#বেলাদোনা (২১)
#ফাতেমা_তুজ
মনগড়া কিছু ভাবনায় ব্যগ্র হয়ে গেছে বেলা। হবার ই কথা। ইথানের বলা এক একটা সহজ শব্দ ওকে প্রচন্ড আকর্ষণ করে। কেন এতো আকুলতা? কেন এতো টা বিশ্বাস! অস্থির হয়ে উঠেছে মেয়েটি। এক টানে মাথার স্কাফ ফেলে দেয়। বেশ গরম। এখন কিছু টা আরাম লাগছে। তবে ভেতর টা উত্তপ্ত। শীতলতা খুঁজে চলেছে। মস্তিষ্কের নিউরন গুলো ও উল্টো পথের যাত্রী। সঠিক ভাবে ভাবনা আসে না। চেতনা হারা বলা চলে। ধপ করে মেঝে তে বসে পরে বেলা। চিকন নাকের মাঝ বরাবর ঘামের স্রোত নেমেছে। অসহ্য এক যন্ত্রণা চেপে ধরেছে গলা। ভার হয়ে আসে মাথা। ডুকরে কাঁদে মেয়েটি। বার বার ইথানের বলা কথা গুলো গোল চক্রের মতো করে চালাচ্ছে অন্তরের লুটপাট।
অন্য দিকে চলছে শাফায়াতের সাথে সম্পর্ক তৈরির জোগাড়। মস্তিষ্ক ভুগে দ্বিধাদ্বন্ধে। সমাধান পেয়ে ও যেন পায় না অদৃশ্য বলে। এক পর্যায় কল আসে। ইথানের কল। হুট করেই বেলার মন চঞ্চল হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মতো করে মুঠোফোন কানে তুলে। ওপাশের ব্যক্তি তখন রুদ্ধ শ্বাস ফেললো।
” কথা বলছো না কেন বেলা। ”
” আপনি আমায় কল করেছেন কেন? ”
” আমি অস্থির হয়ে আছি বেলা। ভালো নেই একটু ও। ”
” কল করবেন না আমায়। শুনেছেন? ”
” একটা কথা রাখবে প্লিজ। ”
বেলা ভাবলো নাকোচ করবে। পরক্ষণেই মস্তিষ্কের বিপরীত উত্তর এলো।
” বলেন। ”
” আমায় ক্ষমা করা যায় না? ”
” যায় না। ”
বেলার সরল উত্তরের কেঁপে উঠে ইথান। শুষ্ক অধরে জ্বিভ লাগিয়ে বলে–
” মানুষ ভুল করে অনুতপ্ত হলে তাকে ক্ষমা করতে হয় বেলা। আর না হলে মেরে ফেলতে হয়। তোমার নিকট দুটো অপশন ই উন্মুক্ত। আমি হাসি মুখে তোমার দেওয়া ভালোবাসা কিংবা গুলি বুক পেতে নিবো।”
বেলার স্থির অন্তর কেঁপে উঠে। ইথান কে বিশ্বাস করবে কি না এ নিয়ে দ্বিধায় ভুগে। অশান্তির বিচরণ সর্বাঙ্গে। শিউরে উঠে হঠাৎ। মন বলে মনের কথা শোন আর মস্তিষ্ক বলে বিবেকের কথা শোন।
নগ্ন চোখ গুলো বেলা কে দেখছে। কয়েক সেকেন্ডে মেয়েটির এমন পরিবর্তন যেন শাফায়াত কে বিচলিত হতে বাধ্য করেছে। বেলার ছলছল নয়ন শাফায়াতের অন্তরে বুনে সন্দেহের বীজ। বহু কষ্টে চেপে রাখা কথা গুলো মুখ ফুটিয়ে বলে শাফায়াত।
” কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত থাকলে প্লিজ আমায় জানাও বেলা। আমি সবার আগে তোমার বন্ধু। তুমি যদি এমন করো তো আমি কি করে থাকি বলো। ”
” তেমন কিছু না শাফায়াত। ”
” মেনে নিলাম তোমার কথা। তবে মনে রাখবে যে কোনো সমস্যা আমায় জানাতে দ্বিধা করবে না। আমি তাহলে কষ্ট পাবো।”
” তুমি খুব ভালো শাফায়াত। ”
” লজ্জা দিচ্ছো? ”
” না। লজ্জা কেন দিবো। সত্যি বলছি, তুমি খুব ভালো। ”
” আচ্ছা বাবা। এবার একটু হাসো। ”
বেলা হাসলো না। শাফায়াত এর দিকে নিরস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো। মনের ভেতর কেমন এক ধারার খচখচ করছে। শাফায়াত এক হাতে বেলা কে জড়িয়ে ধরলো। আলতো হাতে কপাল স্পর্শ করে বলল–
