বিবি,২৭,২৮

0
64

#বিবি,২৭,২৮
#রোকসানা_রাহমান
পর্ব (২৭)

নিবিড় এসেছে প্রায় ঘণ্টাখানেক হলেও কোমলের দেখা পায়নি এখনও। অধীর চিত্তে অপেক্ষায় থাকলেও এবার অধৈর্য হয়ে পড়ল। দরজার সমুখে স্থির থাকা চোখদুটো চঞ্চলিত হলো। বিছানা ছাড়ল চট করে। উৎসুক মনে বেরিয়ে এলো রুম ছেড়ে। আশপাশে সন্ধানী দৃষ্টি রাখতে রাখতে শ্বশুর- শাশুড়ির রুমে ঢু মারল। বৈঠক রুম পার হলো। সবশেষে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলো। সংকোচ নিয়ে চাপা স্বরে ডাকল,
” কোমল? ”

কোমলের বদলে শাশুড়ি বাইরে উঁকি দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
” কিছু লাগবে? ”

নিবিড় লজ্জিত হলো। অপ্রস্তুত হাসল। টেনে টেনে বলল,
” আপনার মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি না কোথাও। ”
” আমার রুমে আছে হয়তো। ”
” নেই, দেখেছি আমি। ”

রাবেয়া খাতুনের কপাল কুঁচকে এলো। একটুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
” রুমে গিয়ে বসো। আমি কোমলকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ”

নিবিড় একপাশে ঘাড় কাত করে ফিরে গেল স্ত্রীর রুমে। মিনিট পেরুতেই কোমল হাজির হলো সশরীরে। স্বামীর দিকে দৃষ্টিপাত না করেই বলল,
” খাবার বেড়েছি। ”

তার শীতল কণ্ঠে ঘাবড়ে গেল নিবিড়। বুঝে গেল, তার এই নিমন্ত্রণহীন আগমনটা মেনে নেয়নি কোমল। রাগ করেছে খুব। সেজন্যই এতটা সময় দূরে ছিল। দেখা করতে আসেনি পর্যন্ত। সে ভয়ে ভয়ে তাকাল বিছানায় ছড়িয়ে রাখা ব্যাগগুলোর দিকে। কোমলের হাতে দেওয়ার সাহস পেল না। নিজে যে খুলে দেখাবে সেই স্পর্ধাটুকুও নেই। শুষ্ক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সুধাল,
” রাগ করেছেন? ”

কোমল সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না। নিচু দৃষ্টিতেই বলল,
” হাত-মুখ ধুয়ে আসো। ”

কোমল বেরিয়ে গেলে নিবিড় গম্ভীর হয়ে বসে থাকল। মনখারাপের ভঙ্গিতে হাত-মুখ ধুতে গেল কলপাড়ে। ফিরে এসে দেখল বিছানায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাগপত্রের জায়গায় খাবার সাজানো। কোমল অন্যপাশে মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুমের এককোণে। নিবিড় নীরবে খেতে বসল। ভাতে হাত দেওয়ার পূর্বে বলল,
” একটা খাতা ও কলম দেওয়া যাবে? ”

কোমল খাতা-কলম এনে দিয়ে পূর্বের জায়গায় ফিরে গেল। নিবিড় সেই খাতায় খচখচ শব্দে কিছু একটা লিখল। ভাঁজ করে রেখে খাওয়া শুরু করল। খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে উঠার আগে সেই ভাঁজ করা কাগজটি থালায় রাখল। তারপর প্লাস্টিকের ঢাকনা দিয়ে ঢেকে বলল,
” খাওয়া শেষ। নিয়ে যান। ”

কোমলও চুপচাপ সবকিছু তুলে রান্নাঘরে চলে গেল। ধুয়ে পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখে থালায় অর্ধেক ভাতের সাথে একটি কাগজ রাখা। সেখানে লেখা, ‘ আপনি শাস্তি দেন কিন্তু কষ্ট হয় না। ব্যথা দেন কিন্তু দাগ হয় না। সেজন্যই এত অবাধ্য হয়েছি। সাহস পেয়েছি। এবার একটু কঠিন শাস্তি দিবেন। যেন দাগ হয়, কষ্ট হয়। ‘

কোমল কাগজসহ থালাটি নিয়ে রুমে ফিরে গেল। নিবিড়ের সামনে ধরে বলল,
” তুমি কি এমনই করবে সবসময়? ”

