তাসের_ঘরে_তুমি_আমি #পর্ব_০২,০৩

0
71

#তাসের_ঘরে_তুমি_আমি
#পর্ব_০২,০৩
#আয়াশ_রহমান
০২

নিজের স্ত্রীর শরীরে কেমন যেন পরপুরুষ এর ঘ্রাণ পাচ্ছে শান। এ বিষাক্ত অনুভূতির চেয়ে মৃত্যূও শ্রেয়।

কিছুসময় আগে শানকে দেখে পুতুল এগিয়ে আসলে শান তাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু তার কেন যেন মনে হচ্ছে এ সেই আগের পুতুল নয়। কেমন পাল্টে গেছে৷

‘পুতুল।’
‘শান তুমি কখন এলে? আর তোমার চোখে চশমা হাতে লাঠি! তার মানে কি?’
পুতুলকে ছেড়ে দিয়ে কেমন দুঃখী ভাব নিয়ে বলল, ‘বলেছিলাম না পুতুল, ওরা পারলো না, পারলো না আমাকে ঠিক করতে।’
‘মানে!!!’

আমি বোধহয় আর পারবই না দেখতে।’

শান চশমার আড়ালেই খেয়াল করলো কথাটি শুনে পুতুলের চোখে মুখে কষ্টের বদলে কেমন নিশ্চিন্ত হওয়ার আভাস। পদে পদে যেন নতুন কিছুর সম্মুখীন হচ্ছে সে। এই কি সেই পুতুল? তার পুতুল? যাকে শান জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত?

হঠাৎ দরজা খুলে গেলো। শানের মা বাবা যেন কোথায় যাচ্ছিল। হাতে কাথার ব্যাগ দেখে বুঝলো মা বাবা হয়ত এগুলোর সাপ্লাই দিতেই যাচ্ছিল। শানকে দেখেই হাতের ব্যাগগুলো পড়ে গেল তাদের।
ছেলেকে এতদিন পর কাছে দেখতে পেয়ে কেদেই দিল তার মা। শানের বাবাও ছেলেকে দেখে খুব খুশি কিন্তু শানের চোখে চশমা দেখে অবাক হল সবাই। তার মানে সে কি সুস্থ হয়নি? এত সময় তো শানকে কিছু বলতে না দিয়েই তাকে দেখা মাত্রই জড়িয়ে ধরে কাদছিলো তার মা।

‘বাবা তোর চোখে চশমা, হাতে লাঠি?’
শান মাথা নিচু করে বলল, ‘মা-বাবা, আমাকে সুস্থ করতে পারেনি তারা, বলেছে তিনমাস পরে আবার আসতে, তখন আরেকটা অপারেশনের পর আশানুরূপ ফলাফল আসতে পারে। ওখানে থাকার আর টাকা ছিল না তাই আমি চলে এসেছি।’

শানের মা ছেলেকে জড়িয়ে আরো জোড়ে কাদছে। শান তার মাকে জড়িয়ে স্বান্তনা দিচ্ছে। সে চাইলেও পারছে না তার মার চোখের জল মুছে বলতে যে মা আমি ভাল হয়ে গেছি। এই দেখো, তোমাকে বাবাকে দেখতে পাই। কিন্তু শান অপারগ তার যে অনেক কিছু জানার আছে। যে পুতুল কোনো পরপুরুষ এর দিকে তাকাতো না পর্যন্ত আজ সে পুতুলের হাত স্পর্শ করে এক বাইরের পুরুষ ওষ্ঠের ছোয়া দিয়ে গেছে, তারই সামনে।
এর কারণ শানকে বের করতেই হবে।

সেই চিরচেনা পুতুলকে আজ যেন কেমন অচেনা লাগছে শানের কাছে। ঘরে এসেছে প্রায় এক ঘন্টা মত আগে, শানকে বিছানায় বসিয়ে পুতুল নিজে ফ্রেশ হতে গেছে এখনো বেরোয়নি। কিন্তু একসময় শান অফিস শেষে বাসায় আসলে তার কাছেই ঘুরঘুর করতো পুতুল। আর আজ এতদিন পর এসেও পুতুলের এমন অনিহা। চোখের কোটর থেকে এক বিন্দু অবহেলা বেরিয়ে আসলো যেন। ওইভাবেই মুছে নিল শান। কিন্তু সে মনে মনে ভাবছে,
‘আমাকে খুব সতর্ক থাকতে হবে, নাহলে সব আমি কোনোভাবেই জানতে পারবো না। খুব ভালোভাবে আমার এই মিছে অন্ধত্বকে কাজে লাগিয়ে সত্য সামনে আনতে হবে। কেন আমার পুতুল এমন করছে? কেনো?’

