বুকের_বা_পাশে 🌿🌿 #written_by_Nurzahan_Akter_Allo #Part_36

0
63

#বুকের_বা_পাশে 🌿🌿
#written_by_Nurzahan_Akter_Allo
#Part_36

তুয়া অসহায় দৃষ্টিতে ওর আব্বু দিকে তাকালো। তুয়ার আব্বু তুয়ার ফেস দেখে হেসে দিলো। বাকিরাও মুখ টিপে টিপে হাসছে। প্রত্যয় বসে বসে তুয়ার কর্ম কান্ড গুলো মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রত্যয় ওর নিজের খারাপ লাগাকে পাশে রেখে দিব্যি ওর মুখে হাসি ফুটিয়ে সবার সাথে কথা বলছে। এখন এমন একটা পরিস্থিতি চাইলেও আপাতত কিছু বলার ভাষা নেই।এদিকে তুয়া ঠোঁট উল্টে হনহন করতে করতে ওর আম্মুর কাছে চলে গেল। আর বাকিরা হো হো করে হেসে দিলো।তুয়ার আম্মু রান্না ঘরে রান্না করছিলো, তুয়া গিয়ে ওর আম্মু কে জড়িয়ে ধরলো। তুয়ার আম্মু পেছন ফিরে তুয়ার কপালে একটা আদর দিয়ে ধরা গলায় বললো,

— “আম্মু রে তুই আমার মেয়ে, আর আমি তোর মা। তুই আমার কলিজার টুকরো। আমার কাছে নাই বা অভিনয় করলি।” (আম্মু)

— “আম্মু আমি ঠিক আছি।আমাকে নিয়ে আর টেনশন করো না।” (তুয়া মুচকি হেসে)

— “আম্মু রে, আমাদের মেয়েদের জীবনটাই ত্যাগের। এই ত্যাগ করার জন্যই আমাদের জীবনে অনেক কিছু অপূর্ণ থেকে যায়। প্রত্যয়ের মতো ছেলে হয় না রে আম্মু, ওর সাথে মানিয়ে নে। আমি তোর আম্মু আমার কাছে তো কিছু লুকাতে পারবি না।” (আম্মু)

— (নিশ্চুপ)

— “আম্মু রে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে না, মন থেকে প্রত্যয়কে মেনে নে। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কারো সাথে সংসার করা যায়, কিন্তু ভালবাসা যায় না। একটা সংসারের ভিত্তি হলো ভালবাসা, বিশ্বাস, ভরসা এই তিনটে জিনিস। দেখিস মা, প্রিয়মকেও আল্লাহ অনেক ভাল রাখবে, আল্লাহ এতটা নিষ্ঠুর না।” (তুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে)
— “হুম।”

— “তুই আর প্রত্যয় দুজন দুজনের পরিপূরক হয়ে থাক।প্রত্যয় যদি জানে তুই তোর মনের বিরুদ্ধে ওকে মেনে নিয়েছিস। তাহলে প্রত্যয় খুব কষ্ট পাবে রে আম্মু। প্রত্যয় এমন একটা ছেলে ওর বুক ফাটে তবু্ও ওর মুখ ফোটে না। ওর কথাটাও একবার ভেবে দেখ মা।” (আম্মু)

— “আম্মু আমি প্রত্যয়কে মন থেকেই মেনে নিয়েছি। তুমি সব কথা ঠিকই বলেছো। আমি মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ওর সাথে ভাল থাকার অভিনয় করলে প্রত্যয় এটা খুব সহজে ধরতে পারবে। এজন্য খুব কষ্টও পাবে। আর এখানে তো ওর কোন দোষ ছিলো না। তবুও আমার জন্য অনেক কিছু ওকে সাফার করতে হলো। আর তোমার সামনে আমি তোমাকে ধরে কথা দিলাম। আমি প্রত্যয়কে মন থেকেই মেনে নিয়েছি। এবার আমি ওর যোগ্য অর্ধাঙ্গিনী হওয়ারই চেষ্টা করবো।” (তুয়া)

— “হুম মা দোয়া করি তোরা সবাই খুব ভাল থাক। আমি জানি তুই পারবি।” (আম্মু)
— “আম্মু আজকে আমাকে খাইয়ে দিবে? কতদিন তোমার হাতে খাইনি।” (তুয়া মুচকি হেসে)
— “হুম দিবো।”