নিবিড় মাথা দু-দিকে নেড়ে বলল,
” না। ”

কোমল চেয়ে থাকলে সে পুনরায় বলল,
” বদলে যাব। সত্যি বলছি। ”
” কবে? ”
” যেদিন থেকে আপনি আমার সাথে থাকবেন। ”

হাঁপিয়ে গেছে এমন ভাবে নিশ্বাস ছাড়ল কোমল। মুখ শুকনো করে চলে যেতে নিলে নিবিড় পথরোধ করল। করুণ স্বরে বলল,
” বাবুর মাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব! ”

কোমল তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে সে আবারও সামনে এসে দাঁড়াল। বলল,
” শাস্তি দেও, তবুও এড়িয়ে যেও না। ”

কোমল সে কথা পাত্তা দিল না। আবারও পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে এগুলো। নিবিড় দৌড়ে দরজা আটকে দাঁড়াল। অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
” আমি এরকম কঠিন শাস্তি দিতে বলিনি তো। ”

কোমল পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালে নিবিড় চোখ বড় বড় করে ফেলল। বিস্ময়াভূত হয়ে বলল,
” তোমার চোখদুটো অন্যরকম লাগছে কেন? গালগুলোও। নাকটাও। ”

কোমল কপাল কুঁচকে ফেললে নিবিড় ওর কাঁধ চেপে ধরল। রুমে জ্বলে থাকা বাতিটার নিচে দাঁড় করিয়ে বলল,
” পুরো মুখটায় তো অন্যরকম লাগছে! কী করে হলো? ”

কোমল ক্ষীণ স্বরে বলল,
” জানি না। ”
” জানো। আমাকে বলবে না, তাই বলো। ”
” হ্যাঁ, বলব না। ”
” কী আশ্চর্য! বলবে না কেন? হঠাৎ করে অন্যরকম সুন্দর হয়ে গেলে স্বামীকে বলতে হয়। ”
” কে বলেছে? ”
” ড. নিবিড়। ”

কোমল না চাইতেও হেসে ফেলল। নিবিড় মুগ্ধ হলো। স্বস্থি হলো বুকের খুব কাছটা। মনে মনে বলল, ‘ আপনার রাগ করা যথার্থই। স্বামী হিসেবে যে দায়িত্বটা আমার পালন করার কথা ছিল সেটা আপনি করছেন। সংসার পাননি অথচ সেই সংসারের প্রতিটি সদস্যকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসছেন, আগলে রাখছেন। আপনার অক্লান্ত ধৈর্য দেখে আমি বার বার কৃতজ্ঞতায় অবনত হই, অনুপ্রাণিত হই আবার যন্ত্রণায় কাবুও হই। সেই যন্ত্রণা প্রকাশ করতেও লজ্জা হয়। বিনিদ্রায় যখন মুষড়ে পড়ি তখন নিজেকে সান্ত্বনা দিই এই ভেবে যে, আর কিছু না পারি আপনার স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা তো করছি। আমার নামের আগে ডক্টর শব্দটা বসানো শুধু আমার বাবার না আপনারও যে চাওয়া। আমার আজও সেই দিনটা মনে পড়ে। যেদিন কোমল নামের মেয়েটিকে আমি প্রথম দেখেছিলাম। ‘৷ নিবিড় উদাস হয়ে পড়ে। কল্পনা করতে চাই সেই দুপুরবেলাকে। যেদিন সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। বাবা-মাকে বলেছিল, কোনোদিনও বাড়ি ফিরবে না সে। তারাও এতটা দুঃখ পেয়েছিলেন যে, নিবিড়কে আটকাতে আসেনি। নীরবে শুধু কেঁদে ছিলেন। নিবিড় সারাবেলা পুরো গ্রাম চষে বেড়িয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ল ঠিক সেসময় একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে। আগাগোড়া কালো বোরকায় মোড়া। শুধু চোখদুটো দেখা যায়। সেই অপরিচিত চোখদুটোও প্রথম দেখায় চিনে ফেলেছিল সে। অবাক হয়ে চেয়ে ছিল শুধু। কোমল তার হাত ধরে টাকার কয়েকটি নোট দিয়ে বলেছিল,
” তোমার ফরম ফিলআপের টাকা। স্কুল এখনও খোলা। যাও, জমা দিয়ে আসো। ”