এসব মনের মাঝেই বলতে বলতে পুতুল বের হয়ে
আসলো। তাকে এক পলক দেখে শান মাথা নিচু করলো। আগের অনুভুতি চেয়েও সে বাইরে আনতে পারছে না। পারছে না এই পুতুলকে ভালবেসে বুকে টেনে নিতে।

‘চলো তোমাকে ওয়াশরুমে দিয়ে আসি। ফ্রেশ হও, তারপর একসাথে খাই।’
‘না আমি যেতে পারব।’
‘মানে?’
‘আসলে একয়দিন তো একাই ছিলাম, সব কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আরো সেটা তো অচেনা জায়গা ছিল আর এটা আমার চিরচেনা ঘর। আমি নিজেই পারব।’
‘অহ আচ্ছা।’ বলে পুতুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়াচ্ছে। অন্য সময় হলে হয়ত শান পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতো তাকে। কিন্তু সেদিকে একবার দৃষ্টি দিয়েই লাঠি হাতাতে হাতাতে ওয়াশরুম যেতে ধরল শান।

খেতে বসেছে সবাই৷ শানের বাবা প্রশ্ন করলো,
‘বাবা সব জমি জমা বিক্রি করেই তো তোকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আবার কিভাবে যাবি?’
‘কেন বউমা তো চাকুরি করে টাকা জমাচ্ছিল? সেই টাকা তো আমরা আগের বার নেইনি, আরো তিনমাস আছে সময়, একয়দিনে আরো জমবে, সবমিলে এবারের খরচ তো হয়ে যাওয়ারই কথা তাইনা মা?’

শানের মার কথা শুনে পুতুলের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। পরে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
‘আ আসলে মা, আমার তো এখনো অভারটাইমের টাকা পাইনি, কি করবো বল, বেসরকারি এনজিও তো, এই কয়দিনে পেলেই তো কিছু একটা দেয়া যাবে।’
‘সে কি বউমা! অভারটাইম ছাড়াও তো তোমার বেতনের যথেষ্ট টাকা থাকার কথা, কারন আমার কাথা সেলাই করে যেটাকা হয় সেটা দিয়েই তো আমি পরিবার চালাই, তুমি আর কয় টাকাই দাও?’
‘মা আপনি বলতে চাচ্ছেন আমি সংসারে টাকা দেই না?’
”দেখো বউমা,,,,’

‘আচ্ছা মা থামো তোমরা, পুতুলের সমস্যা থাকতেই পারে চাকুরীতে। বেসরকারি জব তো। আমি তো আগেই বলেছিলাম আমার আর সুস্থ হওয়ার আশা নেই, মাঝখান থেকে তোমার মায়ের জমিটুকু বিক্রি করা লাগলো এমনি এমনি।’

‘কি বলছিস এসব বাবা?’
‘মা বাদ দাও, খাইয়ে দাও না, কতদিন তোমার হাতে খাইনি আমি।’
শানের কথায় তার মার চোখে পানি চলে আসলো৷ সে তরি হরি করে উঠে শানের পাশে গেলো শানকে খাইয়ে দিতে।
‘আজ শুধু মা কেনো? আমার ছেলেকে আমিও খাইয়ে দিব।’ বলে শানের বাবাও নিজের প্লেট নিয়ে শানের পাশে গেল।

খুব যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছে শানকে তার বাবা মা। শান মাঝে মাঝে আড়চোখে খুব সতর্ক ভাবে পুতুলের কার্যকলাপ লক্ষ করছে। মন দিয়ে খেয়ে যাচ্ছে পুতুল, আশেপাশের কোনো চিন্তা নেই মনে হয় তার। আগের দিন হলে হয়ত পুতুল শানের বাবা মার কাছে নালিশ দিত যে আপনাদের ছেলেকেই খাওয়াবেন! মেয়ে কি দোষ করলো?
কিন্তু আগের পুতুল আর এখন সামনে বসে থাকা মানুষ কি আদৌ এক আছে? ভেবেই শান তাচ্ছিল্য হাসলো।

