অদৃষ্টচর #written_by_Nurzahan_Akter_Allo #Part_06

0
80

#অদৃষ্টচর
#written_by_Nurzahan_Akter_Allo
#Part_06

আদ্রিয়ান ওর সব পেশেন্ট দেখে চেয়ার থেকে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই আরেকজন এসে উপস্থিত হলো৷ আদ্রিয়ান আবার বসে পড়লো। কেবল আসা ভদ্রলোকের রিপোর্ট দেখে কিছু সময় আলোচনা করে নিলো। এরপর নিজের কেবিনে গিয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিলো। ঘড়িটা দেখে সে ওটির ড্রেস পড়ে ওটির দিকে চলে গেল। এখানে পর পর চারটা ওটির রুম। আদ্রিয়ান যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। একটা মহিলার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে। তাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। ছোট্ট বাবুটা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। কিন্তু বাবুটার বাবা মেয়ে বাবু চাই না। সে কিছুতেই এই বাবু নিবে:না। নার্সরা এত বুঝাচ্ছে। তাও উনি একটা কথায় বার বার বলছে, এই বাবু সে নিবে না।

আদ্রিয়ান এক পা এক পা করে ওখানে গিয়ে দাঁড়ালো। নার্সের কোলের বাবুটাকে সে কোলে নিলো। বাবুটা শুভ্র তোয়ালেতে পেঁচানো আছে। অাদ্রিয়ান মুচকি হেসে বাবুর গালে আলতো করে টোকা দিলো। বাবু চোখ মেলে তাকাচ্ছে। নয়টা মাস মায়ের পেটে থাকার পর পৃথিবীর আলোর চোখে লাগছে। এজন্য ঠিক মতো তাকাচ্ছে না। আদ্রিয়ান বাবুটাকে কোলে নিয়ে মুচকি হেসে বললো,

–“রাজকন্যা! আমাদের এই পৃথিবীতে আগমনের জন্য আপনাকে জানায় সুস্বাগতম। আপনার মতো পবিত্র ফুল কেন এই অমানুষের ঘরে জন্ম নিলেন? এটা মোটেও ঠিক করেন নি। যে নিজের ওসরজাতকে স্বীকার করতে রাজি না। তার গৃহে কেন আল্লাহর রহমত নিয়ে আসলেন? উনি তো কাপুরুষ। এজন্য আপনাকে অস্বীকার করছে। নিজের সৃষ্টিকর্তার উপহারকে অস্বীকার করছে। সে নিজেই তো একজন কাপুরুষ। আপনাকে কিভাবে আগলে রাখবে বলুন? উনার সাথে সাথে পৃথিবীর সব ছেলেদেরকেই খারাপ তো করছেনই, এমনকি উনি একজন ব্যর্থ বাবা হয়ে সব বাবাদের গায়েও অমানুষের তকমাটা লাগাচ্ছে ।”

আদ্রিয়ানের কথা শুনে বাবুর বাবাও চুপ করে গেছে। আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে ওই লোকের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে একদম শান্তভাবে বললো,

–“আপনার বউ কারো সাথে পরকিয়া করতো?”
–“ন না না তো।”
–“আপনি কি উনার কবুল বলে বিয়ে করা হাজবেন্ড?”
–“হ্যা।”
–“আপনি কি উনার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন?”
–“হ্যা।”
–“তাহলে বলছেন আপনারই স্পার্ম থেকে এইটা বাবুটার জন্ম তাই তো?”
–“হ হ্যা।”
–“তাহলে বাবুটাকে মানতে পারছেন না কেন? আল্লাহর রহমতে তো এই বাবুটা আপনার শরীরের অংশ থেকেই জন্মেছে। তাহলে বাবুটাকে কিছু করার আগে, আপনাকেই তো মেরে ফেলা উচিত।”

লোকটা আর কথা বলার ভাষা পেল না। লোকটি লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো। আদ্রিয়ান লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো,

–“বাবুটা যখন বড় হবে, আর আপনার করা এই কাজের কারণটা জানতে চাইবে। তখন তাকে উত্তর দিতে পারবেন তো? আল্লাহ যদি চাই, তাহলে আপনাকে বৃদ্ধ বয়সে এই বাবুর হাতের একফোঁটা পানি খেয়েই আপনার মৃত্যু হতে পারে। মেয়েকে অবহেলা করবে না‌। এটা মনে রাখবেন, এই মেয়েটাই স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালার তরফ থেকে আপনার জন্য উপহার হিসেবে এসেছে।”