নিবিড় এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। নোটগুলোর দিকে নির্বাক চেয়ে থেকে বলল,
” মা আপনাকে বলে দিয়েছে? ”
” বলে বুঝি দোষ করেছে? ”

নিবিড় মাথা নত করে ফেললে কোমল বলল,
” আগে তো তোমার নামে খুব প্রশংসা শুনতাম। ইদানিং নিন্দা শুনছি। কেন বলো তো? ”

নিবিড় উত্তর দিতে পারে না। নীরবে চেয়ে থাকে মাটির দিকে। কোমল গাছের গুড়িতে বসে। নিবিড়কেও বসতে বলে। সে বাধ্য ছেলের মতোই সামান্য দূরত্ব রেখে বসল। শুকনো কণ্ঠে জানায় সে লেখাপড়া করতে চায় না। কারণটাও স্পষ্ট। বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই। তাকে নিয়ে বাবার যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এভাবে অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিয়ে স্কুল পাশ করা যায়। আর কিছু না। কোমল চুপচাপ সবটা শুনে বলেছিল,
” তুমি যদি আমার থেকে ধার নেও, তাহলে আর কাকিমা হাত পাতবে না। ”
” ধার নেব কেন? ”
” পরিশোধ করার জন্য। ”
” কিভাবে? ”

কোমল ধীরে ধীরে নিবিড়কে অনেক কিছু বুঝায়। সেই সাথে নিজের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করে। নিবিড়ের কিশোর চোখদুটো খুব সহজেই কোমলের উৎসাহিত চোখদুটোর ভাষা পড়ে ফেলে। তার সাহায্যে কেউ একজন ডাক্তার হবে, এক বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতেই পারে না। সে মানতে বাধ্য হয়, মায়ের মুখে শোনা কোমল নামের মেয়েটির মন তার নামের মতোই কোমল। আর এই কোমল মনে ব্যথা দিতে একটুও ইচ্ছে হলো না নিবিড়ের। গম্ভীর স্বরে জানাল, সে ধার নিবে এবং পরিশোধও করবে। দুজনের ইচ্ছেতেই প্রথম ধারের হিসেব লেখা হয় খাতায়। ‘ নিবিড় কল্পনা থেকে বেরিয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আনমনে বলল, ‘ সেই ধারের অংক শুধু বেড়েই চলছে! ‘ কথাটা অস্পষ্ট হলেও কোমলের কানে পৌঁছাল এবং বুঝে ফেলল। প্রশ্ন করে বসল,
” কিসের ধার? ”

নিবিড় তৎপর হলো। প্রসঙ্গ এড়িয়ে নিতে বলল,
” ধার না ভাগ, আপনার ভাগের ভাতটুকু থালাতে পড়ে আছে। খাবেন না? ”

কোমল খেতে বসে বলল,
” ব্যাগে করে কী এনেছ? দেখাবে না? ”

নিবিড়ের আনন্দ ফিরে এলো। প্রবল আগ্রহের সাথে বলল,
” দেখাবই তো। কোথায় রেখেছ? ”
” ঐ তো টেবিলের উপর। ”

নিবিড় একছুটে ব্যাগগুলো নিয়ে আসল। উল্টো করে ভেতরের সব জিনিস বের করে পুরো বিছানা ভরে ফেলল। কোমল অবাক হয়ে দেখল, বাচ্চাদের খেলনা, জামা, জুতোসহ নানান জিনিসে ভরপুর। সে খাওয়া বন্ধ করে বলল,
” এমন পাগলও কেউ হয়? আমার প্রেগন্যান্সির বয়স মাত্র দশ সপ্তাহ! এরমধ্যেই পুরো দোকান তুলে আনা শেষ? ”

নিবিড় অভিযোগের সুরে বলল,
” মা আর শাশুড়ি মিলে শখানেক কাঁথা সেলাই করতে পারে, শ্বশুরমশাই পুরো গ্রামে মিষ্টি বিলাতে পারে আর আমি একটা জিনিস আনলেই দোষ? বউকে ভালোবাসলে দোষ, বউয়ের বাবুকে ভালোবাসলেও দোষ। তাহলে ভালোটা বাসব কাকে? তুমি বলে দেও। ”

কোমলের মুখ হাঁ হয়ে গেল। নিবিড় থালা থেকে একদলা ভাত দিয়ে সেই হাঁ বন্ধ করে বলল,
” বউয়ের বাবু যতদিন না পৃথিবীতে আসছে ততদিন বাবুর আব্বুর উপর মায়া করা হোক। নিমন্ত্রণ সময় মাসিক থেকে সাপ্তাহিক করা হোক। ”