পুতুল নিজের খাওয়া শেষ করে রুমে চলে গেল কাউকে কিছু না বলে। ‘দেখেছিস বাবা,বৌমার আচরণ? আগে তো বৌমা আমার সাথে ছাড়া খেতই না, আর আমার মুখে মুখে কথা বলছে এখন! তুই ছিলি না, তোর বাবার ঔষধ শেষ হয়ে গেছিলো, পুতুলকে বলায় সে যে কিরকম ব্যবহার করেছে আমাদের সাথে কি বলব তোকে। যে তারপর থেকে আমি বেশি করে কাথা সেলাই করি যেন এই বুড়ো বুড়ির কারো কাছে আর হাত পাতা না লাগে কিন্তু বাবা বৌমা,,,,’

শান আগেই মাকে চিন্তিত করতে চায় না। সে মাকে বুঝ দিল, ‘মা চিন্তা করো না, হয়ত অফিসে কাজের চাপ বেশি তাই এমন করছে। দেখো ঠিক হয়ে যাবে দুইদিন পরে।’

লাঠি মেঝেতে ঠেকাতে ঠেকাতে নিজের ঘরে গেলো শান। পুতুল বিছানায় বসে মোবাইল টিপছিল। শানকে দেখা মাত্র মোবাইল রাখতে গেল কিন্তু কি মনে করে যেন মুচকি হেসে আবার মোবাইল চালানো শুরু করলো।

শান সেটা দেখে মুচকি হাসলো,’ হয়ত ভাবছে এ তো অন্ধ দেখবে কিভাবে?’

শান বেডে গিয়ে বসল, পুতুলের হাতের মোবাইলের দিকে তাকানোর চেষ্টা করেও তেমন কিছু দেখতে পারলো না। বেশি দেখিতে গেলে পুতুলের কাছে ধরাও খেয়ে যেতে পারে। তাই পুতুলকে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
‘পুতুল?’
– – –
‘পুতুল??’
‘কি হয়েছে?’ বিরক্তির সাথে বলল পুতুল।
‘চলো আজ দুজন বেলকনিতে বসে গল্প করি।’
‘দেখ আমি ভীষন ক্লান্ত। কালকে আবার সারাদিন অফিস আছে। আমি ঘুমাব।’
‘অহ আচ্ছা। ঘুমাও লাইটটা নিভিয়ে দাও।’ বলে শান পাশ ফিয়ে বিছানায় মাথা দিয়ে ভাবতে লাগলো আগের দিনের কথা।
——
‘এই বউ কি হয়েছে? কথা বল না কেনো?’
– – – –
‘রাগ করেই থাকবা?’
‘নাহ আমি আবার রাগ করার কে?’
‘কি হয়েছে বলো!’
‘তুমি এখনো বুঝতে পারছোনা কি হয়েছে?’
‘বুঝলে কি বলতাম?’
‘থাক আর বুঝা লাগতো না আপনার।’
‘আবার রাগ করলে?’
‘আমার কথার কি কোন দাম আছে তোমার কাছে?’
‘তোমার দাম না থাকলে কার দাম থাকবে বলো তো?’
‘আমি যে বললাম চল আজ দুজনে একটু আকাশ দেখি, তুমি কি বললে? কাজ আছে তোমার কালকে রেস্ট নিতে হবে, তো এখন আবার আমাকে বলছো কেনো?’
‘হাহাহা তো এই ব্যাপার!!’ বলেই পুতুলকে কোলে তুলে বেলকনির দিকে এগুলো শান। পুতুলও রাগ অভিমান ভুলে শানের কাধ জড়িয়ে গালে একটা অধরের স্পর্শ দিয়ে দিল শানকে।
——-

আগের স্মৃতিগুলোর কথা ভেবে মুহুর্তেই চোখ ভিজে গেলো শানের। পাশে ফিরে দেখলো পুতুল লাইট বব্ধ করে এখনো চ্যাট করেই যাচ্ছে।
‘পুতুল ঘুমিয়েছো?’ পুতুলের দিকে তাকিয়ে বলল শান কথাটি।

পুতুল শানের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে একটু পর বলল,’ আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি কখন থেকে একটু চুপ করে ঘুমাতে দাও প্লিজ। কাল অনেক কাজ আছে।’
‘আচ্ছা ঘুমাও।’ বলে শান মুচকি হাসল আর পুতুল মোবাইলে চ্যাট করেই যাচ্ছে।
‘আজকাল এত বড় মিথ্যা বলতেও একবার বাধে না পুতুল!!’ মনে মনে বলল শান, দৃষ্টি এখনো পুতুলের দিকেই।
নিকনেমে কয়েকটা ফুলের স্টিকার দেয়া জন্য আইডির মালিকের নাম পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে না। শান কিছু একটা ভেবে শুয়ে পড়লো।