এরপর তুয়া ওর আম্মু সাথে হাতে হাতে কাজ করলো।তিন্নি, তুয়া আর তুয়ার আম্মু তিনজনে গল্প করছে, আর মাঝে মাঝে হাসছে। ওদের হাসির শব্দ ড্রয়িংরুমে বসে থেকেই শোনা যাচ্ছে। তারপর তুয়াদের বাসাতেই রাতের খাবার খেয়ে নিলো সবাই।

প্রত্যয় আর কিছুক্ষণ বসে সবার সাথে কথা বলে ছাদে গেল। তুয়া ড্রয়িংরুমে এসে দেখে প্রত্যয় নেই। তুয়া ওর বাবার সাথে কিছুক্ষণ মন খুলে কথা বললো। তারপর প্রত্যয়দের বাসাতে গেল কিন্তু ওখানেও প্রত্যয় নেই। তুয়া কিছু একটা ভেবে ছাদে গেল। তুয়া দরজার থেকে উঁকি মেরে দেখলো কেউ ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তুয়া সেদিকেই এগিয়ে গেল। প্রত্যয় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তুয়া নিঃশব্দে প্রত্যয়ের পাশে এসে দাঁড়ালো।প্রত্যয় পেছনে না তাকিয়ে গম্ভীর সুরে বললো,

— “কিছু বলবি?”
— “মিঃ হাজবেন্ড, আপনি এখানে করছেন?”
— (নিশ্চুপ)

— “ওহ বুঝেছি, পরীদের সাথে প্রেমালাপ করতে এসেছেন বুঝি? হা হা হা, আমি কি আপনাদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটালাম?” (তুয়া)

— “জানিস তুয়া, আমি কারো সহানুভূতি, দান, শান্তনা এসব নিয়ে চলতে পছন্দ করি না। আর এখন তুই আমার সাথে নাই বা অভিনয় করলি। আমি তো তোকে বলিনি আমাকে দয়া দেখাতে। তাহলে এমন ব্যবহার করে তুই কি বোঝাচ্ছিস যে তুই সব মেনে নিয়েছিস? আমাকে কি এখন তোর দয়ার পাত্র হয়েই বাঁচতে হবে।” (প্রত্যয় শান্ত সুরে)

— (নিশ্চুপ)

— “আর যাই করিস আমাকে দয়া দেখাস না। আমি কারো দয়া নিয়ে বাঁচতে পারবো না। সবাইকে বোকা বানালেও আমাকে বোকা বানাতে পারবি না। কারণ কি জানিস? আমি তোর চোখের সব ভাষাই পড়তে পারি।” (প্রত্যয়)

— “হুম জানি। আর তোমাকে দয়া দেখানোর সাহস বা যোগ্যতা আমার কোনটাই নেই। সত্যি আমি এবার সব মেনে নিয়ে, নিজেকে সামলে নিতে চাচ্ছি।” (তুয়া জোরপূর্বক হেসে)

— “সবটা এত সহজে ভুলতে পেরেছিস? পারবি সব ভুলে আমার সাথে থাকতে? সময় নে ঠিক আছে, আমি মেনে নিবো। কিন্তু মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমার সাথে ভালো থাকার অভিনয় করিস না। তোর এমন ব্যবহার আমি সহ্য করতে পারছি না।” (প্রত্যয় তুয়ার বাহু ধরে)

— “তাহলে তুমি এখন আমাকে কি করতে বলছো?”

— “কাঁদবি, তুই খুব খুব কাঁদবি। আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদবি। আমি তোর এই জোরপূর্বক হাসিটা দেখতে চাই না। নিজের খারাপ লাগা, এক বুক কষ্ট নিয়ে আমার সামনে হাসবি না। আমার সামনে ভালো থাকার অভিনয় করবি না। বুঝতে পারলি তুই? বুঝিছিস আমার কথা?আমি তোর অভিনয় দেখতে চাই না। নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য হলেও তুই কাঁদবি।” (প্রত্যয় তুয়ার বাহু ধরে)
— (নিশ্চুপ)