চলবে

#বিবি
#রোকসানা_রাহমান
পর্ব (২৮)

” বউয়ের বাবু যতদিন না পৃথিবীতে আসছে ততদিন বাবুর আব্বুর উপর মায়া করা হোক। নিমন্ত্রণ সময় মাসিক থেকে সাপ্তাহিক করা হোক। ”
” না করলে কী হবে? ”
” কোমলের স্বামীর কাছে নালিশ যাবে। ”

কোমল আগ্রহ নিয়ে সুধাল,
” তারপর কী হবে? ”
” শাস্তি দিবে। ”
” কী শাস্তি? ”
” দৈনিক নিমন্ত্রণপত্র লেখা। ”
” তাই নাকি? ”
” জি। আর সেই শাস্তি গ্রহণ করতে সে বাধ্য। কারণ, কোমল আমার বেলায় কঠিন হলেও স্বামীর বেলায় তুলোর মতো নরম। ”

কোমল হেসে ফেলে। খাওয়া শেষ করে হাত ধোয়। প্লেট তুলতে গেলে নিবিড় বলল,
” আমি রেখে আসছি, তুমি বসো। ”

কোমল চটপটে বলল,
” কী আশ্চর্য! তুমি নিবে কেন? ”
” আপনার স্বামী তাই। ”

নিবিড় দুষ্টু হেসে এঁটো প্লেট তুলে নিল একহাতে। অন্যহাতে পানির গ্লাস। দরজার দিকে হেঁটে যেতে নিলে কোমল পিছ ধরে ব্যস্তস্বরে বলল,
” ছি! ছি! কী করছ এসব? আমার কাছে দেও। ”

নিবিড় কপট শক্ত স্বরে বলল,
” এমন ছুটছ কেন? সাবধানে হাঁটো। ”

কোমল থতমত খেল। পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিবিড় তার দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
” প্রেগন্যান্সির প্রথন তিন মাস খুব সাবধানে চলা-ফেরা করতে হবে। কারণ, এই সময়টায় মিসক্যারেজের ভয় থাকে বেশি। ”

কোমল ধীরে বলল,
” সামান্য প্লেট সরানোতেও সাবধানতা লাগবে? আমি যতটুকু জানি ভারী কাজকর্ম করা যায় না। সে তো মা আমাকে করতেও দেয় না। একদম শুয়ে-বসে থাকার চেয়ে ছোটো-খাটো কাজ করা ভালো। ”

নিবিড়ের বিজ্ঞ ভাব ছুটে গেল। মনে পড়ল, তার স্ত্রী যথেষ্ট বুদ্ধিমান, জ্ঞানী। অবসরের পুরো সময়টায় বইয়ে ব্যয় করে। আর যে মেয়ের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সে মেয়ে ডাক্তার হতে না পারলেও ডাক্তারি বিষয়ে টুকটাক জ্ঞান তো নিশ্চয় নিয়েছে। নিজের দেওয়া উপদেশের সম্মান ধরে রাখতে বলল,
” সবসময় সাবধান থাকা ভালো। তাছাড়া ছোট-খাটো কাজও সারাক্ষণ করা যাবে না। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে হবে। ”
” সারাক্ষণ করলাম কখন? ”
” একটু আগে আমার এঁটো প্লেট সরাওনি তুমি? ”

কোমল মাথা উপর-নিচ করে ইতিবাচক উত্তর দিলে নিবিড় বলল,
” সে হিসেবে তো এখন তোমার বিশ্রাম নেওয়া দরকার। আবার কাজ করতে চাচ্ছ কেন? ”

কোমল চোখ বড় বড় করে ফেললে নিবিড় পুনরায় বলল,
” যাও, বিশ্রাম করো। ”

কোমল নাছোড়বান্দা। নিবিড়ের হাত থেকে প্লেট কেড়ে নিতে চাইলে সরিয়ে বলল,
” তোমার যদি এতই কাজ করতে মন চাচ্ছে তাহলে অন্য কাজ করো। ”
” কী কাজ? ”
” একটা মোটা খাতা আর কয়েকটা কলম খুঁজে বের করো। ”
” এগুলো দিয়ে কী হবে? ”
” এসে বলছি। ”