পুতুলকে হাত পা বেধে ফেলে রাখা হয়েছে একটা কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে। পুতুল হাত মুখ বাধা অবস্থায়ই শান শান বলে চিৎকার করছে আর বলছে,
‘আমাকে বাচাও আমাকে নিয়ে যাও তুমি শান, শান।।।।।’

ধড়ফড়িয়ে উঠল শান, কি বাজে স্বপ্ন দেখলো সে!! পাশে তাকালো, পুতুল এখনো ঘুম। ভোরের আকাশে হালকা আলোর আভা দেখা দিয়েছে মাত্র৷

খুব সন্তর্পণে পুতুলের পাশে গিয়ে মোবাইল হাতে নিল শান। পাসওয়ার্ড দেয়া। শান নিজেই বসিয়েছিলো পুতুলের মোবাইলের পাসওয়ার্ড। নিজের নাম লিখলো সে, হলোনা, অবাক হল শান। পুতুল আর তার নাম একসাথে লিখলো তাও হচ্ছিল না। পুনরায় আবার তাদের বিয়ের ডেট লিখলো, এবারও ফলাফল শূন্য। প্রচন্ড রাগ হল শানের।তখনই পুতুল আড়মোড়া ছাড়ল। শান তড়িঘড়ি করে মোবাইল পুতুলের পাশে রেখে ক্রোধিত মনে বাথ্রুমে ফ্রেশ হতে গেলো।

সকালে ড্রয়িংরুমে বসে আছে শান, পুতুল আফিসে যাবে তাই শাড়ি আর বোরকা আয়রণ করছে ড্রয়িংরুমের টেবিলে আর পাশের সোফায় তার বাবা বসে কাথার কাপড় দেখছে। রান্না ঘরে মা রান্না করছিলো৷ শানের বাবার সাথে কথা বলতে এসেছে সে কাথার কাপড়ের বিষয়ে। হঠাৎ শানের রান্না ঘরের দিকে নজর গেলে দেখতে পেলো দুধ উপরে পড়ছে চুলা থেকে।

সে আনমনে বলে ফেললো, ‘মা রান্নাঘরে যাও তোমার দুধ তো পুড়ে গেলো।’

সবাই শানের দিকে অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো। পুতুলের চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। শানের মা বাবারও একি অবস্থা।।
শান ভালোই বুঝতে পারছে সে কি ভুল করে ফেললো অজান্তে।

চলবে,

#তাসের_ঘরে_তুমি_আমি
#পর্ব_০৩
#আয়াশ_রহমান

‘কি বললি?’
‘ক কই কি বললাম মা?’
‘দুধ পুড়ে যাচ্ছে তুই দেখলি কিভাবে?’
শান মুচকি হেসে উত্তর দিল। মা যাদের দৃষ্টিশক্তি নেই তাদের কিন্তু অন্য পাচটি ইন্দ্রিয়ের উপরই নির্ভরশীল হতে হয়। দুধ পোড়ার সেন্টেই তো বুঝা যাচ্ছে।’

শানের কথায় সবাই স্বাভাবিক হল। পুতুল মনে হল অনেক বড় ভীতি তে রক্ষা পেলো।

পুতুল অফিসে গেলেই পিছনে শান লাঠি হাতে চশমা পড়ে রওয়ানা দিল।
পেছন থেকে বাবা ডাক দিল,’কই যাচ্ছিস বাবা?’
‘এইতো সামনেই একটু বাইরে গিয়ে কোথাও বসি।বাসায় ভালো লাগছে না।’
‘ওহ। আমিও সাথে আসব?’
‘ না বাবা একাই পারব, বেশিদূর যাব না।’

তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়ল শান। পুতুল অনেক দূরে চলে গিয়েছে হাটতে হাটতে। সামনে মোড় পাবে বলে। শান আরেকটু দূরে তাকিয়ে দেখলো একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, পুতুল গাড়ির সামনে গেলেই তার দরজা খুলে গেল। শান সেটা দেখে দৌড় দিল, লাঠি হাতে নিয়েই। কিন্তু কারো সাথে জোড়ে ধাক্কা খেলো। দুজনেই রাস্তায় পড়ে গেলো।