— “ভালবাসি আমি তোকে। এজন্য তোর ভালোর জন্য আমি সব করতে পারি। যদি কখনও আমাকে ভালবেসে আমার কাছে আসিস, তাহলে তোকে ফিরানোর সাহস আমার নেই। আমার মনের দরজা তোর জন্য সব সময় খোলা আছে, আর থাকবেও। তোর উপরে আমি কখনও কোনো অধিকার জোর করে চাপিয়ে দিবো না। তোর স্থান আমার বুকের বা পাশে। তোকে আমি আমার সবটুকু ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখবো। আমাকে নিয়ে তোর যত খারাপ লাগা আছে,আমাকে বল। আমি সব শুধরে নিবো, তবুও তুই মিথ্যে ভাল থাকার অভিনয় করিস না। আমি মিথ্যের উপর ভিত্তি করে আমাদের সম্পর্ক গড়তে চাই না।” (প্রত্যয়)

— “আমি সবটা মেনে নিয়েছি। দেখো এবার, আমি তোমার লক্ষী বউ হয়ে দেখাবো। আমাকে একটু সময় দাও।” (তুয়া ধরা গলায়)

— “সময় নে ঠিক আছে। তাহলে এখন তুই ভাল থাকার অভিনয় করছিস কেন? আমার লক্ষী বউ হতে হবে না, তুই যেমন আছিস তোমনটাই থাক। শুধু তোর মনের এক কোণে আমাকে একটু জায়গা দিস। আমি তোর পাশে আছি। প্রতিটা পরিস্থিতিতে আমাকে তুই তোর পাশে পাবি। প্রিয়মের কথাও যদি মনে পড়ে, তাহলে আমার বুকে মাথা রেখেই কাঁদবি। আমি এই নিয়েও কোন অভিযোগ করবো না। তবুও তুই ভাল থাকার অভিনয় করিস না তুয়া। আমি সহ্য করতে পারছি না।” (প্রত্যয়)

তুয়া প্রত্যয়ের কাছে আবার ধরা খেলো। তুয়া সত্যি সত্যি এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। প্রত্যয় তুয়াকে একটানে ওর বুকে মাঝে লুকিয়ে নিলো। তুয়া প্রত্যয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে,

— “কেন, কেন আমি বারবার তোমার কাছেই ধরা খাই?কেন তুমি আমাকে এত বোঝো? কেন তোমাকে কিছু বলার আগেই বুঝে ফেলো? এতকিছুর পরেও কেন আমাকে সহ্য করছো তুমি?” (তুয়া কেঁদে কেঁদে)

— “এর উত্তর তো তোর জানা তুয়া। একটা শব্দের জন্য আমি তোর কাছে আবদ্ধ। শুধু “ভালবাসি ” এই একটা শব্দের জন্য।” (প্রত্যয় শান্ত সুরে)

— “আমি তোমার যোগ্য না। আমি তোমার ভালবাসার দাম কখনই দিতে পারিনি। আমি তো নিজেই সব দিক থেকে হেরে বসে আছি। আমি এখন সর্বহারা পথিক।তোমাকে আমি কিভাবে ভাল রাখবো?” (তুয়া কেঁদে কেঁদে)

— “এতকিছু জানি না। তোর আমাকে ভালবাসা লাগবে না, আমার ভালবাসাটাই যথেষ্ট। তোকে আমি হয়তো প্রিয়মের মতো ভালবাসতে পারবো না। কিন্তু আমার বুকের যত ভালবাসা আছে। সেই সব ভালবাসাটুকু আমি তোকে উজার করে দিতে পারবো।” (প্রত্যয়)

— “তুমি আমাকে একটু সময় দাও। আমার একটু সময়ের বড্ড বেশিই দরকার। আমি সব ভুলে যেতে চাই, আমি নিজেকে সামলে নিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।আমিও এবার ভাল থাকতে চাই। আমিও এই নিষ্ঠুর কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চাই। আমি আর পারছি না এই দহনে দগ্ধ হতে।” (তুয়া কেঁদে কেঁদে)

— “আমি আছি তো তোর পাশে। শুধু তুই নিজেকে একটু শক্ত কর। দেখবি সবটা ঠিক হয়ে যাবে।” (প্রত্যয় স্বযত্নে জড়িয়ে ধরে)

এরপর তুয়া আর কোন কথা বলেনি। কিন্তু প্রত্যয়ের বুকে মাথা রেখে খুব কেঁদেছে। প্রত্যয়ের বুকের শার্ট ভিজে গেছে তুয়ার চোখের পানিতে। প্রত্যয় তুয়াকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তুয়া এখন কাঁদুক, খুব কাঁদুক। কারণ কাঁদলে মনের কষ্টটা কিছুটা হলেও কম হয়।