নিবিড় তড়িঘড়িতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে ঢুকতেই রাবেয়া খাতুন শশব্যস্তে প্লেট আর গ্লাস নিজের হাতে নিলেন। লজ্জায় গলে গিয়ে বললেন,
” এগুলো তুমি আনতে গেলে কেন? আমাকে ডাকলেই পারতে! ”

নিবিড় শাশুড়ির লজ্জাকে পাত্তা দিল না। মিনিট কয়েক রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে গল্প করল। কোমলের খাওয়া-দাওয়ার মেন্যু ও সময়ের একটি পূর্ণাঙ্গ রুটিন মুখস্থ করিয়ে তবেই বেরুল। পেছন ফিরলে দেখতে পেত শাশুড়ির দৃষ্টি কতটা মুগ্ধতায় ডুবে আছে। দৈব্যকর্ণ থাকলে শুনতে পেত, ‘ এমন সুখের সুতোয় দুটিতে বাঁধা থাকিস সবসময়। ‘

কোমল সত্যি সত্যি খাতা আর কলম নিয়ে বসে ছিল। নিবিড় পকেট থেকে কিছু ট্যাবলেট বের করে রাখল তার সামনে। খাতা- কলম হাতে নিয়ে বলল,
” আজ থেকে আপনি আমার পেশেন্ট। আর আমি আপনার ডাক্তার। ”

কোমলের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলে নিবিড় বলল,
” ডাক্তারের প্রথম রোগী তার স্ত্রী, কী সৌভাগ্য দেখেছেন? ”

সৌভাগ্য দেখায় খুব একটা আগ্রহ দেখা গেল না কোমলের মধ্যে। নিবিড়ের থেকে কলম কেড়ে নিয়ে বলল,
” রোগীর নাম কোমল। বিবি না। ”

বলতে বলতে খাতার উপরে বড় করে লেখাটা কেটে দিল। নিবিড় বাঁধা দিতে গিয়ে থেমে গেল। উৎসাহের সাথে বলল,
” সম্পর্কটা যদি পুরোপুরি রোগী আর ডাক্তারই হয়ে যায় তাহলে কোনো ছাড় হবে না। যা যা লিখে দিব সব মানতে হবে। ”
” এতে যদি ডাক্তার খুশি হয় তাহলে ছাড়ের আবেদন পড়বে না কখনও। ”

_________
আমের মৌসুমে বিকেলের নাস্তায় আম খেতে পছন্দ করেন আনিস মোল্লা। কেটে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে কোমল। সেই দায়িত্ব পালনেই আমের টুকরো দিয়ে মাঝারি আকারের বাটি সাজাল সে। বাবার সামনে নিয়ে যেতেই তিনি বললেন,
” বসো এখানে। ”

কোমল মৃদু হেসে পাশে বসলে এক টুকরো আম মুখে তুলে দিলেন পরম আদরে। রস জিহ্বায় পড়তে মুখ কুঁচকে ফেলল। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
” এত টক কেন! এটা আমাদের বাগের আম না? ”

মা উত্তর দিলেন,
” না। বাজার থেকে আনিয়েছি। ”
” কেন? আমাদের আম পাকেনি? ”

রাবেয়া খাতুনের মুখে মেঘ জমল। স্বামীর দিকে চেয়ে বললেন,
” পেকেছে। ”
” তাহলে বাজার থেকে এনেছ কেন? তুমি জানো না, বাবা শুধু আমাদের গাছের আম খায়? ”

রাবেয়া খাতুন চুপ হয়ে গেলেন। কোমল আমের বাটি সরিয়ে নিতে নিতে বলল,
” বাবা, একটু অপেক্ষা করো। আমি মতিন কাকাকে দিয়ে বাগ থেকে আম আনাচ্ছি। ”

কোমল রুম থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে রাবেয়া খাতুন দ্রুত বললেন,
” বাগানে আম নেই। ”

কোমল পেছন ফিরল। সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল,
” কেন? ”
” যার বাগান সে পেড়ে নিয়েছে। ”
” বাগান তো আমাদেরই। ”
” না, তোর বাবা বেচে দিয়েছে। ”