আদ্রিয়ান বাবুটাকে ওই লোকের হাতে তুলে দিলেন।এরপর সে ওটির দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। লোকটি বাবুকে কোলে নিয়ে কেঁদে দিলো। আদ্রিয়ান আর পিছু ফিরে তাকালো না। যদি লোকটা লজ্জা পায় এটা ভেবে। লোকটি বাবুকে অসংখ্য আদর দিলো। বাবার কান্না দেখে বাবুটাও চোখ মেলে বাবার দিকে তাকালো। হয়তো উনি উনার ভুল বুঝতে পেরেছে। সমাজের দিক বিবেচনা করে এমন ভুল করে ফেলেছিলো।

রুপ এখনো বাসায় ফিরতে পারেনি। পুলিশ তাকে লকাপে বন্দী করে রেখেছে। রুপ চুপ করে মেঝেতে বসে আছে। অনেক উঁচুতে একটা ছোট জানালা আছে। সেই জানালা দিয়ে আলো আসছে। রুপ সেদিকেই তাকিয়ে আছে। এভাবে কি আর বসে থাকা যায়? ওর প্রচুর ঘুম পাচ্ছে। এইবার দিয়ে তিনবার হাই তুললো সে। ওর যেহেতু ঘুম পাচ্ছে। তাই অযথা বসে না থেকে ও দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। সে এখন ঘুমাবে। এই মূহুর্তে ঘুমানোর মতো শান্তির কিছু আছে বলে ওর মনে পড়ছে না।

শ্রেয়ানের মাথা কাজ করছে না। কালকে রাতের ঘটনার পর থেকে চোখ বন্ধ করতে পারছে না। ওর মনে হচ্ছে চোখ বন্ধ করলেই সে আসবে। আবার ওর গলা চেপে ধরবে। শ্রেয়ানের হাতের মুঠোয় থাকা চুল গুলো সে রেখে দিয়ে দিয়েছে। শ্রেয়ান একা একা গভীরভাবে কিছু চিন্তা করলো। ওর মাথাতে অন্য কিছু ঘুরছে। ওকে বাইরে বের হতে হবে। কিন্তু ওর আম্মু কিছুতেই এখন ওকে বের হতে দিবে না। এখন শুধু ওর সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা। ওর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য সে উন্মোচন করেই ছাড়বে। যদি ওর প্রাণ সংশয় হয় তবুও সে থামবে না।

রাহীদ, রুপের আব্বু-আম্মু কিছুতেই রুপের জাবিন করাতে পারলো না। কারণ উপর মহল থেকে কড়াভাবে নিষেধ আছে। এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। রুপের এখন বাইরে বের হওয়াও রিস্ক। পাবলিক ওর উপরে খুব রেগে আছে। সাতটা যুবককে খুন করেছে। এই ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। রুপের আম্মু তো কেঁদে কেঁদে হয়রান। উনাদের আদরের মেয়ে কিনা লকাপে বন্দী আছে। বাবা-মা হিসেবে তারাও কিছু করতে পারছেনা।

রুপকে একটা রুমে আনা হয়েছে। পুলিশ অফিসার সাদিফ বসে আছে রুপের সামনে। রুপকে ঘুম থেকে উঠিয়ে এখানে আনা হয়েছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ার ফলে ওর চোখ লাল হয়ে আছে। চুলের বেনুনী ঢিলে হয়ে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সাদিফ রুপের দিকে একটা ছবি এগিয়ে দিয়ে বললো,

—“এই মেয়েটাকে চিনো?”

–“বলবো! তার আগে আপনি আমার থেকে দশ হাত দূরে সরে বসুন। নাহলে আমার একটা কথার আনসারও করবো না।”

সাদিফ কিঞ্চিৎ অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করলো না। রুপের কন্ঠে রাগ প্রকাশ পাচ্ছে। তবে সাদিফ একচুলও না সরে ঠাঁই বসে থাকলো। রুপ এমনভাবে সাদিফের দিকে তাকালো। যেন রুপ ওকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। এই প্রথম কোনো মেয়ে ওর সাথে এত রুড ব্যবহার করছে। সাদিফ ওদের সামনে থাকা টেবিলের উপর রাখা পেনটাকে হাতে নিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