‘এই চোখে দেখেন না নাকি?’
শান তাকিয়ে দেখলো বোরকা পড়া একটা মেয়ে, হাতে বাজারের ব্যাগ ছিল। কিন্তু সাথে থাকা ডিমগুলো রাস্তায় পড়ে থেতলে গিয়েছে।
‘চোখে দেখতে পান না নাকি? আমার সব বাজার! আমার ডিমগুলো!! মামী আজ আমাকে কি করবে?’ বলতে বলতে উঠে শানকে দেখে চমকে গেলো মেয়েটি।
‘আপনি তো সত্যি মনে হয় দেখতে পান না, হাতে লাঠি, চোখে চশমা।’
শান মেয়েটিকে দেখছে, বয়স হয়ত খুব বেশি না ১৮ বা ১৯ হবে, টানা টানা চোখ দুইটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মুখে মুখে কথা বলে।
‘তাহলে দৌড়েছেন কেনো?’ তারপর পিছনে কুকুর দেখে আবার একাই বলল,’কুকুর দেখে ভয় পেয়েছেন?’
শান শুনছে শুধু। পুতুলের গাড়ি চলে গেছে। কিন্তু শান দৌড়ের সময়ই নম্বরটা নিয়ে নিয়েছে।
‘আমি পাশের বাসায় আজ দুইমাস মামা মামীর সাথে ভাড়া এসেছি, আপনাকে তো দেখিনি এই এলাকায়! কে আপনি?’
মেয়েটির ডাকে দৃষ্টি ফিরল শানের।
‘আপনি কি বোবাও নাকি?’
শান অবাক হয়ে গেল। কি বলে মেয়েটা, ঠিক তখনই শানদের পাশের বাসার দুইতলা থেকে ডাক এলো।
‘মিথু এই মিথু জলদি আয়, ওখানে দাড়িয়ে কি করিস?’
‘হ্যা হ্যা মামী, আসছি। হায়রে আমার ডিম, এখন মামী আজ আবার আমাকে মারবে।’ কেদেই ফেললো বলতে বলতে বেচারি।
‘আজ আপনার জন্য আমার ভাগ্যে যে কি আছে আল্লাহই জানে।’ বলে হন হন করে চলে গেলো মেয়েটি।

পুতুলের চিন্তায় আবার রাস্তা ধরে সামনের দিকেই এগোচ্ছে শান। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কি সেটাই ভাবার পালা। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ একজন বলল,’একি তুমি!!’

শান দেখলো তার পুরাতন অফিসের এক কলিগ রিয়াদ দাঁড়িয়ে আছে। তাই নিজেকে প্রস্তুত করলো সে,
‘কে কে ভাই?’
‘শান তোমার চোখ ঠিক হয়নি?’
‘রিয়াদ ভাই নাকি? গলার আওয়াজে তো সেরকমই লাগে।’
‘হ্যা আমি রিয়াদ। কিন্তু তোমার,,,,,’
পাশের একটা চায়ের দোকানে বসল তারা।

শানের কাছে সব শোনার পর রিয়াদ বলল,’তাহলে তো খুব বিপদে আছো তোমরা।’
সবই ভাগ্য ভাই।’
‘আচ্ছা জব করবে?’
‘আমার মত অন্ধকে চাকুরী কে দেবে ভাই?’
‘আমার এক চাচা একটা প্রাইভেট মিডিয়া ফার্মে বড় পোস্টে আছে। সেখানে তুমি চাইলে রেডিও স্টেশনে কাজ করতে পার।’
‘মানে?’
‘অর্থাৎ তোমার দৃষ্টি লাগবে না, কথা দিয়েই কাজ চলে যাবে। আর এমনিতেও তোমার গলা তো খুব সুন্দর। মনে নেই অফিসে সবাই আমরা তোমার গলার গান শুনতে চাইতাম?’
‘তাহলে তো খুবই উপকার হয় ভাই।’ (শান ভাবলো ‘ভালই হবে এই জব করলে, নিজের লুকানো কথা আরো বিশ্বাসপ্রবণ হবে আর আমিও বাবা মার জন্য কিছু করতে পারব।’)

‘চল আজকেই পরিচয় করিয়ে দিয়ে আসি তোমাকে।’
‘আচ্ছা ভাই।’

