব।তোমার এক কণা ভাগ ও কাউকে দিবোনা আমি।তুমি এ টু জেড আমার।
:হয়েছে থাক আর ঢং করতে হবেনা।।ক’দিন যাক না এইসব ভালোবাসা উবে যাবে।একটু বুড়ি হয়ে নেই না দেখবে সব আকর্ষণ শেষ।
মুহূর্তেই আসিফের মেজাজ গরম হয়ে গেল।ঋতুকে ঘুরিয়ে ওর দিকে ফিরিয়ে রেগে বললো,
:আমাকে তোমার ভ্রমর মনে হয়?মধু খেয়ে উড়ে যাবো?তুমি এই কথা বলতে পারলে কি করে!
আসিফের রাগান্বিত চোখ দেখে ঋতু কেঁপে উঠে।ইশ কি দরকার ছিল এই কথা বলার।ভয়ে ভয়ে আসিফের গালে হাত রেখে বলে,
:তোমাকে কষ্ট দিতে বলিনি।ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা করো।
: ….(নিশ্চুপ)
:এই স্যরি তো
আসিফ চলে যেতে নিলেই ঋতু পা উঁচু করে আসিফের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।পরম আবেশে আসিফ ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলে,
:তোমার কঠিন শাস্তি হবে আজ।
ঋতু লজ্জায় ওর গলা জড়িয়ে বুকে মুখ লুকায়।
______

রায়াকে দেখে সাদেক সাহেব আর রেহানা বেগম খুব অবাক হলেন।এই অফ সীজনে বলা নেই কওয়া নেই মেয়েটা বাসায় কেন?কোনো বিপদ হয় নি তো!এমনিতেই বড় মেয়ের এহেন সিদ্ধান্তে তাঁরা দুজন অনেকটা ভেঙে পড়েছেন এরমধ্যে ছোট মেয়েকে দেখে তাদের কলিজা যেন শুকিয়ে গেছে।
রেহানা গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললো,
কিরে মা হঠাৎ চলে এলি?ফোন করলেই তো তোর বাবা গিয়ে তোকে নিয়ে আসতো।রাস্তায় কোনো সমস্যা হয় নি তো?
:না।
:আহা মেয়েটা এতো পথ জার্নি করে এসেছে ওকে রেস্ট নিতে দাও পরে প্রশ্ন করো।যা মা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট কর।
:আপুনী কোথায়?
প্রশ্নটা শুনে সাদেক সাহেব চমকে উঠলেন।ঋতুর ব্যাপারে কোনো কিছু তো রায়াকে জানানো হয়নি।তবে ও এই প্রশ্ন কেন করলো?রায়া কিভাবে জানে ঋতু এখানে!
:ঋতু রুমেই আছে। (রেহানা বেগম বললেন)
রায়া এক ছুটে ঋতুর ঘরের দিকে গেল।ঋতুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।ওর জন্য আজ ওর বোনের এতো সুন্দর সংসার শেষ হয়ে গেছে ভাবতেই ওর কষ্টের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।

:আহা এতো কাঁদছিস কেন?যা হবার তা হয়েছে।তুই ঠিক আছিস এতেই আমি খুশি।ওরা তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো?
:আপুনী তুমি এতো স্বাভাবিক আছ কিভাবে?এখনও আমার কথা ভাবছো?ঐদিকে তোমার সোনার সংসার শেষ হয়ে গেল।আমি মরে গেলেও কিছু হতোনা কিন্তু আসিফ ভাইয়ের মতো স্বামী হারিয়ে ফেললে।
:তোরা দুজনেই আমার জন্য অনেক দামী রায়া।তাছাড়া ওরা কেবল তোকে কিডন্যাপ করেনি আসিফকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল।।আমার সবচেয়ে প্রিয় দুজনের জীবন বিপন্ন করার চেয়ে বিচ্ছেদই ভালো।এই বিষয়ে আর কোনো কথা না, বাবা মা শুনলে অযথা টেনশন করবে।তুই ঠিকঠাক ফিরে এসেছিস আলহামদুলিল্লাহ।

অনেকক্ষণ ধরে দরজায় নক করা সত্ত্বেও দরজা খুলছে না আসিফ।জাহানারার চিৎকার চেঁচামেচিতে আরাফাত সাহেব দৌড়ে এলেন।দরজা ভাঙতে হবে মনে হচ্ছে,
ছেলেটা কোনো অঘটন ঘটালো না তো??

(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here