এভাবে কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় তুয়া প্রত্যয়ের বুকে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে। প্রত্যয়ের শার্ট খামছে ধরেই তুয়া কাঁদছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে তুয়ার হাত ছেড়ে দেওয়া জন্য প্রত্যয় তুয়াকে মুখের দিকে তাকালো। আর দেখলো তুয়া সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে গেছে। ছাদের মেঝেতে দুইজনেই বসে আছে। তুয়া প্রত্যয়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। আর প্রত্যয় তুয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রত্যয় গভীর ভাবে তুয়ার কপালে একটা আদর দিলো।প্রত্যয় এক হাত দিয়ে ওর বুকে তুয়াকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। যাতে তুয়ার মাথাটা প্রত্যয়ের বুকে থেকে সরে না যায়। মাথার উপর লক্ষ লক্ষ তারকাদের মেলা। আর খোলা ছাদের উপর প্রত্যয়ের বুকের মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে তুয়া। এই সুন্দর মুহূর্তটাকে প্রত্যয়ের মোটেও নষ্ট করতে ইচ্ছা করছে না। প্রত্যয়ের কাছে এটাই ওর জীবনের বেস্ট মুহূর্ত বলে মনে হচ্ছে। তুয়ার মাথাটা এখন প্রত্যয়ের বুকে থাকাতে প্রত্যয়ের বুকটা যেন প্রশান্তিতে ভরে গেছে। ভালবাসার মানুষটা বুকে মাথা রাখলে যে বুকের ভেতর এত প্রশান্তি এসে ছুয়ে দেয়, এটা প্রত্যয়ের কাছে অজানায় ছিলো। প্রত্যয় তুয়ার দিকে তাকিয়ে বললো

— “তুই তো আমার লক্ষী বউ। খুব খুব ভালবাসি আমি আমার এই মিষ্টি বউটাকে। আমার বউটাকে আমি এতটা ভালবাসি যে, এটা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। নতুন করে তোকে লক্ষী বউ হতে হবে না।তুই যেমন আছিস, তেমনই থাক। আমার তো এই তুয়াকেই চাই।” (প্রত্যয় আদুরে সুরে)

কান্না করার জন্য তুয়ার চোখ দুটো ফুলে আছে। নাকটাও টিয়াপাখির মতো লাল হয়ে আছে। তুয়ার নাকটা দেখে প্রত্যয় আস্তে করেই তুয়ার নাকটা ধরে টানলো। আর ঘুমন্ত তুয়া বিরক্তবোধ করে ভ্রু কুচকে আবার ঘুমিয়ে গেল। তুয়ার এমন কাজে প্রত্যয় হেসে ফেললো। বেশি নড়াচড়া করলে তুয়া ঘুমাটা যদি ভেঙ্গে যায়, তাই প্রত্যয় ওভাবেই বসে থাকলো; ওর প্রিয়সীর মুখ পানে তাকিয়ে। আর এতেও প্রত্যয় অনাবিল সুখ অনুভব করতে পারছে।

প্রায় ১মাস পর__

প্রত্যয় এখন তুয়াকে একটু বেশি সময় দেওয়া চেষ্টা করে। তুয়াও আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিচ্ছে।প্রত্যয়ও যথেষ্ট সাপোর্ট করেছে তুয়াকে। প্রিয়ম সুইজারল্যান্ডে মডেলিং এর শো আর গান নিয়ে নিজেকে বিজি রাখে। প্রিয়মও আর নিজেকে দমিয়ে রাখেনি। তুয়ার জন্য একবুক ভালবাসা নিয়েই প্রিয়ম সামনে দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ব্যর্থ প্রেমিকের মতো প্রিয়ম নিজেকে গুটিয়ে রাখেনি। সময় আর নদীর স্রোতকে যেমন কখনই আটকে রাখা যায় না। তেমনি মানুষের জীবনটাও বহমান। তেমনি প্রত্যয়, তুয়া আর প্রিয়মের জীবনও থেমে নেই। বহমান স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে ওদের জীবনের প্রতিটা সময়।

To be continue….!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here