” মাথা ব্যথা করছে? ”
আজ বহু দিন পর ইথান কে এলোমেলো দেখলেন ভিকা। আলগোছে কাছে এসে দাড়ালেন। ছেলেটা কে যে প্রচন্ড ভাবে ভালোবাসেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নিজ সন্তান কে যতো টা ভালোবাসায় বড় করেছেন তার থেকে বেশি ভালোবাসা দিয়েছেন ইথান কে। হবার ই কথা। না হয়ে উপায় ই বা কি। হয়তো বিগড়ে যাওয়া ছেলের মুখ টি ইথানের মাঝে খুজেছেন বহুদিন। দীর্ঘনিশ্বাস লুকান ভিকা। আদুরে গলায় ডেকে বলেন–
” কি হয়েছে মাই বয়? এতো দিন পর বাড়ি এলে। তা ও মুখ টি শুকনো।”
” মন ভালো নেই মম। ”
” কেন? তুমি কি তোমার কাজে মন দিতে পারছো না? ”
” বিষয় টা তেমন না। ”
” সেটা তো মুখের ভঙ্গিমা তেই বোঝা যাচ্ছে। খুব অসহায় দেখাচ্ছে তোমায়। ”
” সত্যিই আমি খুব অসহায় মম। একটু বেশিই অসহায় যেন। ”
” তোমার কন্ঠ ঠিক লাগছে না। কি হলো বলো তো আমায়? ”
ভিকার কোলে মাথা রাখলো ইথান। এক হাত কপালে রেখে গভীর শ্বাস ছাড়তে শুরু করেছে। প্রতি টি নিশ্বাস যেন এক একেকটা মন খারাপ গল্প শোনায়। কিছু সময় যেতেই ইথানের চোখ হাসে আলোকরশ্মির মতো করে। ঠোঁটের দু পাশ হয় প্রসারিত। মুখ থেকে বের হয় এক একটা সুখ দুঃখের শব্দ।
” আমি একটি মেয়ে কে ভালোবাসি মম। খুব বেশিই ভালোবাসি সম্ভবত। বলা যায় নিজের থেকে ও বেশি। তবে সমস্যা হচ্ছে আমি এই গভীর অনুভূতি টা সঠিক সময়ে অনুভব করি নি আর বার বার তার প্রতি অন্যায় করেছি। তবে বিশ্বাস করো প্রথম থেকেই আমি ধীর ছিলাম সে কাজে। চেয়ে ও পারি নি অনেক অপরাধ করতে। অন্যায় করা থেকে বিরত থেকেছি। কিন্তু সে আমায় ভুল টাই বুঝেছে। আমার অন্তর্নিহিত সত্য টা দেখে নি। এতে অবশ্য তার দোষ নেই। তবে আমি যে তাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”
মুহূর্তেই কেঁদে ফেলে ইথান। ভিকার গাল বেয়ে ও নেমে যায় কয়েক বিন্দু। ছেলেটা তার খুব আপনজন। নিজ সন্তানের থেকে কোনো অংশে কম নয়। তবে বলা বাহুল্য ইথানের সাথে তার পরিচয় মাত্র ছয় বছর। এই সময় টা সংখ্যার দিক থেকে খুব অল্প হলে ও সেকেন্ড এর দিক থেকে খুব ই বড়। তাছাড়া ইথান আর ভিকার মাঝের মা ছেলের সম্পর্ক টা তদ্রুপ বিশাল ও বটে।
” বিচলিত হয় না মাই বয়। আমি বলছি তুমি নিজেকে প্রমান করতে পারবে। ”
” কি করে মম? ”
” নিজের সত্য টা মেলে ধরো উজাড় করে। চোখের উপর থাকা কালো পর্দা টা সরিয়ে দাও। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
” সেটা সম্ভব নয়। ”
” কেন? ”
” সময়ের বড় অভাব। হাতে গোনা এক সপ্তাহ মাত্র। ”
চিন্তিত ঠেকলো ভিকা কে। তিনি জানতে চাইলেন মেয়েটির নাম। ইথান যখন বেলা নাম টি উচ্চারণ করলো তখনি ভরকে গেলেন ভিকা। বেলা সম্পর্কে ইদানিং একটি কথা এসেছে তার কানে আর সেটা হচ্ছে বেলা মুসলিম। অজানা এক ভয় বাঁধলো ওনার অন্তরে। শুকনো ঢোকে ভিজিয়ে নিলেন গলা। এখন কি হবে?