কথাটা বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন দ্রুতপদে। কোমল সপ্রশ্নে বাবার দিকে চেয়ে থাকলে তিনি আমতা আমতা শুরু করে দিলেন। জবাবদিহির মতো করে বললেন,
” নিবিড়দের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে অনেক টাকা দাবি করেছিল চেয়ারম্যান। ঐ সময়টায় এত টাকা হাতে ছিল না আমার। জমি বেচার জন্যও সময়ের প্রয়োজন ছিল। সেই সুযোগে চেয়ারম্যান বাগান লিখে দিতে বলে। ”
” আর তুমি দিয়ে দিলে? ”
” আর কোনো পথ ছিল না। ”

কোমল টলমল চোখে বাবার পাশে বসল। একহাত চেপে বলল,
” আমাকে ক্ষমা করে দিও, বাবা। ”

আনিস মোল্লা মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। কপালে চুমু খেলেন। কোমল ফুপিয়ে উঠলে তিনি প্রসঙ্গ বদলে ফেলতে বললেন,
” নিবিড় কি আজ চলে যাবে? ”
” হ্যাঁ, কেন? ”
” কাল থাকলে ভালো হতো। বাসায় মেহমান আসবে। ”

কোমল চোখ মুছে বলল,
” আবার কাকে দাওয়াত দিয়ে এসেছ? ”

আনিস মোল্লা জবাব দিলেন না। বিশাল বড় অন্যায় করে ধরা পড়েছেন এমন মুখ করে বসে থাকলেন। কোমল বাবার পাশ থেকে উঠে বলল,
” এভাবে রোজ রোজ দাওয়াত না দিয়ে পুরো গ্রামবাসীকে আমাদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেও। তাহলে তিনবেলায় তোমার মেয়েকে দোয়া দিতে পারবে। তোমার নাতি-নাতনির মুখ না দেখা পর্যন্ত তাদের ছুটি নেই। ”

আনিস মোল্লা লজ্জায় মুখ অন্যদিকে সরিয়ে নিলে কোমল বলল,
” মাকে খুব খাটাচ্ছ! ”
__________
বাবাকে খুশি করতে নিবিড়কে ঢাকা যেতে দিল না কোমল। পরদিন দুপুরে মেহমানের সাথে খাওয়া-দাওয়া করল। মেহমানদের মধ্যে মহিলা দুজন কোমলের রুমে এসে মাথায় হাত রাখলে সে আবদারের ভঙ্গিতে বলল,
” আমার স্বামীর জন্য একটু বেশি বেশি দোয়া করবেন। ”

কথাটা বলে সে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। পাশে না তাকিয়েও শাশুড়ির মিটমিটি হাসি টের পেল। মেহমানরা চলে যেতেই কুলসুম দুটো রঙিন কাঁথা কোমলের হাতে দিয়ে বললেন,
” বউ, দেখ তো নকশা পছন্দ হয় নাকি? এগুলা গায়ে দিবা বুঝছ? নিচে বিছানোর লাইগা পাতলা কইরা বানাইছি কতগুলা। প্রথমদিকে তো মুতব বেশি। ধুইতে কষ্ট হইব, শুকাইতেও দেরি হইব। ”

কোমল কাঁথাদুটো সযত্নে হাতে নিয়ে বলল,
” খুব সুন্দর হয়েছে, আম্মা। এখানে রাখলে ময়লা হবে, আলমারিতে তুলে রাখি। ”

কোমল উঠতে নিলে কুলসুম নাহার বাঁধা দিলেন। কাঁথা দুটো নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
” আমি রাখতাছি, তুমি এত নড়াচড়া কইরো না। শরীর ভার হয়ছে অনেক। পা ফসকাইলে সর্বনাশ! ”

কাঁথা আলমারিতে রাখতে রাখতে বললেন,
” এহন থেইকা বাথরুমে যাওয়ার সময় আমারে কইবা। আমি তোমার লগে যামু। ”

______________

কোমলের প্রেগন্যান্সির বয়স প্রায় আটাশ সপ্তাহ। তলপেট ভার হয়ে এলে ঘুম ভেঙে যায়। শাশুড়িকে মৃদুস্বরে ডেকে জানায় বাইরে যাবে। কুলসুম নাহার বুঝতে পেরে লাফিয়ে ওঠেন। বউমা যতক্ষণ না শোচাগার থেকে বের হলো ততক্ষণ নিকটেই অপেক্ষা করলেন।

বেশ কয়েক মিনিট অতিবাহিত হলে কোমল বেরিয়ে আসে। কুলসুম নাহার দূর থেকে লক্ষ করলেন ছেলের বউয়ের মুখ শুকনো, চিন্তিত। তিনি শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
” কী হইছে? তোমারে এমন দেহায় ক্যান? ”