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরল শান। পুতুল তখনো আসেনি। তার মা বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিল চাকুরী পেয়েছে সে রেডিও স্টেশনে। আর ডিউটি রাতে৷ ২ টায় শেষ অফিস৷
শানের বাবা মা চিন্তায় পড়ল। চোখে দেখতে পায় না তার উপর এই রাত বিরাতে কিভাবে যাবে ছেলেটি।
তবে শান তাদের আশ্বাস দিল সে পারবে৷ রিক্সায় যাবে আবার আসবে।

তখনই পুতুল আসল। কালকে ওই ব্যবহারের পর শানের মা পুতুলের সাথে কথা বলে না। তাই পুতুল বলল,’ আমি ঘরে গেলাম, আজ খাব না, ভাল লাগছে না শরীর।’
শানের মা সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করলো না। শান বলল,’আমিও যাব।’
রুমে এসে বোরকা খোলার পর শান খেয়াল করলো পুতুল সকালে যে শাড়ি পড়ে গেছিলো সেটা আর এইটা এক না। চোখ কুচকে গেল তার। তাও কিছু বলল না। ফ্রেশ হয়ে আসল পুতুল।
বেলকনিতে ভেজা শাড়িটা নাড়তে দিতে গেল। শানও বেলকনিতে উলটো দিকে দাঁড়িয়ে আছে।

শান তার দিকে ফিরে হঠাৎ সদ্য নাড়তে দেয়া শাড়িটায় দাত দিল। তারপর পুতুলকে বলল,’এই শাড়ি কোথায় পেলে?সকালে তো এই শাড়ি পড়েছিলে না?’

পুতুলের মুখে ভয়ের আভা দেখা গেলো। চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। থতমত খেয়ে বলল,’তুমি কিভাবে জানলে?’
‘সকালে ইস্ত্রি করার সময় আমি শাড়িটা ধরেছিলাম, সুতি কাপড়ের ছিল। এটা তো শিফনের শাড়ি মনে হচ্ছে যেরকম আমি তোমাকে গিফট করেছিলাম, তোমার খুব পছন্দের ছিল।
পুতুল হঠাৎ কি মনে করে বলল,’আরেহ এটা তো তোমার দেয়া শাড়িই। আলাদা করে ব্যাগে নিয়েছিলাম।’
কি জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা বলে দিল পুতুল। শান পুরো অবাক। তার অন্ধত্ব এর সুযোগ নিয়ে কি কি বলছে সে।
‘কিন্তু এটা তুমি কেনো নিয়ছিলে?’
‘আজকে অফিস ছুটি নিয়েছি আগেই। বান্ধবীর ছোট মেয়ের জন্মদিন ছিল। দাওয়াতে আমরা কয়জন বান্ধবীই ছিলাম। আসলে আমাদের আজকে থাকার প্ল্যানিং ছিল তার বাসায়। তার স্বামী বিদেশে তো, একা থাকে তাই। বুঝোই তো বাচ্চার জন্মদিন। কেক গায়ে মেখে একাকার করে দিয়েছে পিচ্চি মেয়েটা। তাই আমাকে শাড়িটা চেঞ্জ করতে হল। থাকতেই চেয়েছিলাম ওখানে কিন্তু তোমার কথা ভেবে চলে আসলাম।’

বাহ কি সুন্দর বানোয়াট কথা বলে দিল পুতুল। শুনেই হাসি আসলো শানের। তবুও কিছু বলল না এখন।
‘আমিও বাইরে যাব। তুমি যেহেতু ঘাবে না ঘুমাও।’
‘কোথায় যাবে এই রাতে?’
‘সেটা নয় মায়ের কাছেই শুনে নিয়, যদি সময় হয়।’ বলে শান চলে গেলো।

রেডিও স্টেশনে আরজের কাজ দেয়া হল শানকে। শান টেনশনে ছিল পারবে নাকি। কিন্তু রিয়াদ ভাইয়ের চাচা তাকে সাহস জুগালো। এখন মোটামুটি ইজি হয়ে গেল কাজটা। প্রথম দিনেই শানের ভয়েস সবার হৃদয় কেড়ে নিল।