এক বিশেষ নিষেধাজ্ঞা থাকা তে দীর্ঘদিন যাবত লোক সমাগমে গবেষণা করতে পারেন নি প্রফেসর আলবার্ট। সেই ব্যক্তি টি আজ গনমাধ্যমে উপস্থিত। তার বিশেষ আবিষ্কার তুলে ধরে পুরো পৃথিবী কে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আর সেটা হলো ক্যান্সার এর প্রতিষেধক।তিনি দাবি করেছেন এই ঔষধ যে ব্যক্তি গ্রহণ করবে তাকে ক্যান্সার স্পর্শ করতে পারবে না প্রায় পাঁচ বছর। এমন টাই আশা করেছিলেন প্রফেসর আলবার্ট। তার আগেই অপঘাতে মৃত্যু ঘটবে তিনি হয়তো ভাবতে ও পারেন নি। ল্যাব এর বাইরে নিরস ভাবে দাঁড়িয়ে আছে ইথান। হাত টা কাপছে। প্রফেসর এর মৃত্যু সংবাদ ওকে যেন এলোমেলো করে দিয়েছে। খোলা চোখে তাকিয়ে থাকে সে। ভেতর টা চঞ্চলতা হারিয়ে কেমন ধীর স্থির। আনমোনা হয়ে কতোক্ষন পায়চারি করলো তারপর ফোন করলো বুলেট কে।
” স্যারের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছো? ”
” মাত্র ই পেয়েছি ইথান। তখন থেকে সব কেমন অস্থির ঠেকছে। ”
” জানি না কি হতে চলেছে। ভালো কাজ কেউ সহ্য করতে পারে না তাই না? ”
” হয়তো। ”
একটু থেমে আবার বলল বুলেট
” রাগ করো না। তবে আমার মনে হয় বেলা কে বাঁচিয়ে আমরা ভুল করলাম।”
ইথান নিরুত্তর রইলো। ওপাশ থেকে পর পর কয়েক টা প্রশ্ন করলো বুলেট।কোনো টার উত্তর পেলো না।সামনে এগিয়ে গেল ইথান। প্রফেসর আলবার্ট এর লা’শ বের করা হচ্ছে। চোখ দুটো কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব যত্ন নিয়ে মেরেছে কেউ। চোখ বন্ধ করলো ইথান। বেলা কে বাঁচিয়ে সত্যিই কি তবে ভুল করলো সে? না না এটা ভুল নয়। সবার আগে তো ভালোবাসা। তাছাড়া বেলা নিজে ও কোনো দোষ করে নি। তাহলে তাকেই কেন ম’রতে হবে? কলে এখনো বুলেট। ইথান সচকিত হয়। দীর্ঘশ্বাস নামায়।খুব সহজেই দুঃখ প্রকাশ করে। তার সাথে জানায় বেলার জন্য এক সাগর সমান ভালোবাসা। বুলেট নিজেও সায় জানায়। ইথান কল রাখার পূর্বে বলে ‘আমি আজ ই আসবো বি ডি তে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো বেলা কে বোঝাতে। জানি না কি হবে তবে আমি শেষ চেষ্টা অবশ্য করবো। ”
চলবে