কোমল মাথা দু’পাশে নেড়ে কিছু না বুঝালেও ভেতরে ভেতরে ভয় জমিয়ে ফেলল। মূত্রত্যাগের সময় লাল রঙের কিছু দেখেছে বোধ হলো। কিন্তু এসময় তো মাসিক হওয়ার কথা নয়। কোথাও ব্যথা পেয়েছে এমনও না। তাহলে এই রক্ত নির্গমনের কারণ কী? কোমলের দুশ্চিন্তা হলো। ঘুমাতে ঘুমাতে ঠিক করল, নিবিড় আসলেই প্রথমে এ ব্যাপারটি জানাবে।

______________
” মা বলল, আমাদের মেয়ে হবে। ”

কোমল হালকা হেসে বলল,
” তাই নাকি? ”
” হ্যাঁ, কিন্তু আমি জানি ছেলে হবে। ”
” কী করে জানলে? আল্ট্রার রিপোর্টে এসেছিল? ”
” না। ”
” তাহলে? ”

নিবিড় কোমলের কোলে মাথা রেখে বলল,
” আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আপনার স্বামী ভাবী ডাক্তার। ”

কোমল চুলে হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলল,
” তাই তো! আমি একদম ভুলে গেছিলাম। ”

নিবিড় অভিমানের ভান ধরে বলল,
” এটা ভুলে যাওয়ার মতো বিষয়? ”

কোমল হেসে ফেলল। সেই হাসিতে নিবিড়ের অভিমান বাষ্পাকারে উড়ে গেল। ভীষণ উৎসাহে বলল,
” মেয়ে হোক অথবা ছেলে। বড় হয়ে কিন্তু ডাক্তারই হবে। তারপর আরেকটা ডাক্তার পরিবারে তার বিয়ের সম্বন্ধ করব। ”
” কেন? ”

নিবিড় সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না। কোমলের স্নিগ্ধ মায়াভরা মুখটায় চেয়ে মনে মনে বলল, ‘ যাতে আপনার স্বপ্ন ভাঙার ব্যথাটা চিরতরে বিদায় হয়ে যায়। ‘

” কী হলো বলছ না যে? ”

নিবিড়ের পলক পড়ে। জিজ্ঞেস করল,
” কী বলব? ”
” ডাক্তার পরিবারে সম্বন্ধ করবে কেন? ”
” কথা বলে বলে রাত শেষ করে ফেলব নাকি? পরে তো মুখে খাবার ঠেলে দিয়ে বলবেন, তাড়াতাড়ি ঢাকার বাস ধরো। ”

কোমল আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। স্বামীর গভীর ভালোবাসায় গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলতে ভুলে গেল।

_______________
একত্রিশ সপ্তাহে পেটে হালকা ব্যথা শুরু হলেও বত্রিশ সপ্তাহে তীব্র রূপ নিল। আনিস মোল্লা ডাক্তার ডাকতে হাসপাতালে ছুটলেন। কুলসুম নাহার ও রাবেয়া খাতুন কোমলের পাশে বসে আছে হাত ধরে। বিপদ আসঙ্কায় দুজনের মুখ রক্তশূন্য। কুলসুম নাহার বলেই ফেললেন,
” এহন তো প্রসবের সময় না। তাইলে ব্যথা হইতাছে ক্যান? নিবিড় রে খবর দিছেন? ”
” হ্যাঁ। ”
” এহনও আইতাছে না ক্যান? ”
” একটু সময় তো লাগবে এতদূর থেকে আসবে! ”

কুলসুম নাহারকে শান্ত করতে গিয়ে রাবেয়া খাতুন অশান্ত হয়ে পড়ছেন দ্বিগুন। কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে যেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদেই ফেললেন। চিৎকার করে বললেন,
” মতিন? দেখ তো কোমলের বাবা আসল নাকি? ”

তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
” ভয় পাস না, মা। ডাক্তার এলেই ব্যথা চলে যাবে। ”

আনিস মোল্লার আগে নিবিড় পৌঁছাল বাড়িতে। স্ত্রীর মুখ দেখেই বললেন,
” এখনও হাসপাতালে নেননি? বাবা কোথায়? ”

রাবেয়া খাতুন উত্তরে কী বললেন কানে গেল না নিবিড়ের। সে কোমলকে কোলে তুলে নিল।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here