–“বাহ্! তোমার মাঝে দারুণ একটা ব্যাপার আছে। আমি সত্যি এতদিন এমন কাউকেই খুঁজছিলাম।
হিংস্র বাঘিনীর সাথে লড়াইয়ে নামার মজাই আলাদা। ”

রুপ কোনো কথা বললো না। সে চুপ করে বসে আছে। সাদিফ রুপকে রাগিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। রুপ এখন অবধি টু শব্দ করেনি। সাদিফের মন চাচ্ছে মেয়েটাকে থাপড়ে গাল লাল করে দিতে। সাদিফ উঠে রুপের থেকে দশ হাত দূরে গিয়ে বসলো। রুপের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। সাদিফ সেটাও খেয়াল করলো। সাদিফ উঠে দাঁড়ালো রুপকে আর্টটা করা ছবিটা দেখাতে। রুপ সাদিফকে বসতে বলে সে নিজেই টেবিলের উপর থেকে ছবিটা নিয়ে দেখলো। রুপ সাদিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

–“এটা আমার বেস্টু মিমি। সে এমন জঘন্য করে আমার জানা ছিলো না।”
–“কফিশপের ওই ছেলেটা কে ছিলো?”
–“মিমির কথামত আমি কফিশপে ওই ছেলের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম।”
–“মিস রুপ, আপনি ছেলেটাকে থাপ্পড় মেরেছিলেন কেন?
–“সে আমাকে টিজ করে কথা বলেছিলো।”
–“আপনি যে আপনার বান্ধবীর সাথে জড়িত না, এটা আমরা কেন মানবো?
–“মানতে তো বলছি না। আমি যে জড়িত, সেটা আগে প্রমাণ করুন।”
–“নিজেকে খুব চালাক ভাবেন, তাই না?”
–“এখানে চালাক ভাবার মতো কিছু তো দেখছি না। তবে আমি কিছু করিনি। এটা প্রমান হওয়ার পর এই কথার আনসারটা আপনাকে দিবো।”
–“ওকে।”

সাদিফ উঠে চলে গেল। কিছুক্ষণ আগে একজন পুলিশ গিয়ে ওই ছেলেটাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে এসেছিলো। ওই ছেলেটার নাম রিমন। আর রিমন যেহেতু ওই খুনী মেয়েটা দেখেছে, সেহেতু ওই তো খুনীকে চিনবে। রুপ তখনও দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিলো। পুলিশ রিমনকে নিয়ে লকাপের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। রিমনের বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। আবার সেই হিংস্র মেয়েটাকে দেখবে। এটা ভাবলেই ওর কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছে। রিমন ঘুমন্ত অবস্থায় বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটাকে দেখে ওর মনে হলো, একটা পরী ঘুমিয়ে আছে। ছেলেটা পুলিশের দিকে তাকিয়ে না সূচক মাথা নাড়ালো। যার মানে এই মেয়ে না। পুলিশ রিমনকে নিয়ে একটা রুমে গেল। ওখানে একজন আর্টিস বসে আছে। রিমণ খুনীর বর্ণনা দিতে লাগলো। আর সেই বর্ণণা অনুযায়ী আর্টিসটা আর্ট করতে থাকলো। আর্ট করা হয়ে গেলে পুলিশ কাজগটা নিয়ে চলে গেল। তারপর সেই আর্ট করা কাগজটা পুলিশ অফিস সাদিফকে দেখলো। আর সাদিফ সেই আর্ট করা ছবিটা নিয়ে রুপকে দেখালো। আর রুপের থেকেই মিমির নামটা জানতে পারলো।

পবিত্রের দাদু ওনার রুমে বসে আছে। কনিষ্ঠ আঙ্গুলে প্রথম তিনটা গিরা গুনে গুনে কিছু একটা বললো। এরপর তিনবার শিষ বাজালো। উনার সামনে থাকা পিতলের গামলাতে পানি ভর্তি করে রাখা আছে। সেই গামলাতে উনি ফু দিলো। এরপর যা দেখলো তাতে উনি নিজেও আঁতকে উঠছে। সেই পানি ভর্তি গামলাতে দুধের মতো সাদা বিরাট একটা সাপের ছবি ভেসে উঠেছে। সাপটার শরীরে অন্য কোনো রঙের চিহ্ন নেই। দুধের থেকে সাদা বেশি হবে তাও কম হবে না। তার মানে আসাদের মামার আকা সেই চিহ্নটার মানে সর্প অর্থাৎ সাপ।

To be continue………!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here