রাত ২.৩০, মাত্র বাসায় পৌছেছে শান। তার মা তার জন্য অপেক্ষা করছিলই। ছেলে চোখে দেখেনা, এত রাতে যদি কিছু হয়। কিন্তু তারা তো আর জানে না কিছু। তবে আসার সময় একটা অদ্ভুত দৃশ্য খেয়াল করেছে শান। তাদের পাশের বাসার বেলকনি থেকে কারো ফুফানোর আওয়াজ আসছিল। ভাল করে খেয়াল করে দেখলো সকালের সেই মেয়েটা। বেলকনিতে দাড়িয়ে কেদে যাচ্ছে। শান কয়েক মুহুর্ত অবাক হয়ে তাকালেও বেশি কিছু ভাবেনি।

মাত্র রুমে ঢুকল সে। ঘুমাচ্ছে পুতুল, সেই মায়াবী মুখ যা দেখার জন্য অফিস থেকে প্রায় ছুটেই বাড়িতে ফিরত শান। মায়াবী গড়নের মুখটা দেখেই যেন সারাদিনের ক্লান্তি দূর করত সে। শরীরের পোশাক ঠিক নেই, ঘুমানোর সময় অবশ্য পুতুলের এটা আগেও হত। মুচকি হাসলো শান।
হঠাৎ ঘাড়ের দিকে নজর পরল শানের। মুহুর্তে চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। পুতুলের ঘাড়ের পাশে আরেকটু কাধের দিকে একটা তিল। যেটা শানকে বার বারই আকৃষ্ট করত। কত শত চুমু যে সেখানে দিয়েছে শান তার ঠিক নেই। আর আজ সে জায়গায়ই একটা দাগ। যেটাকে লাভ বাইট বলে। খুব তাজা দাগটা, মনে হয় আজকেই দেয়া হয়েছে।

চোখ লাল হয়ে উঠছে ক্রমশ শানের। মনে ইচ্ছা হচ্ছে এখনই এক ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দিক। সব কিছুর কৈফিয়ত চাইবে, কিন্তু আবার মন বলছে তাহলে তো যেকোনো কারণ দেখিয়ে পুতুল বাচতে পারে, নিজের চোখে সব সত্য দেখতে চায় শান। খুব কষ্টে মনকে মানিয়ে নিল সে।

পরের দিন সকাল হতেই শান পুতুলের পিছু নিল। এবার আর কোনো ভুল নয়। শান গাড়িটার নম্বর থেকে কালকেই গাড়ির মালিকের ডিটেইলস জেনেছে। আশ্চর্য হলেও এটা পুতুলের অফিসের কারো নয়। সাব্বির নামের একটা ছেলের। সে নাকি কয়েকটা গ্যারেজের মালিক।

পুতুলকে আজকেও সেই গাড়ি তুলে নিল। আজ শান পেছনে একটা সি এন জি নিয়েছে। কিন্তু গাড়ি তো পুতুলের অফিসের দিকে যাচ্ছে না। অবাক হলেও পেছনে যেতে লাগলো শান। গাড়িটা দ্রুত চলছে৷ শান সি এন জি চালককে আরো দ্রুত চালাতে বলছে। কিন্তু হঠাৎ গাড়িটা ভিড়ের আড়ালে মিশে গেলো। একটা সি এন জি তো আর প্রাইভেট কারের গতির সাথে পারবে না! বিরক্ত হল আজকেও সে। অগত্যা সি এন জি কে পুতুলের অফিসের ঠিকানা দিল। অফিসের সামনে নেমে আবার অন্ধের অভিনয় শুরু হল তার।

অফিসের সামনেই রিসেপশন। সেখানে গিয়ে পুতুলের কথা জিজ্ঞেস করলে রিসেপশনিস্ট এমন ভাব করলো যেন চিনতেই পারলো না। পাশ দিয়ে আরেকটা মেয়ে যাচ্ছিল। রিসেপশনিস্ট তাকে জিজ্ঞেস করলো,
‘ম্যাম ইনি পুতুল নামের কারো কথা জিজ্ঞেস করছে।’
‘কিহ, পুতুল!!’
শান মেয়েটিকে দেখে বুঝলো মেয়েটি এই অফিসেই কাজ করে।
‘মেয়েটি আবার বলল,’আপনি কে, আপনাকে তো চিনতে,,,’
‘আমি পুতুলের এক আত্মীয়। চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছি ঢাকা। উনি কোথায় বলা যাবে?’

‘কিন্তু পুতুল তো এ অফিসে থাকে না।’
‘মানে?’
‘মানে পুতুল তো ছয় সাত মাস হবে এই চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে!!!’

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here